গল্প হলেও সত্যি ঘটনা. জীবন কে স্পর্শ করবে
দেহাতীত তবুও অতীত নয়-----
সময়টা বোধ হয় ১৯৬২ বা ৬৩ সাল। তখন ছাত্র আমি ক্লাস সেভেনের, রামকৃষ্ণ মিশন, নরেন্দ্রপুর। পুরী রামকৃষ্ণ মিশনের আমন্ত্রণে, নরেন্দ্রপুরের ফুটবল টিমের পক্ষে আমরা খেলতে গিয়েছিলাম।
পুরী রামকৃষ্ণ মিশনের পূজনীয় বড় মহারাজ প্রতিদিন রাতের খাবারের পরে, আমাদের বিভিন্ন গল্প শোনাতেন। শেষদিন আমাদের জোরালো আবদারে, ওনার দেখা এক আশ্চর্য কাহিনী বললেন, যা আজও সময়ের স্রোতে হারিয়ে যায় নি।
বড় মহারাজ প্রতিদিন রাতের খাবারের পর, তাঁর সেবককে সঙ্গে নিয়ে সমুদ্রপাড় ধরে স্বর্গদ্বার অব্দি নৈশ-ভ্রমণে যেতেন, সাথে থাকত একটি ছাতা ও টর্চ। সেইসময় সৈকতে কোন আলোর ব্যবস্থা ছিল না, তবে জেলেপট্টি সংলগ্ন রাস্তায় ল্যাম্পপোস্ট ছিল।...... ল্যাম্প পোস্টের ক্ষীণ আলোয় পোস্টের আশপাশ কিছুটা আলোকিত হয়ে থাকত।
সেদিনটা ছিল ঝোড়ো হাওয়া, সাথে ঝিরিঝিরি বৃষ্টি। মহারাজ যথারীতি নৈশভ্রমণে বেড়িয়েছেন, সাথে সেবক মহারাজ।...... সমুদ্র পাড় ধরে উনি হেঁটে চলেছেন স্বর্গদ্বারের দিকে। হঠাৎ নজরে পড়ল, ল্যাম্প-এর ক্ষীণ আলোকে কে যেন পোস্টের নিচে বসে আছে মাথা নিচু করে। মহারাজ ক্ষনিকের জন্য সেদিকে তাকিয়ে, আবার হাঁটতে লাগলেন। ফেরার পথেও একই দৃশ্য নজরে পড়ল।
পরেরদিন রাতে--- সফেন সমুদ্রের ঢেউয়ের গর্জন আর অসংখ্য তারা আর চাঁদের আলোর সমারোহে অনন্ত আকাশ সমাহিত। মহারাজ তাঁর সেবকের সঙ্গে নিবিড় আলোচনা করতে করতে হেঁটে চলেছেন স্বর্গদ্বারের পথে। আবার সেই ল্যাম্পপোস্ট ! আর সেই কারোর বসে থাকার দৃশ্য !.....মহারাজ থমকে দাঁড়িয়ে পড়লেন আর সেবককে বললেন--- 'চলতো, দেখি এই রাতে ওখানে কে বসে আছে ?' ------- কিছুটা এগিয়ে গিয়ে, উনি স্পষ্ট দেখলেন, কেউ যেন সাদা কাপড়ে আবৃত ও কিছু কাজে ব্যস্ত ! মহারাজ সামনে গিয়ে জিজ্ঞেস করলেন--- 'কে তুমি ? এত রাতে এ-জায়গায় বসে ?'
বারংবার প্রশ্নে উত্তর না পেয়ে, মহারাজ ওনার ছাতাটি দিয়ে কাপড়ের সামান্য অংশ তুললেন। তিনি সবিস্ময়ে দেখলেন--- এ তো দেহ নয়, এক অবয়ব মাত্র ! সেবক ভয়ে কাঠ !...... মহারাজ নির্ভয়ে বললেন--- 'কে তুমি ? আর কেনই বা এসময়ে প্রতিদিন ?'
ক্ষীণ নারীকণ্ঠে ভেসে এল--- 'আমি মৃতা। আমার ছোট্ট একটি ছেলে আছে, আর সে খুব কষ্টে আছে। ও বাবার সাথে জেলেপাড়ায় থাকে। ওর বাবা নেশা-ভাঙ করে পড়ে থাকে, আর আমার ছেলেটি শীতে খুব কষ্ট পায়। আমি তাই কাঁথা বুনছি ছেলের জন্যে।'
মহারাজ ব্যথিত হয়ে, ওখানেই নিচু হয়ে বসে বললেন--- 'মা, আমি তোমার ছেলের কষ্ট লাঘব করব, কথা দিলাম।'..... ক্ষীণকণ্ঠে আওয়াজ এল--- 'আমার ছেলে ভোলা'।
পরদিন সকালে, মহারাজ জেলেপাড়ায় উপস্থিত হলেন। তিনি ভোলা নামের বাচ্চা ছেলেটি ও তার বাবার খোঁজ করাতে, মতুয়া নামক এক বয়স্ক জেলে সর্দার ওনাকে দখিন দিকের এক ঘরে নিয়ে গেল।..... মহারাজ দেখলেন--- ছেড়া কাঁথায় শীর্ণ একটি বাচ্চা ছেলে শুয়ে আছে। সর্দার জানাল যে--- ওর মা সম্প্রতি মারা গেছে, আর ওর বাপ ঘরে প্রায় থাকেই না। সর্দারকে মহারাজ বললেন--- 'ভোলাকে আমি আশ্রমে নিয়ে যাব, এবং দেখাশোনার ব্যবস্থাও করব।'
এরপর মহারাজ ভোলার নিশ্চিত আশ্রয়ের ব্যবস্থা করলেন। এবং নৈশ ভ্রমণে আবার ওই ল্যাম্পপোস্টের নিচে বসে থাকা অশরীরীনীকে মহারাজ বললেন--- 'মা তোমার ছেলে ভোলা আর কষ্টে নেই। এবার তুমি এই মায়ার জগৎ থেকে যাতে মুক্ত হও, সেই প্রার্থনা আমি করব'।
এরপর থেকে আর কখনো নৈশ ভ্রমণে মহারাজ ওই দুঃখিনি মা কে দেখতে পান নি।
মহারাজ আমাদের বললেন--- 'এই দেখ, এই সেই ভোলা, যে তোমাদের সাথে গত তিনদিন ধরে সকল কাজে হাত মিলিয়েছে । ও এখন আশ্রমের ডিসপেনসারির কর্মীর পরিবারভুক্ত।'
ভোলা লেখাপড়া শিখেছে। বড় মহারাজের অপার স্নেহ-ভালবাসায় এক সুস্থ সুন্দর জীবন লাভ করেছে।.....আমিও স্কুলের গন্ডি পেরিয়ে, সময়ের আবর্তনে বৃহত্তর জগতে হারিয়ে গেছি....... কিন্তু আজও পূজনীয় মহারাজের কাছে শোনা ও কিছুটা দেখা কাহিনী জীবন-সায়াহ্নে উঁকি মারে।
---- ড.কমল চক্রবর্তী (নরেন্দ্রপুর রামকৃষ্ণ মিশনের প্রাক্তন ছাত্র)র কলমে.....








কোন মন্তব্য নেই