তিনসুকিয়াতে ষোড়শ সংখ্যা উজান উন্মোচন হল
তিনসুকীয়া : ষোড়শ সংখ্যা ‘উজান’ উন্মোচন অনুষ্ঠানে ‘ভাষা আন্দোলনের ষাট বছর’ নিয়ে বললেন সমাজকর্মী তথা গবেষক অধ্যাপক দেবব্রত শর্মা উজান এখন ষোড়শী। ষষ্ঠদশ সংখ্যা বেরোল গেল ২৭ ডিসেম্বর, ২০২০। রবিবারে। উন্মোচন করলেন, সমাজকর্মী তথা গবেষক অধ্যাপক দেবব্রত শর্মা। এবারে অতিমারির জন্যে খানিক দেরি হল। অন্যথা অন্য বছরে বেরোয় শারদোৎসবের আগে আগে। এবারে কাগজের মূল ভাবনা ছিল ‘ দেশভাগ, প্রব্রজন, নাগরিকত্ব এবং।’ নিরস প্রবন্ধে এবং সরস গল্পে বিষয়গুলো এসেছে। কবিতাতেও বহু কবি একে ছুঁয়েছেন। অনেকগুলো অ-বাংলা লেখাও সংগ্রহ করে অনুবাদে পরিবেশিত হয়েছে। এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে প্রখ্যাত হিন্দি কথাশিল্পী ‘অজ্ঞেয়’-র দেশভাগের প্রেক্ষাপটে এবং অসমিয়া কথাশিল্পী অরূপা পটঙ্গিয়া কলিতার ‘অসম আন্দোলনে’র প্রেক্ষাপটে দুটি গল্প। ষাটের ভাষা আন্দোলনের দিনের সুবিখ্যাত হেমাঙ্গ-ভূপেন জুটির ‘হারাধন রংমন’ গানের এবারে ষাট বছর। এর একটি পর্যালোচনা হাজির করেছেন দেবব্রত শর্মা।
বাণী প্রসন্ন মিশ্র পূর্বোত্তরের স্বনাম ধন্য গবেষক, যাঁর দীর্ঘদিনের অধ্যয়নের বিষয়ই আমাদের বিষয়ের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। তাঁর লেখাটি সম্প্রতি বাংলা ও অসমিয়াতে স্বতন্ত্রভাবে প্রকাশিত গ্রন্থ ‘আবহমান বাঙালি’ (উত্তরপূর্বীয় বাঙালির আত্মানুসন্ধান) থেকে নিয়ে পুনরুপস্থাপন করা হয়েছে মাত্র। সেরকম এই সংখ্যা সমৃদ্ধ হয়েছে দেশভাগ ও চলচ্চিত্র নিয়ে তিনটি লেখাতে। তার একটি প্রখ্যাত তথ্যচিত্র নির্মাতা সৌমিত্র দস্তিদার লিখে দিয়ে সংখ্যাটির ভার বাড়িয়েছেন। সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কারে ভূষিত কথাশিল্পী শ্যামল ভট্টাচার্য তাঁর উপন্যাসিকাতে কাশ্মীর সীমান্তের অতিস্বল্পচেনা জনজীবনের সঙ্গে আমাদের আলাপ করিয়ে দিয়েছেন। সেরকম ভারত বাংলাদেশের, পূর্বোত্তর এবং বাইরের জনা পঞ্চাশেক লেখক লেখিকার লেখাতে কাগজটি সেজে উঠেছে। তাঁদের মধ্যে উল্লেখ যোগ্য হচ্ছেন, বাকি যারা লিখেছেন, তাঁদের মধ্যে উল্লেখ যোগ্য ---প্রবন্ধে
দেবাশিস ভট্টাচার্য-মুম্বাই,বাসব রায়, কমল চক্রবর্তী,মৃন্ময় দেব, প্ৰণব কুমার হাজরিকা, দেবাশিস ভট্টাচার্য (শিলচর), রাজেন শর্মা, দিগন্ত শর্মা প্রমুখ। কবিতায় রবিন ভট্টাচার্য, রাম চন্দ্র পাল , কমলিকা মজুমদার , দোলন চাঁপা দাস পাল , অভীক কুমার দে, আবুল কাশিম তাপাদার, নীলদীপ চক্রবর্তী,স্নিগ্ধা নাথ,অর্জুন দাস, শান্তনু গঙ্গারিড়ি, শ্রীভদ্র,অরবিন্দ বিশ্বাস,জ্যোতিষ কুমার দেব,কোলাজ রায়,স্বস্তিসাধন চক্রবর্তী,শান্তনু সরকার,বসু ভট্টাচার্য,ইন্দ্রনীল,প্রবীর বসু,সেলিম মুস্তাফা প্রমুখ।গল্পে আরো রয়েছেন, কুমার অজিত দত্ত, সঞ্জীব দেবলস্কর, সমর দেব, ইকবাল তাজওলী, অর্পিতা বিশ্বাস , দেবদুলাল গোস্বামী , সুস্মিতা মজুমদার , দেবব্রত সেনগুপ্ত।
তিনসুকিয়াতে ষোড়শ সংখ্যা উজান উন্মোচন হল। প্রচ্ছদ যথারীতি সাজিয়েছেন ত্রিদিব দত্ত। ভেতরের অলঙ্করণে ছবি এঁকে দিয়েছেন পার্থসারথি দত্ত।
অধ্যাপক দেবব্রত শর্মার হাত ধরে কাগজটি বেরুলো -- শ্রীপুরিয়ার চট্টেশ্বরী কালীবাড়ি প্রাঙ্গণে। জীবন কৃষ্ণ সরকারের পরিচালনাতে উজানের শিল্পীদের পরিবেশিত ‘শুভ কর্মপথে’ এই উদ্বোধনী রবীন্দ্র সঙ্গীত দিয়ে সভা শুরু হয়। এতে অংশ নেন শীলা দেব দে সরকার, চন্দ্রা চক্রবর্তী, মিতালি মালাকার। তার আগে সম্প্রতি প্রয়াত অমরেশ দত্ত, অসিত রায়, তরুণ গগৈ, অলোক রঞ্জন দাসগুপ্ত, পার্থ বসু, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, তরুণ গগৈ, সনৎ কৈরি, পীযুষ দাস, মানব রতনমুখোপাধ্যায় প্রমুখ এবং কোভিড আক্রান্ত হয়ে অকালে যারা মারা গেলেন তাঁদের স্মৃতিতে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। ‘উজান সাহত্য গোষ্ঠী’র সভাপতি সুজয় কুমার রায় সভাপতিত্ব করেন সভাতে।
এর পরে ফুলাম গামোছা এবং উপহার দিয়ে দিয়ে অতিথি অধ্যাপক দেবব্রত শর্মা এবং তাঁর জীবন সঙ্গিনী শিক্ষিকা সান্ত্বনা শর্মাকে বরণ করে নেন ‘উজান’ পত্রিকার সম্পাদক সবিতা দেবনাথ এবং ‘উজান সাহিত্য গোষ্ঠী’র সম্পাদক ভানু ভূষণ দাস। সুজয় কুমার রায় সবাইকে স্বাগত জানিয়ে অতিমারির দিনেও উজানের মতো কাগজ প্রকাশের অনুষ্ঠান সফল করে তুলবার জন্যে সবাইকে ধন্যবাদ জানান। ‘উজান’ সম্পাদক সবিতা দেবনাথ এরপর স্বাগত ভাষণে উজানের বর্তমান সংখ্যার পরিকল্পনা সম্পর্কে বিষদে বক্তব্য রাখেন। এর পরে ‘উজান সাহিত্য গোষ্ঠী’র সাধারণ সম্পাদক ভানু ভূষণ দাস গেল বছরের বহু প্রতিকূলতার মধ্যে উজানের বিচিত্র কাজকর্মের খতিয়ান তুলে ধরেন। উপদেষ্টা সুশান্ত কর ষোড়শ সংখ্যা ‘উজানে’র পরিকল্পনা নিয়ে আরো খানিক বিস্তৃত তুলে ধরেন, লেখকদের সহযোগিতার জন্যে কৃতজ্ঞতা জানান। এবং অতিথি দ্বয় দেবব্রত শর্মা ও সান্ত্বনা শর্মার সঙ্গে উপস্থিত সবার আলাপ করিয়ে দেন।
এর পরেই ‘উজান’ পত্রিকার বর্তমান সংখ্যার উন্মোচন করেন অধ্যাপক দেবব্রত শর্মা।তাঁকে সঙ্গ দেন উজান সম্পাদনা সমিতির সদস্যরা ছাড়াও সমীরণ গুহ, অধ্যাপক হিমাংশু বিশ্বাস , নির্মল চট্টোপাধ্যায় সহ অনেকে।
অধ্যাপক দেবব্রত শর্মার সেদিনে বলবার বিষয় ছিল ‘ভাষা আন্দোলনের ষাট বছর : ফিরে দেখা’. সম্প্রতি ‘১৯৬০র ভাষা আন্দোলন’ শীর্ষক একটি গবেষণা গ্রন্থ বেরিয়েছিল যোরহাটের একলব্য প্রকাশনী থেকে। দেবব্রত শর্মা এবং দয়া সাগর কলিতার যৌথ শ্রমের ফসল বইটি। তিনি সেই বইটিও নিয়ে এসেছিলেন। সেই বই ছাড়াও, উজান পত্রিকার সঙ্গে একলব্য প্রকাশনীর বই পত্রের একটি স্টলও রাখা হয়েছিল পাশে। সেই গবেষণার কাজ করতে গিয়ে আলাপ হয়েছিল চাবুয়াতে ভাষা দাঙ্গাতে নিহত শিশু প্রণতিবালা দাস। তাঁর ভাই স্বপন দাসকেও সঙ্গে নিয়ে এসেছিলেন দেবব্রত শর্মা। বলবার শুরুতেই তিনি স্বপন দাসের সঙ্গে সভার আলাপ করিয়ে দিলে, উজানের হয়ে চন্দ্রা চক্রবর্তী তাঁকে একটি গামোছা দিয়ে বরণ করেন।
দেবব্রত শর্মার বলবার পরিসর ছিল ব্যাপক। হাজার বছরের বাংলা ও অসমিয়া ভাষার ইতিহাস টেনে তিনি বলেন, দুই ভাষা সহযোগী ভাষা হিসেবেই বিকশিত হয়েছিল। প্রতিবেশী ছিল আছে দুই ভাষিক গোষ্ঠী। ঔপনিবেশিক শক্তি নিজেদের শাসনকে পাকা করতে অসমে উনিশ শতকে বাংলা ভাষাকে সরকারি ভাষা হিসেবে চাপিয়ে দেয়, সেই থেকে অসমিয়া উগ্রজাতীয়তাবাদী মধ্যবিত্ত বাঙালিকে খামোখা শত্রু পক্ষে ঠেলে রাখে। ওদিকে অসমিয়া ভাষার বিকাশে পদ্মনাথ ভট্টাচার্য বিদ্যাবিনোদ থেকে হেমাঙ্গ বিশ্বাস প্রমুখের অবদানও তিনি শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন। তিনি বলেন, ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকেরা নিজেদের শাসনকে পাকা করতেই হিন্দুস্তানি ভাষাকে মুসলমানে ও হিন্দুর ভাষা বলে বিভাজিত করে। উর্দুকে করে তুলে মুসলমানের ভাষা। হিন্দি তাঁর মতে একেবারেই উনিশ শতকে ব্রিটিশ ও উত্তরভারতীয় বর্ণহিন্দুদের গড়ে তুলা নবীন ভাষা। যাকে এখন রাষ্ট্রভাষা বলে দাবি করা হয়। তিনি ভাষাগুলোর মধ্যে স্তরভেদ নিয়েও প্রশ্ন তুলেন। প্রশ্ন করেন, কেন একেবারে উপরে থাককে সংস্কৃত ও ইংরাজির স্থান। এর পরে হিন্দি, তার নিচে প্রাদেশিক ভাষাগুলো আর একেবারে নিচে সাঁওতালি, মুণ্ডারি, নেপালি আদি ভাষাগুলো? তিনি বলেন, প্রথমে ব্রিটিশ শাসনের স্বার্থে, পরে হিন্দ হিন্দু শাসক শ্রেণি নিজেদের স্বার্থে বাঙালি ও পাঞ্জাবীদের ভাগ করবে বলেই দেশভাগ করল। বাঙালি মধ্যবিত্তও সেই জালে অনেকে জড়ালেন। অসমিয়া মধ্যবিত্তের স্বার্থ তো ছিলই? তিনি বলেন, ‘আজাদ হিন্দ ফৌজ’ নাম ছিল নেতাজি সুভাষ বসুরর নেতৃত্বাধীন বাহিনীর। তিনি হিন্দুত্বের কাছেও আত্মসমর্পণ করেন নি। তাঁর দাদা শরৎ বসু আবুল কাশিমদের সঙ্গে নিয়ে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলার স্বপ্ন দেখেছিলেন, সেটি বাস্তবায়িত হলে আজ বাঙালিকে দেশান্তরি হতে হত না, ডি ভোটার হতে হত না, এন আর সি-র মার সইতে হত না। নেতাজি সুভাষ বসুর পথই এখনো নতুন ভারতের পথ বলে তিনি মত ব্যক্ত করেন। তিনি প্রশ্ন তুলেন অসমিয়া ভাষাকে সরকারি ভাষা করতে গিয়ে ষাট বছর আগে যারা অসমের বাঙালির রক্ত ঝরালেন তাঁরা নিজের জন্যেই বা কী লাভ করলেন? ভাষা আন্দোলনের নামে কোথায় কী রক্তপাত হয়েছে, তিনি তাঁর বেশ কিছু করুণ কাহিনি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, অসমিয়া ভাষার জন্যে যারা প্রাণ দিয়েছেন, তাঁদের সংখ্যা খুব বেশি নয়—কিন্তু সেই স্বল্প সংখ্যকদের বহুকেও অসমিয়া মধ্যবিত্ত মনে রাখেন নি। এর মধ্যে নগাঁওয়ের শিশির নাগও আছেন। অন্যদিকে তিনি বাঙালিদেরও প্রশ্ন করেন, তাঁরা ১৯শে মে’র শহিদদের স্মরণে তো সঙ্গতভাবেই রাখেন, কিন্তু ব্রহ্মপুত্র উপত্যকাতে শতাধিক মৃতের হিসেব কেন রাখেন না? ভাষা আন্দোলন থেকে অসম আন্দোলন অব্দি হাজারো বিপন্ন মানুষের কথা মনে না রেখে ‘আহ মরি বাংলা ভাষা!” গাইবার মানে কী? তিনি বলেন, আজ সময় অতীতকে ভুলে না গিয়ে মনে রেখে প্রায়শ্চিত্ত করবার। এবং অসমিয়া ও বাঙালীদের সহযোগী ভাষিক গোষ্ঠী হিসেবে বিকশিত হওয়া। আজ এই দুই জনগোষ্ঠীর কোনোটিরই ছেলেমেয়েরা মাতৃভাষা শিখছেন না, পড়ছেন না। বিশ্বায়নের চাপে বিপন্ন সমস্ত ভারতীয় ভাষা, সেখানে দুই ভাষাকেই নিজেদের অহং ছেড়ে আরো দুর্বলতর ভাষিক গোষ্ঠীর প্রতিও শ্রদ্ধাশীল হওয়া দরকার, যাতে নিজেরাও বাঁচেন, বাঁচেন অন্যেরাও।
প্রায় দেড় ঘণ্টার বক্তৃতা শ্রোতারা মুগ্ধ হয়ে শুনেন। তাঁর বক্তৃতাতে তিনি হেমাঙ্গ-ভূপেন জুটির হারাধন রংমন গানের কথা উল্লেখ করেন। এই গানটি এবং সুবিখ্যাত ‘মানুষ মানুষের জন্যে’ এই দুই গানটিরই এবারে ষাট বছর। ফলে আই পিটিয়ের প্রস্তুত করা শুভপ্রসাদ নন্দী মজুমদার ও বিভু চৌধুরীর গলাতে ‘হারাধন রংমন’ গানটি বাজিয়ে শুনানো হয় শ্রোতাদের। তাঁর পরে সংক্ষিপ্ত বক্তব্য রাখেন সান্ত্বনা শর্মা ও স্বপন দাস। গোটা অনুষ্ঠানের সঞ্চালনা করেন ত্রিদিব দত্ত।












কোন মন্তব্য নেই