নাগাল্যান্ডে বাঙালি হিন্দুদের ভবিষ্যত চিন্তা নিয়ে বৈঠক
নয়া ঠাহর , সংবাদদাতা : ডিমাপুর, ১৪ ডিসেম্বর:: "পরবর্তী প্রজন্মের ভবিষ্যত নির্বিঘ্ন ও সুনিশ্চিত করার পাশাপাশি উত্তর পূর্বাঞ্চলের হিন্দু বাঙালিদের রাজনৈতিক অধিকার অক্ষুন্ন রাখতে হিন্দু বাঙালি সংগঠন গুলির মধ্যে অভিন্ন এক সমন্বয় গড়তে হবে। একে অন্যের পরিপূরক হিসেবে কাজ করতে সফল হলেই এই জনগোষ্ঠীর প্রতি বঞ্চনা, লাঞ্ছনা ও চির বৈষম্যের অবসান ঘটানো সম্ভব হবে। একই সঙ্গে, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সাথেও সদ্ভাব রেখে চলা বাঞ্ছনীয়।" ---নাগাল্যাণ্ডের ডিমাপুরস্থিত রাম ঠাকুর মন্দির প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত এক সভায় অংশগ্রহণ করে "নর্থ ইস্ট হিন্দু বাঙালি ইউনাইটেড ফোরাম" এর মুখ্য আহ্বায়ক চিত্তরঞ্জন পাল এ মন্তব্য করেন। তিনি আরও বলেন, দেশ ভাগের আগে বৃহত্তর অসমে বাংলা ভাষাভাষী মানুষেরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিলেন। বাংলা ভাষীর জনসংখ্যা ৩৯ লক্ষের বিপরীতে অসমিয়া ভাষীর সংখ্যা ছিলো মাত্র ১৯ লক্ষ। কিন্তু স্বাধীনতা অর্জনের পর উত্তর পূর্বাঞ্চলে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজ্য গঠনের প্রেক্ষিতে বাঙালিরা বিভিন্ন রাজ্যে সংখ্যালঘু হয়ে যায়। ফলে, সংশ্লিষ্ট রাজ্য গুলিতে হিন্দু বাঙালিরা নিত্য নতুন নানা অদ্ভূত ধরনের সমস্যার সন্মুখীন হতে বাধ্য হচ্ছেন। সম্প্রতি অসম মন্ত্রীসভা সম্প্রসারণে প্রায় আশি লক্ষ হিন্দু বাঙালি জনগোষ্ঠীকে সুপরিকল্পিতভাবে উপেক্ষা করেছে। স্বাধীনতার পর থেকে হিন্দু বাঙালিরা তিনজন মন্ত্রী পেয়ে আসছেন অসমে। যদিও বর্তমানে মাত্র একজন হিন্দু বাঙালি মন্ত্রী অন্তর্ভুক্ত করেছে। এছাড়া, ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায় প্রায় পঞ্চাশ লক্ষেরও বেশি হিন্দু বাঙালি জনগোষ্ঠীর মানুষ বসবাস করেন। অথচ এই জনগোষ্ঠীর একজনও মন্ত্রী নেই। আমাদের মধ্যে মতভেদ থাকতে পারে, তথাপিও ভেদাভেদ ভুলে আমাদের ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। আমাদের অধিকার আদায়ের স্বার্থে, পরবর্তী প্রজন্মের জন্য। তা না হলে, অদূর ভবিষ্যতে রাজনৈতিক দলগুলো এই জনগোষ্ঠীকে চিরদিনের জন্য নিঃশেষ করে দেবে। কখনও এন আর সি-র নামে, আবার কখনও নাগরিকত্বের নামে কিংবা ইনার লাইন পারমিটের নামে সমস্ত গনতান্ত্রিক অধিকার খর্ব করাই হচ্ছে রাজ্য সরকার গুলির প্রকৃত উদ্দেশ্য। তিনি উত্তর পূর্বাঞ্চলের সমস্ত হিন্দু বাঙালি সংগঠন গুলির প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, প্রতিটি সংগঠন তাদের নিজস্ব স্বকীয়তা বজায় রেখে একই ছাতার নিচে আসতে হবে। যে জাতির বীর শহিদেরা স্বাধীনতার জন্য আত্মবলিদান দিয়েছেন, তাঁদের উত্তরসূরি হিসেবে এতো বঞ্চনা আমরা আর সহ্য করতে পারছি না। দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে। এ লড়াই চালিয়ে নিতে হবে। নাগাল্যান্ডের ডিমাপুরে বসবাসকারী হিন্দু বাঙালিদের এই সভা অনুষ্ঠিত করার জন্য তিনি ধন্যবাদ জানান।
প্রসঙ্গত, "সারা অসম বাঙালি যুবছাত্র ফেডারেশন"এর সভাপতি দীপক দে বলেন, সাহিত্য, সংস্কৃতি, সঙ্গীত, ক্রীড়া ও ধর্মীয় অনুষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করার ক্ষেত্রে হিন্দু বাঙালিরা হচ্ছেন অগ্রদূত। যদিও স্বাধীনতার আগে বা পরে যখন বাঙালির স্বর্ণযুগ চলছিলো, এই জনগোষ্ঠীর নেতারা বাঙালি জাতির জন্য মঙ্গলের চিন্তা করেন নি। তিনি প্রশ্ন করেন, এতো বাঙালির প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতা কার লাভের জন্য করা হয়েছে? এমন স্বাধীনতা পেয়ে হিন্দু বাঙালিরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছেন। আমরা আমাদের সাংবিধানিক অধিকার ভোগ করতে পারছি না। কেন্দ্রীয় সরকারের ত্রাণ ও পুনর্বাসন বিভাগ আজ কোথায় দাঁড়িয়ে আছে। যখন ভুক্তভোগী উদ্বাস্তু মানুষের শংসাপত্র প্রয়োজন হয়, তখন এই মন্ত্রণালয়ের খোঁজ খবর পাওয়া যায় না। উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসন হলো কী হলো না, তা পরীক্ষা করার জন্যও বিভাগটির এখন অস্তিত্ব নেই।
তিনি আরও বলেন, নাগাল্যান্ডের বাঙালিরা অত্যন্ত ভাগ্যবান, এখানে ভিত্তিবর্ষ ১৯৭৯ সাল করা হয়েছে। কিন্তু অসম সরকার ১৯৫১ সালকে ভিত্তিবর্ষ করতে চাইছে। অসমে হিন্দু বাঙালির অবস্থা আরও বেশি খারাপ। রাজ্য ও কেন্দ্রে হিন্দুদের জন্য কী আইন প্রস্তুত করা হয়েছে? সব আইন তো ভূমিপুত্রদের স্বার্থে করা হয়েছে। অথচ হিন্দু বাঙালির বিরুদ্ধে এন আর সি, বসুন্ধরা ১,২,৩ আধারকার্ডের লাইন লাগানো হয়েছে। অসম ও ত্রিপুরা রাজ্যে অসংখ্য হিন্দু বাঙালি বসবাস করেন। কিন্তু নাগাল্যান্ড, মণিপুর, মেঘালয় ও অরুনাচলের হিন্দু বাঙালিরা অধিকারের কথা মুখে উচ্চারণ করতে পারেন না। সে জন্য, নর্থ ইস্ট হিন্দু বাঙালি ইউনাইটেড ফোরামের পক্ষ থেকে তাদের বক্তব্য তুলে ধরার জন্যই এই সংগঠনের জন্য হয়েছে । ওদিকে, ডিলিমিটেশনের মাধ্যমে বিগত দশ বছরে হিন্দু বাঙালির সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করেছে। এই জনগোষ্ঠীর মানুষদের রাজনৈতিক ভাবে হত্যা করেছে। ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায় হিন্দু বাঙালির রাজনৈতিক পীঠস্থান হোজাই বিধানসভা কেন্দ্র কে ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছে।
ডিমাপুর বাঙালি সমাজের সভাপতি অ্যাডভোকেট কমলাকান্ত পাল বলেন, নাগাল্যান্ড, মনিপুর, মিজোরামে ইনার লাইন পারমিট আগেই প্রবর্তন করা হয়েছে। এখন ডিমাপুরেও ইনার লাইন পারমিট প্রবর্তন করতে চলেছে। ফলে এখানে হিন্দু বাঙালির কোনো ধরনের অধিকার থাকবে না। নাগাল্যান্ডে রাজনৈতিক অধিকার চাওয়ার মানেই হচ্ছে এক দুঃস্বপ্ন। এখানে বাঙালি সংগঠন গুলির নেতারা অংশগ্রহণ করেছেন, কিন্তু এদের পেছনে হাজার হাজার মানুষের সমর্থন রয়েছে।
এছাড়া, নাগাল্যান্ড লিঙ্গুইস্টিক মাইনোরিটিজ ফোরামের চেয়ারম্যান বিষ্ণু ভট্টাচার্য বলেন, উত্তর পূর্বাঞ্চলের হিন্দু বাঙালিরা আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে রাষ্ট্রহীন নাগরিকে পর্যবসিত হতে চলেছে। সুতরাং এমন পরিস্থিতিতে নন ট্রাইবেলেরা এই সব রাজ্যে সংঙ্ঘবদ্ধ ভাবে কাজ করতে হব। তিনি বলেন, ডিমাপুরে এখন থেকে আমরা বাংলা পত্রিকা পড়বো। কারণ স্থানীয় পত্রিকা গুলোতে আমাদের আশা আকাঙ্খার প্রতিফলন হয় না। তিনি এই সংগঠনের মাধ্যমে উত্তর পূর্বাঞ্চলের হিন্দু বাঙালিদের একত্রিত হতে আহ্বান জানান। "বঙ্গস" সংগঠনের সভাপতি জুয়েল আচার্যি বলেন, নাগাল্যান্ডে হিন্দু বাঙালির কোনও অধিকার নেই। এমন কী, আয়ুষ্মান কার্ড, আধারকার্ড পাওয়ারও যোগ্য নয়। ডিমাপুর বেঙ্গলি স্টুডেন্টস এসোসিয়েশনের সভাপতি অঙ্কিত দাস বলেন, এখানে বাঙালিদের অপভ্রংশ করে বলা হয় "খোলাম", মেঘালয়ে "ঢাকার" এবং মনিপুরে "মায়াং" বলে ছোট নজরে দেখা হয়। রাজ্য বিজেপির যুব মোর্চার উপর সভাপতি রজত ঘোষ এসব যন্ত্রণা উপশম করতে একটি লীগেল টীম বানাতে প্রস্তাব দেন। ডিমাপুর বিশ্ব হিন্দু পরিষদের সভাপতি অ্যাডভোকেট সুদীপ নারায়ন দত্ত বলেন, নাগাল্যান্ডের ইনার লাইন পারমিট তিনটি স্তরে প্রস্তুত করা হয়েছে। প্রথমত, যাদের ১৯৬০ সালের আগের নথিপত্র আছে, তারা পিআরসি পাবেন। ১৯৭৯ সালের আগে আসা মানুষেরা ডোমিসাইল সার্টিফিকেট পাবেন এবং তারপরে আসা মানুষেরা ইনার লাইন পারমিট নিয়ে থাকতে হবে। অধিকার কেড়ে নেওয়ার জন্য বাঙালিদের নাম ভোটার তালিকা থেকে কর্তন করা হচ্ছে। সভায় কার্বি আংলঙ বাঙালি সমাজের সভাপতি সিতু নাথ ও সাধারণ সম্পাদক অজিত দাস সহ আরও অনেকেই বক্তব্য রাখেন। আগামি জানুয়ারি মাসে বৃহৎ আকারে বোকাজান শহরে এক সভা অনুষ্ঠিত হবে।








কোন মন্তব্য নেই