Header Ads

, নির্যাতিতা ডাক্তারের বিচারের কথা উচ্চারিত হলে না আমরণ অনশনের আড়ালে চলে গেল

অনুচ্চারিত থেকে গেল নির্যাতিতার কথা

দেবদূত ঘোষঠাকুর 


দিন পনেরোর অনশন। 'আমরণ অনশন' মঞ্চে হঠাৎ মুখ্যসচিবের প্রবেশ। ফোনে মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে আন্দোলনকারী জুনিয়র ডাক্তারদের কারো কারো কথা। কিছু বাদানুবাদ। আসলে মুখ্য সচিবকে অনশন মঞ্চে পাঠানো টাই মুখ্যমন্ত্রীর বড় চাল। 
গেম চেঞ্জার। 
তারপরে যা ঘটল তার চিত্রনাট্য বোধহয় আগেই লেখা ছিল। নিজের গুহায় যেন শিকারকে টেনে নিয়ে গেল বাঘ। নবান্নে মমতার সামনে আন্দোলনকারী জুনিয়র চিকিৎসকেরা অনেকটাই খেই হারিয়ে ফেললেন যেন। আধঘন্টার বৈঠক যখন দুই ঘন্টার দিকে এগোচ্ছে, তখনই বোঝা গিয়েছিল মুখ্যমন্ত্রী খেলিয়ে খেলিয়ে মাছ ডাঙায় তুললেন বলে! 
এ যেন এক টান টান ডার্বি। খেলা এক্সট্রা টাইম পেরিয়ে গেল। 
বৈঠক শেষের কিছুক্ষণের মধ্যেই অনশনের যবনিকাপাত। জুনিয়র ডাক্তারেরা ভাঙবেন তবু চমকাবেন না। তাঁরা ঘোষণা করলেন, আর্জি করের নির্যাতিতার বাবা-মায়ের অনুরোধেই এই অনশন প্রত্যাহার। ততক্ষণে আন্দোলনরত জুনিয়র ডাক্তার, সিনিয়র ডাক্তার এবং তাঁদের সঙ্গে প্রায় আড়াই মাস ছায়ার মতো লেগে থাকা সাধারণ মানুষের অনেকেরই প্রশ্ন, সোমবারের ডার্বি জিতল কে? মমতা না জুনিয়র ডাক্তারেরা? 
বৈঠকে যাওয়া জুনিয়র চিকিৎসকদের অধিকাংশই মনে করছেন, ৮-২ গোলে জিতেছেন তাঁরাই। শনিবার ফোনালাপে তাঁদের ১০ দফা দাবির মধ্যে যেগুলি মুখ্যমন্ত্রী মানতে চাইছিলেন না, সেগুলির বেশ কয়েকটি সোমবার মানতে বাধ্য হয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বিশেষ করে মেডিক্যাল কলেজ গুলিতে ছাত্র নির্বাচনের বিষয়টি। হাসপাতালের রোগী কল্যাণ সমিতিতে জুনিয়র ডাক্তারদের ঠাঁই পাওয়াটাও তাঁদের একটা বড় জয় বলে দেখছেন আন্দোলনকারীদের বড় অংশই।
 কিন্তু যে সব সাধারণ মানুষ এতদিন জুনিয়র ডাক্তারদের পাশে ছিলেন তাঁদের অনেকেই ওই বৈঠকের গতি প্রকৃতিতে আশাহত হয়েছেন। কেন?  তাঁদের অনেককেই বলতে শুনেছি, 'নবান্নের ওই বৈঠকে 'অভয়া' কিন্তু ব্রাত্য থেকে গিয়েছেন। তাঁর নাম এক বারের জন্য ও দুই ঘন্টার বৈঠকে ওঠেনি। 'জাস্টিস ফর আরজি কর' স্লোগান কারও মুখে শোনা যায়নি। 
'হতাশ' সাধারণ মানুষের প্রতিনিধিদের অনেকে ওই বৈঠককে পর্যালোচনা করেছেন ঠিক এই ভাবে: 
(১) আন্দোলনকারী জুনিয়র ডাক্তারেরা মনে প্রাণে বিশ্বাস করেন, 'নির্ভয়া' আরজি করে থ্রেট কালচারের শিকার।
(২) ওই থ্রেট কালচারের প্রতিবাদ করার শাস্তি হিসেবে 'অভয়া'-র এমন নৃশংস মৃত্যু হয়েছে। 
(৩) জুনিয়র ডাক্তারেরা আরজি করে‌ ওই থ্রেট কালচারের সঙ্গে যুক্ত ৪৭ জন চিকিৎসকের চিহ্নিত করে তাঁদের শাস্তির দাবি করেছিলেন। 
(৪) হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ চিহ্নিত  জুনিয়র ডাক্তারদের  সাসপেন্ড করেছিলেন। 
(৫) সোমবার আন্দোলনকারী জুনিয়র ডাক্তারদের সামনেই মুখ্যমন্ত্রী হাসপাতাল-কর্তৃপক্ষের ওই সিদ্ধান্ত খারিজ করে দিয়েছেন।  
(৬) কোনও কোনও জুনিয়র ডাক্তার এ নিয়ে  হাল্কা প্রতিবাদ করেছিলেন বটে, কিন্তু মুখ্যমন্ত্রী তাতে আমল দেননি। 
(৭) জুনিয়র ডাক্তারেরা মনে হয় মেরুদন্ড বাড়িতে রেখে গিয়েছিলেন। তা না হলে তাঁরা প্রতিবাদে সোচ্চার হলেন না কেন? কেনই বা বৈঠক ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন না?  প্রতিবাদীদের দের বড় একটি অংশ মনে করছেন, জুনিয়র ডাক্তারদের মূল লক্ষ্য থেকে বিচ্যুৎ করিয়েছেন দুঁদে রাজনীতিক মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। শনিবার টেলিফোন আলাপচারিতায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কিছুটা রক্ষণাত্মক থাকলেও, সোমবার প্রথম থেকেই মমতা ছিলেন আক্রমণাত্মক। জুনিয়র ডাক্তারদের আক্রমণাত্মক হতে না দিয়ে, একের পর আক্রমণ এসেছে মুখ্যমন্ত্রীর দিক থেকে। 'অফেন্স ইজ দ্য বেস্ট ডিফেন্স' এই প্রবাদে ভর করে তাঁর নিজস্ব ঢঙেই লড়াই জিতে নিয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের স্বাস্থ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। 
মুখ্যমন্ত্রীর জয় অন্য একটি দিকেও। যেখানে জুনিয়র ডাক্তারের অনশন করছিলেন, সেখানেই ২০০৮ সালে সিঙ্গুরে টাটাদের কারখানা গড়া নিয়ে অনশনে বসেছিলেন মমতা। জুনিয়র ডাক্তারেরা ১৫ দিনেই শেষ করেছেন অনশন। মমতা অনশনে ছিলেন ২৬ দিন। মুখ্যমন্ত্রীর সেই রেকর্ড কিন্তু অক্ষতই থেকে গেল। 
আন্দোলনকারী জুনিয়র ডাক্তারদের ব্যথা কিন্তু এখানেই শেষ নয়। প্রাথমিক ভাবে তাঁদের আরজি কর আন্দোলনের পিছনে ছিলেন শহর কলকাতা ও তার আশপাশের মানুষ। সল্টলেকে স্বাস্থ্য ভবনের সামনে আন্দোলন শুরু হওয়ার পর থেকে শহরাঞ্চল থেকে তার ছড়িয়ে পড়ে মফস্‌সল এলাকায়। অনশন শুরু হওয়ার পরে এই প্রতিবাদে একটু একটু করে সামিল হতে শুরু করেন গ্রামের মানুষ। আর তার জন্যই অনশন আন্দোলনকে আর দীর্ঘায়িত হতে দিতে চাননি। গ্রামে গ্রামে প্রতিবাদীরা হোয়াটস্যাপ গ্রুপে যে আন্দোলনের রূপরেখা তৈরি করতে শুরু করেছেন সেই খবর মমতার কানে পৌঁছে গিয়েছিল। স্থানীয় স্তরে মিছিল, মিটিং বা মানববন্ধনের কর্মসূচির ডাক দেওয়া হচ্ছিল ওই গ্রুপগুলির মাধ্যমে। এভাবে প্রতিবাদের ঢেউ  আর ছড়িয়ে পড়লে বিপদ যে বাড়বে তা চিন্তায় ফেলেছিল শাসক দলকে। 
 সমাজ মাধ্যমে সূত্রের খবর, মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে জুনিয়র ডাক্তারদের সোমবারের বৈঠকের পর থেকে বিভিন্ন এলাকায় হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ ছাড়ার প্রবণতা তৈরি হয়েছে। যাঁরা গ্রুপ ছেড়ে যাচ্ছেন তাঁরা হতাশা ব্যক্ত করছেন। এই প্রতিবাদ আন্দোলনের চালিয়ে যাওয়ার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন। একটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপের অ্যাডমিনিস্ট্রেটরের মন্তব্য,  ' আমরা বলছি যে আমাদের মূল দাবি আদায় এখনও হয়নি। অভয়া এখনও বিচার পায়নি। সেই বিচার শেষ না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন তুলে নেওয়ার কোনও যুক্তি নেই। তাতে তেমন সাড়া মিলছে না।' 
তবে জুনিয়র আন্দোলনকারী জুনিয়র ডাক্তারেরা সেরকমটা ভাবছেন না। তাঁরা তাকিয়ে রয়েছেন শনিবারের গণ কনভেনশনের দিকে। আমরণ অনশন তোলায় আন্দোলনের গতিমুখ স্তিমিত হয়েছে বলে‌ জুনিয়র ডাক্তারদের একাংশ যে সংশয়ের মধ্যে রয়েছেন তা মানতে চাননি আন্দোলনের নেতারা। 
 তাঁরা বলছেন, শনিবারের গণ কনভেনশন থেকে নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে। হতাশার কোনও জায়গা নেই।
 তবে একটা কথা মেনে নিতেই হবে যে,  বিধানসভার উপনির্বাচনের আগে নরমে গরমে প্রতিবাদের হাওয়ার  কিছুটা নিজের পালেই নিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছেন তৃণমূল নেত্রী। 


উত্তরবঙ্গ সংবাদ ২৪/১০/২০২৪

কোন মন্তব্য নেই

Blogger দ্বারা পরিচালিত.