Header Ads

একুশের বিধানসভা নির্বাচন ও উত্তরে গুরুং এফেক্ট !!

বিশ্বদেব চট্টোপাধ্যায়

পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যপুলিশের এক অফিসার হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্ত বিমল গুরুংয়ের বিরুদ্ধে এক গুচ্ছ জামিন অযোগ্য অভিযোগ এনে রাজ্যসরকার তাকে পাহাড় ছাড়া করেছিল। এক গাদা অত্যন্ত গুরুতর অভিযোগের ভিত্তিতে তার বিরুদ্ধে যখন গ্রেফতারী পরোয়ানা ঝুলছে তখন বেশ কিছুদিন পাহাড়ের জঙ্গলে-নেপালে আত্মগোপন করে থাকলেও শেষপর্যন্ত দিল্লীতে বিজেপি’র আশ্রয়ে গুরুং ছিলেন--এমনটাই খবর ছিল। বিজেপি তাকে শুধুমাত্র মানবতার কারণে দিল্লীতে শেলটার দিয়েছিল--এমনটা ভাবার কোনো কারণই নেই। কারণ, যে ব্যাপারে দলের কোনো স্বার্থ থাকে না সে ব্যাপারে বিজেপি’র কোনোরকম মাথাব্যথাই থাকে না। বিজেপি’র শেল্টারে থাকাকালীন গুরুংয়ের নিয়মিত ব্রেনওয়াশ করে তাকে মাহেন্দ্রক্ষণে ব্যবহারের উপযোগী করে তোলা হচ্ছিল বলেই আমার বরাবর মনে হয়েছে। গুরুং সম্পর্কে আমি বহুদিন ধরেই লেখালেখি করেছি--বলতে গেলে তাকে নিয়ে এক প্রকার সমীক্ষাই করে এসেছি। এতকাল গুরুং সম্পর্কে যা কিছু লিখে এসেছি তা অক্ষরে অক্ষরে সত্যি প্রমাণিত হয়েছে।

দীর্ঘ আত্মগোপনের কাল কাটিয়ে হঠাৎই যেদিন গুরুং তৃণমূল কংগ্রেসের নতুন অবতার হিসেবে খোদ কলকাতায় রাজ্যপুলিশের নিরাপত্তা বেষ্টনীর মধ্যে থেকে সাংবাদিক বৈঠক করলেন সেদিনই আমি লিখেছিলাম--গুরুং তৃণমূলের জন্যে ব্যুমেরাং হতে চলেছেন। রাতারাতি তার বিরুদ্ধে দায়ের করা গুরুতর অভিযোগের সিংহভাগই প্রত্যাহার করে নিয়ে তৃণমূলের রাজনীতিতে তাকে ঢালাও স্পেস দেওয়ার পরিণাম অত্যন্ত খারাপ হতে চলেছে। আমি সন্দেহ প্রকাশ করেছিলাম--গুরুং বিজেপি’র পক্ষেই খেলতে মাঠে নেমে পড়েছেন বা নামিয়ে দেওয়া হয়েছে। তৃণমূলের রাজনৈতিক নীতিনির্ধারকরা বিজেপি’র ফাঁদে পা দিয়ে গুরুংকে দলের মধ্যে সামিল করে নিল বলেও আমার সন্দেহ ব্যক্ত করেছিলাম। আমার লেখাগুলো পড়ে যথারীতি বেশ কিছু ‘রাজনৈতিক বোদ্ধা’ শিম্পাঞ্জির মতো দাঁত বের করে খ্যাক-খ্যাক করে হাসাহাসি করেছিল। তাদের প্রগাঢ় বিশ্বাস তৈরি হয়েছিল পাহাড়ের সুপারম্যান গুরুংকে নিয়ে--‘গুরুং যেখানে পাহাড় তো বটেই ডুয়ার্সের ভোটও সেখানে’--এই বদ্ধমূল ধারণাই শেষপর্যন্ত তৃণমূলকে ডুবিয়ে দিয়েছে। এই স্পষ্ট আশঙ্কা আমি আমার লেখার মাধ্যমে ব্যক্ত করেছিলাম। গুরুংকে সাজিয়ে গুছিয়ে বিজেপি-ই এ রাজ্যে তৃণমূলের পরম হিতৈষীর ভ‚মিকায় নামিয়ে দিয়েছিল বলেই আমার ধারণা ছিল। এমন একটা ফাঁদ তারা তৈরি করেছিল যার মধ্যে তৃণমূল পা গলিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছিল। দিল্লীতে থাকাকালীন গুরুংয়ের সঙ্গে তৃণমূলের যে সব মাথা যোগাযোগ করেছিলেন তাদের বিশ্বাস কি ভাবে কি বলে অর্জন করতে হবে সে সব পাঠ গুরুং দীর্ঘ সময় ধরে নিয়েছিলেন--কলকাতায় আত্মপ্রকাশ করেই তিনি বিজেপি’র বিরুদ্ধে যে ভাষায় এবং ভঙ্গিতে আক্রমণ শুরু করলেন তা আমার কাছে খুব স্বাভাবিক রাজনীতি বলে মনে হয় নি। আমার কাছে অস্বাভাবিক মনে হয়েছে--তৃণমূলের হঠাৎ করে একেবারেই অসম রাজনৈতিক সম্পর্কসূত্রে বাঁধা গুরুংকে ঢালাও স্পেস দেওয়ার কারণে বিনয় তামাংদের সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট করার দিকে ঝুঁকে পড়ার ব্যাপারটা। গুরুং পাহাড়ে ফিরতে চেয়েছিলেন যে কোনো মূল্যে। তিনি বুঝতে পারছিলেন--এই মুহূর্তে পাহাড়ে ফিরতে হলে বিজেপি বিরোধিতার চড়া সুর সঙ্গে নিয়েই ফিরতে হবে এবং তৃণমূলকে ভেতর থেকে পথে বসিয়ে দিতে হবে। তার মধ্যে এই বিশ্বাসও ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছিল--এবারে বিজেপি-ই রাজ্যে ক্ষমতায় আসতে চলেছে। সুতরাং গুরুং যদি ভেতর থেকে তৃণমূলকে ডুবিয়ে দিতে পারেন তাহলে পুরস্কার স্বরূপ পাহাড়কে স্বশাসিত অঞ্চল (কেন্দ্রের অধীন) হিসেবে ঘোষণা করে গুরুংয়ের হাতে তুলে দেওয়া হবে। পৃথক রাজ্য যে কোনো কালেই এই ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অঞ্চলকে করা যাবে না সেটা গুরুংও জানেন।

অর্থাৎ সব দিক থেকেই তৈরি হয়েই তীব্র বিজেপি বিরোধী হুঙ্কার তুলে কলকাতায় পা রেখেছিলেন গুরুং। তৃণমূল কংগ্রেস গুরুংকে দারুণভাবে ব্যবহার করা যাবে মনে করে বিনয় তামাংদেরও বাতিলের খাতায় তুলে রাখল। তারা ধরেই নিয়েছিল--পাহাড়ের তিনটি তো বটেই সমতলেরও শিলিগুড়ি সহ বাকি তিনটি এবং জলপাইগুড়ি-আলিপুরদুয়ারের চা-বাগান অধ্যুষিত অঞ্চলের আসনগুলিও ফিরে পাবে। কিন্তু আমি খুব স্পষ্ট করেই লিখেছিলাম--হিতে বিপরীত হতে চলেছে--করাণ, গুরুং পাহাড় এবং ডুয়ার্সে তাঁর হারানো মাটি বিজেপিকে বাদ দিয়ে এক ফোঁটাও ফিরে পাবেন না। গুরুংও সেটা জানতেন এবং জানতেন বলেই তিনি বিজেপিকে তীব্র আক্রমণের মাধ্যমে তৃণমূলের ন্যূনতম সম্ভাবনাও খতম করে দিতে পেরেছেন। কোচবিহার থেকে কালিম্পং--এই পাঁচটি জেলার ২৭-টি আসনের একটিতেও গুরুংয়ের ছিটেফোঁটা ম্যাজিকও কাজ করে নি। তৃণমূল যে পাঁচটি আসন দখল করতে পেরেছে তার একটিও দার্জিলিং-আলিপুরদুয়ার-জলপাইগুড়ির গুরুং প্রভাবিত এলাকা নয়। ঠিক এটাই হতে চলেছে বলে আমি আমার বিশ্লেষণের মাধ্যমে অনেক আগেই দেখিয়েছিলাম। গুরুংকে তৃণমূলের বিশ্বাসভাজন করে পাঠানোর ধুরন্ধর রাজনীতিটা পিকে-ও ধরতে পারেন নি। বিজেপি’র পরিকল্পনা তাই অনায়াসে ক্লিক করে গেছে !!

কোন মন্তব্য নেই

Blogger দ্বারা পরিচালিত.