Header Ads

পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি’র এই রামধাক্কা একেবারেই অপ্রত্যাশিত ছিল না !!

বিশ্বদেব চট্টোপাধ্যায়ঃ

রাজ্যের তিন বিধানসভা কেন্দ্রের উপনির্বাচন নিয়ে আমি কোন প্রাক্ সমীক্ষার ফলাফল প্রকাশ করি নি। কারণ, আমি অনেক আগে থেকেই বলে আসছি বিজেপি’র এনআরসি-হুমকি বিজেপির ভরাডুবির কারণ হবে। নরেন্দ্র মোদী-অমিত শাহ’রা বাংলার ভূ-প্রকৃতি সম্পর্কেও যেমন বিশেষ কোন খবর রাখেন না--তেমনই বাংলার মানুষের চিন্তা-চেতনা ও প্রকৃতি সম্পর্কেও প্রায় কিছুই জানেন না এবং বিস্ময়ের ব্যাপার হল বাংলাকে বা বাংলার মানুষকে জানার চেষ্টা না করেই তাঁরা এনআরসি’র হুমকি দিতে দু’বার ভেবে দেখার প্রয়োজন অনুভব করেন নি।


 ভিটেমাটি ছেড়ে এসে একটু আশ্রয়ের জন্যে যেসব লক্ষ লক্ষ মানুষকে রক্তাক্ত ক্ষত-বিক্ষত হতে হয়েছে, মান-সম্মান খোয়াতে হয়েছে এবং এসব সব-হারানোর যন্ত্রণা পেরিয়ে এদেশে মাথা তোলার চেষ্টা করে যেতে হচ্ছে তাদের বুকের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতার ভয় কিভাবে সব সময়ে তাদের আতঙ্কের মধ্যে রাখে তা বোঝার ক্ষমতা মোদী-অমিত শাহ’দের একেবারেই থাকার কথা নয়। তাই তাঁরা সহস্র ভুলভ্রান্তিতে ভরা অসমের এনআরসির পরিকল্পনার মধ্যে যুক্তিসঙ্গত সংশোধনের কথা ভাবেন নি--বিশ লক্ষাধিক মানুষকে অনুপ্রবেশকারী বানিয়ে দিয়েও সদম্ভে আশা করছেন অসমে ফের ক্ষমতায় ফিরবেন এবং বাংলাতেও পরিবর্তন আনবেন! তাঁদের এই বালকোচিত ভাবনায় যে বড় রকমের গলদ থেকে গেছে তার প্রমাণের জন্যে এই ফলাফলের প্রয়োজন ছিল জরুরি।
এনআরসি অন্যতম প্রধান কারণ হলেও আরও কিছু কারণ রয়েছে এই লজ্জাজনক মুখ থুবড়ে পড়ার মধ্যে। এনআরসি’র হুমকি ছাড়াও বিজেপি’র কিছু নেতার চালচলন ও চ্যাটাং চ্যাটাং কথাবার্তায় মানুষ হতাশ হয়ে পড়ছিল। প্রদেশের শীর্ষস্তর থেকে একেবারে  নিচু তলায় ক্ষমতার লড়াই বেআব্রুভাবেই প্রকট হচ্ছিল, এর ফলে তাদের গ্রহণযোগ্যতাও কমছিল  হু-হু করে। সেটা বোঝার মতো রাজনৈতিক মেধা দিলীপ ঘোষ-সায়ন্তন বসু-রাহুল সিনহা প্রমুখ কোন নেতার মধ্যেই আছে বলে মনে হয় নি। থাকলে পুর-পঞ্চায়েত দখল ও সেগুলো হাত থেকে ছিটকে যাওয়ার যে এপিসোডগুলো মানুষ দেখছিল আর হাসাহাসি করছিল তা দেখতে হত না। লোকসভায় অপ্রত্যাশিতভাবেই ১৮টি আসন পাওয়ামাত্র বিজেপি নেতারা ধরেই নিয়েছিলেন রাজ্যে তাঁরা পরিবর্তন এনেই ফেলেছেন--শুধু মন্ত্রীসভা গঠনটাই বাকি !
সিংহভাগ রাজ্যেই বিজেপি’র সর্বজনগ্রাহ্য সংগঠন গড়ে ওঠে নি গ্রহণযোগ্য নেতার অভাবেই। কেন্দ্রীয় কিছু নেতাকে সামনে রেখে রাজ্য জয়ের উচ্চাশা তাই মুখ থুবড়ে পড়ছে রাজস্থান-মধ্যপ্রদেশ-ছত্তিশগড়-কর্ণাটক-মহারাষ্ট্রের মতো রাজ্যগুলিতেও ! এই ছবিই হয়তো দেখা যাবে ঝাড়খণ্ডেও। সার্জিক্যাল স্ট্রাইক, পাকিস্তান বিরোধী জাতীয়তাবাদী আবেগ এবং কাশ্মীর দিয়ে রাজ্যে রাজ্যে বিজেপি ঝাণ্ডা ওড়াতে চিরকাল পারবে না। রাজ্যে রাজ্যে জাত-পাত-ধর্ম নিরপেক্ষ সর্বজনগ্রাহ্য নেতা-কর্মী তৈরি করতে না পারলে অস্তিত্বের সঙ্কট গভীর থেকে গভীরতর হতেই থাকবে। পশ্চেমবঙ্গেও বিজেপির এই সর্বজনগ্রাহ্য নেতা-কর্মীর দৈন্যদশাই একুশের স্বপ্ন পূরণের ক্ষেত্রে এক হিমালয়ান বাধা হিসেবেই চিহ্নিত হতে চলেছে। এক কথায় বলতে গেলে তৃণমূল কংগ্রেসের সাংগঠনিক দৈন্যদশা ও গ্রহণযোগ্যতা হারানো নেতৃত্বের বেলাগাম বোলচাল ও বাচালতার নেতিবাচক প্রতিক্রিয়াকে পুঁজি করে বিজেপির পক্ষে রাজ্যে পরিবর্তন আনা সম্ভব হবে না। তার একটা অন্যতম বড় কারণ হল বিজেপির একবগ্গা বোধবুদ্ধি বিবর্জিত হিন্দুত্ব (যা সাম্প্রদায়িক রাজনীতির ছবি তৈরি করে প্রায়শঃই) নির্ভর রাজনীতি যা ধর্মীয় বিভাজনকে বিশ্রীভাবে মাঝেমাঝেই প্রকট করে তোলে।
অন্যদিকে তিন কেন্দ্রের উপনির্বাচনে তৃণমূলের সাফল্যের পেছনে পিকে’র কেরামতীকেই বাহবা জানাচ্ছেন অনেকে। আমি কিন্তু ভিন্নমত পোষণ করছি। বিজেপি যদি আগ বাড়িয়ে তীব্র এনআরসি আতঙ্ক তৈরি না করত তাহলে তিনটি কেন্দ্রে তৃণমূল যে ব্যবধানে জয়ী হয়েছে সেই ব্যবধান থাকতো বলে আমার মনে হয় না। বিজেপি স্বেচ্ছায় নিজের ভবিষ্যতের লেজে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে। এ আগুনের হাত থেকে পরবর্তী নির্বাচনগুলিতে বিজেপি নিজেদের বাঁচাতে পারে কিনা সেটাই এখন দেখার। বিজেপি বুঝতেই পারে নি বাংলায় এনআরসি’র আগুন নিয়ে খেলার এই বিধ্বংসী প্রতিক্রিয়া হতে পারে !
তৃণমূল কংগ্রেসকে এনআরসি এই উপনির্বাচনে যথেষ্ট পরিমাণে অক্সিজেন দিয়ে দিল আগামী পুর নির্বাচনের জন্যে। কিন্তু এনআরসি আতঙ্ক কতদিন তৃণমূলের পক্ষে ইতিবাচক ভূমিকায় দাঁড়িয়ে থাকবে সেটা বলা কিন্তু খুব মুশকিল। তৃণমূলের সাংগঠনিক শরীরে এখন অসংখ্য রোগ ধরে গেছে--প্রয়োজনীয় চিকিৎসা হচ্ছে না। মাঝেমধ্যে ধমক-চমক দিয়ে নানারকম বার্তা দেওয়ার চেষ্টার ত্রুটি না থাকলেও পরিস্থিতির কোন পরিবর্তনই হচ্ছে না। পিকের নানান চমকপ্রদ ফর্মূলা প্রয়োগ করা হচ্ছে বটে কিন্তু সেগুলো চন্দ্রবাবু নায়াডু-রাহুল-উদ্ধব ঠাকরে-লালুপ্রসাদ যাদব প্রমুখ অনেকেই ব্যবহার করেও ভরাডুবি ঠেকাতে পারেন নি। কারণ, পিকে নয়--শেষ কথা বলে জনতা। আমার অন্ততঃ বিশ্বাস সেটাই !

No comments

Powered by Blogger.