হিন্দু বাঙালির হাতে ক্ষমতা না আসা পর্যন্ত এই জনগোষ্ঠী সুরক্ষিত হতে পারেনা : দীপক দে
বোকাজান, ১৬ ডিসেম্বর: "হিন্দু বাঙালির হাতে রাজনৈতিক ক্ষমতা না আসা পর্যন্ত এই জনগোষ্ঠী কখনও সুরক্ষিত হতে পারবে না। একটি জাতি সমৃদ্ধশালী হতে গেলে প্রথমে প্রয়োজন তার শিক্ষা এবং তারপর রাজনৈতিক ক্ষমতা অর্জন। সরকারি অনুদান পেয়ে একটি পরিবার সাময়িক ভাবে নিস্তার পেলেও জাতির ভবিষ্যৎ গড়ে দিতে পারে না।" -- গত ১৫ ডিসেম্বর কার্বি আংলঙ জেলার বোকাজান শহরে অনুষ্ঠিত এক সভায় এ মন্তব্য করেন "সারা অসম বাঙালি যুবছাত্র ফেডারেশন" -এর সভাপতি দীপক দে।
তিনি আরও বলেন, আগামি ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায় ন্যূনতম দশজন হিন্দু বাঙালি বিধায়ক নির্বাচিত করে বিধানসভায় পাঠাতে হবে। হিন্দু বাঙালিদের দাবিয়ে রাখার জন্যই অসমে দশ বছর অন্তর অন্তর আন্দোলন এবং সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষ হয়েছে, যাতে হিন্দু বাঙালিরা তাদের মনোবল হারিয়ে ফেলেন। প্রতিটি আন্দোলনের নিষ্কর্ষ হচ্ছে এই জনগোষ্ঠীকে কী ভাবে বঞ্চিত করা যায়। এই উপত্যকার রাজনৈতিক পীঠস্থান হচ্ছে হোজাই বিধানসভা কেন্দ্র। কিন্তু হিন্দুত্ববাদী সরকার ক্ষমতায় এসে বাঙালির স্বাভিমান স্বরূপ এই বিধান সভা কেন্দ্রটিকে কেটে টুকরো করার দরুন ভবিষ্যতে এখান থেকে আর বাঙালি বিধায়ক নির্বাচিত না হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। অপরদিকে, বিজনী বিধানসভা কেন্দ্র থেকেও বাঙালি বিধায়ক নির্বাচিত হয়েছে। এই কেন্দ্র থেকেও যাতে বাঙালি বিধায়ক নির্বাচিত হতে না পারে, সে ব্যবস্থা পাকাপোক্ত ভাবেই করা হয়েছে। গত দশ বছরে অসমে যেসব আইন করা হয়েছে, ডিলিমিটেশান, আধারকার্ডের বিড়ম্বনা ইত্যাদি সব মিলিয়ে হিন্দু বাঙালি কে টার্গেটে রেখেই তা সম্পাদন করা হয়েছে। সরকার এই জনগোষ্ঠীকে ছাগলের তিন নম্বর বাচ্চা বানিয়ে রেখেছে। স্বাধীনতার পর গত দশ বছরে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে হিন্দু বাঙালি সম্প্রদায়ের। আলফা ও আসুর চাদর গায়ে জড়িয়ে বর্তমান সরকার পরিচালনা করছে। এহেন বিপরীতমুখী পরিস্থিতিতে হিন্দু বাঙালিদের এমন এক একজন বিধায়ক নির্বাচিত করতে হবে, যাঁরা নির্দ্ধিধায় জাতির স্বার্থে বিধায়ক পদ স্বেচ্ছায় ছেড়ে আসতে পারে।
প্রসঙ্গত, "নর্থ ইস্ট হিন্দু বাঙালি ইউনাইটেড ফোরাম" এর মু্খ্য আহ্বায়ক চিত্তরঞ্জন পাল বলেন, দেশ স্বাধীনতা অর্জনের পর মুহূর্তেই হিন্দু বাঙালিরা যখন পরিবার পরিজনদের নিয়ে দুবেলা দুমুঠো অন্ন যোগারের সন্ধানে ব্যস্ত ছিলেন, তখন উত্তর পূর্বাঞ্চলের উপজাতি জনগোষ্ঠীর মানুষেরা নিজেদের ঘর গোছাতে শুরু করেন। পূর্ব পাকিস্তান থেকে বিতাড়িত এই উদ্বাস্তরা ঘূর্ণাক্ষরেও টের পান নি যে ষষ্ঠ তফশিলের ধারালো অস্ত্রের কোপে পঞ্চাশ বছর পর তাঁদের কোনোও অধিকার থাকবে না। ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রী প্রয়াত জওহরলাল নেহেরু কে "নর্থ ইস্ট ফ্রন্টিয়ার এজেন্সি (নেফা) বর্তমান অরুণাচল প্রদেশে ছিন্নমূল উদ্বাস্তুদের স্থায়ীভাবে পুনর্বাসন দিতে বলেছিলেন। যদিও পণ্ডিত নেহেরু সে কথায় কর্ণপাত করেন নি। ফলস্বরূপ, আজ উত্তর পূর্বাঞ্চলে হিন্দু বাঙালিরা হচ্ছেন স্বাধীন রাষ্ট্রের পরাধীন নাগরিক স্বরূপ। সমগ্র উত্তর পূর্বাঞ্চলের হিন্দু বাঙালির নিরাপত্তা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হলে অসমের হিন্দু বাঙালিদেরই সে গুরুদায়িত্ব পালন করতে হবে। কারণ প্রায় সোয়া কোটি হিন্দু বাঙালির মধ্যে অসমেই বসবাস করেন প্রায় আশি লক্ষ।
নাগাল্যান্ড লিঙ্গুইস্টিক মাইনোরিটিজ ফোরামের চেয়ারম্যান বিষ্ণু ভট্টাচার্য বলেন, সমগ্র উত্তর পূর্বাঞ্চলে হিন্দু বাঙালিরা এক উত্তপ্ত আগ্নেয়গিরির ওপর বসে আছেন। স্বাধীন দেশের দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক। অথচ এই বাঙালিরাই সর্বপ্রথম স্বাধীনতার অগ্নিমন্ত্রে দীক্ষিত হয়েছিলেন। স্বাধীনোত্তর কালের সরকার গুলো হিন্দু বাঙালির সমস্যার প্রতি নিরন্তর অনীহা প্রকাশ করে আসছেন। যারদরুণ, উত্তর পূর্বাঞ্চলে হিন্দু বাঙালির ভোটাধিকার ছাড়া গণতান্ত্রিক কোনো অধিকার নেই।
সভায় ফোরামের অন্যতম আহ্বায়ক চন্দন পাটিকর আন্দামানের সেলুলার জেলের উদ্ধৃতি দিয়ে আবেগিক বক্তব্য রাখেন। তিনি বলেন, বর্তমান অটোনোমাস কাউন্সিলের সরকার হিন্দু বাঙালি জনগোষ্ঠীর চাকরিরত শিক্ষক কর্মচারী দের সমতল থেকে পাহাড়ে বদলির আদেশ দিয়েছে। একজন মহিলা শিক্ষয়িত্রীর পক্ষে রোজ পাহাড়ে যাওয়া আসা করা দূরূহ ব্যপার। তিনি আরও বলেন, বোকাজান অঞ্চলে জমির পাট্টা সংক্রান্ত ঝামেলা রয়েছে। পূর্বে শহরের জমির মালিকানা ছিলো একজন জমিদারের হাতে। অটোনোমাস কাউন্সিল এমন আইন প্রণয়ন করতে চলছে, যাতে হিন্দু বাঙালিদের হাতে জমির মালিকানা স্বত্ব আর থাকবে না। কার্বি আংলঙ বাঙালি সমাজের সভাপতি সিতু নাথ নয়াদিল্লির যন্তর মন্তরে ধর্ণা কার্যসূচি রূপায়ণ করতে পরামর্শ দেওয়ার পাশাপাশি সাধারণ সম্পাদক অজিত দাসও বক্তব্য দেন। আগামি ২২/২৩ জানুয়ারি সারা অসম বাঙালি যুবছাত্র ফেডারেশন, কার্বি আংলঙ বাঙালি সমাজ ও এবসু-র তত্ববধানে বিশাল জনসভা অনুষ্ঠিত করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।








কোন মন্তব্য নেই