"হতাশ হইনি ভেঙে পড়েনি সর্বত্র জীবন মানুষ হয়ে থাকতে পারেন "
" আমি হতাশ হইনি, ভেঙে পড়িনি। জীবন সর্বত্রই জীবন। বাইরের নয়, আমাদের নিজেদের ভিতরের জীবন। আমার আশেপাশে মানুষজন থাকবে, মানুষের মাঝখানে মানুষ হয়ে থাকা, যত বড়ো সংকটই দেখা দিক না কেন, চিরকাল মানুষ হয়ে থাকা, হতাশ না হওয়া, ভেঙে না -পড়া -- এই হল জীবন, এ-ই হল জীবনের লক্ষ্য।"
এমন দৃঢ় মনোবল নিয়ে নির্বাসনে থাকা অবস্থায় দাদাকে চিঠি লিখেছিলেন ফিওদর দস্তয়েভস্কি। দস্তয়েভস্কি যে নামের সাথে জড়িয়ে আছে লাঞ্ছনা-বঞ্চনার ইতিহাস। ছোটবেলা থেকেই দরিদ্র্যতার মধ্যে বেড়ে উঠেছেন। ১৮২১ সালের ১১ নভেম্বর মস্কোয় দস্তয়েভস্কির জন্ম। ফিওদর দরিদ্রদের জন্য নির্মিত মারিন্স্কি হাসপাতাল এলাকায় তার পারিবারিক বাড়িতে বেড়ে ওঠেন। এটি ছিল মস্কোর সীমান্তবর্তী নিম্নবিত্ত শ্রেণির জেলা। হাসপাতালের মাঠে খেলার সময় হাসপাতালে আগন্তুক রোগীদের সাথে তার সাক্ষাৎ হত। যারা ছিল রুশ সামাজিক স্তরের সর্বনিম্ন শ্রেণির জনগণ।
দস্তয়েভস্কি শৈশবেই সাহিত্যের সাথে পরিচিত হন। তার যখন চার বছর বয়স তার মা তাকে পড়া ও লেখা শিক্ষা দিতে বাইবেল ব্যবহার করতেন। তার পিতামাতা তাকে বিপুল পরিমাণ সাহিত্যের সাথে পরিচয় করিয়ে দেন। এই অসাধারণ সাহিত্যচেতনার মানুষকে নিয়ে বুদ্ধদেব বসু ‘এক গ্রীষ্মে দুই কবি’ নামে এক লেখায় বলেছেন, ‘দস্তয়েভস্কিকে দেখামাত্র আমরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে বলে উঠি—দ্যাখো, এই যে মানুষ।’ দস্তয়েভস্কি মনে করতেন, নায়কের প্রতি পাঠকের করুণার উদ্রেক হলে তার অন্তর্নিহিত সত্য করুণার নিচে চাপা পড়ে যায়। তিনি সব সময় চেয়েছেন সাধারণ মানুষের মধ্যে থাকা অসাধারণ মানুষটাকে বের করতে। ফিওদর কে বাবা ভর্তি করিয়ে দিলেন ইন্জিনিয়ারিং পড়ার জন্য। কিন্তু ছোটবেলা থেকে সাহিত্য সাধনায় নিয়োজিত থাকায় তিনি সাহিত্য নিয়েই এগিয়ে যেতে চেয়েছিলেন। তাই বলেছেন- “নিজেকে কবি বলে মনে হত, ইঞ্জিনিয়ার বলে কিছুতেই মেনে নিতে পারছিলাম না।"
সাহিত্য অনুরাগী ফিওদর সবসময় চেষ্টা করেছেন মানুষকে মানুষ হিসাবে পরিচিত করার জন্য। আজীবন লড়াইয়ের লক্ষ্যে অবিচল ছিলেন। জীবনে হতাশা এসেছে তবু পিছিয়ে পড়েন নি। উঠে দাড়িয়েছেন আবার দৃঢ় প্রত্যয়ে। চারদিকে শোষিত মানুষের জন্য ভেবেছেন। সাহিত্য সাধনায় নিজেকে এতোদূর নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন যেখানে মানুষ তাকে চিনবেন। পেরেছিলেনও তেমনি হয়ে উঠতে। একের পর এক কর্মসৃষ্টি দিয়ে হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছিলেন। এরমধ্যে ক্রাইম এ্যান্ড পানিসমেন্ট, এ ন্যাস্টি স্টোরি, দি ড্রিম অফ এ রিডিকুলাস ম্যান,মৃত্যুপুরী , দি ইডিয়ট , ভূতলবাসীর আত্মকথা উল্লেখযোগ্য।
আর ফিওদর ছোটবেলা থেকে দেখে এসেছেন জারতন্ত্রের শাসন। শোষিত মানুষের কান্না দেখে কেঁদেছেন নিজেও। ছোটবেলায় নিজের বাবার দ্বারা মানসিক অত্যাচারে মারা যেতে দেখেছেন নিজের মা কে। একইভাবে জারদের অত্যাচারে নিজের চোখের সামনে মারা যেতে দেখেছেন পিতা কে। আর এই অন্যায়ের শাসক জারদের দেখে তার মনে বিপ্লবের বীজ অঙ্কুরিত হয়ে ওঠে। তাই তিনি উচ্চকন্ঠে বলার চেষ্টা করেছেন- “এই পৃথিবীতে সত্যি উচ্চারণের মত কঠিন কিছু নেই, তোষামোদ করার মতো সহজ কিছু নাই।” একসময় এসে দস্তয়েভস্কি মনে করলেন নিপীড়িত মানুষের জন্য কিছু একটা করা দরকার। চারপাশে জারের সাধারণ মানুষের ওপর অমানবিক নির্যাতন দেখতেন আর ভাবতেন এই নিপীড়ন বন্ধে কাজ করতে হবে। তখনই বিপ্লবী তত্ত্বে নিজেকে গড়ে তুললেন। বিপ্লবী সমাজতন্ত্রী দর্শনের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে এই সময় থেকে তিনি ফরাসি ও ইউরোপীয় সমাজতান্ত্রিক চর্চায় মনোনিবেশ করেন। পরবর্তীতে বিপ্লবী গণতন্ত্রী সমালোচক বেলেন্ স্কির সঙ্গে বন্ধুত্বের সূত্র ধরে আলাপ হয় রাজধানীর রাজনৈতিক বিপ্লবীদের সঙ্গে। ১৮৪৮ সালের কোনো একটা সময় থেকে তিনি বিপ্লবী সমাজতন্ত্রী পেত্রাশেভস্কির প্রগতিশীল পাঠচক্রে যাতায়াত শুরু করেন। পরে পেত্রাশেভ্ স্কির জনৈক সহযোগী পরিচালিত গোপন বিপ্লবী সংগঠনে যোগদান করে নিষিদ্ধ সাহিত্য ছাপিয়ে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার কাজে উৎসাহিত হয়ে পড়েন। এর ফলে একসময় তাকে পড়তে হয় জারের রোষানলে। তখন বারবার তাকে সহ্য করতে হয় অমানুষিক নির্যতন। জার যখন বুঝতে পারলেন একদল লোক জারের বিরুদ্ধে সংগঠিত হচ্ছিল তখন জারের শাসকরা ভয় পেয়ে যায়। আর তখনই সিদ্ধান্ত নেয় যারা বিপ্লবের ঝান্ডা বহন করছে তাদেরকে দমন করতে হবে। এ সময় গ্রেফতার করা হয় ফিওদর দস্তয়ভস্কিকে। কিছুদিনের মধ্যে জারের নির্দেশে সমস্ত বুদ্ধিজীবী রাজদ্রোহীদের মৃত্যুদন্ড রদ করে সশ্রম কারাদণ্ডে দন্ডিত করা হয়। দস্তয়েভস্কিকে পাঠিয়ে দেওয়া হয় সাইবেরিয়ার বন্দি শিবিরে।
একদিকে লাঞ্ছিত ও নিপীড়িত মানুষের মানবিকতা এবং কষ্ট সহিষ্ণুতা অন্যদিকে ধনী ও অভিজাতদের স্বার্থপরতা ও নিষ্ঠুরতার ছবি এঁকে দস্তয়েভস্কি সমাজ জীবনে চলমান সংঘাত এবং বিরোধকে তুলে ধরেছেন তার কীর্তির মাধ্যমে। লেখক হিসাবে দেখাতে চেয়ছেন একজন মানুষ নিজের ব্যক্তিত্ব রক্ষা করতে না পেরে,নিজের মতো হয়ে উঠতে না পেরে কিভাবে শেষমেশ কঠিনতায়, অসামাজিকতায় অথবা মস্তিষ্ক বিকৃতিতে পৌঁছে যায়। এই শ্রেণির মানুষ শেষ পর্যন্ত জীবন যুদ্ধে হেরে গিয়ে নিজের মানব প্রকৃতিকে দমন করতে করতে মনুষত্যের প্রাণীতে পর্যবসিত হয়। মনুষ্যত্বের এই চরম অবমাননা দস্তয়েভস্কি খুব কাছ থেকে দেখেছেন। আর তাই তাকে বলা হয়ে থাকে লাঞ্চিত বঞ্চনার ফিওদর। মানুষ হয়ে মানুষের পাশে দাঁড়তে চেয়েছিলেন। লড়াই করেই মর্যাদার সাথে বেঁচে থাকতে চেয়ছিলেন। আজকের সময়ে এমন মানুষ প্রয়োজন প্রজন্মের কাছে। হেরে না যাওয়ার লড়াই এগিয়ে নেওয়ার মনোবল থাকা দরকার। আজকের পুঁজিবাদী সমাজের মানুষের মননে যে ফ্যাসিবাদ তার থেকে বের হয়ে জানতে হবে এই মহান মনীষীদের। ব্যক্তিজীবনে চর্চায় নিয়ে আসতে বিপ্লবী আদর্শের।
এই মহান রুশ ঔপন্যাসিক, ছোটগল্পকার, প্রাবন্ধিক ও দার্শনিক মারা যান ৯ ফেব্রুয়ারি ১৮৮১। মৃত্যু দিবসে শ্রদ্ধা ও স্মরণ করছি ফিওদর দস্তয়েভস্কি কে।
#মনিষী_স্মরণ
#শ্রদ্ধা_ও_স্মরণ
#ফিওদর_দস্তয়েভস্কি
#অনুশীলন








কোন মন্তব্য নেই