Header Ads

পাখি ধারার নিষ্ঠুর প্রথা থেকে সবাই কে বাঁচান urmila

জানেন কি, বিজয়া দশমীর দিন কলকাতার বনেদি বাড়িগুলো থেকে জীবন্ত নীলকন্ঠ পাখি ওড়ানোর নিষ্ঠুর প্রথা বন্ধ হয়েছিল এক মহিলার হাত ধরেই। লামিদি ওরফে ঊর্মিলা গঙ্গোপাধ্যায় তার নাম। সম্পর্কে অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নাতনি। 

"... রাজা নবকৃষ্ণের আমল থেকে শোভাবাজার রাজবাড়িতে মহা ধূমধামে দুর্গাপুজো হয়। কলকাতার ওই সময়কার অনেক বনেদিবাড়িতে পুজোর সময় বিজয়া দশমীর দিন দুটি নীলকন্ঠ পাখি উড়িয়ে দেবার প্রথা আছে। একটি ওড়ানো হয় যখন ঠাকুর দালান থেকে প্রতিমা রাস্তায় বেরোন। অন্যটি বিসর্জনের আগে গঙ্গার ঘাটে। মা দুর্গা হিমালয়ে শ্বশুরবাড়ির পথে রওনা দেবার খবর নীলকন্ঠ পাখিরা আগেই 'নীলকন্ঠ' মহাদেবের কাছে পৌঁছে দেবে। 

বাড়ির মেয়ে বউদের সঙ্গে দোতলার ঝোলা বারান্দায় দাঁড়িয়ে ঘোমটার আড়াল থেকে লামিদি দেখত পাখিটা ঝটপট করে খাঁচা থেকে বেরিয়ে একটু উড়ে কোনও পাঁচিলে বসত। সঙ্গে সঙ্গে একদল কাক এসে তার পালক ধরে টেনে ঠোকরাতে থাকত। পরদিন সকালে দেখা যেত মরা পাখিটা রাস্তার ধারে নালায় পড়ে আছে। হিমালয়ে পৌঁছন তার আর হত না। গঙ্গার ঘাটে তো মেয়েদের যাওয়া বারণ। সে পাখিটাও মরে নিশ্চয় গঙ্গায় ভেসে হিমালয়ের ঠিক উলটো দিকে পৌঁছে যেত।

বাড়ির নতুন বউ লামিদির চোখে জল আসে। ভেতরে ছটফট করে। কিন্তু তার কথা কে শুনবে? দোর্দণ্ডপ্রতাপ রঘুপতির শাসন সেখানে তখনও ভীষনভাবে বজায় আছে।"

এর পর কেটে গেছে বহুবছর। লামিদি ফিরে এসেছে শান্তিনিকেতনে। মাঝে অনেকটা সময় কাটে ওড়িশার সিমলিপালের মায়াময় জঙ্গলে। সিমলিপালের ময়ূরভঞ্জের রাজাদের শিকারের একটা প্যালেস ছিল পাহাড়ের ওপরে। বর্তমানে ফরেস্ট বাংলো সেটা। ওখানে বসে বিকেলের পড়ন্ত রোদের আলোয় তিন-চারটে নীলকন্ঠ পাখিকে দেখে তিরিশ বছরের পুরোনো কলকাতার পুজোর কথা মনে পড়ে তার। প্রতিজ্ঞা ছিল, "রঘুপতির এই শাসন আমি বন্ধ করবই।"

"...কলকাতায় গিয়ে পুরনো নথিপত্র ঘাঁটতে থাকে। খবর সংগ্রহ করে বনেদিবাড়ির বর্ষীয়ানদের কাছে থেকে। একটা বড় তালিকা তৈরি হয়ে যায় কলকাতার যেসব বনেদি বাড়িতে এখনও দুর্গাপুজো হয়। পুজোর মধ্যেই একটা দল নিয়ে সাংবাদিক সেজে বাড়ি বাড়ি গিয়ে খবর নেওয়া হয় কোন কোন পরিবারে এখনও নীলকন্ঠ ওড়াবার প্রথার চল আছে। 

তালিকাটা অনেক ছোট হয়ে আসে। সে তালিকায় থাকে শোভাবাজার রাজবাড়ি, এখানে দুটি পুজো হয় দু'তরফের, মানে চারটি পাখি, ছাতুবাবু-লাটুবাবুর বাড়ি, চোরাবাগানের মিত্তির বাড়ি, হাটখোলার দত্ত বাড়ি, আরও অনেক। 

অপেক্ষা করতে হয় আরও এক বছর। এর মধ্যে এই তথ্যটা বেরিয়ে এসেছে যে, কোনও কোনও বাড়িতে প্রতি বছর বংশ-পরম্পরায় পাখিওয়ালা ঠিক সময় পাখি দিয়ে যায়। কোনও কোনও বাড়ি থেকে আবার পাখি কেনা হয় বাইরে থেকে কোনও জায়গা থেকে। কিন্তু কোথা থেকে কেনা হয় জানা যায় না। 

ষষ্ঠীর দিন সকালে বনদপ্তরের বন্যপ্রাণ শাখার কর্মীদের একটা বড় দল নিয়ে লামিদি পৌঁছে যায় শোভাবাজার রাজবাড়িতে। লামিদি তখন রাজ্য বন্যপ্রাণ উপদেষ্টা পর্ষদের সদস্য। এবার আর পরিচয় গোপন করা হয় না। সবিনয়ে বলা হয় নীলকন্ঠ ওড়ানো বন্যপ্রাণ সংরক্ষণ আইন বিরুদ্ধ কাজ ও এই সুন্দর পাখিটি অবলুপ্তির পথে। আপনারা অনুগ্রহ করে এই প্রথা বন্ধ করুন। বেশ কিছু প্রচারপত্রও দিয়ে আসা হয়। 

এরপর চলে অন্য সব বাড়িতে বিনীত আবেদন। খবর মিলে যায় ছাতুবাবু-লাটুবাবুর পরিবার থেকে পাখিওয়ালাদের আস্তানার। নতুনবাজারে লোহিয়া হাসপাতালের আশেপাশে তারা লুকিয়ে পাখি বেচে। 

সপ্তমীর দিন সকাল ন'টায় গিরিশ পার্কে গিরিশবাবুর মূর্তির তলায় দলটা মিলিত হয়। আজকের অভিযান লোহিয়া হাসপাতালের কাছে। 

গাড়ি থামিয়ে মহিলা বনকর্মী নমিতাকে নিয়ে লামিদি রাস্তায় নেমে পড়ে। আর সবাই অপেক্ষা করেন গাড়িতে।খুঁজতে খুঁজতে একটা গলিতে গামছা চাপা দেওয়া তিনটে খাঁচায় পেয়ে যায় বারোটা নীলকন্ঠ। গাদাগাদি করে ছোট খাঁচায় পোরা।

--- কত করে পাখি বেঁচবে?
--- ছ'শো টাকা। 
--- একটু কমাও না বাবা। বাড়িতে পুজো। আমাদের আত্মীয়স্বজন মিলে অনেকগুলো পাখি লাগবে। 
--- ঠিক আছে দিদি। পাঁচশোই দেবেন। 
নমিতা বলে, আর পাখি নেই? আমাদের আরও কটা দরকার ছিল। 

এমন সময় হঠাৎ ছুটতে ছুটতে একটি ছেলে এসে বলে পুলিশ, পুলিশ ওদিকে আমাদের পাখি তুলে নিচ্ছে।

প্রথমটা না বুঝলেও ব্যাপারটা বুঝতে দেরি হয় না। লামিদি বলে, পুলিশ! পুলিশের সাহস তো কম নয়। আজকে পুজোর দিন, পাখি তুলে নিচ্ছে? চলো তো তোমরা, দেখাচ্ছি পুলিশকে মজা। এসো নমিতা। দেখা গেল বনদপ্তরের সাদা গাড়ি, সামনে কনকবাবু। লামিদি কনকবাবুকে ইশারা করে। তার পর ধমকাতে থাকে, কী রকম মানুষ আপনারা? পুলিশ বলে হিন্দুধর্ম, আচার নিয়ম সব রসাতলে দেবেন নাকি? পাখি ছাড়া বিসর্জন হবে কি করে? শিগগির পাখি নামান গাড়ি থেকে। আমাদের বারোটা পাখির দরদাম হয়ে গেছে। চলুন, দেখবেন চলুন।

কনকবাবুও উলটে ধমকাতে থাকেন। আপনারা পাখি কিনছেন। জানেন আাইনের চোখে আপনারাও অপরাধী। আপনাদের অ্যারেস্ট করা হবে। উঠুন আমাদের ভ্যানে।

নমিতা কেঁদে ফেলে। দিদি কী হবে?

বচসা চলতেই থাকে। সবাই পৌঁছে যায় গামছা ঢাকা খাঁচাগুলোর কাছে। পিছনে আস্তে ধীরে সাদা গাড়িও পৌঁছে গেছে। 

কনকবাবু, অনুপবাবুরা আগেই বেশ কয়েকটি খাঁচা বড় রাস্তা থেকে তুলে ফেলেছেন। দর করা খাঁচাগুলোও তুলে নেওয়া হল। পিছনের দরজা খুলে কনকবাবু বললেন, আপনারা 'আন্ডার অ্যারেস্ট'। উঠুন বলছি ভ্যানে। লামিদি আর নমিতা আচলে চোখ মুছতে মুছতে ভ্যানে উঠে পড়ে। ভ্যানের দরজা বন্ধ করেই লামিদি বলে, আর এখানে নয়। সোজা সল্টলেকে বনদপ্তর রেসকিউ সেন্টারে চলুন। গাড়ি স্টার্ট নেয়।

পথে কিছু পিঁপড়ের ডিম কিনে নেওয়া হয় হাতিবাগান বাজার থেকে। সল্টলেকে পৌঁছে তাড়াতাড়ি উপোসি ২৩টি পাখিকে বড় খাঁচায় ঢুকিয়ে জল আর পিঁপড়ের ডিম দেওয়া হয়। প্রথমে ঠোঁট ডুবিয়ে অনেক জল খেয়ে টপাটপ পিঁপড়ের ডিম খেতে থাকে। আহা কতদিন জলও পায়নি, খাবারও পায়নি পাখিগুলো।

পাখিধরারা এদের ধরে আঠাকাঠি দিয়ে। ডানাগুলি থাকে আঠায় জোড়া। ধরার পর থেকে পাখিরা থাকে উপোসি। কে আর তাদের খেতে দেয়। হিমালয়ে যখন চলেই যাবে। 

এর মধ্যে দু'দিন ছুটিতে কেটে গেছে। অনেকগুলি পাখি মারা গেছে। বিজয়া দশমীর দিন লামিদি আর ক'জন বনকর্মী বাকি পাখিগুলি নিয়ে ইছামতী নদীর ধারে বিভূতিভূষণ অভয়ারণ্যের দিকে রওনা হয়। পৌঁছতে রাত হয়। লামিদিকে আর খাঁচার মধ্যে নীলকন্ঠ পাখিদের নামিয়ে দিয়ে বনকর্মীদের কালো ভ্যান কলকাতায় ফিরে যায়। রাতে লামিদি একা থেকে যায় ফরেস্ট বাংলোতে। 

ভোরবেলা যখন টিপটিপ বৃষ্টি পড়ছে। বাংলোর দোতলা থেকে খাঁচাগুলো নামায় লামিদি। একে একে খাঁচার দরজা খুলে ছেড়ে দেয় নীলকন্ঠ। কয়েকটি উড়ে ইছামতীর ওপারে গাছে বসে। বাকি সাতটি আর পারে না। লাফিয়ে লাফিয়ে আঠামাখা ডানা নিয়ে বারান্দায় উঠে বসে। বনদপ্তরের নথিতে তারা মৃত।

তাদের নিয়ে বাসে করে লামিদি কলকাতায় ফেরে। বেঁচে থাকে দুটি। এবার চলে ডানা পরিষ্কার। প্রতিটি পালক ধরে ধরে acetone দিয়ে মোছা হয়। আর আনা হয় ভীমরুলের লার্ভা। বড় খাঁচায় থাকে। ক্যাঁচোর ক্যাঁচোর ডাকে আর কপাকপ লার্ভা খায়। 

একাদশীর দিন সন্ধের খবরে টিভিতে দেখা যায় শোভাবাজার রাজবাড়ির এক প্রবীনকে। তিনি বলেন, আমরা জেনেছি এ ভাবে নীলকন্ঠ ছাড়া সরকারি আইন বিরুদ্ধ কাজ। আমরা এ বছর থেকে এই প্রথা বন্ধ করে দিলাম। আমরা মাটির নীলকন্ঠ বিসর্জন দেব ঠিক করেছি। 

কলকাতার বাকি বনেদিবাড়ির কর্তারাও নিজেদের মধ্যে মিটিং করে বন্ধ করে দিলেন নীলকন্ঠ ওড়ানো।..."

আর বাকি দুটি নীলকন্ঠকে দু্'মাস যত্ন করে খাইয়ে দাইয়ে চাঙ্গা করে একদিন লামিদি রওনা হল তাদের নিয়ে সিমলিপালের পলপলা ক্যাম্পে। গোটা অভিযানের জন্য তাঁকে কম ‘নাটক’ করতে হয়নি। ঊর্মিলাদেবীর কথায়, “বাড়ির নতুন ঘোমটা পড়া বৌয়ের পক্ষে বিষয়টা সেই সময় মোটেই সুখকর হয়নি!” তবুও লামিদি তার কথা রেখেছে। 

আর মাটির নীলকন্ঠ বিসর্জন দিয়ে কিংবা শোলার তৈরী নীলকন্ঠ গ্যাসবেলুনের সাহায্যে উড়িয়ে বনেদি বাড়িগুলো এখন সেই পুরোনো রীতি বজায় রেখে চলেছে। প্রাণে বেঁচে গেছে কয়েকশো নীলকন্ঠ। 

'লামিদির গল্প' বই থেকে গল্পটা তুলে ধরলাম। প্রকাশকঃ দোয়েল পত্রিকা। কলকাতা বইমেলা ২০২০। মূল্যঃ ২৫০ টাকা। 

লামিদিকে নিয়ে জানতে আরও দুটো লিংক দিলাম। পড়বেন ভালো লাগবে। 

1. https://www.anandabazar.com/west-bengal/purulia-birbhum-bankura/%E0%A6%AB-%E0%A6%A8-%E0%A6%AC-%E0%A6%9C%E0%A6%B2-%E0%A6%87-%E0%A6%9B-%E0%A6%9F-%E0%A6%B9-%E0%A6%9C-%E0%A6%B0-%E0%A6%B9%E0%A6%A8-%E0%A6%B2-%E0%A6%AE-%E0%A6%A6-1.121941

2.https://eisamay.com/special-coverage/durga-puja-2014/news/lamidi-a-pathfinder/articleshow/43598871.cms

©️Kanad Baidya

কোন মন্তব্য নেই

Blogger দ্বারা পরিচালিত.