বিশ্বদেব
চট্টোপাধ্যায়
গত পরশু আমার বাড়ির ঢিলছোঁড়া দূরত্বে সদ্য নির্মিত একটি ত্রিতল বাড়ির দোতলার বারন্দা থেকে মাত্র ১২ বছরের এক কিশোরী ঝাঁপ দিল নিচে ! সত্যিমিথ্যে জানি না--শুনলাম মায়ের সঙ্গে যে কোনো কারণেই হোক কথা কাটাকাটি-বকাঝকার কারণেই মেয়েটি দোতলা থেকে ঝাঁপ দিয়েছে। ঈশ্বরের অসীম করুণায় প্রাণে বেঁচে গেলেও শারীরিক ও মানসিক সম্পূর্ণ সুস্থতা কবে ফিরে পাবে জানি না--কিন্তু কামনা করছি দ্রুত সুস্থ স্বাভাবিক জীবনে বাচ্চাটি ফিরে আসুক।
মাত্র ১২ বছর বয়সে এই ধরণের কাণ্ড ঘটানো একেবারেই স্বাভাবিক ঘটনা নয়। আমাদের শৈশবে তো এসব কল্পনাই করতে পারতাম না। তার অবশ্য প্রচুর যুক্তিসঙ্গত কারণ রয়েছে। আমরা আমাদের শৈশবে দৌড়-ঝাঁপ করার জন্যে চতুর্দিকে প্রচুর স্পেস পেতাম। এক বাড়ি থেকে আরেক বাড়িতে ছোটাছুটি করে বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে মেলামেশা গল্প-গুজব খেলাধুলো করার পর্যাপ্ত সুযোগ পেতাম। এসবের ফাঁকে যতটুকু সময় থাকতো তার মধ্যে এই ধরণের কঠিন ও ভারি বিষয় নিয়ে ভাবনার বিন্দুমাত্র সুযোগ থাকতো না। গত পরশুর ঘটনায় আমি আঁতকে উঠেছিলাম--এরকম ঘটনাও ঘটতে পারে চোখের সামনেই ! বর্তমান পরিস্থিতিতে এটাও এখন অপ্রত্যাশিত মনে হচ্ছে না। দু-দুটো বছর ছেলেমেয়েদের জীবন থেকে অত্যন্ত মূল্যবান সময় হারিয়ে যাচ্ছে। প্রায় ঘরবন্দি জীবনের মারাত্মক একঘেয়েমীতে তারা ভেতরে ভেতরে প্রচণ্ড অবসাদবোধে আক্রান্ত হচ্ছে--ক্লান্ত বিধ্বস্ত হচ্ছে। তাদের মানসিকতার সুবিন্যস্ত কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়ছে। স্কুল-কলেজ বন্ধ--পরীক্ষা বন্ধ--পড়াশোনাও একপ্রকার বন্ধই বলা যায়--কারণ কোথাও কোনো চাপ নেই প্রতিযোগিতা নেই--আরও ভাল কিছু করার উদ্যোমও নেই। মাধ্যমিক উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা বন্ধ--পরীক্ষা না দিয়েও পরবর্তী ক্লাসে ঘরে বসেই পৌঁছে যাওয়া--সামগ্রিক এই পরিস্থিতিতে ছেলেমেয়েরা দিশেহারা হয়ে পড়ছে। মানসিক দিক থেকে বিপর্য্যস্ত হয়ে পড়ছে--ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে--এমন একটা আতঙ্ক তাদের তারা করে বেড়াচ্ছে। এর মধ্যে অসংখ্য পরিবার আর্থিক দিক থেকেও মারাত্মক সমস্যায় হাবুডুবু খাচ্ছে। পাশাপাশি রয়েছে করাল মৃত্যুর ছায়া। প্রতিদিন কাছে-দূরের চেনা অচেনা মানুষের মর্মান্তিক মৃত্যুর খবরও বিচলিত করছে তাদের। কারুর সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা বা নিজের মানসিক অবস্থা শেয়ার করারও সুযোগ থাকছে না তাদের অনেকেরই। এই রকম একটা পরিস্থিতিতে ছেলেমেয়েদের মনমেজাজের দিকে লক্ষ্য রেখে তাদের পাশে থেকে তাদের বন্ধু হয়ে ওঠার চেষ্টা যদি মা-বাবারা না করেন তাহলে নানান জটিলতা তৈরি হবেই। তাদের একা থাকতে দেওয়া উচিত হবে না। তাদের যে কোনো মূল্যে খুশি রাখার কথা অভিভাবকদের ভাবতেই হবে। বকা-ঝকা একেবারেই নয়--কারণ এই রকম শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতিতে তারা ভয়ানকভাবে একাকীত্বে ভুগতে থাকে--নিঃসঙ্গতা অনুভব করে। বাড়ি বা নিজের ঘরটাই তখন জেলখানা মনে হতে থাকে। সেটা মনে হতে দেওয়ার কোনো সুযোগই যাতে না তৈরি হয় সেটা দেখতেই হবে।
২০২০ সালে যারা বিশ্ববিদ্যালয়ে নাম লিখিয়েছিল তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবনটাকেই জানার সুযোগ পেল না। যারা মাধ্যমিক থেকে উচ্চমাধ্যমিকে উত্তীর্ণ হয়েছিল তারা উচ্চমাধ্যমিকের জীবনটাকেই ছুঁতে পারল না। যারা কলেজের প্রথমবর্ষে পা রেখেছিল তারাও কলেজ জীবনের সিংহভাগ সময়টাকেই হারিয়ে ফেলল। এই ভাবে অনেকেই মহা মূল্যবান দু-টি বছর হারিয়ে নিজেদের ভবিষ্যতের জন্যে কতটা কি হারালো তা ভাবতে ভাবতেই মানসিক দিক থেকে বিপর্য্যস্ত হয়ে পড়ছে ছেলেমেয়েরা। এদের কথা কে ভাববে? সরকার ভাববে না--কারণ, ভাবার মতো মেধা যোগ্যতা ও মানসিকতা তাদের নেই। দলতন্ত্রের তান্ত্রিকরা দলের উর্দ্ধে উঠে কিছু ভাবতে সক্ষম নয়--কারণ, সেই শিক্ষাদীক্ষা তাদের নেই। তারা প্রায় সব বিষয়েই এক একজন মহামুর্খ বললেও কম বলা হয়--কিন্তু তারা নিজেদের সর্বজ্ঞ সর্ববিশারদ মহাজ্ঞানী মহাজন ভাবেন--আর তা ভাবেন বলেই আজ দেশ জুড়ে অক্সিজেন ভ্যাকসিন সহ সামগ্রিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ভেতরের ভয়ানক অবব্যস্থা এবং গলদগুলো বেরিয়ে আসছে। গোমূত্র ও রামলীলায় মগ্ন রাজ্যগুলিতে জ্বলছে অনির্বাণ চিতা--জলে ভাসছে রাশি রাশি পচা মৃতদেহ--আকাশে উড়ছে চিল-শকুন--জলেস্থলে শেয়াল-কুকুরে ছিঁড়ে খাচ্ছে মানুষের প্রাণহীন সৎকারহীন দেহ ! এই হচ্ছে আমাদের নার্সিসিস্ট ঋষিকল্প মহাজ্ঞানী মহাজন প্রধানমন্ত্রীর ‘আত্মনির্ভর’ ভারতবর্ষ !
হাইপ্রোটিন খাদ্য ওষুধ স্বাস্থ্যকর পরিবেশ তো দূরের কথা দু’বেলা দু’মুঠো খাবারও আত্মনির্ভর দেশ সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে পারছে না। করোনার মোকাবেলায় পৃথিবীর সেরা হওয়ার তুর্কীনাচন এখন পরিণত হয়েছে চরম ব্যর্থতার গ্লানিতে। এই ঘোর অমানিশার প্রভাব থেকে কি করে মুক্ত থাকবে আমাদের ছেলেমেয়েরা? ঘরে ঘরেও চরম নির্বুদ্ধিতার মাশুল গুণতে হচ্ছে ছেলেমেয়েদের। পরিবারের বয়স্করা বেপরোয়া জীবন যাপন করছেন--করোনা প্রতিরোধের প্রয়োজনীয় বিধি মানছেন না। ভাইরাসকে নিয়ে আসছেন ঘরের মধ্যেই। লাইন দিচ্ছেন মদের দোকানের সামনে। এইসব নির্বোধ মানুষের ওপর ছেলেমেয়েরা ভরসা রাখবে কি করে? কে ভাববে এদের কথা। সরকারি কেষ্টবিষ্টুরা বড়বড় বাণী ঝেড়ে সরে যাচ্ছেন যে যার জায়গায়। তাদের প্রগলভতা ও বাচালতা প্রতিমুহূর্তে বিপদের দিকে ঠেলে দিচ্ছে আমাদের পরবর্তী প্রজন্মকে ! সত্যি সত্যি এ সময় বড় বেশি উদ্বেগের বড় বেশি অনিশ্চয়তার--তবু এখনও সবটুকু সময় হাতের ফাঁক গলে বেরিয়ে যায় নি। সচেতন হবে কি মানুষ !!
কোন মন্তব্য নেই