প্রশান্ত কিশোর ও তৃণমূল কংগ্রেস
বিশ্বদেব চট্টোপাধ্যায়: কারুর ভাল লাগুক বা না লাগুক-এটাই এখন পশ্চিমবঙ্গে রীতিমতো জোরালো চর্চার বিষয়। কেন না তৃণমূল কংগ্রেসের পালে যে কিশোর হাওয়া ভালরকমই এসে লাগছে তা বুঝতে কারুর অসুবিধে হচ্ছে না। আজকের বিধায়কদের নিয়ে সুপ্রিমোর বৈঠকও প্রশান্ত হাওয়া টের পাওয়া গেল ভালরকমই। বৈঠকে নেত্রী পাঁচ/ছয়টি পরিকল্পনা সহ যেসব নির্দেশ জারি করলেন তা তৃণমূলের কস্মিনকালের ইতিহাসেও শোনা যায় নি। তিনি বলেছেন বিধায়কদের সাত দিনই নিজের নিজের কেন্দ্রে থাকতে হবে--দলীয় নির্দেশ ছাড়া হুটহাট করে কলকাতায় আসা যাবে না। কেন্দ্রের বাইরে (বিদেশ গেলে অবশ্যই) গেলে দলকে জানিয়ে দলের অনুমতি নিয়ে যেতে হবে। বিধায়করা আলটপকা মন্তব্য আর করবেন না-এতে দলের ভাবমূর্তি নষ্ট হয়। বিধায়ক জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক, রবীন্দ্রনাথ ঘোষ, সাংসদ অভিষেক ব্যানার্জ্জী, কল্যাণ ব্যানার্জ্জী, গৌতম দেব, সৌরভ চক্রবর্তী এবং বিশেষ করে অনুব্রত মণ্ডল, আরাবুল ইসলাম প্রমুখ তাঁর এই নির্দেশের লক্ষ্য ছিলেন কিনা সেটা অবশ্য স্পষ্ট হয় নি। নেত্রী আরও দুটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশ জারি করেছেন যা একেবারেই অপ্রত্যাশিত বলে অনেকের কাছেই মনে হয়েছে। পুলিশের সংশ্রব কাটাতে হবে এবং সাংবাদিকদের এড়িয়ে চলতে হবে।
পুলিশের সংশ্রব এড়িয়ে বা তাদের জোরে রাজনীতি করার অভ্যাস কাটিয়ে ওঠা আদৌ যাবে কিনা সেটা অন্য প্রশ্ন। সাংবাদিকদের এড়িয়ে যাওয়ার বিষয়টাও মেনে চলা শুধু কঠিন-ই নয় প্রায় অসম্ভবই বলা যেতে পারে। কারণ, বাথরুমের দরজা পর্যন্ত সাংবাদিকদের নিয়ে ঘোরাফেরা করাটা এমনই এক অভ্যাসে পরিণত হয়ে গেছে যার সঙ্গে একমাত্র তুলনা করা যেতে পারে মাদকাসক্তির সঙ্গেই-যা কাটিয়ে ওঠার জন্যে সর্বাগ্রে জোরালো চিকিৎসার প্রয়োজন যার দিশা এখনও পাওয়া যায়নি। সাংবাদিক এবং পুলিশ রাজনীতিকদের ফুসফুস এবং হৃদযন্ত্র। দুটোর একটাকেও বাদ দেওয়া বাস্তবে কতদূর সম্ভব সেটাই এখন দেখার।
দলবদলের হিড়িকের মুহূর্তে নেত্রী খুব জোরের সঙ্গে দলীয় নেতাদের নির্দেশ দিয়েছিলেন-যারা দল ছেড়ে চলে গেছে কোনমতেই যেন তাদের আর দলে ঢোকানো না হয়। কিন্তু আজকাল দু’দিন ধরে দেখা যাচ্ছে-পুর ও নগরোন্নয়নমন্ত্রী ফিরহাদ হাকিম এবং খাদ্যমন্ত্রী জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক সাড়ম্বরে সাংবাদিকদের সামনে দলত্যাগীদের ফের ফিরিয়ে নিচ্ছেন বিজয়ীর ভঙ্গিতে। সিদ্ধান্তের এই অস্থিরতায় প্রশান্ত কিশোরের অনুমোদন যদি থাকে তাহলে বলতে বাধা নেই-এতে ফলাফল হিতে বিপরীত হওয়ার সম্ভাবনাই বাড়ছে। কারণ, দলত্যাগীরা যে কোন কারণেই হোক ফিরে এসে যে ফের দলত্যাগ করবে না এমন কোন নিশ্চয়তা তারা নিজেরাই দিতে সক্ষম নয়।
বৈঠকে কিছু নেতাকে খুশি করতে সকলের সামনে কোন পূর্ণমন্ত্রী তথা দীর্ঘ ২২ বছরের জেলা সভাপতিকে ভর্ৎসনা করার রাজনীতিতেও প্রশান্ত কিশোরের অনুমোদন যদি কাজ করে থাকে তাহলেও বলতেই হচ্ছে সংশ্লিষ্ট জেলার রাজনীতি সম্পর্কে প্রশান্ত কিশোর এখনও হোমওয়ার্ক করে ওঠার সময় পান নি। জালে জড়িয়ে নেওয়া বাঘের শরীরে লাঠি চালানো খুব সোজা-এখন পরিস্থিতির ফেরে কেউ কেউ জালে জড়িয়ে গেলেও তার ওপর দীর্ঘ নির্ভরতার ইতিহাস ভোলার প্রয়াস আদতে লাভদায়ক হবে বলে ভাবাটা বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে।
বৈঠকের শেষ চমৎকার সিদ্ধান্তটি নিঃসন্দেহে তৃণমূল কংগ্রেসের কর্পোরেট কালচারে বিকশিত হয়ে ওঠার অভিনব প্রয়াস-যা ১০০% প্রশান্ত কিশোরের মস্তিষ্কপ্রসূত। নেত্রী নির্দেশ দিয়েছেন প্রত্যেক বিধায়ক এমন চার জনের নামের তালিকা কালীঘাটে পাঠাবেন যাদের দু’জন বুথস্তরের রাজনৈতিক কাজকর্মে সক্রিয় থেকে সবিস্তারে দলকে রিপোর্ট পাঠাবেন-একজন সামাজিক মাধ্যমে কাজ করবেন-চতুর্থজন বিধায়কের কেন্দ্রের সামগ্রিক কাজকর্মের বিষয়ে খবরাখবর দেবেন।
কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল-এই চারজনের নামের তালিকা পাঠাবেন বিধায়ক নিজে। স্বভাবতঃই তিনি এমন চারজনের নামই পাঠাবেন যারা বিধায়কের অনুগত এবং বিশ্বস্ত। বিধায়কের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করা বা রাখাই হবে তাদের কাজ এবং তারা তৃণমূলী কালচারের বাইরের কেউ হবেন না। সাধারণতঃ যেসব স্পুন নেতাদের স্পাইন্যাল কর্ড হিসেবে কাজ করে বিধায়করা তাদের মধ্য থেকেই চারজনকে ঠিক করে নাম পাঠাবেন--তাতে কতদূর কি হবে সেটা সময়ই বলবে। তবে যাকে সামাজিক মাধ্যমে ব্যবহার করা হবে তার নাম খুঁজে পাওয়া বেশ কঠিন হবে বিধায়কদের পক্ষে--কেন না সিংহভাগ বিধায়কই সামাজিক মাধ্যমে খুব একটা সচল নন--তার চেয়েও বড় কথা সামাজিক মাধ্যম যে কত কঠিন ঠাঁই এবং প্রয়োজনীয় শিক্ষাদীক্ষা ছাড়া যে এখানে মানুষের মন পাওয়া যায় না-সে সম্পর্কেও বিশেষ স্পষ্ট ধারণা নেই। সামাজিক মাধ্যমে প্রচুর তৃণমূল সমর্থক সক্রিয় থাকলেও হাতে গোণা দু’চার জনের পোস্ট বা লেখালেখি ভদ্র শিক্ষিত রাজনীতি সচেতন মানুষের পাতে দেওয়ার যোগ্য। বলতে দ্বিধা নেই--এদের সিংহভাগই দলের উপকার করতে গিয়ে দলকে মারাত্মকভাবেই বিড়ম্বিত করে তোলে-যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ে ইভিএমে।
যাইহোক, অস্তিত্বের সঙ্কটের মুখে দাঁড়িয়ে নেত্রী যেসব সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন তার সবগুলো না হলেও কিছু কিছু সিদ্ধান্ত যদি কঠোরভাবে বাস্তবায়িত করার প্রশ্নে কোনরকম আপোষ না করেন তাহলে দলের পক্ষে অনেকটাই মাটি ফিরে পাওয়া সম্ভব হতে পারে। একই সঙ্গে প্রশান্ত কিশোরের যাবতীয় স্ট্র্যাটেজির ওপর নির্ভর করার আগে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক সংস্কৃতির কথাটা মাথায় রেখে নির্ভর করা উচিত হবে।
(পাঠকের নিজস্ব মতামত)









কোন মন্তব্য নেই