Header Ads

মুক্তমনা janoki অনেক অন্ধকার পেরিয়ে আলোর প্রদীপ জ্বালিয়ে ছিলেন

যে সময়ে ভারতীয় মেয়েরা শিক্ষার আলো থেকে ছিল  বঞ্চিত সেই  সময়ে একা পড়াশোনার জন্য  লন্ডন পাড়ি দিয়েছিলেন এক মেয়ে । তার বয়সী অন্য মেয়েরা যখন স্কুলে পড়ার স্বপ্নকে জলাঞ্জলি দিয়ে অশিক্ষার অন্ধকারকে মেনে নিতে বাধ্য হচ্ছে তখন চেনা গণ্ডি চেনা ছক ভেঙ্গে মাদ্রাজ থেকে কলকাতায় চলে এসেছিলেন একা একা। তিনি জানকি  আম্মল।পুরো নাম জানকি আম্মাল এডাভ্যালাথ কক্কট।

জন্মেছিলেন ১৮৯৭ সালে কেরালার  তেলিচেরিতে । বাবা দেওয়ান বাহাদুর কক্কট কৃষাণ ছিলেন মাদ্রাজ হাইকোর্টের সাব-জজ। ছয় ভাই পাঁচ বোনের বড় পরিবার।

কক্কট কৃষাণ মুক্তমনা মানুষ। পরিবারে  মেয়েদের শিল্পে-সাহিত্যে উৎসাহ দিতেন। পরিবাবের সবাই  শিল্পে সাহিত্যে আগ্রহী। কিন্তু ছোট থেকেই  জানকি একটু অন্যরকম।পছন্দগুলো ভিন্নধারার। তাঁর টান বিজ্ঞানে। আগ্রহ গাছপালায় । তেলিচেরিতে ব্যাচেলার ডিগ্রির পাঠ শেষ করে চলে এলেন কলকাতায়। ভর্তি হলেন প্রেসিডেন্সি কলেজে।  উদ্ভিদবিদ্যাতে অনার্স। স্নাতকের পর কলেজের শিক্ষকরাই জানকিকে প্রভাবিত করলেন ‘সাইটোজেনেটিক্স’ পড়ার জন্য।
 
কিন্তু তার জন্য বিদেশ যেতে হবে। চেষ্টা শুরু করলেন বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে স্কলারশিপের। এর মধ্যেই এলো চাকরির ডাক। মাদ্রাজের ওইম্যানস ক্রিশিয়ান কলেজে যোগ দিলেন অধ্যাপক হিসাবে।

স্কলারশিপের চেষ্টা বৃথা হয়নি। সুযোগ মিলল আমেরিকার মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ে। এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯২৫ সালে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি পেলেন। ভারতে ফিরে আবার ওইম্যানস ক্রিশিয়ান কলেজের পুরনো ক্লাসরুমে।

প্রাচ্য দেশ থেকে তিনিই প্রথম মহিলা যিনি বারবার স্কলারশিপ পেয়েছিলেন। তাঁকে আবার পাঠানো হয় বিশ্ববিদ্যালয়ে। ১৯৩১ সালে মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই ডিএসসি ডিগ্রি। উদ্ভিদবিদ্যাতে পিএইচডি অর্জনকারী তিনিই প্রথম ভারতীয় মহিলা।

দেশে ফিরে এসে আবার অধ্যপনার জগতে ফিরে গেলেন। তবে এবার অন্য কলেজে । ত্রিবান্দ্রামের মহারাজা বিজ্ঞান কলেজে প্রফেসরের পদে। বছর দুয়েক সেখানেই কাটান। কলেজে পড়াতে ভালোই লাগছিল । কিন্তু তাঁর ভাবনা জুড়ে গবেষণা । নিত্য নতুন আবিষ্কারের  নেশা। ১৯৩৪- এ কলেজ ছেড়ে যোগ দিলেন কোয়াম্বাটরে আখ উৎপাদন ইনস্টিটিউটে। জেনেটিসিস্ট পদে। খোল নলচে বদলে দিলেন আখ গবেষণার দিশা।
 
১৯৩৫-এ বিজ্ঞানী সি ভি রমন ইন্ডিয়ান অ্যাকদেমি অফ সায়েন্স প্রতিষ্ঠা করেন । প্রথম বছর ফেলোশিপ পান জানকি ।
 
বেশ কয়েক বছর দেশের মাটিতে কাজ করার পর চলে গেলেন বিদেশে। লন্ডনের রয়্যাল হর্টিকালচার সোসাইটিতে। চলল গবেষণার কাজ।

ভারতের মাটি তখন অস্থির। স্বাধীনতার জন্য জাতীয়তাবাদী আন্দোলন তুঙ্গে। অন্যদিকে ইউরোপেও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আঁচ তখন পুরোপুরি নেভেনি।  ১৯৪৫- ১৯৪৭ এই দু’বছরে পাল্টে গেল জানকির দেশের ইতিহাস ,  ভূগোল। ভারতের পাশেই জন্মে হয়েছে আরও একটা নতুন রাষ্ট্রের। পাকিস্তান।

স্বাধীনতার পর নতুন করে দেশ গড়ার ডাক দিলেন স্বাধীন দেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওয়ান- কিষাণ-মজুরের দেশ ভারতবর্ষ। উন্নতির ভিত্তিও হবে কৃষি। নতুন বীজ চাই। নেহেরুর আহ্বান পৌঁছল লন্ডনে গবেষণারত জানকির কাছেও। দেশ ডাকছে। তাকে প্রয়োজন।

১৯৫১ তে ফিরে এলেন তিনি ভারতের মাটিতে। বটানিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া পুনর্গঠন করলেন। পরের বছর ডিরেক্টর হলেন সংস্থার।

ঘাস, সঙ্কর প্রজাতির বাঁশ নিয়ে তাঁর গবেষণা যুগান্তকারী। বাগানের উদ্ভিদের ক্রোমোজোম নিয়ে গবেষণা করেন ।

রয়্যাল হর্টিকালচারল সোসাইটির বাগানে ড. জানকি  আম্মাল বংশগতিবিজ্ঞানী হিসাবে কাজ করার সময় ম্যাগনেলিয়ার মত কিছু গাছের সদ্য অঙ্কুরিত চারায় কলচিসিন  প্রয়োগ করলেন। দিন কয়েকপর দেখেন চারা গাছের কচি পাতাগুলো যেন তাড়াতাড়ি বেড়ে গিয়েছে। অন্য গাছের তুলনায় কলচিসিন প্রয়োগ করা গাছগুলো অনেক দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। পাতায় ফুলে তফাৎটা চোখে পড়ার মত। নতুন এই ফুলের নাম দেওয়া হয় ম্যাগনেলিয়া কোবাস।ফুল তাজাও থাকে অনেকদিন। বীজের সংখ্যাও বেশি।

এই গাছের কিছু বীজ নিয়ে জানকি  ব্যাটেলস্টোন পাহাড়ে রোপণ করলেন একদিন। নতুন ফুলে ভরে উঠল ভ্যালি।

১৯৭৭ সালে ভারত সরকার তাঁকে পদ্মশ্রী সম্মানে সম্মানিত করে। পদ্মশ্রী ভূষিত তিনিই প্রথম মহিলা বিজ্ঞানী। রয়্যাল সোসাইটি অব হর্টিকালচার ম্যাগনেলিয়া ফুলের নাম বদলে দেয় তাঁর নামেই। ভারতীয় মহিলা বিজ্ঞানীর মেধার প্রতি সম্মানে।
তাঁর সম্মানে ম্যাগনেলিয়ার নাম রাখা হল আম্মাল।

ভারতের উদ্ভিদবিদ্যা গবেষণায় তাঁর অবদান স্মরণে রেখে ২০০০ সালে ভারত সরকারের পরিবেশ ও বন মন্ত্রক তাঁর নামে ট্যাক্সনমিতে জাতীয় পুরস্কার ঘোষণা করে।
আজ ড. জানকি  আম্মাল এর প্রয়াণ দিবসে তাঁকে অসীম শ্রদ্ধা জানাই 🙏

কোন মন্তব্য নেই

Blogger দ্বারা পরিচালিত.