Header Ads

তালিকা বিড়ম্বনায় নাজেহাল বিজেপি !!

বিশ্বদেব চট্টোপাধ্যায়

আমি বার বার বলে আসছি তৃণমূলকে হটিয়ে ক্ষমতায় বসতে হলে কম করেও যে ১৪৮-টি আসন পেতেই হবে সেই ১৪৮ জন নির্ভরযোগ্য প্রার্থী বিজেপি’র স্টকে নেই। প্রায় ৮০ হাজার বুথের মধ্যে এই মুহূর্তেও বিশ-পঁচিশ হাজার বুথে তাদের উল্লেখযোগ্য সংগঠনও নেই। কাগজে-কলমে তাদের সাংগঠনিক ছবিতে অনুষ্ঠানের ত্রুটি না থাকলেও বাংলা দখলের স্বপ্ন দেখা ও তাকে বাস্তবায়িত করা বিজেপি’র পক্ষে অত্যন্ত কঠিন। প্রধানমন্ত্রী মোদী এবং সেকেণ্ড ম্যান অমিত শাহ সে ব্যাপারে সম্পূর্ণ ওয়াকিবহাল থেকেও বাংলাকে পাখির চোখ করে তৃণমূলের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নেমে পড়েছেন। এ ব্যাপারে পুরোপুরি বঙ্গ বিজেপি’র ওপর নির্ভর করতে হলে তারা বাংলার কথা ভাবতেনই না। বছর পাঁচেক আগের রাজ্য বিধানসভা নির্বাচনে মোদীর কাটআউট এবং গোটা রাজ্যে বেশ কিছু বড় বড় জনসভা করেও মাত্র তিনের বেশি বিধায়ক পাঠাতে পারে নি বিজেপি।

বাংলার কথা বিশেষভাবে ভাবার সুযোগ তাদের সামনে চলে আসে মুকুলের হাত ধরেই। ২০১৭ সালের নভেম্বর থেকে অমিত শাহরা কাগজ-কলম নিয়ে আঁক কাটতে শুরু করে দেন। তারা চাইছিলেন বিজেপি বিরোধী ভোট দু’তিন ভাগে ভাগ হয়ে যাক। যেমনটা ভেবেছিলেন তেমনটাই হয়েছে। ২০১৯-এর লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি বিরোধী ভোট সুস্পষ্টভাবেই দু’তিন ভাগে ভাগ হয়ে যায় এবং বিজেপি তার বিরোধীদের হৃদকম্প মারাত্মকভাবে বাড়িয়ে দিয়ে ১৮-টি আসন ছিনিয়ে নিতে পেরেছে। বিজেপি’র নিজস্ব শক্তি মোটেও ১৮-টি আসন ছিনিয়ে আনার ধারে কাছেও ছিল না। তবু তারা জিতেছে মূলতঃ মুকুলের চাণক্য রাজনীতি এবং দলের নব্য ও তৎকাল নেতাদের ব্যবহার করেই। এই বিষয়টাই অমিত শাহ’রা গভীরভাবে খুঁটিয়ে বিশ্লেষণ করে এই সিদ্ধান্তে এসেছিলেন যে, বাংলা দখল করতে হলে আদি-আদিখ্যেতা নিয়ে বসে থাকলে হবে না--অনেক বেশি ‘লিবারেল’ হতে হবে। আদিরা এতদিন বস্তা বস্তা শুধু ঘাস-ই কেটেছে--কাজের কাজ কিছুই করে দেখাতে পারে নি। ২৯৪ আসনের বিধানসভায় ২০১৬ সাল পর্যন্ত মেরেকেটে সর্বোচ্চ ৩-টি আসন দখল করার বেশি কিছুই করতে পারে নি। দলের দরজা-জানলা হাট করে খুলে না দিলে রাজ্যরাজনীতিতে দলের অস্তিত্বই টিকিয়ে রাখা অসম্ভব হয়ে উঠবে শেষপর্যন্ত। ফলে অমিত শাহরা দলের দরজা খুলে দেওয়া মাত্র দলের সাংগঠনিক প্রভাব ও দাপট বাড়তে শুরু করে দেয়। দলের ওজন ও প্রভাবও বাড়তে থাকে। ইতিমধ্যে তৃণমূল কংগ্রেস তাদের আগ্রাসী বিরোধীশূন্য রাজনৈতিক স্থায়ীত্ব প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বাম ও কংগ্রেসকে একেবারে গিলে ফেলতেই মূল স্রোতের রাজনীতিতে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছিল তার মধ্যে অক্লেশে ঢুকে গেল বিজেপি। একই সঙ্গে মোদীর কাটআউট এবং মুকুলের চাণক্য রাজনীতির দৌলতে বিজেপি দেখতে দেখতে রাজ্যরাজনীতিতে প্রধান বিরোধী শক্তি হয়ে উঠল। একুশের বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূলের প্রধান প্রতিপক্ষ হিসেবে বিজেপি শুধু উঠেই এল না--ক্ষমতা অর্জনের দোরগোড়ায় চলে এল ! ক্ষমতায় বসার সঙ্গে সঙ্গে তৃণমূল একেবারেই বাছবিচার না করেই বস্তা বস্তা আবর্জনা তুলে এনে দল ভারি করেছে। নীতি-নৈতিকতার বিশেষ ধার ধারে নি। বিজেপিও একের পর এক ছিপ ফেলে বড় বড় মৎস শিকারে তৎপরতা দেখাতে কসুর করে নি। দলকে বাংলার ক্ষমতায় বসাতে গেলে যে এটার দরকার ছিল তা নানাভাবে বিজেপি গোপন করার চেষ্টা করে নি।
বিজেপি’র প্রার্থী তালিকায় ১৫০-জনের বেশি নব্য বিজেপির জায়গা হয়েছে মনে হচ্ছে। সঠিক হিসেব এক্ষুণি করে উঠতে পারি নি। তবু যতদূর মনে হচ্ছে প্রায় ৫০%-এর বেশি প্রার্থী-ই সম্প্রতি দলে যোগদেওয়া নেতানেত্রীদের মধ্যে থেকেই নেওয়া হয়েছে। বাকি কমবেশি ১৪৪ জন প্রার্থী বেছে নেওয়া হয়েছে সঙ্ঘের তালিকা থেকে এবং কট্টর হিন্দুত্ববাদী বিজেপি’র তালিকা থেকে এবং সেলিব্রেটিদের তালিকা থেকেও বেশ কিছু প্রার্থীকে বেছে নেওয়া হয়েছে। ফলে লঙ্কাকাণ্ড বেধে যেতেও দেরি হয় নি। প্রার্থী নিয়ে ক্ষোভ-বিক্ষোভ সব দলেই কমবেশি হয়ে থাকে। কিন্তু বিজেপিতে যা হচ্ছে তার চেহারার মধ্যে একটা রহস্যের ছায়া পড়তে দেখা যাচ্ছে। তা না হলে--শমীক ভট্টাচার্য্যর প্রার্থীপদের বিরুদ্ধে যারা বিক্ষোভে ফেটে পড়ছে তাদের মধ্যে প্রকৃতপক্ষে বিজেপি ক’জন রয়েছে তা নিয়ে যথেষ্ট প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে। প্রার্থী নির্বাচনের আগে জেলায় জেলায় বৈঠক করে সকলকে দলের সিদ্ধান্ত মেনে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল বলেও মনে হচ্ছে না। ফলে বিজেপি’র শৃঙ্খলাবদ্ধ রেজিমেন্টেশন নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। বিজেপি’র মতো একটা দল নিশ্চিত না হয়ে শিখা মিত্র এবং তরুণ সাহা’র নাম প্রার্থী তালিকায় প্রকাশ করে কি করে? এত বড় মাপের কমিউনিকেশন গ্যাপ এবং সমন্বয়ের অভাব দেখা গেল কি করে?
আমি বলেছিলাম, আরও তিন-চারজন সাংসদকে টিকিট দেওয়া হবে। দেওয়া হল তিনজনকে--জগন্নাথ সরকার, শান্তনু ঠাকুর এবং অর্জুন সিংকে। অর্জুন সিং বিধানসভায় জিতে গেলে তাঁর লোকসভা আসনে দীনেশ ত্রিবেদী টিকিট পেতে পারেন। কিন্তু বাকি ছ’সাত জন এমপি জিতে গেলে তাদের সাংসদ আসনের দাবিদার নিয়েও অশান্তি তৈরি হবে নিশ্চিত। ২৯৪ আসনে প্রার্থী দিতে গিয়ে আক্ষরিক অর্থেই হিমশিম খেতে হচ্ছে বিজেপিকে। দল আছে--প্রচুর অর্থ-বৈভব আছে--কিন্তু নেই জিতে আসার ক্ষমতাসম্পন্ন নির্ভরযোগ্য প্রার্থী। তবু প্রার্থী তালিকা প্রকাশের পরেই তীব্র ক্ষোভ-বিক্ষোভ মাথাচাড়া দিচ্ছে। তৃণমূল-সিপিএম-কংগ্রেস সহ নানান দল থেকে যেসব প্রভাবশালী মন্ত্রী-বিধায়ক-সাংসদ বেরিয়ে এসে বিজেপিতে যোগ দিয়েছেন তাদের রাজনৈতিক প্রভাব এবং সাংগঠনিক ভিত্তির ওপর অনেকটাই নির্ভর করতে হচ্ছে বিজেপিকে। কারণ, তাদের প্রাথমিক প্রায়োরিটি যে ভাবেই হোক তৃণমূলকে হটিয়ে ক্ষমতা দখল। তারপর নিজেদের মতো করে দলকে সাজিয়েগুছিয়ে নেওয়ার কথা ভাবা যাবে বলেই তারা মনে করছে।
নীতি নৈতিকতা নিয়েও বেশ কিছু প্রশ্ন উঠছে। কালনার বহুবিতর্কিত বিশ্বজিৎ কুণ্ডুকে প্রার্থী করার বিরুদ্ধেও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। খোঁচা দিয়েছে তৃণমূলও। অথচ মেখলিগঞ্জের তৃণমূল প্রার্থী পরেশচন্দ্র অধিকারীকে প্রার্থী করা নিয়ে তৃণমূলের মুখে কোনো শব্দ নেই ! যদিও আমার দৃঢ় বিশ্বাস বিশ্বজিৎ কুণ্ডু বিজেপি’র টিকিটে এবারে জিতছেন না। যাইহোক, সদ্য দলে যোগ দেওয়া ১৫০ জনের বেশি যাদের প্রার্থী করা হয়েছে তাদের মধ্যে কম বেশি ১০০ জনের জেতার সম্ভাবনা দেখছেন অনেকেই। বাকি ১৪৪ জনের আদি সঙ্ঘাশ্রয়ী প্রার্থীদের মধ্যে ৪০-৫০ জনের ওপর কিছু কিঞ্চিৎ ভরসা রাখা যেতে পারে। এই হিসেব থেকেই স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে--আদি বিজেপি নির্ভরতা নিয়ে একুশের বিধানসভা নির্বাচনে নামলে সাকুল্যে ঐ ৪০-৫০ জনের বেশি আসন বিজেপি দখল করতে পারতো না। ক্ষমতা দখল তো দূরের কথা। এটাই চূড়ান্ত বাস্তবতা--বিজেপি’র সঙ্ঘাশ্রয়ী নেতা-কর্মীরা মানুন আর না-ই মানুন ! ২১ তারিখে নন্দীগ্রামে সভা করতে আসছেন অমিত শাহ। তার আগেই দিলীপবাবুরা চেষ্টা চালাবেন ক্ষোভ-বিক্ষোভ সামলাতে। না পারলে রীতিমতো বিড়ম্বনায় পড়তে হবে বিজেপি’র প্রদেশ সভাপতিকে।
তবে শেষপর্যন্ত এত ক্ষোভ-বিক্ষোভ সত্ত্বেও বিজেপি’র ফলাফল কি হতে চলেছে তার একটা আভাস আমি দেব আগামী ২১ তারিখের মধ্যেই। এরই মধ্যে কোচবিহারের যে কেন্দ্রটিকে বিজেপি পাখির চোখ করেছিল সেই নাটাবাড়িতে বিজেপি’র টিকিটে দাঁড়াচ্ছেন মিহির গোস্বামী। জেলা তৃণমূলের ঐতিহাসিক গোষ্ঠী রাজনীতির প্রধান দুই নেতা মুখোমুখি হতে চলেছেন এই কেন্দ্রে। আমি লিখেছিলাম--আমার হাতে প্রমাণ না থাকলেও আমার কাছে যে খবর রয়েছে তার ভিত্তিতে বলতে পারি--মিহির গোস্বামী রাজি হলেই এই কেন্দ্রে তাঁকে প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করবে বিজেপি। সেটাই সত্যি হল শেষপর্যন্ত। সন্দেহ নেই--লড়াইটা বেশ কঠিন হয়ে উঠল রবীন্দ্রনাথ ঘোষের কাছে। দিন রাত এক করে মাটি কামড়ে পড়ে থাকতে হবে রবিবাবুকে। জিততে পারলে তাঁর অপ্রতিরোধ্য আধিপত্য অক্ষুন্ন থাকবে জেলা তৃণমূল কংগ্রেসের রাজনীতিতে। কোচবিহার জেলা নিয়ে বিস্তারিত লেখার ইচ্ছে রয়েছে আমার। খুবই আকর্ষণীয় লড়াই হবে এখানে !!

কোন মন্তব্য নেই

Blogger দ্বারা পরিচালিত.