Header Ads

গানে গানে বন্ধন যাক টুটে- এই মহৎ ভাবনা নিয়েই উজানের "উজান 'পত্রিকা প্রকাশ পেল

✺✺✺✺✺✺✺✺✺
‘উজান’ অষ্টাদশ সংখ্যা বেরোল গেল ২৫ ডিসেম্বর,২০২২।রবিবারে সন্ধ্যা সোয়া পাঁচটায়। উন্মোচন করলেন তিনসুকিয়া শহরের দুই প্রবীণ সঙ্গীত শিল্পী ও শিক্ষক নির্মলেন্দু চট্টোপাধ্যায় এবং পূর্ণেন্দু দাস। এবারে কাগজের মূল ভাবনা ছিল ‘গানে গানে বন্ধন যাক টুটে’ –অর্থাৎ সংগীত। উজান সম্পাদনা সমিতি সব সময়েই মনে করে—ছোটো কাগজকে কেবলই কিছু কবিতা আর কথাশিল্পের গণ্ডিতে বেঁধে রাখাটা খুব বুদ্ধিমানের কাজ নয়। বাকি শিল্প ও সমাজ নিয়ে ভাবাটাও বুদ্ধিমানেদের দায়। সেই জন্যে আগেই দুটি সংখ্যা কেবল ‘অভিনয়’ শিল্প নিয়ে করেছে। করেছে ‘মাতৃভাষা মাধ্যমের শিক্ষা’ নিয়ে। নাগরিকত্বের সংকট নিয়ে করেছে দুই দুইটি সংখ্যা। গেলবারে ছুঁয়েছিল ‘অতিমারি’। এবারে গান নিয়ে কিছু ভাবনা উস্কে দেবার দায় নিল ‘উজান’।
 কিন্তু কাজটি নিজেরা একা ভালো করা যাবে না  ভেবে সাহায্যের আমন্ত্রণ নিয়ে হাজির হওয়া গেল দুই সুপরিচিত সঙ্গীত শিল্পী তথা ভাবুক শুভপ্রসাদ নন্দী মজুমদার ও কল্লোল দাশগুপ্তের কাছে। দুজনেই কলকাতার লোক। প্রথমজন সেখানে অসম থেকে দীর্ঘদিনের প্রবাসী, দ্বিতীয়জন বেশ কিছু বছর অসমে প্রবাসী ছিলেন। ফলে অসম তথা পূর্বোত্তরের সঙ্গে তাঁদের সাংস্কৃতিক সংযোগও প্রশ্নাতীত।  তাঁরা সানন্দে উজানের সঙ্গে জুড়লেন। ভাবনাকে রূপ দিলেন। লেখক নির্বাচন করে ডাক পাঠালেন। এবং বছর ভরে লেগে রইলেন। ডাক পৌঁছেছিল বহুর কাছে, স্বাভাবিকভাবেই সবার থেকে সমান সাড়া মেলেনি। কিন্তু যেটুকু পৌঁছুল সেটুকুও কম কিছু না। 
 এই দু’জনে তো লিখলেনই। আর যারা লিখলেন তাঁদের মধ্যে অন্যতম---শুভেন্দু মাইতি,সম্বিত বসু,স্বপন সোম,শিবাংশু দে,চন্দ্রা মুখোপাধ্যায় অমিতাভ দেব চৌধুরী,শৌনক দত্ত,জেনেভি খোঙজি প্রমুখ। জেনেভি সুপরিচিত খাসি শিল্পী, বাংলাতেও গান করেন। রবীন্দ্র সঙ্গীতও। তাঁর ইংরাজি লেখাটি অনুবাদ করে দিয়েছেন ধনঞ্জয় চক্রবর্তী।  
 রয়েছেন তিন গীতিকবিও একগুচ্ছ গানের কথা নিয়ে। কলকাতার সুপ্রতীম দত্ত—আলফাজ নামে যিনি গান লিখে থাকেন আর শিলচরের হৃষীকেশ চক্রবর্তী ও  বিশ্বরাজ ভট্টাচার্য ।
 গান নিয়েই কবিতা লিখতে কাউকে বলা হয় নি। তবু অনেকেই কবিতাতে গানকেই ধরেছেন। রামচন্দ্র পাল –উজানের নিয়মিত লেখক। কালিকা প্রসাদ ভট্টাচার্যকে স্মরণ করেছেন সুখপাঠ্য কবিতাতে। আর যারা লিখলেন, তাঁদের অন্যতম...গৌতম চৌধুরী,সন্তোষ রায় ,তপন রায় ,সপ্তর্ষি বিশ্বাস,স্বর্ণালি বিশ্বাস ভট্টাচার্য,রবীন ভট্টাচার্য,সুজিত দাস,খোকন সাহা, চন্দ্রিমা দত্ত,সঞ্জয় ভট্টাচার্য , মৃন্ময় রায়,স্নিগ্ধা নাথ,ব্রত চক্রবর্তী, এ এফ ইকবাল,রাজীব ভট্টাচার্য,সুতপা চক্রবর্তী,মিফতাহ উদ্দিন প্রমুখ। 
ঋতুপর্ণ (-আ) নেওগের অসমিয়া কবিতা অনুবাদ করেছেন ময়ূরী শর্মা বরুয়া। কবি এবং অনুবাদক দুজনেরই মাতৃভাষা কিন্তু অসমিয়া। অনুবাদ করেছেন পার্থসারথি দত্তও । 
 দুটি অসমিয়া গল্প অনুবাদ করেছেন দীপঙ্কর কর ও অভিজিৎ লাহিড়ি । প্রথম জন করলেন কুল শইকীয়ার গল্প এবং দ্বিতীয় জন সৌরভ কুমার চলিহার ছোটো গল্প। চারটি ভিন্ন স্বাদের মৌলিক গল্প লিখেছেন  কল্পনা রায়,শঙ্কু  চক্রবর্তী,শর্মিলা দত্ত  এবং নীলদীপ চক্রবর্তী।
 প্রচ্ছদটি যথারীতি সাজিয়েছেন ‘উজান’ সদস্য রেখাশিল্পী ত্রিদিব দত্ত । ভেতরের অলঙ্করণে সহযোগিতা করেছেন অনুভব ওঝা ও সুমিত পাল। 
 জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে শিলচরের নবম উত্তর পূর্বাঞ্চল বাংলা ছোটো-কাগজ সম্মেলনে কাগজটি পৌঁছুবে। আর পৌঁছুবে শীতের নানান বইমেলাতেও। শিলচরের বাতায়নে এবং আগরতলার ‘অক্ষর পাবলিকেশনসে’ও পাওয়া যাবে।
তিনসুকিয়ার সুবচনী আলি দুর্গাপূজা মন্দির প্রাঙ্গণে উন্মোচন অনুষ্ঠানের শুরু হতে সামান্য দেরি হয় বিদ্যুৎ বিভ্রাটের জন্যে। তার পরে চলে টানা সাড়ে তিনঘণ্টা –পৌনে নটা অবধি। জীবন কৃষ্ণ সরকারের পরিচালনাতে উজানের শিল্পীদের পরিবেশিত দুটি উদ্বোধনী সংগীতে অনুষ্ঠানের সূচনা হয়। গান দুটি ছিল নিজেদের লেখা ‘মোরা উজানের যাত্রী’ –সংগঠন সঙ্গীত এবং ‘শুভ কর্মপথে’ এই রবীন্দ্র সঙ্গীত । এতে আরও যারা অংশ নেন শীলা দেব দে সরকার, বর্ণালি সেনগুপ্ত, বিনায়ক সেনগুপ্ত। এদের  এবং পরের সব কটি পরিবেশনে বাদ্যে সহযোগিতা করেন তবলাতে বিজন সরকার, ক্যাসিওতে রাহুল দাস এবং গিটারে সুজয় দত্ত। ‘উজান সাহিত্য গোষ্ঠী’র সাধারণ সম্পাদক ভানু ভূষণ দাস সবাইকে স্বাগত জানিয়ে ছোট্ট বক্তব্য রাখেন।
 এর পরেই দুই অতিথি নির্মলেন্দু চট্টোপাধ্যায় এবং পূর্ণেন্দু দাসকে মঞ্চে ডেকে নিয়ে উত্তরীয় পরিয়ে বরণ করে নেন সাংগঠনিক সম্পাদক জীবন কৃষ্ণ সরকার ও সাংস্কৃতিক সম্পাদিকা শীলা দেব দে সরকার। তাঁদের হাতে উপহার স্বরূপ দুটি স্মারক ও বই তুলে দেন তাঁরা। অষ্টাদশ সংখ্যা ‘উজান’ পত্রিকার পেছনকার ভাবনা তুলে ধরে ছোট্ট বক্তব্য রাখেন মুখ্য সম্পাদিকা সবিতা দেবনাথ এবং সম্পাদক মণ্ডলীর অন্যতম সদস্য সুশান্ত কর। এর পরেই তাঁদের দুজনের হাতে উন্মোচিত হয় কাগজের নতুন সংখ্যা। উন্মোচনে তাঁদের সঙ্গ প্রদান করেন অধ্যাপক হিমাংশু বিশ্বাস, অধ্যাপিকা সান্ত্বনা সেন দেব চৌধুরী, সুজিৎ চৌধুরী, পার্থ সারথি দত্ত প্রমুখ। এছাড়াও এদিন উন্মোচিত হয় ‘উজান সাহিত্য গোষ্ঠী’র সহ সভাপতি প্রশান্ত ভট্টাচার্যের কবিতার বই ‘অভিব্যক্তি’।  
এর পরেই একগুচ্ছ অসমিয়া আধুনিক গানে আসর মাতান শিল্পী পূর্ণেন্দু দাস এবং ধ্রুপদি গানে নির্মলেন্দু চট্টোপাধ্যায়। বিজন সরকার, রাহুল দাস, সুজয় দত্ত ছাড়াও পূর্ণেন্দু দাসকে ঢোলকে সহযোগিতা করেন পরাগ বরবরা। ঘণ্টা দেড়েকের এই অতিথি শিল্পী দুজনের গানের অনুষ্ঠানের বাইরেও সেদিনের অনুষ্ঠানে একক গান করে শোনান শীলা দেব দে সরকার, জীবন কৃষ্ণ সরকার, বিনায়ক সেনগুপ্ত, টিউলিপ দত্ত ও তুহিনা ভট্টাচার্য।  কবিতা আবৃত্তি করে শোনান বাচিক শিল্পী নমিতা ঘোষ। নিজের লেখা কবিতা পড়েন নিহারিকা দেবী। ছোট্ট মেয়ে তানিশী রায় লোকগানের সুরে একটি বিখ্যাত আধুনিক বাংলা গানের সঙ্গে নেচে আসর মাতায়। 
 প্রায় চারঘণ্টার অনুষ্ঠানের একেবারে শেষে রক্তিম চক্রবর্তীর পরিচালনাতে তিনসুকিয়ার ‘আদ্যাশক্তি সৃষ্টি কলা মন্দির’-এর শিল্পীরা পরিবেশন করেন নৃতিনাট্য রবীন্দ্রনাথের ‘চণ্ডালিকা’।  তাতে যে শিল্পীরা অংশ নেন তাঁরা হলেন সোনালি ভট্টাচার্য, বার্বি গুহ, শ্রেয়ান চক্রবর্তী, প্রিয়াংশু দত্ত, সৌম্যজিৎ দেব, বিদ্যাশ্রী চৌধুরী, রূপালি ভট্টাচার্য, দিব্যানি মজুমদার, কাব্যা নেওয়ার ও সায়নিকা পাল।
 পুরো অনুষ্ঠানের সঞ্চালনার দায়িত্বে ছিলেন ত্রিদিব দত্ত। এদিন হঠাৎ বৃষ্টি এবং সেই সঙ্গে শীত নামাতে অনুষ্ঠানের শুরুতে ব্যাপক উৎকণ্ঠাতে পেয়েছিল। কিন্তু শেষ অব্দি ভরা প্রাঙ্গণ অনুষ্ঠানকে সফল সমাপ্তির দিকে নিয়ে যায়। শহরের এবং শহরের বাইরের বহু দর্শক এসে সমবেত হয়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে অনেক সঙ্গীত শিল্পীও হাজির থেকে সৌষ্ঠব বাড়িয়েছেন।

কোন মন্তব্য নেই

Blogger দ্বারা পরিচালিত.