১৯শে মে-র উত্তরাধিকার
জয়দীপ ভট্টাচার্য্য
এতদঅঞ্চলের বিশিষ্ট সমাজ বিজ্ঞানী সুজিত চৌধুরী তার একটি প্রবন্ধে লিখেছিলেন " বাঙালি জাতিসত্ত্বার মূখ্য অবয়ব ভাষা নির্ভর, ভাষা যেখানে বিপন্ন অস্তিত্বও সেখানে বিপন্ন। এভাবে বলা যায় যে বরাক উপত্যকার মানুষ নিত্যদিন যে বিপদ সম্ভাবনায় আতঙ্কিত, মূলতঃ পরিচয়ে তা ভাষিক ও সাংস্কৃতিক। অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক নিপীড়ন গুলো সেই মৌলিক উপাদান থেকেই উৎসারিত।"
সুজিত চৌধুরীর সময় থেকে বর্তমান সামাজিক রাজনৈতিক প্রেক্ষিত অনেকটাই পাল্টে গেছে কিন্তু তার এই পর্যবেক্ষণ এখনো একইভাবে প্রাসঙ্গিক।আসলে আসামের রাজনীতি রাজ্যের জটিল জনবিন্যাসের সাথে প্রথম থেকেই জড়িয়ে গেছে। বহিরাগতদের সংখ্যাবৃদ্ধি অসমিয়া অস্তিত্বের প্রতি হুমকিস্বরূপ এই ধারণাটি যে অম্বিকাগিরি রায়চৌধুরীর সময় থেকে উচ্চবর্ণ অসমিয়া সমাজে প্রোথিত হয়েছিল তারপর থেকে রাজনৈতিক স্বার্থে তাতে ক্রমাগত জল হাওয়া দেওয়া হয়েছে। এই প্রক্রিয়া বর্তমানেও বহমান। বরঞ্চ উগ্র জাতীয়তাবাদের দোসর হিসেবে এখন মঞ্চাসীন উগ্র হিন্দুত্ব বা রাস্ট্রবাদ যা একটি আরেকটির পরিপূরক হিসেবে কাজ করছে। তাই তো নতুন সরকার গঠনের পরদিনই সরকারি তরফে এন আর সি তালিকায় সীমান্ত জেলাগুলোতে ২০% ও অন্যান্য জেলায় ১০% পুনর্বীক্ষনের জন্য সুপ্রিম কোর্টে আবার আবেদন জানানো হয়েছে। উল্লেখ্য যে পূর্ববর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার দিনই বিগত মূখ্যমন্ত্রী শপথ নিয়েই এন আর সির কাজের খবর নিতে মূখ্য কার্যালয় সফর করেছিলেন। অর্থাৎ সেই' ট্রাডিশন সমানে চলছে ।'
এই রিভেরিফিকেশনের আওতায় সীমান্ত জেলা হিসেবে কাছাড় ও করিমগঞ্জের নামও উত্থাপিত হয়েছে। বিগত সরকারের আমলেও একই আবেদন করা হয়েছিল সুপ্রিম কোর্টে। কিন্তু বিগত এন আর সি কোঅর্ডিনেটরের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে সেই আবেদন প্রত্যাখ্যান করে সর্বোচ্চ আদালত। কি বলেছিলেন প্রতীক হাজেলা ? তিনি বলেছিলেন যে সরকার যা চাইছে তার চেয়ে বেশি পুনর্বীক্ষন ইতিমধ্যে করা হয়েছে। এবং এটি সর্বৈব সত্য। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় যে বরাক উপত্যকার তিনটি জেলায় ইতিমধ্যে ২৫% রিভেরিফিকেশন করা হয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে এই তথ্যগুলো মোটেই বর্তমান সরকারের অজ্ঞাত নয়। তবুও বারবার এই আবেদনের পিছনে যে গূড় রাজনৈতিক উদ্দেশ্য রয়েছে তাতে কোন সন্দেহ নেই।
যে ন্যারেটিভটি কৌশলে বিভিন্ন মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে তা হলো একটি বিশেষ ধর্মীয় গোষ্ঠীর বহিরাগতদের নাম অবাঞ্ছিত ভাবে এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে । রিভেরিফিকেশন হলে তা ধরা পড়বে। কিন্তু এন আর সি র গত অভিজ্ঞতা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে যে এর ফলে কেবল কোন ধর্মীয় গোষ্ঠী সমস্যায় পড়েননি জাতি ধর্ম নির্বিশেষে যে ভাষিক গোষ্ঠী সমস্যায় পড়েছেন তা হচ্ছে ' বাঙালি'। এবং সরকারের বর্তমান উদ্যোগের পিছনেও এটাই লক্ষ্য । অন্ততঃ যাতে এরফলে ব্রহ্মপুত্র উপত্যাকার উচ্চবর্ণ অসমিয়া, যারা এবারও হাত খুলে শাসকদলকে ভোট দিয়েছেন তাঁদের কাছে এই সরকারের জাতিয়তাবাদী ভাবমূর্তিকে অক্ষুন্ন থাকে।
ভাষা এই রাজ্যের রাজনীতিতে আজও নির্নায়ক ভূমিকা পালন করে চলেছে। তাই তো অনেক দৌঁড় ঝাপ করে কেন্দ্রীয় সরকারের সম্মতি আদায় করার পরও 'ভাষা শহীদ স্টেশন' নামকরণ ইচ্ছাকৃত ভাবে দিশপুরে আটকে রাখা হয়। তাই তো বাঙালি দের কোন সংগঠনকে আর্থিক অনুদানের জন্য ডাকার কথা মনে থাকেনা। আবেদন নিবেদনের পরও রাজ্যের এক তৃতীয়াংশ জনগোষ্ঠীর ভাষার ' সরকারি সহযোগী ভাষার স্বীকৃতি জোটেনা। হাল আমলে ১৯ শে মের দিন বরাক উপত্যকায় পরীক্ষার দিন ধার্য্য করা কিংবা উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা পর্ষদের চেয়ারম্যানের মন্তব্য একই ব্যাপারকে বারবার প্রমাণ করছে।
প্রশ্ন হলো এর থেকে উত্তরণ কোন পথে ? তার সাথে আরেকটি প্রশ্নও সঙ্গত ভাবেই ওঠে আসে - বরাক উপত্যকার বাসিন্দারা দিশপুরের এই ঔপনিবেশিক নিপীড়ন নিয়ে সত্যিই কি চিন্তিত ? সত্যিই কি এর থেকে উত্তরণ চাইছেন অধিকাংশ জনগন ? তার সাথে আরেকটি প্রশ্নও জড়িয়ে যায় যে এই উপত্যাকার জনমানসে সত্যিই কি কোন একীভূত সামাজিক সাংস্কৃতিক অস্তিত্ব গড়ে উঠেছে যেমনটা উত্তর পূর্বাঞ্চলের সব উপজাতি বা জনজাতিদের মধ্যে প্রবল ভাবে বিদ্যমান রয়েছে ? এই অঞ্চলের'বাঙালি' প্রসঙ্গে চলুন আবার ফিরে যাই সুজিত চৌধুরীর কাছে । একই প্রবন্ধে তার উক্তি " বলা প্রয়োজন বঙ্গভাষা যদিও বাঙালীত্বের একটি মৌলিক উপাদান তবুও বাঙালি পরিচিতির সঙ্গে সাংস্কৃতিক আনুগত্যের একটি ব্যাপার অন্তর্লীন রয়েছে। আমাদের এই অঞ্চলের বিশেষ প্রেক্ষিতে বঙ্গভাষী মানেই বাঙালি নন, তিনিই বাঙালি যিনি বাঙালি জাতিসত্ত্বার অংশ হিসেবে নিজের পরিচিতি সম্পর্কে সচেতন এবং বাঙালি সংস্কৃতির আবহমান প্রবাহের সঙ্গে নিজের আত্মীয়তাকে তার অস্তিত্বের অঙ্গ বলে মনে করেন।" ভাবা দরকার এই সংজ্ঞা এখানকার কত শতাংশ জনগণের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। সাংস্কৃতিক অস্তিত্বের সাথে আর্থিক অবস্থানের কিন্তু খুব একটা যোগ নেই। শহরের তথাকথিত ' জীবনমুখী' গানের সাথে প্রত্যন্ত অঞ্চলের নৌকায় বসে গাওয়া ভাটিয়ালি বা লোকগান মিলেমিশেই তৈরি হয় সংস্কৃতি। বরাক উপত্যকার ভাষা আন্দোলনের ঐতিহ্য এরকম এক সাংস্কৃতিক অস্তিত্ব তৈরী করার ব্যাপারে অনুঘটকের কাজ করার কথা ছিল। তা হয়নি কারণ অসংখ্য বিভাজনকে এখানে রাজনৈতিক কারণে জিইয়ে রাখা হয়েছে। এখানে সূক্ষ্ম মনস্তাত্ত্বিক বিভাজন রয়েছে ডিমাসা রাজার আমলে যে সব লোকেদের ডেকে আনা হয়েছিল তাদের সাথে পরবর্তীতে আগতদের, বিভাজন রয়েছে যারা পূর্ববর্তী 'কাছাড়ে ' আগে থেকে বসবাস করতেন তাঁদের সাথে শ্রীহট্ট থেকে আগত মূলতঃ শিক্ষিত ভদ্রলোকদের,বিভাজন রয়েছে শহর ও গ্রামাঞ্চলে বসবাসী বঙ্গভাষীদের মধ্যে, বিভাজন রয়েছে বঙ্গভাষী ও স্থানীয় উপজাতি গোষ্ঠীর মধ্যেও।এসব বিভাজনে কিন্তু মদত জোগানো হয় দিশপুর থেকে । মধ্যে মধ্যেই তাই এখানে 'বরাকী' ভাষার ইস্যু উত্থাপিত হয়।
এই বিভাজন আছে বলেই স্বাধীনতার এতো দশক পেরিয়ে আজও এখানে ন্যূনতম চিকিৎসা পরিকাঠামোর অভাবে প্রতিদিন হৃদরোগীর মৃত্যু, চাকরি বাকরির অভাবে ' ব্রেনড্রেন' চলতেই থাকে। হয়তো এভাবেই কোন একদিন এটি সম্পূর্ণ মেধাহীন, স্বপ্নহীন, এক মৃত উপত্যাকায় পর্যবসিত হবে।
বিভাজিত হয়ে অধিকার আদায় করা যায়না। উনিশ সঙ্গোপনে আমাদের বারবার এই কথাই মনে করায়।
এই উপত্যাকার জন্য একটি পৃথক ভৌগলিক বা রাজনৈতিক অস্তিত্ব কি এখনো জরুরী নয় ?
'বেলা যে বয়ে যায় ....








কোন মন্তব্য নেই