Header Ads

নবরাত্রির নয়টি রাতের তাৎপর্য

বিশ্বদেব চট্টোপাধ্যায় : দুর্গাপুজো ও নবরাত্রি একে অপরের পরিপূরক। শরৎ কালে ভারতের একপ্রান্ত যখন শারদীয়া বা দেবী দুর্গার আরাধনায় মেতে ওঠে তখন ভারতের অন্যপ্রান্ত মেতে ওঠে নবরাত্রি পালনে। এইবছর ইংরাজি ক্যালেন্ডার অনুযায়ী নবরাত্রি শুরু হবে , ২৯ সেপ্টেম্বর, রবিবার এবং শেষ হবে ৭ অক্টোবর, সোমবার। হিন্দু শাস্ত্র মতে, পিতৃপক্ষের অবসান ঘটিয়ে দেবীপক্ষের সূচনা অর্থাৎ মহালয়ার পরের দিন প্রতিপদ থেকে নবমী পর্যন্ত এই নয় রাত্রি ধরে মা দুর্গার নয়টি শক্তির পূজাকেই 'নবরাত্রি' বলা হয়। মা দুর্গার এই নয়টি শক্তি 'নবদুর্গা' নামে পরিচিত।
প্রত্যেকটি রূপ আলাদা আলাদা অর্থ বহন করে। সেগুলি হল--
১। শৈলপুত্রী : নবরাত্রির প্রথম রাতে পুজো হয় নবদুর্গা র প্রথম রুপ শৈলপুত্রী। শৈল মানে হল পাহাড় বা পর্বত। আর, দুর্গা হলেন হিমালয় পর্বতের কন্যা। যেহেতু, তিনি হিমালয় পর্বতের কন্যা সেহেতু, তাঁর নাম শৈলপুত্রী। এখানে দেবীর বাহন হল ষাঁড়। তাঁর এক হাতে থাকে ত্রিশূল এবং অন্যহাতে থাকে পদ্ম। 
২। ব্রহ্মচারিণী : দ্বীতিয় রাতে পুজো হয় নবদুর্গার দ্বীতিয় রুপ ব্রহ্মচারিণী। যিনি ব্রহ্মাকে স্বয়ং জ্ঞান দান করেন, ভক্তকেও ইনিই ব্রহ্মপ্রাপ্তি করান। এখানে তাঁর এক হাতে থাকে রুদ্রাক্ষের জপমালা এবং অন্যহাতে থাকে কমণ্ডলু। 
৩। চন্দ্রঘণ্টা : তৃতীয় রাতে পুজো হয় নবদুর্গার তৃতীয় রুপ চন্দ্রঘণ্টা। এখানে তাঁর মাথায় থাকে চাঁদ। দেবীদুর্গার মহিষাসুর বধের জন্য দেবরাজ ইন্দ্রের প্রদত্ত ঘণ্টা যার মধ্যে গজরাজ ঐরাবতের মহাশক্তি নিহিত ছিল, চন্দ্রের চেয়েও সুন্দরী ইনি। 
৪। কুষ্মান্ডা : নবরাত্রির চতুর্থ রাতে পুজো হয় নবদুর্গার চতুর্থ রুপ কুষ্মান্ডা। উষ্মার অর্থ তাপ । দুর্বিষহ ত্রিতাপ হল কুষ্মা, যিনি এই ত্রিতাপ নিজের উদরে বা অন্ডে ধারণ করেন। কথিত আছে, দেবী তাঁর এই রুপে মহাবিশ্বের সৃষ্টি করেছিলেন। তাই, তিনি এই পুরো মহাবিশ্বের স্রষ্টা হিসেবে পূজিত হন। 
৫। স্কন্দমাতা : পঞ্চম রাতে পুজো হয় নবদুর্গার পঞ্চম রূপ স্কন্দমাতা। কার্তিকের আর এক নাম স্কন্দ। আর দেবী হলেন দেব সেনাপতি কার্তিকেয় বা স্কন্দের মা। 
৬। কাত্যায়নী : ষষ্ঠ রাতে পুজো হয় নবদুর্গার ষষ্ঠ রূপ কাত্যায়নী। পুরাণ অনুযায়ী, কাত্যায়ন নামে এক ঋষি ছিলেন, দেবী দুর্গা তাঁর কন্যা রূপে জন্ম নেন। তাই, দুর্গার এই রূপের নাম কাত্যায়নী।
৭। কালরাত্রি : সপ্তম রাতে পুজো হয় নবদুর্গার সপ্তম রূপ কালরাত্রি। অনন্ত মহাকাশে নৃত্যরত কালভৈরবের দেহ থেকেই আবির্ভূতা ইনি দেবী যোগনিদ্রা মহাকালিকা বা কালরাত্রি নামে পরিচিত। কালরাত্রি ভীষণদর্শনা দেবী। তাঁর গায়ের রং কৃষ্ণবর্ণা। তিনি এলোকেশী। তাঁর গলায় বজ্রের মালা দোলে। তিনি ত্রিনয়না। তাঁর নিঃশ্বাস প্রশ্বাসের সঙ্গে ভয়ংকর অগ্নিশিখা নির্গত হয়। কালরাত্রির বাহন গাধা। তিনি চতুর্ভূজা; তাঁর চার হাতে বর ও অভয়মুদ্রা এবং খড়্গ ও লোহার কাঁটা রয়েছে। কালরাত্রির রূপ ভয়ংকর হলেও তিনি শুভফলের দেবী। বিশ্বাস করা হয় যে, কালরাত্রি দুষ্টের দমন করেন, গ্রহের বাধা দূর করেন এবং ভক্তদের আগুন, জল, জন্তুজানোয়ার, শত্রু ও রাত্রির ভয় থেকে মুক্ত করেন। কালরাত্রির উপাসনা করলেই দৈত্য, দানব, রাক্ষস, ভূত, প্রেত পালিয়ে যায়। 
৮। মহাগৌরী : অষ্টম রাতে পুজো হয় নবদুর্গার অষ্টম রূপ মহাগৌরী। তিনি সন্তানবত্সলা, শিবসোহাগিনী, বিদ্যুদ্বর্ণা মা দুর্গার প্রসন্ন মূর্তি। বিশ্বাস করা হয় যে, নবরাত্রির অষ্টম রাতে তাঁর পুজো করলে সব পাপ ধুয়ে যায়। মহাগৌরী সাদা রঙের পোষাকে সজ্জিত থাকেন। চার হাত বিশিষ্টা এই দেবীর বাহন ষাঁড়। 
৯। সিদ্ধিদাত্রী : নবরাত্রির শেষ তথা নবম রাতে নবদুর্গার শেষ রূপ হল সিদ্ধিদাত্রী। সিদ্ধিদাত্রী পদ্মের উপর অধিষ্ঠিত থাকেন। অপরূপ লাবণ্যময়ী চতুর্ভুজা, ত্রিনয়নী, প্রাতঃসূর্যের মত রঞ্জিতা যোগমায়া মাহেশ্বরী ইনি সকল কাজে সিদ্ধি প্রদান করেন। 
মা দুর্গার নয়টি রূপ নবরাত্রিতে প্রতিটি রাতের তাৎপর্য বহন করে। শরতকালীন এই নবরাত্রি উত্সবকে বলা হয় শারদ নবরাত্রি। মূলত, এটি শক্তির আরাধনা। নবরাত্রির পরদিন বিজয়া দশমীর সাথে সাথে এই শক্তিপূজার সমাপণ হয়।
অন্যদিকে নবরাত্রির প্রতিটি দিনের সাথে এক একটা রঙের সম্পর্ক মানা হয় ও তার পেছনে একটা করে কারণও থাকে। দিন ও রঙ অনুযায়ী মহিলারাও সেজে ওঠেন। অনেকেরই হয়ত জানা আছে এই রঙের সাথে দিন মেলানোর গল্পটা। এই নয় দিনে, দেবী দুর্গার ন'টি আলাদা রূপে পুজার্চনা হয়ে থাকে। এই এক একদিনের দেবীর রূপের সাথে মানিয়ে দেবীকে সাজানো হয়ে থাকে। তবে রঙগুলো দেখে থাকলেও আমরা অনেকেই হয়ত এই রঙের তাৎপর্য সম্পর্কে ঠিকঠাক জানিনা। তাই স্বাভাবিক ভাবেই আমাদের মনে কৌতূহল, এই রঙের মানেগুলো জানার। এখানে তাই এই নয় রূপের সাথে ন'টি রঙের তাৎপর্য বোঝানো হল বিশদে।
১. প্রথম দিন (লাল) নবরাত্রির প্রথম দিন হল প্রতিপদ। শৈলাপুত্রী বা পর্বত কন্যা বলে এই দিনে আরাধনা হয়ে থাকে ওনার। এই রূপেই মহাদেবের অর্ধাঙ্গিনী হিসেবে পুজো হয়ে থাকে। প্রতিপদের লাল রঙ হল শক্তি ও উদ্দমের পরিচায়ক। এই রঙটি হল উষ্ণতা ও শক্তির প্রতীক।
২. দ্বিতীয় দিন (গাঢ় নীল) এই দিন (দ্বিতীয়া) মা ব্রহ্মচারীর রূপ নেন। ব্রহ্মচারিণীর রূপে দেবী সুখ ও স্বাচ্ছন্দ্যের ডালি সাজিয়ে আনেন। এই দিনের রঙ হল ময়ূরকন্ঠী। নীল রঙ হল শান্তি ও পরম শক্তির প্রতীক।
৩. তৃতীয় দিন (হলুদ) উৎসবের তৃতীয় দিনে (তৃতীয়া) দেবী দুর্গা চন্দ্রঘন্টা রূপে আবির্ভূত হন। এই রূপে দেবী দুর্গার কপালে থাকে অর্ধচন্দ্র,যা কিনা অসীম সাহস ও সৌন্দর্য্যের প্রতীক। চন্দ্রঘন্টা হলেন দেবীর সেই শক্তির রূপ, যা অসুর বিনাশিনী। হলুদ হল এই দিনের রঙ, যা কিনা উজ্জ্বলতার প্রতীক ও সবার মনকে করে তোলে উদ্দীপ্ত।
৪. চতুর্থ দিন (সবুজ) চতুর্থী বা উৎসবের চতুর্থ দিনে দেবী দুর্গা নেন কুষ্মাণ্ড রূপ। এই দিনের রঙ হল সবুজ। এই পৃথিবীর সৃষ্টিকর্তা হল কুষ্মাণ্ড। মনে করা হয় যে তাঁর হাসিতেই এই পৃথিবী হয়ে উঠেছে সবুজ,শ্যামল ও সুফলা।
৫. পঞ্চম দিন (ধূসর) নবরাত্রির পঞ্চম দিনে (পঞ্চমি) দেবী দুর্গা "স্কন্দ মাতা"-র অবতারে অবতীর্ণ হন। ওঁর শক্তিশালী বাহুতে দেখা যায় শিশু কার্তিককে। এই ধূসর রঙ হল এমন এক মাতৃ রূপ, যেখানে নিজের সন্তানের কোন বিপদ বা সঙ্কটে মা ঘূর্ণিরূপে সব ধ্বংস করার ক্ষমতা রাখেন। সন্তানের সুরক্ষাই সর্বোপরি।
৬. ষষ্ঠ দিন (কমলা) ষষ্ঠীর দিন দেবী দুর্গার "কাত্যায়নী" রূপ। মনে করা হয়ে থাকে, কোনও এক কালে কাতা নামক এক অতি বিখ্যাত ঋষি ঘোর তপস্যা করেন দেবী দুর্গাকে নিজের কন্যা রূপে লাভ করার জন্য। ওনার এই প্রচেষ্টায় সন্তুষ্ট হয়ে দেবী দুর্গা তাঁর মনোকামনা পূর্ণ করেন। তিনি ঋষি কাতার কন্যারূপে জন্ম গ্রহণ করেন। পরণে ছিল কমলা রঙের বস্ত্র, যা কিনা অসীম সাহসের প্রতীক বলে মনে করা হয়।
৭. সপ্তম দিন (সাদা) সপ্তমীর দিন মা দুর্গার কালরাত্রি রূপ। দেবীর এটাই সবচেয়ে উগ্র, হিংসাত্মক রূপ মনে করা হয়। চোখে ভয়ানক আগুনের রোষ নিয়ে দেবীকে এই দিনে সাদা বসনে দেখা যায় বলে মানা হয়ে থাকে। সাদার সঙ্কেত হল আক্রোশের মাঝেও উনি শান্তি ও কল্যাণ কামনাকরী। দেবী তার ভক্তদের সবরকমের বিপদ থেকে রক্ষা করবেন।
৮. অষ্টম দিন (গোলাপী) অষ্টমী বা নবরাত্রির অষ্টম দিনের রঙ হল গোলাপী। এই দিনেই দেবী দুর্গা সব পাপের মোচন করেন বলে মনে করা হয়। গোলাপী হল আশার প্রতীক, এক নতুন শুরুর সূচক।
৯. নবম দিন (হালকা নীল) নবরাত্রির নবম দিনে, দেবী দুর্গা "সিদ্ধিদাত্রীর" রূপ ধারণ করেন। এই দিনে তাঁর আভূষণ হালকা নীল। সিদ্ধিদাত্রী রূপের আছে অতিমানবীয় আরোগ্য ক্ষমতা। আকাশী নীল যেন প্রকৃতির রূপেরও প্রতি মুগ্ধ হওয়ার প্রকাশ।

কোন মন্তব্য নেই

Blogger দ্বারা পরিচালিত.