একদিন হঠাৎ অন্য কোথাও
- সুপৰ্ণা লাহিড়ী বড়ুয়া
রোজ সকালে ঘড়ির টিক্ টিক্ টিক্। উঠতে হবে। সারাটা দিনের একটা রূটিন সেটা করা থাকে। ঠিক যেন আলাদা আলাদা বাটিতে বিভিন্ন দায়িত্বের রেসিপি সাজিয়ে দিতে হবে। এই সেট করা জীবনের বিভিন্ন টাৰ্গেট থাকে। যে টাৰ্গেটগুলো আবার পূরণ করতে পারলে এই বাজারের ভালো ক্ৰেতা হয়ে উঠতে পারা যায়। পরিবারকে একটু বেশি সুখ, আনন্দ দিতে পারা যায়। শান্তি না সই সুখ কিনে নিয়ে দিতে পারাটা কি কম কথা! যে যত ভালো ক্ৰেতা সেই তত সফল নাগরিক। অৰ্থাৎ এই টাৰ্গেটগুলো আমাদের কিছু ইচ্ছে পূরণের একটা সিড়ি বলতে পারি। দিনগুলো তাই সেট করা। গতকালের দিনটা আর আজকের দিনটা কম-বেশি একই। আবার আগামিকাল সেও তো একইভাবে সাজানো। এই যে বললাম টাৰ্গেট, আমরা বেশিরভাগ মানুষই জীবনের স্বপ্নগুলো, মুড়িয়ে মুড়িয়ে কোথাও গচ্ছিত রেখে দিই। মাঝে মাঝে শুধু ডাউন মেমরিলেনের সঙ্গে একটা দীৰ্ঘশ্বাসকে সাক্ষী করে ভাবতে বসি, যে ভাবনাটা আমাদের চারপাশের বাতাসকে ভারি করে তোলে। যেখান থেকে অক্সিজেন পাওয়া যায় না। না যায় না। এমনই সময় হঠাৎ করে কাছে কিংবা দূরে কেউ ডাকলে, নেচে ওঠে মন। বন্ধু বলে কতদিন আসনি কিংবা একবার এসো, অনেক কথা আছে। হ্যাঁ আছেই তো, হৃদয় যতদিন প্লাস্টিকের মতো হয়ে যায় না ততদিন কথা থাকে। কথার ফাঁকে ফাঁকে একটু হাসবো, ভুল-ঠিক বাক্য চয়ন করবো। কখনও চোখের কোনায় চিক্চিক্ করে উঠবে নোনতা জলের ফোঁটা। এটাই তো সম্পৰ্ক। বলবো, শুনবো, নতুন করে ভাববো, হাত ধরবো, এগিয়ে যেতে চাইবো, এই চাওয়াটাই জীবনবোধ। তাই নয় কী? এমনি করে হঠাৎ একদিন লোকাল ট্ৰেনে। কু-ঝিক-ঝিক। বেশি দূরে নয়। গুয়াহাটি থেকে ডিফু। দুশো তেরো কি.মি. দূরত্বের পথ। লোকাল ট্ৰেন ১২০৬৮ জন শতাব্দীতে সময় লাগে মাত্ৰ সারে তিন ঘন্টা। নয় মাৰ্চ ২০১৯। কাৰ্বি আংলং মহিলা সমিতির সোনালী জয়ন্তী অনুষ্ঠান। হৈ হৈ করে মহিলারা চারদিন ব্যাপী অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছেন। মাঝখানের একটা দিন, একটা আলোচনা চক্ৰের আয়োজন করেছে, ‘বৰ্তমান সময়ে নারীর উন্নতিকরণ’। একটা মহিলা সমিতিকে পঞ্চাশ বছর ধরে বাঁচিয়ে রাখাটা যে কি ভীষণ কষ্ট, ধৈৰ্য্য, উৎসাহ আর একনিষ্ঠতার ফল বুঝতে পারি। ভাবলেও অবাক হই। গুরুগম্ভীর আলোচনা চক্ৰে ডাকলে যাই, বক্তব্য রাখি, কিন্তু আমার গল্প করতেই বেশি ভালো লাগে। পাঁচ মেশালি গল্প। জনজাতীয় গ্ৰামগুলো, খাসি গ্ৰাম হতে পারে, কাৰ্বি, নাগা, মনিপুর গ্ৰাম, যেখানেই যাই মানুষগুলোর নিজস্ব যে সংস্কৃতি সেখানে থাকে মাটির গন্ধ। সুরগুলো ভীষণ ছন্দময়। সহজ কথা। গভীর উপলব্ধি। প্ৰেয়সী বলছে আমি নতুন চালের পিঠে বানিয়েছি, গামছা বপন করেছি, তুমি আসবে বলে, এর চেয়ে সুন্দর প্ৰেমের অভিব্যক্তি আর কী হতে পারে? কোনও ভান, চাতুরি, ছলনা নেই। গানের কথাগুলোতেও মাছ ধরেছি, কাপড় বপন করেছি, প্ৰকৃতি নদী-জঙ্গল। সুরগুলো এতো মিস্টি। আসলে জনজাতীয় জীবনের সম্পৰ্কগুলো উদার প্ৰকৃতি নিৰ্ভর। ওদের প্ৰেম ব্যাংক ব্যালেন্স কিংবা বীমা কোম্পানির ফাইলের নিবদ্ধ থাকে না। ফ্ৰীজে রাখা বোতলগুলোতে প্ৰেম জমাট বাঁধে না। অল্প চাওয়া, তাতেই আনন্দ। ট্ৰেন চলছে। আমার চোখের সামনের দৃশ্যপট দ্ৰুত বদলে বদলে যাচ্ছে। কোথাও স্থানীয় বাজার। মায়ের সঙ্গে শিশু। কোথাও পিঠে ঝুড়ি নিয়ে একদল পাহাড়ি মেয়ে। ট্ৰেন এক ষ্টেশন ছেড়ে আরেক ষ্টেশনে। হকার ওঠে নামে। লোকাল ট্ৰেনের যাত্ৰীরাও বেশ অন্যরকম হয়। মিশুকে স্বভাবের। সহজেই পরিচিত হয়ে যাই। তারপর টাইম পাস ভাগ করে খাওয়া। গল্প করতে করতে ট্ৰেনও চলে ঝমঝম। কারবি শব্দটার অৰ্থ নাকি অগ্নির উপাসক। কারবি সমাজের সঙ্গে টোটেমের ধারণা যুক্ত হয়ে আছে। পুরো সমাজটাই মূল পাঁচটা গোত্ৰে বিভক্ত। পাখি, গাছ আর প্ৰাকৃতিক সামগ্ৰী নিয়ে তৈরি হওয়া এই গোত্ৰ পদবি দিয়ে চেনা যায়। যেমন যাদের পদবি তেরাং তারা আসলে হানজং গোত্ৰের। তেরাং একটি পাখির নাম। কারবি জনজাতির মানুষ বিশ্বাস করে, এই পৃথিবীর সৃষ্টিকৰ্তা হলেন ‘হেমফু’। শক্তির দেবী হলেন ‘বামিংজা’। সব জনজাতির মতোই কারবিদেরও কৃষি উৎসবই প্ৰধান। কিন্তু কারবি মানুষের মূল উৎসব ‘সমাংকাম’। এই উৎসবটি হল মানুষ যখন মারা যায়, তার আত্মার শান্তির উদ্দেশ্যে এক ধরনের নাচ-গান হয়। সেটাই এক ধরনের উৎসবের রূপ নেয়। আমি যখনই যেখানে যাই ওই অঞ্চলের পোশাক আর খাদ্য সম্পৰ্কে জানতে ইচ্ছে করে, - ‘তোমরা যে পোশাকটা পরো, এর নাম কী?’ পোষাকের নিচের অংশকে বলে পিনি। অসমিয়াতে মেখলা। আঁচলের অংশটা, ছোট চাদরের মতো, বলে পেক্ক। তলার অংশটা বাঁধার মতো একটা রশি যাকে বলে ফুলাম বামকক। এটা কারবি মেয়েদের অভিজাত্যের প্ৰতীক, এটা ছাড়া কারবি পোশাক সম্পূৰ্ণ হয় না। ---কারবি পুরুষদের পোষাকের নাম? --‘ছাটর’। অৰ্থাৎ ছোট ধুতি। সঙ্গে হাতকাটা ফতুয়ার মতো গায়ে তাকে বলে ‘চই’। মাথায় গামছা পাগরির মতো জড়ায় বলে ‘পহ’। কয়েকটি খাওয়ার নাম বল। জানতে চাই ওদের প্ৰিয় খাদ্য। ----ভাত আমাদের প্ৰিয় খাদ্য। সঙ্গে ‘অককাংথ’, একটা ছোট বাঁশের চোঙ্গায় ছোট ছোট মাছ, নুন, হলুদ, কাঁচা শষ্যের তেল মেখে চোঙায় ঢুকিয়ে দেওয়া হল। তারপর উনুনে গরম করতে দেওয়া হয়। বাঁশের চোঙ্গাটি। আরেকটি পদ হল ‘বরেক’। বন মুরগীর সঙ্গে ছোট ছোট বেগুন, চোঙ্গায় ভরে গরম করে তৈরি হয়। ভাত, বরেক তার সঙ্গে থাকে ‘মারি’। রসুন শুকনো মাসরুম, লংকা একসঙ্গে পিষে তৈরি করা হয় ঝাল চাট্নি। অতিথি এলে এভাবেই খেতে দেওয়া হয়। গল্প করি বীনা রংহাংপীর সঙ্গে, এমি টেরাং এর সঙ্গে । কথার মধ্যে দিয়েই জানতে পারি কারবি ধৰ্মস্থানকে ‘জিকেদাম’ বলে। প্ৰাচীন কালে এখানেই কৃষি, কাপড় বপন, বাঁশের কাজ অৰ্থাৎ জীবনধারার প্ৰাথমিক পাঁঠ বড়রা ছোটদের শেখাতেন। খ্ৰিস্টান ধৰ্ম যেখানে ঢুকেছে সেখানে গীৰ্জাঘর তৈরি হয়েছে। জীবনধারাতেও কিছু বদল এসেছে। কারবি রামায়নকে বলা হয় চাবিন আলুন। যখন কৃষিকাজ শেষ হয়, ঘরে ঘরে সন্ধ্যেবেলায় চাবিন আলুন পাঠ হয়। এখন অবশ্য কোথাও কোথাও টিভি আর মোবাইলের কল্যাণে ছেলেমেয়েরা চাবিন আলুন শুনতে চায় না। গ্ৰাম প্ৰধানকে বলা হয় ‘সারৰ্থে’। ওঁর নামই একেকটা গ্ৰামের নামকরণ হয়। কারবি সাহিত্যের ইতিহাস হল মৌখিক সাহিত্যের ইতিহাস। লোকসাহিত্য। জনজাতীয় জীবনে ঢুকলেই বুঝতে পারি ওদের জীবন স্বতন্ত্ৰ জীবন। এই জীবনের মূল মন্ত্ৰই হচ্ছে সংঘবদ্ধ জীবন যাপন। ব্যক্তি কেন্দ্ৰীক জীবনের দৰ্শন ওদের নয়। জনজাতীয় অঞ্চলগুলো প্ৰাকৃতিক সম্পদে ভরপুর। মানুষগুলো বুঝতেও পারেনা সে সবের মূল্য। ওরা পাহাড়, জঙ্গলে, ঝৰ্ণার সঙ্গে দিন যাপন করে, গান গায়, পুজো করে কিন্তু প্ৰকৃতিকে নষ্ট করে না। কিন্তু বহুজাতিক কোম্পানিগুলো শ্যেনদৃষ্টি এই অঞ্চলগুলোর ওপর রয়েছে। পারলেই লুট করে নেয় সব। নানাভাবে চেষ্টা চালিয়ে যায়। প্ৰকৃতি আর জনজাতীয় জীবন দুই ই আজ বিপন্ন। তবু এই বিপন্নতা ওদের ভীত করেনি। এখনও সতেজ, সুন্দর, দৃঢ় ওরা। ওদের সঙ্গে একটা দিন কাটিয়ে এলে সতেজ হয়ে যাই আমিও, বেঁচে থাকার ইচ্ছেটা বেড়ে যায়।
---










কোন মন্তব্য নেই