Header Ads

আজ থেকে ফের জোরেশোরে শুরু হয়ে গেল মুকুল-জল্পনা !!

বিশ্বদেব চট্টোপাধ্যায়

একুশ বছর আগে বিধানসভা নির্বাচনে জীবনে একবারই লড়েছিলেন--জিততে পারেন নি। তারপর আর নির্বাচনী ময়দানে না থেকে তিনি দলের নির্বাচনী ম্যানজার হিসেবে সাফল্যের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে এসেছেন। বিজেপিতে নাম লেখাবার পরেও তিনি নির্বাচনে প্রার্থী হতে চান নি। নির্বাচনী কমিটির প্রধান হিসেবে তাঁকে দায়িত্ব দেওয়া হলে তিনি এক-আধটা নয় ১৮-টি আসনে দলের সাফল্য এনে দিয়েছিলেন। জানি, কিছু লোক হৈ-হৈ করে বলে উঠবেন--মুকুল নয়, জয় এনে দিয়েছেন মোদী এবং অমিত শাহ। কিন্তু তা যে সত্যি নয় তা বোঝা গেল বিধানসভা নির্বাচনে। এই নির্বাচনে বঙ্গ বিজেপি’র ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি ৭৭-টি আসনে জয়ের পেছনেও মুকুলের রাজনীতি’র একটা বিশেষ ভূমিকা রয়ে গিয়েছে। মুকুল যদি তৃণমূলে নির্বাচনের প্রাক্কালে শুভেন্দু-রাজীব-সব্যসাচী সহ শতাধিক তৃণমূল নেতানেত্রীদের দলে টেনে এনে ধস না নামাতেন তাহলে এই জয়টুকুও সম্ভব হত না।

মুকুল রায় তৃণমূলের প্রধান স্থপতি হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়া এমন একজন নেতা যিনি ২০১৬ সাল পর্যন্ত নির্বাচনী বিপর্যয় বা ব্যর্থতা থেকে দলকে সুরক্ষিত রাখতে পেরেছিলেন তাঁর রাজনৈতিক মেধা সম্পন্ন সাংগঠনিক দক্ষতার কারণেই। সংগঠনের পাশাপাশি তিনি পুলিশ-প্রশাসনকেও দলের স্বার্থে কিভাবে ব্যবহার করতে হয় তারও প্রমাণ রেখে এসেছেন। মুকুল রায় যে তৃণমূলের মূল্যবান একটি স্তম্ভ ছিলেন সেটা এখন তৃণমূল স্বীকার না করলেও রাজ্যের মানুষ এবং রাজনীতিসংশ্লিষ্ট নেতা-কর্মীরা জানেন। নারদা কাণ্ডে এবং সারদা কাণ্ডে মুকুল ফ্রেমবন্দি হওয়ার পর দলের ভেতরে ধীরে ধীরে কোণঠাসা হতে থাকেন। নানান অজুহাতে উপেক্ষিত এবং অপমানিত হতে থাকেন। নিজের জায়গাটা যে তিনি দ্রুত হারাচ্ছেন এটা টের পাওয়ার পর তাঁর রাজনৈতিক অস্তিত্ব রীতিমতো সঙ্কটের মধ্যে পড়ে যায়। তবু ২০১৬ সালেও দলের নির্বাচনী দায়িত্ব অত্যন্ত সাফল্যের সঙ্গে পালন করেই শেষপর্যন্ত বাধ্য হয়েই ২০১৭ সালের নভেম্বরে নিজেরই হাতে তৈরি দল ছেড়ে বিজেপিতে যোগ দেন। দল ছাড়ার সঙ্গে সঙ্গেই তার ছেড়ে আসা দলই একের পর এক বিস্ফোরক অভিযোগ তুলতে থাকে তাঁর বিরুদ্ধে। অভিযোগ তোলা হয় সারদা-নারদা’র অভিযোগ থেকে নিজেকে মুক্ত করতেই তিনি বিজেপিতে যোগ দিয়েছেন।
বিস্ময়কর ব্যাপার হল--বিজেপিও কিন্তু নানাভাবে এই অভিযোগটিকেই মান্যতা দিতে কসুর করল না নানান কৌশলে। সাধারণের কাছে স্পষ্ট হতে থাকল--বলা ভাল বিজেপি স্পষ্ট করতে থাকল--তারা মুকুলকে ব্যবহার করবে কিন্তু সারদা-নারদা’র অভিযোগ থাকায় তাঁকে তাঁর প্রাপ্য যোগ্য সম্মান বা মর্যাদা দেবে না--এক কথায় তাঁকে ব্ল্যাকমেইলের মাধ্যমে নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করবে এবং সেটাই করে আসা হচ্ছে আজ পর্যন্ত। মুকুল ২০১৭ সালে বিজেপিতে যোগ দেওয়ার পর ২০১৮ সালের পঞ্চায়েত নির্বাচনে রাজ্যরাজনীতিতে প্রায় অপ্রাসঙ্গিক বিজেপিকে অনেকটাই প্রাসঙ্গিক করে তোলেন তাঁর রাজ্যব্যাপী ছড়িয়ে থাকা অনুগামী ও সংগঠনের মাধ্যমে। বিজেপি কিন্তু মুকুলকে উপযুক্ত কোনো পদ--রাজ্যসভার সাংসদ--কেন্দ্রীয় মন্ত্রীত্ব--এসব কিছুই দেওয়ার কথা ভাবে নি। তবু মুকুল তৃণমূলকে ভেতর থেকে দুর্বল করে তোলার রাজনীতির মাধ্যমে বিজেপি’র গ্রহণযোগ্যতা বাড়িয়ে যাচ্ছিলেন। ২০১৯-এর লোকসভা নির্বাচনে মুকুল-ম্যাজিকেই বিজেপি মাত্র ২ থেকে ১৮-টি আসনে পৌঁছে যায়। তারপরেও মুকুলের প্রায় অর্থহীন সর্বভারতীয় সহসভাপতির আলঙ্কারিক পদ ছাড়া আর কিছু জোটে নি। বিজেপি’র সর্বভারতীয় সংগঠনে যারা সহসভাপতির পদে আছেন তাদের একজনও বিধায়ক বা রাজ্যস্তরের সাধারণ পদহীন কেউ আছেন কিনা আমি জানি না--যতদূর মনে হয় একজনও নেই। তারা হয় কেউ কেন্দ্রীয় মন্ত্রী না হয় লোকসভা বা রাজ্যসভার সাংসদ। একমাত্র মুকুল রায়ই এমন একজন সর্বভারতীয় সহসভাপতি যিনি কোনো কক্ষেরই সাংসদ নন--মন্ত্রীও নন--এমন কী রাজ্যস্তরেও তাঁর কোনো পদ ছিল না ! তবু মুকুল রায় বিজেপিতেই এখনও রয়েছেন। যারা মনে করছেন--তিনি সিবিআই-ইডি’র ভয়ে বিজেপিতে রয়েছেন তাঁরা ঠিক ভাবছেন না। কারণ, মুকুল জানেন--বিজেপি তাদের সর্বভারতীয় সহসভাপতিকে কলঙ্কিত করে কাঠগড়ায় তুলতে পারবে না--তুললে বিজেপিকেও কালি মাখতে হবে। শুধু তাই নয়--মুকুল রায় জানেন, সিবিআই ও ইডিকে ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচন পর্যন্ত বিজেপি টেনে নিয়ে যাবে। রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহারের কারণেই তদন্তের এসপার ওসপার তারা করবে না। সুতরাং মুকুল ভয়ে বিজেপিতে থাকতে বাধ্য হচ্ছেন--এটা যুক্তিসঙ্গত ধারণা নয়।
মুকুল বাংলার রাজনীতির পালস্ যেভাবে বুঝতে পারেন তার চার আনাও বোঝার ক্ষমতা নেই দিলীপ ঘোষ তো বটেই--অরবিন্দ মেনন, শিবপ্রকাশ বা অমিত মালব্যদেরও। বোঝেন না স্বয়ং নরেন্দ্র মোদী এবং অমিত শাহ-ও, বোঝেন না বলেই মুকুলকে একটি বিধানসভা কেন্দ্রের প্রার্থী করে পুরোপুরি নিষ্ক্রিয় করে দিয়ে যারা বাংলার রাজনীতি সংস্কৃতি ভাষাজনিত আবেগের কিস্যু বোঝেন না তাদের হাতেই তুলে দিলেন ! ওয়াররুমে মুকুলকে রেখে পুরো নির্বাচনের দায়িত্ব তুলে দিলে আরও কম করেও ৮০-৮৫-টি আসন বিজেপি’র দখলে চলে আসতে পারত। কারণ, এই ফলাফল-ই বলে দিচ্ছে--লোকসভার মতো যেসব জায়গায় বিজেপি ভাল ফল করতে পারত সেইসব জায়গায় মুকুল তাঁর সংগঠনকে নামাতে পারেন নি। মুকলের সংগঠন যদি মুকুলের নেতৃত্বে কাজ করার সুযোগ পেত তাহলে বিজেপি’র এই লজ্জাজনক স্বপ্নভঙ্গ হত না। লজ্জাজনক এই কারণেই বলছি--বিজেপি’র কেন্দ্রীয় নেতারা রাজ্যবিধানসভা নির্বাচনে যে ভাবে ময়দান কাঁপিয়ে জেতার আগেই জিতে যাওয়ার আস্ফালন করছিলেন তারপর যে ফলাফল উঠে এল তার মধ্যে লজ্জা ছাড়া থাকলই বা কি? ওয়াররুমের কৃর্তত্ব যদি মুকুলের হাতে থাকতো তাহলে ফলাফল নিঃসন্দেহে অন্যরকম হত।
মুকুলের রাজনৈতিক ভাবনা এবং অঙ্ক কষার অসাধরণ মেধা যারা কাছ থেকে দেখার সুযোগ পায় নি তাদের পক্ষে তাঁকে বোঝা সম্ভব নয়। বঙ্গ বিজেপিতে রাহুল সিনহা তথাগত রায় সভাপতির দায়িত্বে থেকে কতজনকে বিধানসভায় পাঠাতে পেরেছেন--কতজনকে সংসদে পাঠাতে পেরেছেন--কটা জেলা পরিষদ, পঞ্চায়েত সমিতি, কর্পোরেশন, পুরসভা দখল করতে পেরেছিলেন তার তথ্য-পরিসংখ্যান সকলেরই জানা। জীবনের দ্বাদশতম পরাজয়ের পরেও রাহুল সিনহার শারীরিক ভাষা দেখে মনে হচ্ছিল তাঁর মতো খুশি আর কেউ হতে পারেন নি। তথাগত এখন একের পর এক বোমা ফাটাচ্ছেন--কিন্তু নিজের দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের পারফরমেন্স নিয়ে একটি শব্দও উচ্চারণ করছেন না ! মুকুলকে সুকৌশলে রাজ্যরাজনীতিতে আটকে রাখার অত্যন্ত নিম্নমানের রাজনীতিই বিজেপি’র ভরাডুবির কারণ হল--এটা আদি-নব্য নিয়ে আদিখ্যেতায় মগ্ন অপদার্থরা এখনও বুঝতেই পারছে না !
মুকুল রায় আজ বিধানসভায় বিজেপি বিধায়ক হিসেবেই শপথ নেওয়ার জন্য হাজির হতেই নানারকম জল্পনা শুরু হয়ে গেল। কেন তিনি বিধানসভায় এক নম্বর গেট দিয়ে প্রবশে করলেন--যে গেট দিয়ে মুখ্যমন্ত্রী এবং বিশেষ কিছু মন্ত্রীরাই সাধারণতঃ প্রবেশ করেন--বিশেষ কোনো বার্তা দিলেন? বিধানসভায় এসে তিনি তৃণমূলের সর্বভারতীয় সভাপতি’র সঙ্গে কেন সৌজন্য বিনিময় করলেন--বিশেষ কোনো বার্তা দিলেন? কেন তিনি সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে বললেন--যদি কিছু বলার থাকে সকলকে ডেকে বলে দেবেন--বিশেষ কোনো বার্তা দিলেন?
হয়তো বিশেষ কোনো বার্তা-ই দিলেন তিনি--কিন্তু কি সেই বার্তা? বিজেপি ছেড়ে তিনি তৃণমূলে ফিরে যাচ্ছেন? এত তাড়াতাড়ি? সবে তো শপথ নিলেন তিনি--বিধানসভায় বিরোধী দলনেতাও হতে পারেন--তবুও? জল্পনা মুকুলকে নিয়ে গত চার বছরে কম কিছু হয় নি--এখন তো হতেই পারে।
আমি কিন্তু ভাবতে পারছি না--মুকুল এখনই এরকম কোনো সিদ্ধান্ত নিতে চলেছেন। কারণ, তিনি খুব ভাল করেই জানেন--তৃণমূলে তিনি তাঁর যে অবস্থান থেকে সরে আসতে বাধ্য হয়েছিলেন সেই অবস্থানে তিনি আর ফিরতে পারবেন না--কারণ, তাঁর ছেড়ে আসা সেই জায়গাটা আর তার জন্যে খালি নেই। এখন তাঁর জন্যে সাবর্ডিনেট কর্মচারীর জায়গা খালি থাকতে পারে--যেখানে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের মাধ্যমে তাঁকে সুরে সুর মিলিয়ে থাকতে হবে। পারবেন তিনি থাকতে? রাজনীতিতে অবশ্য অসম্ভব বলে কিছুই নেই। সুতরাং তিনি যদি ফের তৃণমূলে ফিরে যান একজন অতি ক্ষুদ্র রাজনৈতিক বিশ্লেষক হিসেবে আমি অবাক হব না ঠিকই--কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে আমার খুবই খারাপ লাগবে। সত্যি সত্যি যদি মুকুল বিজেপি ছেড়ে চলে যান তাহলে প্রায় চোখের পলকে বিজেপি আবার রাজ্যরাজনীতিতে তার প্রাসঙ্গিকতা হারাবেই। মুকুলের বিকল্প বঙ্গ বিজেপিতে এই মুহূর্তে আর কেউ নেই !!

কোন মন্তব্য নেই

Blogger দ্বারা পরিচালিত.