এনআরসি নবায়নে হাজারও ভুলের কথা স্বীকার সরকারের, সময়সীমা বৃদ্ধির দাবি
অমল গুপ্ত, গুয়াহাটি : আজ বৃহস্পতিবার অসম বিধানসভায় বহুচর্চিত জাতীয় নাগরিকপঞ্জি (এনআরসি) নিয়ে সরকার ও বিরােধীদের মধ্যে তীব্র বাদানুবাদের সৃষ্টি হয়। এই ইস্যুকে কেন্দ্র করে কংগ্রেস, এআইইউডিএফ-এর সঙ্গে শাসকদলের স্পষ্ট বিভাজন তৈরি হয়। বিজেপি-র আশংকা—এনআরসি-র প্রস্তুতের ক্ষেত্রে ব্যাপক বিসংগতি ও ভুলত্রুটি রয়েছে, ১০০ শতাংশ শুদ্ধ এনআরসি তালিকা প্রকাশ পাবে না, প্রকৃত ভারতীয় নাগরিক ভূমিপুত্র খিলঞ্জিয়ার নাম বাদ পড়বে। অপরদিকে অসম-বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী অঞ্চলের লক্ষ লক্ষ বাংলাদেশীর নাম এনআরসি-তে অন্তর্ভুক্ত হবে। রাজ্য সরকারকে সম্পূর্ণ অন্ধকারে রেখে এবং সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্টকেও। প্রকৃত তথ্য না দিয়ে জাতীয় নাগরিকপঞ্জির সমন্বয়ক প্রতীক হাজেলা স্বার্থান্বেষী শক্তির ইশারা-ইঙ্গিতে অসম বিরােধী স্থিতি গ্রহণ করেছেন। হাজার ভুলে ভরা অশুদ্ধ নাগরিকপঞ্জি প্রকাশ পেলে রাজ্যে এক অস্বস্তিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে এবং আইন-শৃংখলা রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়বে। অসমের ঐক্য-সাম্প্রতিক সংহতি অখণ্ডতা বিঘ্নিত হবে। তাই রাজ্যের খিলঞ্জীয়া মানুষের স্বার্থে ৩১ আগষ্ট চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ না করে কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারের সুপ্রিম কোর্টে দাখিল করা হলফনামা মেনে সীমান্তবর্তী জেলায় ২০ শতাংশ এবং জেলাগুলিতে ১০ শতাংশ হারে রিভেরিফিকেশন করার দাবি জানালাে শাসকপক্ষ।
সুপ্রিম কোর্ট ২০১৭ সালের ৮ আগস্ট প্রয়ােজন সাপেক্ষে ১০ শতাংশ রিভেরিকেশনের সুপারিশ করেছিল। কিন্তু গত শুনানির সময় সেই সুপারিশকে গুরুত্ব না দিয়ে সমন্বয়ক প্রতীক হাজেলা জানিয়ে দেন, ইতিমধ্যে ২৭ শতাংশ অর্থাৎ প্রায় ৮০ লক্ষ মানুষের রিভেরিফিকেশন হয়ে গেছে। কখন হল এবং কবে হল—তা কিন্তু কেউ টেরই পেল না। আজ বিধানসভায় সংসদীয় পরিক্রমা মন্ত্রী চন্দ্রমােহন পাটোয়ারি সুপ্রিম কোর্টে কেন্দ্রীয় সরকার এবং রাজ্য সরকারের হলফনামা দাখিলের কথা জানিয়ে অভিযােগ করে বলেন, বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী জেলা দক্ষিণ শালমারায় ৭.২২ শতাংশ, ধুবড়িতে ৮.২৬ শতাংশ, করিমগঞ্জ জেলায় ৭.৬৭ শতাংশ মানুষের নাম এনআরসি থেকে বাদ পড়েছে। অথচ উপজাতী অধ্যুষিত জেলা কাৰ্বি আংলং জেলায় ১৪.৩১ শতাংশ, উজানের তিনসুকিয়া জেলায় ১৩.২৫ শতাংশ খিলঞ্জীয়া মানুষের নাম বাদ পড়েছে। এই বিসংগতির কথা সুপ্রিম কোর্টকে জানিয়ে সীমান্তবর্তী জেলাগুলিতে ২০ শতাংশ এবং জেলাসমূহে ১০ শতাংশ রিভেরিফিকেশনের দাবি জানানাে হয়। অথচ সমন্বয়ক প্রতীক
জেলা তার বিরােধিতা করে জানিয়ে দেন—কোনও প্রয়ােজন নেই। ইতিমধ্যে ২৭ শতাংশ রিভেরিফিকেশন করে দেওয়া হয়েছে। মন্ত্রী অভিযােগ করেন, সীমান্ত জেলাগুলিতে ব্যাপক হারে লিগ্যাসি ডাটা অপব্যবহার করা হয়েছে। অসম সরকার এক শুদ্ধ জাতীয় নাগরিকপঞ্জি প্রস্তুত করার লক্ষ্য নিয়ে রাজ্য সরকার ১২০০ কোটি টাকা ব্যয় করেছে। ৫৫ হাজার সরকারি কর্মচারীকে কাজে লাগিয়ে এই কাজ সুষ্ঠুভাবে করার জন্য মুখ্যমন্ত্রী সর্বানন্দ সােনােয়াল সর্বতােভাবে সহায়তা করছেন। কিন্তু বিভিন্ন অভিযােগে প্রমাণিত হচ্ছে শুদ্ধ ও নিরপেক্ষভাবে কাজ হচ্ছে না। প্রতীক হাজেলা নিজের মর্জি মাফিক কাজ করছেন। প্রথম তালিকা থেকে ৪০ লক্ষ ৭ হাজার মানুষের নাম বাদ পড়েছে। দেখা গেছে, প্রকৃত ভূমিপুত্র বহু ভারতীয়র নাম বাদ পড়েছে। প্রতীক হাজেলা রাজ্য সরকারের সঙ্গে কোনও সহযােগিতা করছেন না বলেও তিনি অভিযােগ করেন। বহু বছরের অসম আন্দোলনের ফসল এই জাতীয় নাগরিকপঞ্জি থেকে যাতে একজনও প্রকৃত ভারতীয়র নাম বাদ না পড়ে, বিদেশিদের নাম যাতে অন্তর্ভুক্ত না হয় এবং ১০০ শতাংশ শুদ্ধ হয়, কাউকে যেন আত্মহত্যা করতে না হয় সেইদিকে লক্ষ্য রেখে রাজ্য সরকার চাইছে তালিকা প্রকাশের সময়সীমা বৃদ্ধি হােক এবং সরকারের আর্জি অনুযায়ী রিভেরিফিকেশন হােক।
আজ বিধানসভায় জিরাে আওয়ারে বিজেপি-র দেবানন্দ হাজরিকা, শিলাদিত্য দেব-সহ আরও কয়েকজন বিধায়ক এনআরসি বিষয়টি নিয়ে আলােচনার দাবিতে নােটিশ দিয়েছিলেন। অধ্যক্ষ হিতেন্দ্রনাথ গােস্বামী সবাইকে সতর্ক করে বলেন, বিষয়টি অত্যন্ত স্পর্শকাতর। সুপ্রিম কোর্টে বিচারাধীন এমন কিছু বলা হয় যাতে বিধানসভার মর্যাদা হানি হয়। দেবানন্দ হাজরিকা দাবি করেন, ট্রাইবুনালে ডি-ভােটারের অপবাদ থেকে মুক্তি পেয়েও তার নাম এনআরসি-তে তােলা হয়নি। প্রথমে জমির দলিল, রেশন কার্ড জন্মপত্র প্রভৃতি জরুরি নথিপত্র দাখিল করা সত্বেও তা গ্রাহ্য করা হয়নি। হাজার হাজার প্রকৃত ভারতীয়দের নাম কেটে বাদ দেওয়া হয়েছে। ড. নুমল মােমিন তাদের কাৰ্বি আংলঙে উপজাতি গােষ্ঠির ১৮ শতাংশের নাম বাদ পড়েছে বলে দাবি করেন। রমাকান্ত দেউরির মতাে বিধায়কের নাম নেই। মরিগাওঁ ও নগাওঁ জেলায় সন্দেহজনক নাগরিকরা এনআরসি প্রস্তুতির কাজ করছে।
শিলাদিত্য দেব সরাসরি অভিযােগ করেন, মাত্র একজনের হাতে পুরাে ক্ষমতা রয়েছে— যিনি প্রধানমন্ত্রী, মুখ্যমন্ত্রী ও কেন্দ্রীয় সরকারকেও পাত্তা দিচ্ছে না। ওয়ান ম্যান শাে-এর উপর ভিত্তি করে হাজার লক্ষে ভুলে ভরা এনআরসি প্রস্তুত হচ্ছে তিনি প্রতীক হাজেলার বিরুদ্ধে অভিযােগ করেছেন। তিনি বলেন, প্রথমে পনেরােটি নথি দাখিল করে এনআরসিতে নাম অন্তর্ভুক্তের সুযােগ দেওয়া হয়েছিল। পরে তা থেকে পাঁচটি নথি কেটে বাদ দেওয়া হল। এআইইউডিএফ-এর আমিনুল ইসলাম, কংগ্রেসের রকিবুল হােসেন, ওয়াজেদ আলি চৌধুরী, রূপজ্যোতি কুমি, দেবব্রত শইকিয়া প্রমুখদের অভিযােগ, শাসকদল বিজেপি এনআরসি তালিকা প্রকাশে বাধা দিচ্ছে। ওয়াজেদ আলি চৌধুরি প্রশ্ন তােলেন, বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী এলাকাগুলিতে বসবাসকারী সবাই কি বাংলাদেশি ? একথা বলে সরকার প্রকৃত ভারতীয় নাগরিকদের অপমান করছে তথা সীমান্তবাসীদের প্রতি অনাস্থা প্রকাশ করছে। প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী তরুণ গগৈ বিধানসভা চত্বরের নিজ কার্যালয়ে অভিযােগ করে বলেন, শেষ পর্যন্ত এনআরসি এক বাজে কাগজে পরিণত হবে। অগপ, বিজেপি চাইছে না এনআরসি হােক। নাগরিকত্ব সংশােধনী বিল পাশ হয়ে গেলে এনআরসি-র কোনও মূল্য থাকবে না। প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী প্রফুল্ল কুমার মহন্ত এক শুদ্ধ এনআরসি প্রস্তুতের উপর জোর দিয়ে বলেন, সাহিত্যিক তথা বুদ্ধিজীবী আব্দুল মালিকের নামও এনআরসি তালিকা থেকেও বাদ পড়েছিল। কেন্দ্রীয় সরকার সারাদেশে এনআরসি প্রস্তুত করতে চাইছে। রবিরাম নার্জারি, নুরুল হুদা প্রমুখ আশংকা ব্যক্ত করে বলেন, শুদ্ধ জাতীয় নাগরিকপঞ্জি প্রস্তুত হচ্ছে না। ডিটেনশন ক্যাম্পে মানুষ মারা যাচ্ছে। তারা বাধ্য হয়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছে। অধ্যক্ষ হিতেন্দ্রনাথ গােস্বামী বলেন, ডিটেনশন ক্যাম্পগুলিতে মানবাধিকার যাতে লংঘিত না হয় তা সুনিশ্চিত করতে হবে।











কোন মন্তব্য নেই