‘‘আমি দুই বাংলার মানুষের মধ্যে কোনও পার্থক্য দেখি না’’..
রিংকি মজুমদার
আজ সকালে স্যোশাল মিডিয়া খুলতেই বাংলাদেশের অন্যতম প্ৰখ্যাত রবীন্দ্ৰসংগীত শিল্পী মিতা হকের অকাল প্ৰয়াণের দুঃসংবাদ দেখতে পেলাম। কোভিড কেড়ে নিয়েছে তাঁর প্ৰাণ। বছর দশেক আগে গুয়াহাটিতে তিনি এসেছিলেন। সে সময় বাংলা দৈনিক পত্ৰিকা ‘সকালবেলা’য় কর্মসূত্ৰে আমার তাঁর সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ হয়েছিল। সে সময় সকালবেলায় প্ৰত্যেক শুক্ৰবার মেয়েদের নিয়ে ‘সাতবোন’ নামে একটি পেজ বের হতো। সেই পেজটির সম্পাদনা করতেন এতৎঅঞ্চলের প্ৰখ্যাত লেখিকা তথা সাংবাদিক সুপর্ণা লাহিড়ি বড়ুয়া। সাতবোনের জন্য একটি সাক্ষাৎকার নিতে ঘন্টা দেড়েক রবীন্দ্ৰসংগীত শিল্পী মিতা হকের সঙ্গে কথা বলার সৌভাগ্য হয়েছিল। এতো বড়ো মাপের একজন কন্ঠশিল্পী অথচ অহংকারের লেশ মাত্ৰ নেই। কি সুন্দর ঘরের দিদির মতো কথা বাৰ্তা। সেদিন তাঁর সঙ্গে হওয়া কথপোকথন সেই মুহূর্তগুলো খুব মনে পড়ছে। সেই সাক্ষাৎকার রবীন্দ্ৰপ্ৰেমী এবং ‘নয়া ঠাহর’এর পাঠকদের জন্য তুলে ধরলাম।
ছোটবেলা থেকেই বাড়িতে গানের চর্চা ছিল। মেয়েবেলায় বাড়িতে কাকা- কাকিমার সঙ্গে গান শিখতেন। রবীন্দ্ৰ-নজরুল সবই গান তিনি। ১০-১২ বছর বয়সে ওস্তাদ মোহম্মদ হুসেন খাতুনের কাছে গানের তালিম নিয়েছেন। (বছর দশেক আগে )‘ব্যতিক্ৰম সাংস্কৃতিক মঞ্চ’র উদ্যোগে গুয়াহাটিতে আয়োজিত ভাষা-সাংস্কৃতিক মিলনোৎসবে অংশ নিয়ে গানে মাধ্যমে জয় করেছিলেন অসংখ্য শ্ৰোতার মন। আন্তর্জাতিক ভাষা দিবসে শিল্পী প্ৰাণ ঢেলে গাইলেন। রবীন্দ্ৰসংগীতেই ছুঁয়ে গেলেন দর্শকদের হৃদয়। মহানগরের ত্ৰিপুরা ভবনের ১১১ নম্বর রুমে তাঁর সঙ্গে কথা বলার সুযোগ হয়েছিল। বেলা তখন একটা। রুমের কলিংবেলে টিপ দিতেই কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে দরজা খোলেন চল্লিশোর্ধ্ব এক ভদ্ৰমহিলা। নিতান্তই সাদামাটা পোষাকে। দেখলে মনেই হবে না যে তিনি এতো বড় মাপের একজন রবীন্দ্ৰসংগীত শিল্পী। মিতা হক। শ্যামলা গায়ের রং, অনুসন্ধিৎসু চোখ। স্নিগ্ধ হেসে আমাকে বললেন, ‘ভেতরে এসো।’- ‘সকালবেলা’ কাগজ থেকে এসেছি। আপনার সঙ্গে কিছুক্ষণ কথা বলবো-- হ্যাঁ, সৌমেন আমাকে ফোন করে বলেছে।
গুয়াহাটি কেমন লাগছে? এখানকার লোকজন, জায়গা, রাস্তাঘাট...?
-- একই লাগছে, আমাদের ওখানকার মতোই তো সব। এখানে শুধু ভাষাটা আলাদা। গুয়াহাটিতে এর আগে আসিনি, তবে আগরতলা, শিলচর, করিমগঞ্জ গিয়েছি। কলকাতা আপনার কেমন লাগে জিজ্ঞেস করায় তিনি বললেন- ‘কলকাতা ভালো লাগে। তবে সব সময় নিজের মতো লাগে না জায়গা টা। কারণ বিভিন্ন ভাষাভাষীর লোক সেখানে চোখে পড়ে।
মিতা হক, যার নামই পরিচয়। এতো বড় মাপের শিল্পী যাঁর অনুষ্ঠানকে উপভোগ করার জন্য দর্শকরা অনেকখক্ষণ অপেক্ষা করে থাকেন। তিনি যখন মঞ্চে আসেন সবাইকে রবীন্দ্ৰনাথের গানের সুরে আচ্ছন্ন করে রাখেন। মঞ্চের চারদিকে চমৎকারভাবে ছড়িয়ে রাখেন রবীন্দ্ৰনাথের আবেগ। ওঁর গান শুনতে শুনতে বিভোর হয়ে দর্শকমণ্ডলী গানের সুরে হারিয়ে থাকেন। ‘আমার প্ৰাণের মাঝে ক্ষুধা আছে..., আমার পরাণ যাহা চায় তুমি তাই.., গ্ৰাম ছাড়া ওই রাঙামাটির পথ.., আগুনের পরশমণি ছোঁয়াও প্ৰাণে’.. বাঙালির হৃদয় ছোঁয়া এই গানগুলি। অল্প সময়ের জন্য হলেও সেদিন মহানগরের বাঙালি শ্ৰোতারা প্ৰাণ ভরে উপভোগ করেন মিতা হক-এর কন্ঠে মন মাতানো একগুচ্ছ রবীন্দ্ৰসংগীত।
বাংলাদেশে বর্তমানে চলতি গানের প্ৰসঙ্গ উঠতেই তিনি বললেন- বাংলাদেশে বর্তমানে রবীন্দ্ৰ সংগীতকে পেশা হিসেবে নেওয়া যাবে না। তবে বর্তমানে সেখানে ব্যান্ড মিউজিকের চল বেশি। এলআরবি, রেঁনেসা, মোলস বাংলা ব্যান্ড-এর চল বেশি। বাংলাদেশের আবহাওয়া আর ভারতবর্ষের আবহাওয়ার মধ্যে কোনও পার্থক্য দেখেন নি তিনি। তিনি বলেন- ‘সব তো আমাদের ওখানকার মতোই।’
১৯৮৯ সালে কলকাতা দিয়ে তাঁর বিদেশ ভ্ৰমণ শুরু। এর আগে ১৯৭৪ সালে আন্তর্জাতিক শিশু উৎসবে বার্লিন শহরে প্ৰতিনিধিত্ব করতে গিয়েছিলেন।
সিনেমা কিংবা নাট্য জগতের অভিনেতা অভিনেত্ৰীদের প্ৰসঙ্গ উঠতে তিনি জানান- বাংলাদেশের হুমাউন ফিরিদি খালেদ খানের অভিনয় তাঁর ভালো লাগে। এছাড়া আনোয়াড়া, রোজি সামাদ, ফিরদৌজি মজুমদার, মিতা রহমানের অভিনয় তাঁর ভালো লাগে তাঁর।
ভারতবর্ষে অভিনেতা অভিনেত্ৰীদের মধ্যে সৌমিত্ৰ চট্টোপাধ্যায়, সঞ্জীব কুমার, জয়া বচ্চন, অপর্ণা সেনের অভিনয় তিনি খুব উপভোগ করেন।
বাংলাদেশে রবীন্দ্ৰসংগীতের চর্চা কেমন সেই প্ৰসঙ্গ উঠতেই তিনি বলেন- ১৯৬৩ সালে বাংলাদেশে সংগীত প্ৰতিষ্ঠান ‘ছায়ানট’ স্থাপন হয়। পরবর্তী কালে ‘জাতীয় রবীন্দ্ৰসংগীত সম্মেলন পরিষদ’ ১৯৮১ সালে স্থাপন হয়। যার শাখা গোটা বাংলাদেশেই ছড়িয়ে আছে। তিনি সেখানে একসময় সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। এই সাক্ষাৎকার নেওয়ার সময় পর্যন্ত তিনি সভাপতির পদে কর্মরত ছিলেন। অসংখ্য ছেলে মেয়েকে রবীন্দ্ৰসংগীতে তালিম দিয়েছেন তিনি। সেদিন তাঁর সঙ্গে কথায় কথায় বেরিয়ে আসে অনেক কথা। তিনি জানান- দেশভাগের পাকিস্তানীরা যখন বাংলাদেশে রবীন্দ্ৰসংগীতের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল সে সময় রবীন্দ্ৰসংগীতের ওপরই ভিত্তি করে বর্তমানের বাংলাদেশে আন্দোলনের ঝড় বয়ে গিয়েছিল।
বাংলাদেশে নজরুলগীতির সঙ্গে সঙ্গে রবীন্দ্ৰসংগীতের প্ৰভাব যথেষ্ট বেশি। রবীন্দ্ৰসংগীত শিল্পী মিতা হক রবীন্দ্ৰসংগীতে অনেক ছাত্ৰছাত্ৰীকে তৈরি করেছেন। নীরবে নিভৃতে চালিয়ে যাচ্ছেন রবীন্দ্ৰসংগীতের সাধনা-শিক্ষাদান। রবীন্দ্ৰসংগীত নিয়ে তাঁর নিরন্তর এই যাত্ৰা অটুট থাকুক।---
সেদিন মনের ভেতর একরাশ ভালোলাগা নিয়ে ফিরেছিলাম অফিসে। কোভিড আক্ৰান্ত হয়ে এতো কম বয়সে তিনি চলে গেলেন। এপার জগতে আজ তিনি নেই। ওপার জগতে তিনি নিরন্তর ভালো থাকুক।










কোন মন্তব্য নেই