Header Ads

উনিশের চেতনায় বৃহৎ গণ আন্দোলনের প্রয়োজন

কল্পার্ণব গুপ্ত 

দেখতে দেখতে বছর ঘুরে গেল। আবার এসে গেল ভাষা শহীদের রক্তে রাঙানো উনিশে মে। বর্তমান সময়ে সমগ্র দেশ এক ভয়ংকর পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছে। মহামারীতে আক্রান্ত ও মৃতের  সংখ্যা রোজ বৃদ্ধি পাচ্ছে। গণচিতা জ্বলছে, অক্সিজেনের অভাবে রোগীরা ছটফট করছে, মৃতের পরিজনদের বুক ফাটা হাহাকারে বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে। এবারের উনিশে প্রতিবারের মতো যথেষ্ট জাকজমক করে যে পালন করা যাবে না সে কথা বলা বাহুল্য। গান্ধীবাগ সংলগ্ন রাস্তা নানা রঙের আলপনায় সুসজ্জিত হয়ে উঠবে না, স্টেজ বানিয়ে দিবসব্যাপী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের অনুমতি মিলবে না এমনকি শিলচর শ্মশান, রেলস্টেশন উপচে পড়বে না দর্শনার্থীদের ভীড়। কিন্তু তা বলে বরাকবাসী শহীদদের সম্মান জানাতে ভুলবেন না। একাদশ ভাষা শহীদের স্মরণে ওইদিন বরাকের ঘরে ঘরে জ্বলে উঠবে এগারোটি সন্ধ্যা প্রদীপ। 

৬১-এর আন্দোলনের আজ ষাট বছর অতিক্রান্ত। কিন্তু অবস্থার কোনো পরিবর্তন হয়েছে কি? আজও উগ্র অসমীয়া জাতীয়তাবাদী শক্তি সমানভাবে আগ্রাসী। নানা কূট কৌশল করে তারা আমাদের মাতৃভাষায় শিক্ষা লাভের অধিকার কেড়ে নিতে চায়। ইদানীং "সেবা"-র আদেশনামা এবং এ.এচ.এস.ই.সি-র চেয়ারম্যানের বিদ্বেষ প্রসূত মন্তব্যে তা জলের মতো পরিষ্কার হয়ে গেছে। ঐচ্ছিক বিষয় হিসেবে অসমীয়া ভাষাকে বাধ্যতামূলক করার ষড়যন্ত্র চলছে। উনিশের স্মৃতিকে ম্লান করে দেওয়ার জন্য সেইদিন মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার দিন নির্ধারণ করা হয়েছিল।পরে বরাকের বিভিন্ন ভাষাপ্রেমী সংগঠনের চাপে তা বাতিল করা হয়। অসমীয়া ভাষা না শিখলে আসাম থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে হবে এমন নিদানও অনেকে দিচ্ছেন। 

শুধু মাতৃভাষা কেড়ে নেওয়াই নয়, তার সাথে ভাষিক সংখ্যালঘু মানুষের অন্যান্য গণতান্ত্রিক, মানবিক এবং সংবিধান প্রদত্ত মৌলিক অধিকার কেড়ে নেওয়ার চেষ্টাও সমানভাবে অব্যাহত। আসাম চুক্তির ছয় নম্বর ধারা বাস্তবায়নের নাম করে আসামের বাঙালিকে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকে পরিণত করার চেষ্টা চলছে। সরকারি চাকরি করার অধিকার, জমি কেনা বেচা করার অধিকার এমনকি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার অধিকারও তারা এবার কেড়ে নিতে চায়। নাগরিকত্বের অজুহাতে  সরকারি কোষাগার থেকে ১৬০০ হাজার কোটি টাকা খরচ করে মানুষকে নিদারুণ দুর্ভোগে ফেলে একবার এন.আর.সি প্রক্রিয়া সমাপ্ত করা হয়। এবার রি-ভেরিফিকেশনের নামে আরেকদফা হেনস্তার পরিকল্পনা চলছে। হিটলারের কন্সেন্ট্রেশন ক্যাম্পের আদলে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে নির্মাণ করা হয়েছে  ডিটেনশন ক্যাম্প।যখন তখন যার তার হাতে ধরিয়ে দেওয়া হচ্ছে বিদেশি নোটিশ। ১০২ বছরের বৃদ্ধও রেহাই পাচ্ছেন না। 

অন্যদিকে বরাকের প্রতি বঞ্চনা ও বৈষম্য সব সীমা অতিক্রম করে যাচ্ছে।  সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে বিভিন্ন দপ্তরে (যেমন নার্সিং, ল্যাব টেকনিশিয়ান, গ্রামোন্নয়ন বিভাগ, মীন বিভাগ)বরাকের প্রার্থীদের বঞ্চিত করা হচ্ছে। ৭০ বছরে গড়ে উঠা একমাত্র ভারী শিল্প প্রতিষ্ঠান কাছার কাগজ কল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ৫০ মাস থেকে কর্মচারীদের বেতন বন্ধ।তারা একে একে বিনা চিকিৎসায় মৃত্যুবরণ করতে বাধ্য হচ্ছেন। স্বাস্থ্য বিভাগের হালও শোচনীয়। ২০১৬ সালে প্রতিশ্রুতি দেওয়া সত্ত্বেও করিমগঞ্জ মেডিক্যাল কলেজের কাজ এখনো শুরু হয়নি। অসমীয়া উগ্র জাতীয়তাবাদীদের মদতপুষ্ট এই সরকার বরাক উপত্যকার উন্নতি চায় না। তারা বরাককে উপনিবেশে পরিণত করতে চায়। 

উনিশের সংগ্রামী চেতনা এবং একাদশ ভাষা শহীদের আত্মবলিদানের পবিত্র স্মৃতিকে সামনে রেখে আমাদের এবার ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। গড়ে তুলতে হবে এক বৃহৎ গণতান্ত্রিক আন্দোলন। একাদশ ভাষা শহীদের যোগ্য উত্তরসূরি হিসেবে নিজেদের প্রমাণ করার সময় হয়েছে। ভাষিক আগ্রাসন, নাগরিকত্বের সংকট, বঞ্চনা- বৈষম্য এবং অন্যান্য সমস্যার স্থায়ী সমাধান চাই। এটাই সময়ের দাবি।তাই ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে বরাকের সমস্ত শ্রেণীর মানুষকে সংঘবদ্ধ করে বরাকের মুক্তির আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে। 

প্রতারক প্রবঞ্চকরা প্রবল তর্জন গর্জন করে রাশি রাশি মিখ্যা কথা প্রচার করে যাচ্ছে। তাদের এই ঢক্কানিনাদে আমাদের কান ঝালাপালা। কিন্তু নির্জনে কান পাতলে আমরা একাদশ ভাষা শহীদের ডাক ঠিকই শুনতে পাবো। এই ডাক আমাদের বিবেকের ডাক। তা উপেক্ষা করলে ইতিহাস আমাদের ক্ষমা করবে না। (সংগৃহীত)

কোন মন্তব্য নেই

Blogger দ্বারা পরিচালিত.