এ রাজ্যে একের পর এক ভুল করে পিছিয়ে চলেছে বিজেপি !!
লিখেছেন বরিষ্ঠ সাংবাদিক বিশ্বদেব চট্টোপাধ্যায়
(১)
নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বে গোটা দেশেই বিজেপি খুব দ্রুত নিজেদের অপ্রতিরোধ্য সর্বভারতীয় রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে ফেললো কি করে বিজেপি-বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো এ প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করে নি। ফলে বিজেপি’র বিপুল শক্তিতে ফিরে আসার কারণ হিসেবে অত্যন্ত ক্লিশে ও পচাগলা ইভিএম চক্রান্তকেই অজুহাত হিসেবে আঁকড়ে ধরে নিজেদের পরাজয়ের গ্লানিতে অন্ধকার হয়ে যাওয়া মুখগুলো ঢাকার চেষ্টা করে চলেছে।
ছবি, সৌঃ ফেসবুক
মোদী যে এক গভীর পর্যবেক্ষণ ও গবেষণার যোগ্য চরিত্র এটা কেউ বোঝার বিন্দুমাত্র চেষ্টা করে নি। গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন তারই দলের সর্বোচ্চ নেতাকে রাজধর্ম পালনের চেতাবনি দিতে হয়েছিল মোদীকে--দাঙ্গার কলঙ্ক মাথায় নিয়েই মোদী দিল্লিতে উড়ে এসে কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন সরকারকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ জানিয়ে বসলেন। বিজেপি’র অন্দরমহলেও ঝড় উঠেছিল--কিন্তু মোদীকে ঠেকানো যায় নি। ইউপিএ সরকারের ইভিএম-নির্বাচন কমিশন-প্রশাসন-সেনাবাহিনীর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে মোদী অবিশ্বাস্য জয় ছিনিয়ে নিয়ে দেশের প্রধানমন্ত্রীর চেয়ার দখল করার পরেও বিরোধী নেতা-নেত্রীরা মোদীকে নিয়ে গবেষণা করেন নি। ২০১৯-এর নির্বাচনের আগে যেসব নেতা দেওয়ালে ফুটে ওঠা নিজেদের সর্বনাশের সঙ্কেত কিছুটা হলেও দেখতে পেয়েছিলেন তাদের মধ্যে অন্যতম প্রধান চন্দ্রবাবু নায়াডু অন্ধ্র থেকে পশ্চিমবঙ্গ সহ বিভিন্ন রাজ্যে পাগলের মতো ছুটে বেড়িয়েছিলেন। আঞ্চলিক দলগুলিও মমতাকে সামনে রাখার নাটক করে একজোট হওয়ার যে চেষ্টা করছিল তার মধ্যে মোদীর বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে থাকার মতো না ছিল দৃঢ়তা না ছিল ঐকান্তিক লড়াইয়ের মানসিকতা। নির্বাচনে বিধ্বস্ত হতে চলেছেন বুঝেই সমস্বরে ইভিএম চক্রান্তের গান গাওয়া শুরু করে দিয়েছিলেন। অথচ ক্ষমতার বাইরে থেকেই ইভিএম ভোটে মোদী ক্ষমতাসীন হয়েছেন--তাঁরই শাসনে ২০১৬ সালে তৃণমূল কংগ্রেস বিপুল জয় পেয়েছে--রাজস্থান-মধ্যপ্রদেশ-ছত্তিশগড়-কর্নাটক মোদীর হাতছাড়া হয়েছে। ফলে ইভিএম নয়--ঠিক কি কি কারণে মোদী বিপুলভাবে জিতে এলেন--পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল অস্তিত্বের সঙ্কটে পড়ে গেল--অন্ধ্র থেকে চন্দ্রবাবুকে চন্দ্রালোকে বসতি গড়ার কথা ভাবতে হল--রাজস্থান-মধ্যপ্রদেশ-ছত্তিশগড়-গুজরাটের হাওয়া ঘুরে গেল--তা নিয়ে এখনও বিচার-বিশ্লেষণ বলতে গেলে শুরুই হল না।
ব্যক্তিগতভাবে আমি বিজেপি’র নেতা-কর্মী নই। কংগ্রেস-সিপিএমও নই--এবং বিশেষ করে তৃণমূল কংগ্রেসের নেতা-কর্মীও নই। ২০১৩ পর্যন্ত এই দলটার পাশে আমি ছিলাম--কোন প্রত্যাশা নিয়ে নয়--কারুর বৈঠকখানায় বা অফিসেও আমি হত্যে দিয়ে পড়ে থাকি নি। নেতা-নেত্রীদের পালিশ করা মুখের হাসি দেখে ধন্য হওয়ার মানসিকতাও আমার কোনকালে ছিল না। তাই আমি যখন বলেছিলাম মোদী কম করেও ৩৩৫ আসন পেয়ে ক্ষমতায় ফিরছেন--পশ্চিম বঙ্গে ১২-১৫ আসন বিজেপি পেতে চলেছে--তখন আমার দিকে আস্তিন গুটিয়ে তেড়ে আসেন নি এমন কেউ ছিলেন না। আমার বিচার বিশ্লেষণের মধ্যে মেরিট এবং জোরালো যুক্তি যদি না থাকত তাহলে আমি যা বলেছিলাম তা ঘটত না। গুজরাত দাঙ্গার সময় থেকে মোদীকে আমি গভীর পর্যবেক্ষণ ও গবেষণার যোগ্য একটি বিশেষ চরিত্র হিসেবে দেখে আসছি বলেই আমি যা দেখতে পাচ্ছিলাম তা তাবড় দাপুটে নেতা-নেত্রীরা দেখতে পান নি--দেখার কথা ভাবেনও নি। ফলে তৃণমূল কংগ্রেস এখন স্রেফ দক্ষিণবঙ্গের দল হিসেবেই চিহ্নিত হয়ে গেল। তুলনায় বিজেপি উত্তরে তো বটেই দক্ষিণবঙ্গেও তাদের অবস্থান শক্তপোক্ত করে নিতে পারল। এখন কোচবিহারের রবি ঘোষকে সকলের সামনে যাচ্ছেতাই ভাবে অপমান করলেই কি গোটা উত্তরবঙ্গে তৃণমূলের শূন্যস্থানে নেমে যাওয়ার ব্যর্থতাকে ঢাকা যাবে? কোচবিহারকে রবি একাই শেষ করে দিয়েছে? এই সিদ্ধান্তের পেছনে বিন্দুমাত্র বিচার বিশ্লেষণের ছাপ নেই--ব্যক্তিগত আক্রোশের একপেশে অভিযোগের ওপর দাঁড়িয়ে প্রকাশ্যে একজন মন্ত্রী তথা দলের প্রচণ্ড দুঃসময়ের কাল থেকে দীর্ঘ ২২ বছর সভাপতিত্বের দায়িত্ব পালন করে আসা এক নেতাকে যে ভাবে ভর্ৎসনা করা হচ্ছে তাতে দলের অসহায় দেউলিয়াপনাই প্রকট হচ্ছে এবং জেলা রাজনীতির বিরোধী শিবিরে হাতিয়ার তুলে দেওয়া হচ্ছে মাত্র। এরকম বিচার বিশ্লেষণহীন সিদ্ধান্ত উত্তরবঙ্গের জেলায় জেলায় গৃহীত হচ্ছে। এর সুফল বিজেপি নিশ্চিতভাবেই দু’হাতে কুড়িয়ে নেবে।
আমি আমার পরিচিত বেশ কিছু সাংগঠনিক নেতা-কর্মীর কাছ থেকে শুনেছি--অঞ্চল থেকে জেলাস্তরের হাজার হাজার দলীয় কর্মসূচী পালনের জন্যে রাজ্যসভাপতির সই করা দশ টাকার চেক-ও কারুর কাছে কখনো আসে নি। অথচ সংগঠন চালাতে এবং অসংখ্য কর্মসূচী পালনের জন্যে লক্ষ লক্ষ টাকার প্রয়োজন হয়েছে--আট বছরের হিসেব ধরলে তার পরিমাণ যে কত কোটি হবে তা সঠিকভাবে কেউ বলতে পারবে না। কোথা থেকে এসেছে এত টাকা--শুধু এখানেই নয়--বিপুল টাকা সংগ্রহের চাপে সর্বদাই জেলা নেতাদের থরহরিকম্প অবস্থায় কাটাতে হয়--সেই টাকার ব্যবস্থা যুধিষ্ঠিরের নীতিতে করা সম্ভব? সবাই সব কিছু জানে--না জানলেও অচিরেই জানতে হবে--তবু একমাত্র আসামী রবি ঘোষ? ব্যুমেরাং হবে না তো এই বিচারবোধ?
অযাচিতভাবেই প্রচুর অস্ত্র হাতে এসে যাচ্ছে বিজেপি’র। রাজ্যে দুই থেকে একলাফে ১৮-তে পৌঁছে যাওয়ার যাদুছড়ি কিন্তু একেবারেই বিজেপি’র হাতে ছিল না। বাম-কংগ্রেসকে গিলে খেতে খেতে বিরোধী রাজনৈতিক মূল স্রোতটাকেই পুরোপুরি শুকিয়ে ফেলার পাশাপাশি অযৌক্তিক সংখ্যালঘু তোষণের মাধ্যমে ধর্মীয় একটা আত্মঘাতী বিভাজনের রাজনীতিতে মানুষ বীতশ্রদ্ধ হয়েই ভীষণভাবে বিকল্পের সন্ধানে মরিয়া হয়ে উঠেছিল--ঠিক যেমনটা দেখা গিয়েছিল বাম শাসনের শেষপর্বে। কি হবে পরে দেখা যাবে--এখন তো পরিবর্তন হোক--এই মানসিকতাতেই মানুষ বিকল্প হিসেবে তৃণমূলকে ক্ষমতায় বসিয়েছিল। মাত্র আট বছরের মধ্যে রাজ্যের মানুষকে ফের আর একবার পরিবর্তনের কথা ভাবতে বাধ্য করল তৃণমূল কংগ্রেস-ই। যথার্থ নেতার অভাব--সংগঠনের অভাবসহ প্রায় অস্তিত্বহীন বিজেপি নিজেদের কেরামতিতে তৃণমূলকে এই ভয়ানক দুঃস্বপ্নের মধ্যে ঠেলে দিতে পেরেছে--এমনটা বোধবুদ্ধিসম্পন্ন কেউ-ই বিশ্বাস করছেন না। সুতরাং ১৮ টি আসন দখল করা তাদের পক্ষে যতটা সহজ হয়েছে মানুষের বিকল্প হিসেবে গণ্য হয়ে ওঠার কারণে ততটাই বা তার চেয়ে অনেক বেশি কঠিন হতে চলেছে তাদের এই বিপুল জনসমর্থনকে ধরে রাখা। ইতিমধ্যেই সন্দেহ দেখা দিচ্ছে তাদের একের পর এক ভুল করে চলার প্রবণতা দেখে।
(চলবে)
মতামত লেখকের নিজস্ব









কোন মন্তব্য নেই