এ রাজ্যে একের পর এক ভুল করে পিছিয়ে চলেছে বিজেপি !!
লিখেছেন বরিষ্ঠ সাংবাদিক বিশ্বদেব চট্টোপাধ্যায়
(২)
বিজেপি’র প্রথম ভুল মুকুল রায়ের মতো একজন ধুরন্ধর রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে শুধুমাত্র তৃণমূলকে ভাঙ্গার কাজে লাগিয়ে রাখা। আজ পর্যন্ত তাকে এমন কোন গুরুত্বপূর্ণ পদ বা প্রশাসনিক ক্ষমতা দেওয়া হয় নি যার সুযোগ নিয়ে মুকুলবাবু বিজেপিকে এই রাজ্যে আরও শক্তিশালী করতে পারেন। তৃণমূলকে ভেতর থেকে কিভাবে কতটা দুর্বল করা সম্ভব সেটা মুকুল রায় ছাড়া বিজেপি’র আর কোন নেতা জানেন না। কারণ, প্রতিপক্ষকে ভেঙেচুরে নিজে শক্তিশালী হয়ে ওঠার রাজনীতিটা মুকুলবাবু খুব ভাল করেই জানেন এবং বোঝেন। কিন্তু এই রাজনীতিতেও তাকে পদে পদে বাধা দেওয়ার ভুলটা বিজেপি করে চলেছে। মুকুল রায় বিজেপিতে আসার আগে দলের যে চেহারা রাজ্যের মানুষ দেখেছে--মুকুল রায় আসার পরের চেহারার সঙ্গে তার পার্থক্যটা স্পষ্ট হতে বেশি সময় লাগে নি। বিজেপি’র রাজ্য নেতাদের সাংগঠনিক ক্ষমতা ও ভোটরাজনীতিতে প্রয়োজনীয় দক্ষতার বহর মানুষ দীর্ঘকাল ধরে দেখে আসছে। একটা শক্তিশালী প্রতিপক্ষকে পেছনে ফেলে এগিয়ে যেতে হলে দীর্ঘকাল ধরে যাদের অকর্মণ্যতা ও ব্যর্থতা দলকে স্থবির করে রেখেছে তাদের ওপর সম্পূর্ণ ভরসা রাখলে উল্লেখযোগ্য সাফল্য করায়ত্ত হতে পারে না। নির্ভরযোগ্য নেতা-কর্মীর সংখ্যা বাড়াতে হয় এবং এই বৃদ্ধি তখনই সম্ভব যখন অন্য দল থেকে--বিশেষ করে প্রধান প্রতিপক্ষ দলের পক্ষ থেকে গুরুত্বপূর্ণ নেতা-কর্মীরা দলে আসবে। মুকুলবাবুর সৌজন্যে তেমন নেতা-কর্মী দলে আসছেনও--কিন্তু এখানে প্রকট হচ্ছে নতুন-পুরনোর লড়াই। পুরনোরা কত বাঘ মেরেছেন সেটা কারুরই অজানা নয়--কিন্তু সেন্টিমেন্টাল ক্ষোভ সরিয়ে রেখে দলের স্বার্থে পুরনোদের সেন্টিমেন্টকে আহত না করেও নতুন-পুরনোর মধ্যে সমন্বয় সাধনে চূড়ান্তভাবে ব্যর্থ হচ্ছে রাজ্য বিজেপি।
ছবি, সৌঃ ফেসবুক
একদিকে যেমন একেবারেই বাছবিচার না করে নিচু তলায় যাকে তাকে দলে নিয়ে নেওয়ার যে ভুল তৃণমূল করেছিল সেই একই ভুল বিজেপি করছে--পাশাপাশি যাদের দলে দরকার তাদের দলে নিয়েও তাদের উপযুক্ত রাজনৈতিক মর্য্যাদা না দেওয়ার ভুলও করে চলেছে। ফলে অনেকেই অপমানিত হবে--ছেড়ে আসার আগের গুরুত্ব দলে পাবে না জেনেও বিজেপিতে দু’চার রাত কাটিয়ে ফিরে যাচ্ছে। এ ভুলটা রাজ্যনেতাদের একাংশ ইচ্ছাকৃতভাবেই করছেন--নিজেদের ওজন হারানোর আশঙ্কায়।
তৃণমূলের কিছু হামবাগ্ নেতা আছে যাদের প্রগলভতা মাঝে মধ্যেই শালীনতার সীমা ছাড়িয়ে যায়--এই অসংস্কৃত বদঅভ্যাসের কারণে তারা হামেশাই এমন নিম্ন স্তরের নিম্ন মেধার আলটপকা মন্তব্য করে বসেন যা রীতিমতো মানুষকে বিরক্ত ও বীতশ্রদ্ধ করে তোলে। তাদের এই মারাত্মক নির্বিবেক প্রবণতাকে নিছকই ছেলেমানুষী দুষ্টুমি হিসেবে চিহ্নিত করার ভুল যে কী ভয়ানক নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে দলের ভাবমূর্তিতে সেটা প্রবল ধাক্কা খাওয়ার পর নেত্রী উপলব্ধি করছেন। বিজেপিতেও এমন কিছু নেতা আছেন যারা কিছু কম তো নয়-ই বরং দু’এক কদম এগিয়ে রয়েছেন। বিজেপি কিন্তু তাদের মুখেও লাগাম না টানার ভুল করে চলেছে।
বিজেপি’র একটা মারাত্মক ভুল এ রাজ্যে দলের দৃঢ় স্থায়ীত্ব রক্ষার বিরুদ্ধে ইতিমধ্যেই কাজ শুরু করে দিয়েছে। বিজেপি’র কেন্দ্রীয় নেতারা যদি পশ্চিমবঙ্গকে রাজস্থান-মধ্যপ্রদেশ-ছত্তিশগড়-ঝাড়খণ্ড-গুজরাট-উত্তরপ্রদেশের মতোই একটা রাজ্য ভাবেন তাহলে তাদের কোন দোষ দেবে না রাজ্যের মানুষ। কিন্তু রাজ্যনেতারা যদি কেন্দ্রীয় নেতাদের মতোই পশ্চিমবঙ্গকে গো-বলয়ের আর পাঁচটা রাজ্যের মতো একইরকম ভাবতে থাকেন তাহলে তারা মারাত্মক ভুল করবেন--সত্যি বলতে কি তারা সেই ভুলটাই করছেন। পশ্চিমবঙ্গের একটা মানুষের রাজনৈতিক ভাবনার সঙ্গে গো-বলয়ের কোন রাজ্যেরই অন্য একটি মানুষের ভাবনার মধ্যে কোন সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়া যাবে না। কিন্তু বিজেপি’র নেতারা যদি পশ্চিমবঙ্গের মানুষকেও গো-বলয়ের চিন্তা-ভাবনার সঙ্গে জবরদস্তি মিলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন তাহলে সেই ভুলের সংশোধনের সুযোগ তারা চিরতরে হারাবেন। এটা বিশেষ করেই মাথায় রাখতে হবে।
আর একটা মারাত্মক ভুল (ভুল-ই বলছি, যদিও ইচ্ছাকৃতই বলা ভাল) বিজেপি করেছে--এ রাজ্য থেকে ১৮ আসনে অবিশ্বাস্য জয় পেয়েও কেন্দ্রে মন্ত্রীত্ব বন্টনের প্রশ্নে। রাজস্থান-ঝাড়খণ্ড-ছত্তিশগড়-গুজরাট ইত্যাদি রাজ্যের তুলনায় সংসদ সদস্য সংখ্যার বিচারে পশ্চিমবঙ্গ বড় রাজ্য। সেই রাজ্য থেকে একজনকেও পূর্ণমন্ত্রী করা হল না প্রথম দিনেই। মাত্র দু’জন প্রতিমন্ত্রী দিয়ে রাজ্যকে চরম হতাশার মধ্যে ঠেলে দেওয়া হল। পরে কি হবে তা নিয়ে মানুষ খুব ভাবে না--প্রথম সুযোগেই কেন পশ্চিমবঙ্গকে বঞ্চিত করা হল--এ প্রশ্ন চাপা দেওয়া যায় নি। কম করেও দু’জন পূর্ণমন্ত্রী এবং তিনজনকে প্রতিমন্ত্রী না করার ভূলের মাশুল কিন্তু বিজেপিকে গুণতে হবে। জনা পাঁচেক কেন্দ্রীয় মন্ত্রীসহ ১৮ সাংসদকে মাঠে নামিয়ে সুচিন্তিত রাজনীতি যদি করতে পারে বিজেপি তাহলেই ২০২১ সালে তারা ক্ষমতাসীন হওয়ার স্বপ্ন দেখতে পারে--অন্যথায় স্বপ্ন না দেখাই ভাল। কিন্তু মন্ত্রীত্ব বন্টনের ক্ষেত্রেও সমস্যা দেখা দিয়েছিল কোন্ লবির কাকে মন্ত্রী করা হবে এই প্রশ্নে। মুকুলের মনোনীত প্রার্থীদের বাদ দিয়ে আনকোরা সবাইকে মন্ত্রী করা সম্ভব হচ্ছে না--অথচ বিজেপি’র পুরনো-নতুন লড়াই ছাড়াও আরএসএসের অনুমোদনও বড় বাধা হয়ে দাঁড়ানোর ফলেই কি রাজ্যকে শপথ গ্রহণের প্রথম দিনেই এইভাবে উপেক্ষা করা হল? রাজ্যের মানুষ বোঝার চেষ্টা করছে।
জেলায় জেলায় নতুন-পুরনো সমন্বয়ে সংগঠন তৈরিতে ঝাঁপিয়ে না পড়ে নিচু তলায় যে রাজনীতি বিজেপি শুরু করেছে তার সঙ্গে তৃণমূলের রাজনীতির খুব পার্থক্য দেখা যাচ্ছে না। আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগ বহু ক্ষেত্রেই উঠছে। কাটমানিরও কাটমানি নেওয়ার অভিযোগ উঠছে নিচুতলার কর্মীদের বিরুদ্ধে। রীতিমতো একটা হযবরল পরিস্থিতি। এই পরিস্থিতি থেকে দলকে কারা কিভাবে বের করে আনতে পারবে সেটাই এখন দেখার !
মতামত লেখকের নিজস্ব









কোন মন্তব্য নেই