প্রার্থী নিয়ে ক্ষোভ বিক্ষোভ বাংলার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার, ভালমতোই টের পাচ্ছে বিজেপি !!
বিশ্বদেব চট্টোপাধ্যায়
সঙ্ঘের অনুশাসন ও শিক্ষার মধ্যে যেমন শৃঙ্খলাহীনতার অনুমোদন নেই--ঠিক তেমনই রেজিমেন্টেড দল হিসেবে সঙ্ঘ প্রভাবিত বিজেপি’র মধ্যেও দলের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে যাওয়ার অনুমোদন নেই। তবু চার দফার প্রার্থীদের নাম ঘোষণার পরেই দিকে দিকে তো বটেই হেস্টিংসের দলীয় কার্য্যালয়ের সামনেও ক্ষুব্ধ দলীয় কর্মী সমর্থকদের যে বিক্ষোভ প্রদর্শনের ছবিগুলো উঠে এল তা নিয়ে যথেষ্ট বিরক্ত এবং উদ্বিগ্ন বোধ করেছেন দলেরই সেকেণ্ড-ইন-কম্যাণ্ড অমিত শাহ--একই সঙ্গে তিনি কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও বটে ! বিকেলেই তাঁর আসাম যাওয়ার কর্মসূচী থাকলেও তিনি তা বাতিল করে জরুরি বৈঠকে বসেন। সঙ্ঘীদের তো বটেই--বিজেপি’রও উচ্চপদস্থ নেতারা কল্পনাও করতে পারেন নি এ রাজ্যে প্রচারে আসা মধ্যপ্রদেশের বিজেপি মন্ত্রীদেরও ঘরের মধ্যে তালাবন্দি রেখে বিজেপি নেতা-কর্মীরা বিক্ষোভ দেখাতে পারেন !
দলের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে গিয়ে এ ধরণের নীতিহীন দুঃসাহস সত্যি সত্যি বিজেপিরই নেতা কর্মীরা দেখাচ্ছেন নাকি দু’চারজন স্থানীয় বিজেপি নেতাকর্মীকে কব্জা করে অন্য কোনো দল বা গোষ্ঠী শৃঙ্খলাবদ্ধ বিজেপি’র ভাবমূর্তি নষ্ট করার উদ্দেশ্যে নেমে পড়েছে তা নিয়ে দলের ভেতরেই জোরালো আলোচনা শুরু হয়ে গেছে। যেসব কেন্দ্রগুলোতে এই ধরণের ক্ষোভ-বিক্ষোভ প্রদর্শিত হচ্ছে সেই সব কেন্দ্রে বিজেপি-বিরোধীদের জয় নিয়ে সংশয় তৈরি হচ্ছে বলেই এমনটা হচ্ছে মনে করছেন দলের কর্তাব্যক্তিদের অনেকেই। সিঙ্গুরে বেচারাম মান্নার বিরুদ্ধে মাস্টারমশাই রবীন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য্য বেশ শক্তপোক্ত পাঁচিল--টপকে যাওয়ার নিশ্চয়তা অনেকটাই ধাক্কা খেয়েছে। মাস্টারমশাই ছাড়া সমানে সমান টক্কর দেওয়ার মতো বিজেপি’র স্টকে ঐ কেন্দ্রে আর কেউ নেই। আদি বিজেপি’র আবেগ ও সেন্টিমেন্ট দিয়ে বেচারামকে পরাস্ত করা খুব সহজ ছিল না। সিঙ্গুরকে ছিনিয়ে নিতে হলে বেচারামের বিরুদ্ধে যে মাস্টারমশাই একমাত্র উপযুক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী এটা বিজেপি’র কর্তারা অনেক অঙ্ক কষে এবং ভাবনা চিন্তা করেই বুঝতে পেরেছেন। তাই ঐ কেন্দ্রে বিজেপি রবীন্দ্রনাথবাবুকে প্রার্থী করা নিয়ে দু’বার ভাবে নি। ওঁর নাম বিজেপি’র প্রার্থী হিসেবে ঘোষিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যদি বিশেষ বিচলিত কেউ হয়ে থাকেন--তার নাম বেচারাম মান্না। উদ্বেগ তৈরি হয়েছে পাশের হরিপাল কেন্দ্রটিকে নিয়েও। ফলে সিঙ্গুরে যে ভাবে রবীন্দ্রনাথ-বিরোধী তীব্র ক্ষোভ-বিক্ষোভ সঙ্ঘটিত হয়েছে তাতে কোথাও না কোথাও বিজেপিবিরোধী শিবিরে বেশ খানিকটা স্বস্তির আবহাওয়া তৈরি হতেই পারে। এই আসনটি থেকে যতদূর মনে হয় রবীন্দ্রনাথবাবুকে প্রত্যাহার করবে না বিজেপি।
এরকমই কিছু অঙ্ক কিন্তু সামনে উঠে আসছে অন্যান্য কেন্দ্রগুলি থেকেও। বিজেপি অনুসন্ধান শুরু করে দিয়েছে ইতিমধ্যেই। দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে যারা এই ধরণের বিশৃঙ্খলতা তৈরি করছে তাদের বিরুদ্ধে কি ধরণের ব্যবস্থা নেওয়া যায় তাও ভাবতে শুরু করে দিয়েছে দল। দীর্ঘদিন দলের সেবা করে আসার দাবিতে অনেকেই যারা টিকিট না পেয়ে বিদ্রোহী হয়ে উঠছেন তারা বিগত বাম ও তৃণমূল শাসনামলে নিজেদের টিকিট পাওয়ার যোগ্য করে তুলতে পেরেছেন কিনা--তাদের রাজনৈতিক পারফরমেন্স--সাংগঠনিক দক্ষতা--এ সবই খুঁটিয়ে দেখেশুনেই যাদের জেতার সম্ভাবনা বেশি তাদেরই টিকিট দেওয়া হয়েছে বলে দলের দাবি। এমন অনেকেই টিকিটের দাবিতে সোচ্চার হয়েছেন যাদের নিজের এলাকার বাইরে (ওয়ার্ড বা বুথের) বিশেষ জনপরিচিতি নেই। দু’তিনটে ব্লক একাধিক পঞ্চায়েত সমিতি পুরসভা বিশ-পঁচিশটা গ্রামপঞ্চায়েথত নিয়ে এক একটা বিধানসভা। এই বিরাট এলাকায় যেসব মুখের পরিচিতিই নেই--সামাজিক-সাংষ্কৃতিক আন্দোলন বা কর্মকাণ্ডে যাদের ভূমিকাই মানুষ দেখে নি--সর্বজনগ্রাহ্য গ্রহণযোগ্যতা বলতে যাদের কিছু নেই--তারা শুধুমাত্র বিশ-পঁচিশ বছর ধরে পদ্ম-পতাকা ধরে থাকার জন্যেই টিকিট পাওয়ার অধিকারী হবেন--এবারের নির্বাচনে অমিত শাহরা অন্ততঃ এই ফর্মূলায় টিকিট বন্টনের সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন না। তাদের লক্ষ্য তৃণমূলকে হটিয়ে যেভাবেই হোক বাংলা দখল করা। বাংলা দখল করতে হলে ১৪৮-টি আসনের গণ্ডি অতিক্রম করতে হবে। জিতে আসার ক্ষমতাসম্পন্ন ১৪৮ জন প্রার্থী গোটা বাংলা চষে বেড়ালেও বিজেপি খুঁজে পাবে না। ত্রিস্তর পঞ্চায়েত লেবেলে বা পুরসভা লেবেলে বিশ-পঁচিশজন পাওয়া গেলেও বিধানসভায় জিতে আসার মতো ব্যক্তিগত ক্যারিশ্মাসম্পন্ন প্রার্থী মেরেকেটে জনা পঞ্চাশেক পাওয়া যেতে পারে--যাদের দিয়ে প্রধান বিরোধী দলের মর্যাদা পাওয়া নিশ্চিত নয়। গত ২০১৬’র বিধানসভা নির্বাচনেও বঙ্গ বিজেপি’র ঝাণ্ডা হাতে মাত্র তিনজন বিধানসভায় যাওয়ার ছাড়পত্র পেয়েছিলেন।
এই নিদারুণ বাস্তবতার মধ্যে দাঁড়িয়ে যখন দল কোনোদিকেই কুল-কিনারা দেখতে পাচ্ছিল না সেইসময়ে মুকুল রায় তৃণমূল থেকে বিজেপিতে যোগ দিলেন। প্রায় চোখের পলকে বদলে গেল বঙ্গ বিজেপি’র পুরো কাঠামোটাই। ২০১৯-এর লোকসভা নির্বাচনে মুকুল তাঁর চাণক্য রাজনীতির সঠিক প্রায়োগিক কৌশলের সাহায্যে বেশ কিছু বিশ্বস্ত অনুগামীদের টেনে এনে এমন একটি অসাধারণ ম্যাজিক স্ট্রোক দিয়ে দিলেন যার অভিঘাতে অমিত শাহরা রীতিমতো শিহরিত হয়ে উঠলেন--তাঁদের বিশ্বাস জন্মালো--মুকুল ও তাঁর সঙ্গীসাথীদের ওপর নির্ভর করেই বাংলাদখলের স্বপ্ন দেখা যেতেই পারে। এই অনতিক্রম্য বাস্তবতার ওপর দাঁড়িয়েই সিদ্ধান্ত নিতে হল--আদি-নব্য দেখলে চলবে না--যার যেখানে জেতার চান্স তুলনামূলকভাবে সামান্য হলেও বেশি তাকেই টিকিট দিতে হবে--কোনোরকম ঝুঁকি নেওয়া যাবে না। এই সিদ্ধান্ত মেনেই টিকিট বন্টনের ফলে বিক্ষিপ্তভাবে বেশ কিছু অশান্তি মাথাচাড়া দিচ্ছে।
আরও চার দফা’র প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করতে হবে বিজেপিকে। পরিস্থিতি আরও মারাত্মক ঘোরালো হয়ে উঠতে পারে। তাই অমিত শাহ তাঁর গতকালের সমস্ত কর্মসূচী বাতিল করে কলকাতাইে উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে বসলেন। বেশ কিছু সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে অনুশাসন ভাঙার প্রবণতাকে দ্রুত রোখা না গেলে সাজানো ঘুঁটি কেঁচে যাওয়ার সম্ভাবনা বেড়েই যাবে। ক্ষোভ-বিক্ষোভ যে একেবারে কমানো যাবে তা নয়--কিন্তু তা যাতে নিয়ন্ত্রণের মধ্যে থাকে সেটাই এখন বিজেপি’র বড় মাথাব্যথা।
আমি প্রতিটি জেলা ধরে ধরে কার কিরকম সম্ভাবনা তার একটা অঙ্ক কষার চেষ্টা করে চলেছি। বার বার বলেছি--চমকপ্রদ অনেক ঘটনাই ঘটবে যার প্রভাব পড়বে ফলাফলের ওপর। এমনিতে মানুষ তার সিদ্ধান্ত নিয়েই ফেলেছে তবু ঘটনার ঘাতপ্রতিঘাতে তাৎক্ষণিকভাবে কমবেশি কিছু প্রভাব পড়বেই। বিজেপি’র বাকি চারদফার প্রার্থীতালিকা প্রকাশ হওয়ার পরেই আমি একটা চূড়ান্ত অনুমানের জায়গায় পৌঁছুতে পারি। আশা করছি ২০-২১ তারিখের মধ্যে আমার নিজেস্ব অঙ্কের ফলাফল আমি পেয়ে যাব এবং তা পাওয়ার পরেই আমি আমার বন্ধুদের তা জানিয়ে দিতে পারব !!









কোন মন্তব্য নেই