বিশ্বদেব চট্টোপাধ্যায়

অনুশাসিত রেজিমেন্টেড দল হিসেবে বিজেপি’র ইমেজ কিছুটা হলেও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে প্রার্থী তালিকাকে কেন্দ্র করে বিক্ষিপ্ত ক্ষোভ-বিক্ষোভ প্রদর্শনের মধ্য দিয়ে। দিল্লীতে আজ যে তৃতীয় ও চতুর্থ দফার প্রার্থী তালিকা বিজেপি প্রকাশ করেছে তাতে ১৩-টি আসন ফাঁকা রেখে ৬৩-টি আসনে প্রার্থীদের নাম ঘোষণা করা হয়েছে। এই তালিকায় সিঙ্গুর কেন্দ্রে রবীন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য্য’র নাম থাকায় স্থানীয় বিজেপি কর্মী-সমর্থকদের একাংশ মধ্যপ্রদেশ থেকে আগত দুই মন্ত্রীকে ঘরের মধ্যে আটকে রেখে প্রতিবাদ-বিক্ষোভ চালিয়ে যাচ্ছেন। এই বিক্ষোভ প্রদর্শন বিজেপি’র অনুশাসন ও শৃঙ্খলাবিরোধী আচরণ হিসেবেই চিহ্নিত হয়েছে--দলীয় স্তরে এই আচরণের বিরুদ্ধে ব্যবস্থাও নেওয়া হবে--এটা ধরেই নেওয়া যায়। বিক্ষোভ প্রদর্শিত হয়েছে কোন্নগরেও--সেখানে উত্তরপাড়া কেন্দ্রে প্রবীর ঘোষালকে প্রার্থী হিসেবে মানতে রাজি নন দলেরই একাংশ কর্মী-সমর্থক। তাঁর সঙ্গে কথা না বলেই হাওড়া দক্ষিণ কেন্দ্রে রন্তিদেব সেনগুপ্তকে প্রার্থী করায় তিনি তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে ঘোষণা করেন তিনি কোনো আসনেই লড়বেন না--দলের প্রচার কর্মসূচীতে অংশ নেবেন। পরে অবশ্য কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের হস্তক্ষেপে তিনি শেষপর্যন্ত প্রার্থী হতে রাজি হয়েছেন।

বেজায় চটে গেছেন শোভন-বৈশাখী। শোভনের চাহিদা মোতাবেক বেহালা পূর্বে তাঁকে প্রার্থী করা হয় নি। তাঁকে বেহালা পশ্চিমে প্রার্থী হওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হলেও তিনি রাজি হন নি--তাই বেহালা পশ্চিমে প্রার্থীর নাম এখন জানানো হয় নি। বেহালা পূর্বে তাঁকে প্রার্থী না করাটা তাঁর রাজনৈতিক আদর্শকে আঘাত করার সামিল বিবেচনা করে এবং প্রার্থী হিসেবে যথেষ্ট যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও বৈশাখীর নাম আলোচনাতেই না আসায় ভীষণভাবে ক্ষুব্ধ হয়েছেন শোভন-বৈশাখী। তাঁরা বিজেপি ছাড়ার সিদ্ধান্ত ঘোষণাই করে দিয়েছেন ইতিমধ্যেই। এ খবর অমিত শাহ’র কর্ণগোচর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তাঁর সঙ্গে দলের নেতাদের যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে। আগামীকাল অমিতাভ চক্রবর্তী শোভনের সঙ্গে দেখা করে ড্যামেজ কন্ট্রোলের চেষ্টা করবেন বলে জানা গেছে। শোভনের গ্রহ-নক্ষত্রের অবস্থান বা সমাবেশ খুবই নৈরাশ্যজনক হয়ে দেখা দিচ্ছে বেশ কিছুদিন ধরেই। তারই প্রভাবে তিনি তাঁর উজ্জ্বল পলিটিক্যাল প্রতিষ্ঠার গরিমা হারাতে হারাতে এমন একটা জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছেন যেখানে তাঁকে নিয়ে এখন সামাজিক মাধ্যমে কৌতুকের বান ডেকে যাচ্ছে। রাজনীতির সঙ্গে তিনি তাঁর একান্ত ব্যক্তিগত জীবনকে এমনভাবে মিশিয়ে ফেলেছেন যেখানে তাঁর ইমেজ রীতিমতো নষ্ট হয়ে চলেছে। তাঁর সমস্ত পদক্ষেপই যে তাঁর সহায়ক হচ্ছে না--এটা তিনি ভাবতে পারছেন না বা ভাবার মতো স্বাধীন চিন্তাভাবনার জায়গাতেই তিনি আর নেই। কাল হয়তো জানা যেতে পারে তিনি এরপর কোথায় যাবেন--বা আর আদৌ রাজনীতিতে থাকবেন কিনা !

কোচবিহারে নাটাবাড়ি ও কোচবিহার দক্ষিণ কেন্দ্রের প্রার্থীর নাম আজ ঘোষণা করা হয় নি। এটা দেখেই জেলার কিছু লোকজন উদ্বাহু নেত্য শুরু করে দিয়েছেন এই বলে যে--বিজেপি’র হাতে উপযুক্ত প্রার্থী নেই বলেই তারা প্রার্থীর নাম ঘোষণা করতে পারে নি ! আসলে ঘটনাটা এত আমোদের নয়। আমার কাছে প্রমাণ চাইলে আমি প্রমাণ দিতে পারব না ঠিকই, তবে আমি জানি নাটাবাড়ি ও কোচবিহার দক্ষিণের জন্যে বিজেপি’র বিশেষ একটি ভাবনা রয়েছে। রবীন্দ্রনাথ ঘোষের নাটাবাড়ি বিজেপি’র বিশেষ নজরের কেন্দ্র। এখানে যাকে তাকে প্রার্থী করতে বিজেপি চাইছে না। রবীন্দ্রনাথের মুখোমুখি মিহির গোস্বামীকে যদি দাঁড় করানো যায়--অবশ্যই যদি মিহির রাজি হন (এখনও রাজি না হওয়ার কারণেই কি প্রার্থীর নাম ঘোষণায় বিলম্ব হচ্ছে?) তাহলে নাটাবাড়িতে বিজেপি’র যে প্রভাব তৈরি হয়েছে তার দৌলতেই মিহিরের মতো প্রার্থীর লড়াই চমকপ্রদ সাফল্য এনে দিতে পারে বিজেপিকে--এমনটাই কি মনে করছে বিজেপি? আগেই বলেছি--আমি প্রমাণ দিতে পারব না--তাই আমার ধারণা হিসেবেই এই সম্ভাবনার উল্লেখ করলাম আমি। কোচবিহার দক্ষিণ ছেড়ে মিহিরবাবু যদি নাটাবাড়িতে যেতে সম্মত হন তাহলে দক্ষিণে লড়াই দেওয়ার মতো বিজেপি’র প্রার্থী তৈরিই আছে। এ ছাড়াও অন্য আর একটি চমকপ্রদ সম্ভাবনার সঙ্কেতও রয়েছে আমার কাছে। অপ্রত্যাশিতভাবে একজন প্রার্থীরও উদয় হতে পাড়ে নাটাবাড়ি কেন্দ্রে। কথাবার্তা চলছে বলে আমার কাছে খবর রয়েছে--কিন্তু প্রকাশ করা যাবে না। দু’একদিন অপেক্ষা করতেই হবে ! কাজেই দু’হাত তুলে নাচার কোনো কারণ নেই বলেই আমি মনে করছি।
আজকের প্রার্থী তালিকায় চারজন সাংসদের নাম দেখে অনেকেই উল্লাসে ফেটে পড়েছেন এই বলে--বিজেপি’র গোয়াল ফাঁকা বলেই সাংসদদের টানতে হচ্ছে। কিন্তু সাংসদদের বিধানসভায় বিজেপি কেন পাঠাতে চাইছে সেটা কেউ ভাবছেন বলে মনে হয় না। সাংসদদের যত জন জিতবেন ততগুলো লোকসভা আসন খালি হবে এবং উপনির্বাচনে ঐ আসনগুলো ফের দখল করতে হবে--এটা একেবারেই ছেলেখেলার বিষয় নয়। তবু বিজেপি সেটাই করছে। তাদের দৃঢ় বিশ্বাস বিজেপি বাংলার ক্ষমতা দখল করবেই। সেটা হলে উপযুক্ত একটা মন্ত্রীসভা গঠন করতে হবে--তার জন্যে ৪০-৪২ জন উপযুক্ত বিধায়কও লাগবে। কোচবিহারের নিশীথ, চুঁচূড়ার লকেট, টালিগঞ্জের বাবুল এবং তারকেশ্বরের স্বপন দাশগুপ্তকে রাজ্য মন্ত্রীসভায় প্রয়োজন। যদিও এই চার সাংসদই নিশ্চিতভাবেই জিতবেন তেমনটাও বলা কঠিন। তবু চেষ্টায় কোনো ফাঁক রাখতে চাইছেন না অমিত শাহরা। শেষের আরও চার দফার প্রার্থী তালিকায় সাংসদ দিলীপ ঘোষ, সুনীল মণ্ডল সহ আরও তিন-চারজনের নাম থাকলে আমি অন্ততঃ অবাক হবো না। তবে আগেভাগেই বলে রাখা যায় যে--যদি বিজেপি ক্ষমতা দখলের জায়গায় উঠে আসে তাহলে মন্ত্রীসভা গঠন নিয়েও তাদের বেশ ঝামেলার সম্মুখীন হতেই হবে। কারণ, তারা মন্ত্রী সভায় যাদের যাদের কথা ভেবে রেখেছেন তাদের অনেকেই হয়তো নিজেদের ব্যক্তিগত ক্যারিশ্মা এবং গ্রহণযোগ্যতার অভাবে জিততেই পারবেন না। ফলে সমস্যা তৈরি হবেই। এমনিতেই ক্ষমতায় যাওয়ার জন্যে যে ১৪৮ জন প্রার্থীর প্রয়োজন তা সত্যি সত্যি বিজেপি’র হাতে নেই। মেরেকেটে জনা ৩০-৩৫ প্রার্থী (আদি বিজেপি) তাদের হাতে আছে যারা এই প্রবল হাওয়ায় জিতে আসতে পারেন। সুতরাং তাদের অনেকটাই নির্ভর করতেই হবে মুকুল-শুভেন্দু-রাজীব-সব্যসাচী ও তাদের হাত ধরে বিজেপিতে আসা নেতা-নেত্রীদের ওপর। এখনই নিশ্চিত করে আমি বলছি না--তবু জোর দিয়ে এটাও বলতে পারছি না যে, বিজেপি হ্যাণ্ডসাম মেজোরিটি নিয়ে ক্ষমতায় আসছেই। এমনও হতে পারে বৃহত্তম দল হিসেবে উঠে এসেও থমকে যেতে হল। এ আশঙ্কা দেখা দিচ্ছে বিজেপি’র অন্দরমহলের আদি-নব্য দ্বন্দ্বের কারণেই। যার যেখানে জয়ের সম্ভাবনা থাকছে তাকেই সেখানে প্রার্থী করার দৃঢ়তা যদি বিজেপি দেখাতে পারে তাহলে বাংলার ক্ষমতা দখলের স্বপ্ন তাদের সফল হতে পারে--অন্যথায় তীরে এসে তরী ডোবার হতাশায় ডুবে যেতে হতে পারে। নিজের পায়ে অনবরত কুড়ুল মেরে মেরে তৃণমূল খাদের কিনারায় এসে দাঁড়ালেও একেবারে মুছে যাওয়ার মতো অবস্থায় তারা এখনও আসে নি। কাজেই বিজেপি’র সামান্য ভুল বা অতিরিক্ত আত্মতুষ্টির সুযোগ তৃণমূল কিন্তু ছাড়বে না। পরবর্তী চার দফার প্রার্থী তালিকা প্রকাশের পরেও যদি জায়গায় জায়গায় এ ধরণের ক্ষোভবিক্ষোভ মাথাচাড়া দেয় তাহলে বিজেপিকে বেশ সমস্যায় পড়তে হবে। অনুশাসনহীনতাই শেষপর্যন্ত তাদের চরম নৈরাশ্যের কারণ হয়ে উঠতে পারে !!
কোন মন্তব্য নেই