মমতার হাতে দলের রাশ যত আলগা হয়েছে বিপর্য্যয় তত ঘনীভূত হয়েছে !!
বিশ্বদেব চট্টোপাধ্যায়
স্কুলে ইতিহাসের বেশ কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর মুখস্থ রাখতে হতো। যেমন, মুঘল সাম্রাজ্যের পতনের কারণ টাইপের কিছু ‘কমন’ প্রশ্নের উত্তর। সাজিয়েগুছিয়ে লিখতে বিশেষ অসুবিধে হতো না। কিন্তু সর্বভারতীয় কংগ্রেসের, আরজেডি’র, টিডিপি’র, সমাজবাদী’র এবং তৃণমূলের পতনের কারণগুলো সাজিয়েগুছিয়ে লেখা সত্যিই বেশ কঠিন--কারণ, এইসব দলের পতনের কারণ দু’চার পয়েন্টে ব্যাখ্যা করা সহজ নয়। কোনো ইতিহাস বইতে এখনও কারণগুলো সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা হয় নি। আমার নিজস্ব যুক্তিবোধ বিচার-বিশ্লেষণ থেকে তৃণমূলের আশু বিপর্যয়ের যে কারণগুলো উঠে আসছে আমি সেগুলোই ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করছি আজ। এ প্রতিবেদন এক পর্বে শেষ হওয়ার নয়--বেশ বড়-ই হবে--তাই ক্রমশঃ’র পথ ধরে এগোতে হবে আমাকে।
সকলেই না জানলেও কেউ কেউ জানেন হয়তো--একদা পারিবারিক সমস্যার কারণে মমতাকে বাড়ি ছেড়ে অন্যত্র বসবাসের চিন্তা করতে হয়েছিল--তিনি কয়েকদিনের জন্যে হলেও বাড়ি ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন। কেন গিয়েছিলেন জানলেও তা নিয়ে কোনো আলোচনায় আমি যাচ্ছি না--তবে এটুকু বলতেই হচ্ছে যে সেই সমস্যা মমতার পিছু ছাড়ে নি আজও--বরং নানা কারণে সমস্যা বেড়ে গেছে এবং তার ফলেই ধীরে ধীরে হলেও দলের রাশ মমতার হাতে আলগা হতে হতে এমন একটা জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে যেখান থেকে দলকে শক্ত হাতে ধরে রাখার জন্য যে আত্মপ্রত্যয় থাকা দরকার তার অনেকটাই আর তাঁর মধ্যে দেখা যাচ্ছে না। ঠিক এই কারণেই তাঁকে হারাতে হয়েছে মুকুলের মতো একজন দক্ষ সাংগঠনিক নেতা তথা ভোট ম্যানেজারকে। মুকুলকে হারানোর চড়া মাশুল গুণতে হয়েছে তাঁকে গত লোকসভা নির্বাচনেই। ২০১৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনেও (কেন্দ্রে তখন বিপুল বিক্রমে প্রধানমন্ত্রীর চেয়ারে বসে ছিলেন নরেন্দ্র মোদী) মাত্র দুটির বেশি আসন পায় নি যে বিজেপি--সেই বিজেপি-ই মুকুলকে সামনে রেখে ১৮-টা আসন মসৃণভাবে নিজেদের তালুবন্দি করে ফেললো। উত্তরবঙ্গ থেকে একজনকেও লোকসভায় পাঠাতে পারলেন না মমতা ! এ বিস্ময় তিনি এখনও কাটিয়ে উঠতে পারেন নি বলে গতকালও জলপাইগুড়িতে তাঁর অকপট আর্তনাদ ফের শোনা গেল--‘কি অপরাধ করেছিলাম আমরা, কি অন্যায় করেছিলাম !’--না, তিনি কোনো অপরাধ বা অন্যায় করেছিলেন বলে আমি মনে করি না, তিনি মারাত্মক কিছু ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন উত্তরবঙ্গের জন্যে। সে সব বিষয়ে আমি প্রচুর লিখেছি ২০১৯-এর লোকসভা নির্বাচনের বহু আগে থেকেই। আজ শুধু ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ ছাড়াই সেই ভুল সিদ্ধান্তগুলোর উল্লেখ করবো।
পাহাড়কে সত্যি সত্যি হাসানোর জন্যে যেসব পদক্ষেপ নেওয়া দরকার ছিল (উন্নয়নমুখী) তিনি তা নেওয়ার চেষ্টা যে করেন নি তা নয়--কিন্তু সেসব বিশেষ কাজে লাগে নি বিমল গুরুংকে প্রয়োজনের চেয়ে সাংঘাতিক রকমের বেশি বেশি রাজনৈতিক স্পেস দেওয়ার কারণে। একটি জেলার একটি মহকুমাকে (যার বিধানসভা সদস্য মাত্র এক, জেলা পরিষদের অস্তিত্ব নেই, একজনও সাংসাদ নেই, কোনো কালে হবেও না) দুম্ করে অযৌক্তিক দাবির কাছে নতি স্বীকার করে ‘পূর্ণাঙ্গ’ জেলার মর্যাদা দিয়ে বসলেন !
দার্জিলিং জেলাকে যদি ভাঙ্গাটাই যুক্তিযুক্ত ছিল তাহলে দার্জিলিংকে দু’ভাগে ভাগ করা উচিত ছিল--যার একভাগে থাকতো পাহাড়ের চারটি মহকুমা (দার্জিলিং-কালিম্পং-কার্সিয়াং-মিরিক) এবং অন্য ভাগে থাকতো ডাবগ্রাম-ফুলবাড়ি সহ শিলিগুড়ি মহকুমা। বাস্তবে তা হল না গুরুংয়ের হুমকির কারণেই। এই ভুলের ওপরে আরও বড় ভুল সিদ্ধান্ত হল--বিভাজনের রাজনীতির মাধ্যমে গুরুংয়ের আধিপত্য কমানোর জন্য ১৪-১৫’টি উন্নয়ন পর্ষদ গঠন--যা প্রকৃতপক্ষে লাভের বদলে সমস্যাকেই গুরুতর করে তুলেছে। লোকসভা নির্বাচনে এর যা পরিণাম হওয়ার কথা সেটাই হয়েছে। দার্জিলিং তো গেছেই ডুয়ার্স ও উত্তরদিনাজপুরও হাত থেকে খসে পড়েছে। আমি এই সম্ভাবনার কথা কিন্তু লিখেছিলাম। হুবহু সত্য প্রমাণিত হয়েছে। এসব সিদ্ধান্ত তাঁর অপরাধ না হলেও যে মারাত্মক ভুল সিদ্ধান্ত ছিল তা যেমন আগেও বলেছি আজও বলছি ! একুশের নির্বাচনের আগে ফের সেই গুরুংকেই ময়দানে নামিয়ে রাজনৈতিক স্পেস দেওয়ার ভুল সিদ্ধান্তের পরিণাম আরও খারাপ হতে চলেছে।
২০১৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের পর থেকেই উত্তরবঙ্গের প্রতিটি জেলা সগঠন নিয়ে এক ধরণের ছেলেখেলা শুরু হয়েগিয়েছিল--যার প্রকৃত ছবিটা হয় তিনি লক্ষ্য করেন নি--না হয় তাঁকে দেখানো হয় নি। কোচবিহারের রবি ঘোষের মতো নেতাদের সাংগঠনিক ক্ষমতাকে বিশ্রীভাবে সীমাবদ্ধ করার রাজনীতিকে উৎসাহিত করার জন্য একের পর এক ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়া শুরু হল, যার ফল যে মারাত্মক ক্ষতিকর হতে চলেছে সেটাও আমি বার বার লিখেছিলাম। ২০১৬ সালের নির্বাচনে যে রবি ঘোষ দলের হাতে ৯-এর মধ্যে ৮-টি আসন তুলে দিলেন সেই রবি ঘোষের বিরোধী গোষ্ঠীকে বিস্ময়করভাবে তোল্লা দেওয়া শুরু হল--শুধু তাই নয় রবি-বিরোধী গোষ্ঠীর বিস্ময়কর নিষ্ক্রিয়তার কারণে মমতারই মনোনীত প্রার্থীর পরাজয় যারা নিশ্চিত করল লোকসভা নির্বাচনের পরেই তাদের বিপুলভাবে পুরস্কৃত করা হল ! মমতা তাঁর নির্বাচনী প্রচার মঞ্চে সবসময়েই দাবি করেন তিনিই লোকসভার ৪২-টি এবং বিধানসভার ২৯৪-টি আসনের একমাত্র প্রার্থী--সেই একমাত্র প্রার্থী কেন কোচবিহারের মতো তৃণমূলের শক্ত ঘাঁটিতে হেরে ভূত হয়ে গেল দল তা নিয়ে মাথা না ঘামিয়ে এই সিদ্ধান্ত নিল যে রবি ঘোষকে সভাপতি পদ থেকে সরিয়ে একচেটিয়া রাজবংশী ভোট টানতে হলে পার্থপ্রতিমকে সভাপতি করতে হবে, বিনয়কৃষ্ণ বর্মণকে চেয়ারম্যান করতে হবে এবং অর্ঘ্য রায়প্রধানকে কো-অর্ডিনেটর করলেই বিপুল জয় সুনিশ্চিত হবে ! ভোটের ফলাফল সামনে আসতে এখনও মাস-ছয়েক দেরি আছে--তবু এখনই বলে রাখছি--কোচবিহারে দলের এই সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত নিদারুণভাবে হতাশ করবে দলকে। চামচারা যে যা-ই বলুক না কেন (এরা যে কোনো উপায় দলকে ব্যবহার করে কামানো ছাড়া রাজনীতির ‘র’-ও বোঝে না)--রবি ঘোষের মতো ১০০% দলনিবেদিত দক্ষ সাংগঠনিক প্রচণ্ড পরিশ্রমী নেতাকে সাইডলাইনের বাইরে রাখার পরিণাম যে কত খারাপ হতে পারে তা দেখার জন্যে একটু অপেক্ষা তো করতেই হবে।
শুধু কোচবিহার নয়--আলিপুদুয়ার, জলপাইগুড়ি, দার্জিলিং, উত্তর-দক্ষিণ দিনাজপুর, মালদার জেলা সংগঠন নিয়ে চূড়ান্ত ছেলেখেলা শুরু হয়েছে প্রশান্ত কিশোরের হাতে দলের ভালমন্দের দায়িত্ব তুলে দেওয়ার পর। চতুর্দিকে এখন বিদ্রোহ মাথা চাড়া দিচ্ছে। খোলাখুলি রাস্তায় নেমে ক্ষোভ অসন্তোষ উগড়ে দিচ্ছেন নেতা-কর্মীরা। দলত্যাগের কথা ভাবছেন অনেকেই। শ্বাস রুদ্ধ হয়ে আসছে তাদের। ঘরে বাইরের দুর্বিষহ চাপে তাদের এখন প্রাণান্তকর অবস্থা ! মমতা যতই দাবি করুন তিনি সব লক্ষ্য রাখছেন--মানুষ এখন তা আর বিশ্বাস করছে না। কারণ তাঁর আর দলের মাঝখানে প্রশান্ত কিশোর এক বিরাট পাঁচিল তুলে দিয়েছেন--পাঁচিলের ওপারে কি হচ্ছে তা আর তিনি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছেন না--প্রশান্ত কিশোরের রিপোর্ট বা ধারাবিবরণী’র ওপর নির্ভর করেই তাঁকে যাবতীয় সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে--যার সিংহভাগই দলের অভ্যন্তরে ব্যাপকভাবে ক্ষোভ অসন্তোষ তৈরি করছে। এই কারণেই তাঁকে শোভন চট্টোপাধ্যায়, সব্যসাচী দত্ত, সৌমিত্র খাঁ, অর্জুন সিং-এর মতো একসময়ের নির্ভরযোগ্য নেতাদের হারাতে হয়েছে, হারাতে হচ্ছে শুভেন্দু সহ আরও এক ঝাঁক দাপুটে নেতাকেও। প্রকাশ্যেই বেসুরো গাইছেন বাণী সিংহরায়-রাজীব-শীলভদ্র-জিতেন্দ্র-সুনীল মণ্ডল-বিশ্বজিৎ কুণ্ডু-দীপক হালদার-ভূষণ সিং সহ আরও অনেক নেতাই। এসবই বিজেপি’র যাদুকাঠি নাড়ানোর ফল? বিজেপি’র টাকার লোভ? এজেন্সির ভয়? ধরে নিলাম হয়তো তাই--কিন্তু সর্বস্তরের মানুষের মধ্যেও ভয়ানক নেতিবাচক ক্ষোভ অসন্তোষ তৈরি হচ্ছে কাদের সৌজন্যে? তা নিয়ে কি কোনো ভাবনা-চিন্তা কেউ করছে? কে-ই বা করবে--এখন তো প্রশান্ত কিশোরের নির্দেশের বাইরে কারুর একটা পাতা কুড়োনোরও অধিকার নেই। এইরকম একটা অবস্থা কেন তৈরি হল বা কতদিন থেকে হয়ে আসছে তা নিয়ে কারুর কোনো মাথাব্যথাই কি কেউ লক্ষ্য করছেন?
এবারে আসতে হবে আমলাতান্ত্রিক নির্ভরতার মারাত্মক প্রতিক্রিয়ার কথায়।









কোন মন্তব্য নেই