কলকাতা ,দিল্লী আকাশ বাতাস কার্বন বিষ ছড়াচ্ছে ,বাঙালি এগিয়ে
হিমালয় লুকিয়ে বিষবাষ্পের কারখানা
দেবদূত ঘোষঠাকুর
'বিষবাষ্প' বলতেই শীতের মুখে দূষিত বাতাসের কৃত্রিম মেঘে ঢাকা রাজধানী দিল্লি, বা দেওয়ালির পরের সকালে বাজির ধোঁয়ায় ঢাকা মেঘে ঢাকা কলকাতা শহরের কথাই মনে পড়ে। সেটাই স্বাভাবিক। একটি শহর দেশের রাজধানী। অন্যটি পশ্চিমবঙ্গের। কার্বন ডাই অক্সাইড, কার্বন মনৈক্সাইড, সালফার ডাই অক্সাইড, বেঞ্জিনযুক্ত জৈব কণা যুক্ত বাতাস বুকে গেলেই মানুষের জীবনী শক্তির ভাঁড়ারে টান পড়ে। শহরের ওই 'বিষবাষ্প' থেকে মানুষ পাড়ি জমান পাহাড়ে। দূষণহীন বাস বুক ভরে টেনে নিতে। নিজেকে তরতাজা রাখতে।
সত্যিই কি পাহাড়ের বাতাস এখনও বিষের ছোঁয়া থেকে পুরোপুরি মুক্ত? ওই বাতাস বুকে টেনে নিলে জীবনীশক্তি টগবগ করে ফুটবে?
জবাব যদি হ্যাঁ হতো তাহলে রাজনৈতিক টানাপোড়েন ছেড়ে নিশ্চয়ই ভারত, পাকিস্তান, চিন, বাংলাদেশ, ভুটান, আফগানিস্তানের প্রতিনিধিরা টেবিলে পাশাপাশি বসে পাহাড়ের 'বিষবাষ্প' নিয়ে এমন হা হুতাশ করতেন না। প্রস্তাব উঠত না মাস্টার প্ল্যানের ও। চিন এভারেস্টের বেস ক্যাম্পের রাস্তা সম্প্রসারিত করছে পর্যটক টানতে। সিকিম , দার্জিলিঙের পাহাড়ে হোম স্টে-হোটেলের ছড়াছড়ি। পেট্রোল, ডিজেলের ধূসর ধোঁয়া ছড়িয়ে গাঁক গাঁক করে পাহাড়ের পাকদন্ডি বেয়ে উঠে যাচ্ছে গাড়ির সারি। পাহাড়ের বাতাস ভারী হয়ে যাচ্ছে। তাঁর সামগ্রিক প্রভাব পড়ছে পাহাড়ের বাস্তুতন্ত্রে। তাপমাত্রা বাড়ায় করছে বরফের চাদর । আর গোটা বিষয়টি চক্রাকারে ঘুরছে। সেটাই পরিবেশ বিজ্ঞানীদের ভাবাচ্ছে।
নভেম্বর মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে আজারবাইজানের বাকু তে হিন্দুকুশ হিমালয় সংলগ্ন আটটি দেশের পরিবেশ মন্ত্রকের মাথারা এই চক্রকে থামানোর উপায় খুঁজতেই দিনরাত এক করে রাজনৈতিক মতানৈক্য ভুলে আলোচনা করেছেন। নভেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহে বসেছিল এই বৈঠকের ঘোষণাপত্রে বলা হয়েছে, সাড়ে তিন হাজার কিলোমিটার বিস্তৃত হিন্দুকুশ হিমালয়ে
বরফের চাদর সরছে খুব দ্রুত হারে। বরফ গলা জলে ছোট পাহাড়ি নদী দুকূল ছাপিয়ে ভাসিয়ে নিয়ে ছোটো ছোটো গ্রাম। মানুষ বাঁচার ন্যূনতম সুযোগটাও পাচ্ছেন না। অন্যদিকে বরফের বর্ম সরতেই পাহাড়ের পাথর, বালি আর মাটি হুড়মুড় করে নেমে আসছে নীচে। চাপা পড়ে যাচ্ছে পাহাড়ের পাদদেশের গ্রামগুলি। পাথরের ফাঁক ফোঁকর থেকে বেরিয়ে আসছে বিষবাষ্প।
কী ভাবে তৈরি হচ্ছে পরিবেশের ভারসাম্য নাশকারী এই প্রক্রিয়া?
আসলে হিন্দুকুশ হিমালয় এলাকার বাস্তুতন্ত্র পৃথিবীর অতি সংবেদনশীল বাস্তুতন্ত্রগুলির মধ্যে একটি। এই অঞ্চলটি পৃথিবীর সর্বোচ্চ ক্রায়োস্ফিয়ার। ক্রায়োস্ফিয়ার শব্দটি পৃথিবীর অঞ্চলগুলিকে বোঝায় যেখানে বেশিরভাগ জল হিমায়িত আকারে থাকে, যেমন মেরু অঞ্চল এবং পার্বত্য অঞ্চল। বিশ্বের সর্বোচ্চ পর্বতশ্রেণী হিন্দুকুশ-হিমালয়য়ে হিমবাহ এবং নদী ও হ্রদে বরফের আকারে হিমায়িত জল রয়েছে। হিমবাহ, বরফের চাদর, পারমাফ্রস্ট, তুষার এবং বরফের মতো সমস্ত হিমায়িত স্থান নিয়ে গঠিত হয় ক্রায়োস্ফিয়ার। অর্থাৎ হিমায়িত অঞ্চল। তবে সব হিমায়িত অঞ্চলই কিন্তু ক্রায়োস্ফিয়ার নয়। ক্রায়েস্ফিয়ার এমন একটি হিমায়িত অঞ্চলই, যার অন্যতম বৈশিষ্ট্য পারমাফ্রস্ট। আসলে এই পারমাফ্রস্টের উপস্থিতিই হিমালয়ের হিন্দুকুশ এলাকাকে বিষবাষ্পের ভান্ডার হিসেবে গড়ে তুলেছে।
পারমাফ্রস্ট আসলে বরফ আবৃত এমন একটি অঞ্চল যার মূল উপাদান বড় পাথর, নুড়ি পাথর, মাটি আর বালি। বরফের আস্তরণ ওই নুড়ি, পাথর, মাটির মিশ্রণকে একসঙ্গে বেঁধে রেখেছে। বরফ সরে গেলেই পাথর, গুঁড়া পাথর, বালি আর মাটি একে অপরকে ধরে রাখতে পারছেনা। খসে পড়ছে পাহাড়ের অংশ। আর ওই মাটিতে মিশে থাকা বিষবাষ্প মিশে যাচ্ছে আশপাশের বাতাসে।
কিন্তু মাটির গর্ভে ওই বিষবাষ্প এল কোথা থেকে?
ভূবিজ্ঞানীরা বলছেন, পারমাফ্রস্টে প্রচুর পরিমাণে মৃত জৈববস্তু রয়েছে যা সহস্রাব্দ ধরে তাদের কার্বন সম্পূর্ণরূপে পচন ও মুক্ত করার সুযোগ না পেয়ে জমা হয়েছে ওই মাটিতে। আর বরফের আবরণ সরে যখন বাঁশি, পাথর আর মাটি আলাদা হয়ে যাচ্ছে তখন সেই সব গ্যাস মূলত কার্বন ডাই অক্সাইড আর মিথেন। এই বাতাস যেমন বাস্তুতন্ত্রের ক্ষতি করছে, তেমনই বরফে মোড়া পাহাড়ের গড় তাপমাত্রাও বাড়িয়ে দিচ্ছে। শুরু হয়ে যাচ্ছে বাস্তুতন্ত্র বিনাশের এক নতুন চক্র। চক্র যতো ঘুরছে ততোই বাড়ছে হিমালয়ের তাপমাত্রা। ততো বেশি করছে বরফের চাদর। জলবায়ুর স্বাভাবিক চক্রের দফারফা করে দিচ্ছে পারমাফ্রস্টের গলন।
লেখাটা শুরু করেছিলাম শীতের রাজধানী দিল্লি আর দেওয়ালি পরবর্তী কলকাতার বিষবাষ্প নিয়ে। হিমালয়ের বিষবাষ্পের সঙ্গে এই বিষবাষ্পের কোনো সম্পর্ক আছে কি? ভূবিজ্ঞানীরা বলছেন, বরফ ঘেরা পাহাড়ের বাতাস তো একদিনে গরম হয়নি! এর জন্য সময় লেগেছে। অনেকের মনেই প্রশ্ন, বিশ্ব উষ্ণায়নের ঢেউ পাহাড়ের উচ্চতম অংশে পৌঁছে গেল কী ভাবে?
আসলে বাতাস যতো গরম হয়, ততোই তা হাল্কা হয়ে উপরের দিকে উঠে যায়। বাধাহীন ভাবে বাতাসে ভাসতে ভাসতে তার পৌঁছে যায় পর্বত শিখরে। এই ভাবেই দিল্লি আর কলকাতার মেঘ পৌঁছে যায় হিমালয়ের পাদদেশে। সেখানে থেকে পাহাড়ের গা বেয়ে তা উঠতে থাকে উপরের দিকে বরফ গলাতে গলাতে। এই বায়ু প্রবাহের সঙ্গে যদি জলীয় বাষ্প এসে জোটে তা পাহাড়ে নিয়ে অন্য এক ধরনের বিপর্যয়। মেঘ ভাঙা বৃষ্টি। ইংরেজিটা বললে অনেকের কাছে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হবে। কারণ ওই নামটাই বেশি পরিচিত। 'ক্লাউড বার্স্ট' । নিয়ম করে প্রতিবছর হিমালয়ের কোনও না কোনও অংশে এই মেঘ ভাঙা বৃষ্টিতে নিশ্চিহ্ন হয়ে কোনও না কোনও জনপদ। বহু মানুষের মৃত্যু হয়। ঘরছাড়া হয়ে যান বহু মানুষ। নষ্ট হয়ে যায় বেশ কিছু বাস্তুতন্ত্র।
আবার পাহাড়ে গরম বাতাসে বরফ যখন গলতে শুরু করে তখনও আর এক ধরনের বান আসে পাহাড়া নদীতে। পাথরূর উপরে সুতোর মতো নদী বরফ গলা জলে দু কূল ভাসিয়ে দেয়। সামনে যা পড়ে সব ঝেড়েপুছে নিয়ে যায়। আর পাহাড়ে একবার পারমাফ্রস্ট গলা শুরু হলে ওই উচ্চতা তেই গ্রিন হাউজ গ্যাস নিঃসরণা শুরু হয়। পাহাড় তখন নিজেই বিষবাষ্প বা গরম বাতাস তৈরির কারখানা।
তাহলে উপায়?
বাকুতে হওয়া ওই সম্মেলনে হিন্দুকুশ হিমালয় অঞ্চলের দেশগুলির প্রতিনিধিরা কিন্তু কোনও আশার কথা শোনাতে পারেননি। তবে আরও বিপদের সঙ্কেত দিয়েছেন ওঁরা। বলেছেন, পাহাড়ের তাপমাত্রা আরও দেড় ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়লে ওই ক্রায়োস্ফিয়ার অঞ্চলে তিন কোটি পাহাড়ি মানুষের জীবনে বিপর্যয় নেমে আসবে। ধস, হড়পা বানে বিপদে পড়বেন হিমালয়ের পাদদেশে বসবাসরত আরও প্রায় দেড় কোটি মানুষ। শুধু তাই নয়, শুদ্ধ জলের বৃহত্তম ভান্ডারও চরম ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
সেই বিপদের অপেক্ষা করা ছাড়া আর উপায় কী!
, ১৯/১২/২০২৪ সৌজন্যে উত্তরবঙ্গ সংবাদ








কোন মন্তব্য নেই