গিরিশ চন্দ্র ঘোষ এর অভিনয় দেখে ইশ্বর চন্দ্র পায়ের জুতো ছুড়ে ছিলেন
মঞ্চনাটকে তাঁর নেগেটিভ চরিত্রে অভিনয় দেখে সামনের সারিতে বসে থাকা বিদ্যাসাগর মহাশয় পায়ের খড়ম খুলে তাঁকে ছুড়ে মেরেছিলেন। তিনি খড়মটি তুলে নিয়ে কপালে ঠেকিয়ে বলেছিলেন, "এতোদিনে আমার অভিনয় সার্থক হলো"।
তিনিই বাংলার গ্যারিক ---- নাট্যকার, নাট্যপরিচালক, মঞ্চাভিনেতা, কবি ও সর্বোপরি ঔপন্যাসিক গিরিশচন্দ্র ঘোষ। আজ তাঁর প্রযাণ দিবসে তাঁর সম্পর্কে কিছু আলোকপাত করলাম....
বাংলা থিয়েটারের স্বর্ণযুগ মূলত তাঁরই অবদান। ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের প্রভাবে তিনি প্রথম গান এবং কবিতা লিখতে শুরু করেন। স্যার এডুইন আর্নল্ড এর বিখ্যাত কাব্য Light of Asia গ্রন্থটি নির্ভর করে তিনি রচনা করেছিলেন ‘বুদ্ধদেব চরিত’ নাটকটি ! এই নাটকটি সর্বপ্রথম মঞ্চস্থ হওয়ার সময় শ্রীলঙ্কার বিখ্যাত সমাজ সংস্কারক এবং জাতীয়তাবাদী বৌদ্ধ নেতা শ্রী অনাগরিক ধর্মপাল ছিলেন দর্শক হিসেবে ! এই অভিজ্ঞতার উপর তিনি পরবর্তিতে ওনার ডায়েরিতে লিখেছিলেন – ‘বাঙালিরা বুদ্ধকে খুব সম্মান করে ডাকে বুদ্ধদেব বলে ! আর্নল্ড এর Light of Asia যেমন বিশ্বব্যাপী বুদ্ধের নাম এবং অমর কাহিনী পৌঁছে দিয়েছিল গিরিশ ঘোষের বুদ্ধদেব চরিত ও বাঙালির মধ্যে বুদ্ধের প্রতি নতুন ভাবে আগ্রহ সৃষ্টি করেছে! বাংলায় বুদ্ধ ধর্মীয় চর্চার ইতিহাসেও গ্রন্থটি অতি গুরুত্বপূর্ণ দলিল।’ ১৮৭৭ সালে মেঘনাদবধ কাব্যে রামচন্দ্র ও মেঘনাদ উভয় ভূমিকায় তাঁর অভিনয় দেখে সাধারণী পত্রিকার সম্পাদক অক্ষয়চন্দ্র সরকার তাঁকে ‘বঙ্গের গ্যারিক’ আখ্যায় ভূষিত করেন।
তিনি এ্যাটকিনসন টিলকন কোম্পানিতে শিক্ষানবিশের চাকরির সঙ্গে সঙ্গে নানা বিষয় অধ্যয়ন করে স্বশিক্ষিত হয়ে ওঠেন। ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের প্রভাবে তিনি প্রথমে গান ও কবিতা লিখতে শুরু করেন এবং পরে নাট্যমঞ্চের সঙ্গে যুক্ত হলে নাটকও লিখতে থাকেন। ১৮৬৭ সালে বাগবাজার সখের যাত্রাদল-প্রযোজিত মধুসূদনের শর্মিষ্ঠা নাটকের গীতিকার হিসেবে গিরিশচন্দ্র নাট্যজগতে প্রবেশ করেন। পরে দীনবন্ধু মিত্রের সধবার একাদশী নাটকে তিনি নিমচাঁদ চরিত্রে অভিনয় করেন। ১৮৭১ সালে বাগবাজার দল ন্যাশনাল থিয়েটার নামে প্রথম সাধারণ রঙ্গমঞ্চ স্থাপন করে অভিনয় আরম্ভ করে। কিন্তু মতপার্থক্যের কারণে গিরিশচন্দ্র কয়েকজন অনুগামীসহ দলত্যাগ করেন। ১৮৮০ সালে তিনি পার্কার কোম্পানির চাকরি ত্যাগ করে কম বেতনে গ্রেট ন্যাশনাল থিয়েটারের ম্যানেজার হন। তাঁর রচিত প্রথম মৌলিক নাটক আগমনী (১৮৭৭) এ মঞ্চেই অভিনীত হয়।
কলকাতায় ন্যাশানাল থিয়েটার নামে তাঁর একটি নাট্য কোম্পানি ছিল। ১৮৮৪ সালের ২০ সেপ্টেম্বর স্টার থিয়েটারে মঞ্চস্থ গিরিশচন্দ্রের চৈতন্যলীলা নাটকের অভিনয় দেখতে এসে রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব চৈতন্যচরিত্রে বিনোদিনীর অভিনয় দেখে মুগ্ধ হন এবং তাঁকে আশীর্বাদ করেন। এ ঘটনার প্রভাবে গিরিশচন্দ্রের মনে পরিবর্তন আসে এবং তিনি রামকৃষ্ণদেবের শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। শুধু তাই নয়, ধর্মভাবে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি বহু পৌরাণিক ও ভক্তিমূলক নাটকও রচনা করেন। তিনি শ্রীরামকৃষ্ণের অন্যতম অন্তরঙ্গ শিষ্যে পরিণত হন।
পৌরাণিক, ঐতিহাসিক ও সামাজিক বিষয় নিয়ে রচিত তাঁর নাটকের সংখ্যা মোট ৮০। সেগুলির মধ্যে জনপ্রিয় কয়েকটি হলো: অভিমন্যুবধ (১৮৮১), সীতার বনবাস (১৮৮১), সীতাহরণ (১৮৮২), পান্ডবের অজ্ঞাতবাস (১৮৮২), প্রফুল্ল (১৮৮৯), জনা (১৮৯৪), আবু হোসেন (১৮৯৬), বলিদান (১৯০৪), সিরাজদ্দৌলা (১৯০৫), মীরকাশিম (১৯০৬), ছত্রপতি শিবাজী (১৯০৭), শঙ্করাচার্য (১৯১০), বিল্বমঙ্গল ঠাকুর ইত্যাদি। প্রেমভক্তি, স্বদেশপ্রেম ও সমকালীন সামাজিক সমস্যা গিরিশচন্দ্রের নাটকের বিষয়বস্ত্ত।
এগুলি ছাড়া গিরিশচন্দ্র শেকসপীয়রের ম্যাকবেথ (১৮৯৩) নাটকের বাংলা অনুবাদ করেন এবং বঙ্কিমচন্দ্রের মৃণালিনী, বিষবৃক্ষ ও দুর্গেশনন্দিনী উপন্যাস, মধুসূদনের মেঘনাদবধ কাব্য ও নবীনচন্দ্রের পলাশীর যুদ্ধ কাব্যের নাট্যরূপ দেন।
১৯০৫-এর পর থেকে তাঁর নাটকে দেখা দিল দেশপ্রেমের উদ্দীপনা । এই সময়ের নাটকের মধ্যে অন্যতম হল
"সিরাজদৌল্লা" (১৯০৫), "মীরকাশিম" (১৯০৬), "ছত্রপতি শিবাজী" (১৯০৭) প্রভৃতি জনপ্রিয় নাটকগুলি ।
জীবনের শেষ দিকের নাটকগুলিতে আবার ফিরে এসেছিলেন শান্ত ভক্তিভাবে । তাদের মধ্যে অন্যতম হল
"শঙ্করাচার্য" (১৯০৯), "অশোক" (১৯১১), "তপোবন" (১৯১১) ।
অধিকাংশ নাটকে বিভিন্ন চরিত্রে নিজেই অভিনয় করেছেন এবং বহু অভিনেতা-অভিনেত্রীকে সুযোগ করে দিয়ে একটি অভিনয় স্কুল গড়ে তুলেছিলেন। মধুসূদনের চৌদ্দ মাত্রার অমিত্রাক্ষর ছন্দকে ভেঙ্গে তিনি অভিনয়ের উপযোগী ছোট ছোট ছত্রে বিন্যস্ত করেন। তাঁর নামানুসারে এ ছন্দের নাম হয় ‘গৈরিশ ছন্দ’। তিনি ১৮৮৩-১৯০৭ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ২৪ বছর স্টার, এমারেল্ড, মিনার্ভা, ক্লাসিক, কোহিনূর প্রভৃতি রঙ্গালয় পরিচালনার পর পুনরায় ১৯০৮ সালে মিনার্ভার নাট্যাধ্যক্ষ হিসেবে যোগদান করেন এবং আমৃত্যু এর সঙ্গে জড়িত ছিলেন।
চলচ্চিত্র
কাজী নজরুল ইসলাম গিরিশচন্দ্রের ‘ভক্ত ধ্রুব’ উপন্যাসটি চলচ্চিত্রায়িত করেন। ১৯৫৬ সালে মধু বসুর পরিচালনায় গিরিশচন্দ্রের অবলম্বনে নির্মিত মহাকবি গিরিশচন্দ্র চলচ্চিত্রটি মুক্তি পায়।
জন্ম
২৮শে ফেব্রুয়ারি ১৮৪৪সালে গিরিশ চন্দ্র ঘোষ কলকাতার বাগবাজারে জন্ম গ্রহন করেন। তিনি ছিলেন তাঁর পিতামাতার অষ্টম সন্তান। গিরিশ চন্দ্র ঘোষ প্রথমে হেয়ার স্কুল ও পরে ওরিয়েন্টাল সেমিনারি বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন।
প্রয়াণ দিবসে তাঁকে শ্রদ্ধার্ঘ জানাই।








কোন মন্তব্য নেই