Header Ads

নতুন মন্ত্রীসভা ও বিরোধী দলনেতা প্রসঙ্গে দু’চার কথা !!

বিশ্বদেব চট্টোপাধ্যায়

গত কয়েকদিন ধরে আমাকে কিছু চাটুয়া’র ইতর মন্তব্য ডিলিট করে তাদের আনফ্রেণ্ড করতে হচ্ছে। আরও অনেককেই করতে হবে ক্রমশঃ। অবশ্যই খারাপ লাগছে--কিন্তু কিছু করার নেই। গতকাল বিরোধী দলনেতা নির্বাচন প্রসঙ্গে একটি লেখা পোস্ট করেছিলাম--সেখানেও এক চাটুয়ার একটি ইতর মন্তব্য এসেছিল। পাল্টা রুচিহীন ব্যক্তিগত আক্রমণে যাওয়ার অক্ষমতায় আমি শুধু যেটুকু করতে পারি সেটুকুই করি--আবর্জনা পরিষ্কারের চেষ্টা করি। আমার লেখা অনেকেই বহুদিন থেকেই পড়ছেন বলে জানিয়েও দাবি করেন আমি ‘যে কোন কারণেই হোক মমতা বিরোধী হয়ে মমতার চেয়েও আবেগ তাড়িত হয়ে লিখি !’ যিনি বা যারা এ ধরণের দাবি করেন তারা আমার লেখা দীর্ঘদিন ধরে পড়েন নি--পড়লে আমার লেখার মধ্যে মমতা-বিরোধিতার কিছু ‘কোট-আনকোট’ দৃষ্টান্ত তুলে ধরে আক্রমণ করতেন। করতে পারছেন না কারণ, আমার কোনো লেখার মধ্যেই নেত্রী মমতা-বিরোধিতা থাকে না--থাকে তৃণমূল সরকারের কিছু সিদ্ধান্ত এবং কিছু নীতিগত অবস্থানের বিরুদ্ধে যুক্তিসঙ্গত বিরোধিতা--যা আজকের এই বিপুল জয়ের পরেও পাল্টে যায় নি। মমতার গুরুত্বর্পূ মুহূর্তের যত ছবি আমি আপলোড করেছি তা কোনো চাটুয়াও করতে পারে নি। আমি আজ যেসব ছবি আপলোড করি তা আগামীকালের সংবাদমাধ্যমে ছাপা হয়। ২০১১ সাল পর্যন্ত আমার তৃণমূলের পক্ষে থাকার সময়টা দ্রুত বদলে গেছে বিগত দশ বছরেই। ফলে--আমি যেহেতু নিম্নমেধার যুক্তিতর্কবোধহীন এঁটোকাঁটা প্রত্যাশী ক্রীতদাস চাটুয়া নই--কোন নেতানেত্রীর পদলেহন করে পদ-পুরস্কার-সন্তানের চাকরি-ব্যবসা- টিকিট প্রত্যাশীও ছিলাম না--কাটমানিখোর সিণ্ডিকেটবাজ তোলাবাজ লুম্পেন বাহুবলীদের হিপ-পকেটে ঢুকে থাকার চেষ্টা করি নি কখনও--কিছু টোপ-প্রলোভন-ফাঁদে পা গলাতে পারি নি--তাই আমি চাটুয়াদের দায়বদ্ধতার সঙ্গে একেবারেই মানানসই হতে পারি নি। হওয়ার ইচ্ছেও হয় নি--ভবিষ্যতেও হবে না। তাই আমি যখনই যা লিখি সম্পূর্ণ নির্মোহ নিরপেক্ষ অবস্থান থেকেই লিখি আমার যুক্তিবোধের ওপর দাঁড়িয়ে থেকেই। চাটুয়াদের কাছে তা গ্রহণযোগ্য হবে এমন অবাস্তব ভাবনাও আমার মনের মধ্যে কাজ করে না--আশাও করি না। শুধু দুঃখ হয় তখনই যখন তাদের ভদ্রতার শিক্ষার রুচিবোধের আত্মমর্যাদাবোধের মুখোশগুলো খুলে পড়তে দেখি--ধাক্কা খাই তাদের বন্ধুত্বের ডাকে সাড়া দিয়েছিলাম বলে ! যদিও কথায় কথায় শিম্পাঞ্জির মতো দাঁত বের করে খ্যাক-খ্যাক করে হাসতে থাকাদের সরাতে পারি নি--সরাতে হলে ব্লক করতে হয়--সেটা আমি চাই না বলেই শিম্পাঞ্জিগুলো দাঁত বের করে চলেছে এখনও !

সারদা-নারদা কাণ্ডে অভিযুক্ত হয়ে জেল খেটেও দুধ-গঙ্গাজলে ধোয়া পবিত্র সম্পদরা এবং তাদের সঙ্গে আরও ডজনখানেক দৃশ্যতঃ অভিযুক্তরা মন্ত্রীত্ব পাচ্ছেন--বিধায়ক হচ্ছেন--সাংসদ হচ্ছেন যখন--তখন অভিযুক্ত (এখনও প্রমাণিত নন) মুকুল ও শুভেন্দুর বিরুদ্ধে তীব্র জাতক্রোধ কেন--এ প্রশ্নের যুক্তিসঙ্গত ও গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা চাটুয়াদের পক্ষ থেকে না পেলেও আমি জানি জাতক্রোধটা কেন? আমার এ প্রশ্নেরও যুক্তিসঙ্গত উত্তর কেউ দেন নি--মেদিনীপুরে গিরি-মাইতি-মহাপাত্র-সুফিয়ান পরিবার থাকতেও শুধুমাত্র অধিকারী পরিবারের হাতে ৩৫-টি জমিদারি তুলে দেওয়া হয়েছিল কেন? বিনা কারণে? অধিকারী পরিবার এই ৩৫-টি জমিদারি ছিনতাই করে নিয়েছিল? যদি নিয়েই থাকে তাহলে রাজ্যের পুলিশ-প্রশাসন-সরকার চোখ বুঁজে ছিল কেন? এসব অত্যন্ত অপ্রিয় প্রশ্নের সুপ্রিয় উত্তর কিন্তু বিশদে কেউ দেয় নি।
আমার লেখা থেকে কেউ প্রমাণ তুলে ধরে দেখাতে পারে নি--আমি দিলীপ ঘোষ-কৈলাস বিজয়বর্গীয়-অরবিন্দ মেনন-অমিত মালব্যদের গুণগান করেছি--এমন কী প্রধানমন্ত্রী বা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীরও গুণগান করে বিচ্ছিরিরকমের চাটুয়ার ভূমিকা পালন করেছি। না, আমি তা করি নি, আমি একদার তৃণমূলেরই সম্পদ হিসেবে চিহ্নিত মুকুল ও শুভেন্দুকে ব্যক্তিগত ভাবে পছন্দ করি সেটা লিখেছি। আজও লিখছি--ভবিষ্যতেও লিখবো--যতক্ষণ না মুকুল ও শুভেন্দু অপরাধী প্রমাণিত হয়ে জেল খাটছেন ! এটা আমার ব্যক্তিগত গণতান্ত্রিক অধিকারের মধ্যেই পড়ে। আমি চাটুয়াদের বিশ্রীরকমের নিম্নমেধার পোস্টে মন্তব্য করি না--তাদের আঁচড়াতে কামড়াতে যাই না--বিন্দুমাত্র প্রয়োজনও অনুভব করি না। ফেসবুক কারুর উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া প্ল্যাটফর্ম নয়--সমনাধিকারের ভিত্তিতে সকলেই নিজের নিজের মতামত প্রকাশের অধিকার প্রয়োগ করে থাকেন এখানে। সকলের সব মতামত বা পোস্ট মনোরঞ্জনের কারণ হবেই--এ ভাবনার মধ্যে কোনো যুক্তি থাকতে পারে না। তবে অপছন্দের কারণটা শোভন শালীন ভাষা ও ভঙ্গির মাধ্যমে জানানো যেতেই পারে--আমি কতবড় চাটুয়া--এটা প্রমাণের তাগিদে সভ্যতা ভদ্রতা রুচিবোধ সবকিছু জলাঞ্জলি দেওয়ার মধ্যে কোনোরকম বাহাদুরি থাকতে পারে না। কিছুদিন আগেও তৃণমূলের রমরমা বাজারে তৃণমূলবিরোধীরা আমাকে তৃণমূলের দালাল চিহ্নিত করতে দু’বার ভাবতো (ভাবনার শক্তি ছিল না) না--এখন আবার অনেক তৃণমূল চাটুয়া আমাকে বিজেপি’র দালাল চিহ্নিত করতে দু’বার ভাবছে না। তা ভাবতেই পারে--ব্যক্তিবিশেষের ভাবনাচিন্তার সক্ষমতা-অক্ষমতা নিয়ে আমার কোনোরকম মাথাব্যথা নেই। তবে আমি যে বিজেপি’র দালাল বা তাদের এঁটোকাটায় সমৃদ্ধ চাটুয়া এটা যারা প্রমাণ করতে সক্ষম নন আমি তাদের মনুষ্যপদবাচ্য বলেই মনে করি না। আমূল ঘৃণা ছাড়া তাদের জন্যে আমার কিছু থাকার কথা নয়--থাকছেও না। দু’এক দিনের মধ্যেই আমি যখন বিজেপি’র বিরুদ্ধে লিখবো তখনও কিন্তু আমাকে রাতারাতি পাল্টি খাওয়াদের একজন ভাবতে দেরি হবে না--আমি এটা জেনেবুঝেই যা লেখার লিখবো।
যাইহোক এবারে নতুন মন্ত্রীসভা প্রসঙ্গে দু’চার কথা ‘গাঁয়ে মানে না আপনি মোড়ল’ হিসেবেই বলতে হচ্ছে। প্রথমেই নিজের স্বাভাবিক মন্ত্রকে (শিক্ষা) ফিরে আসার সুযোগ পাওয়া ব্রাত্য বসুকে হার্দিক
অভিনন্দন
জানাই। প্রথম তৃণমূল সরকারেও তিনি এই মন্ত্রকের দায়িত্ব পেয়ে সদর্থক পদক্ষেপ গ্রহণের চেষ্টা করেছিলেন নানাভাবে। ফলে ক্যাশ ও কোটা সিস্টেম বেশ কিছুটা অস্বস্তির মধ্যে পড়ে যাওয়ায় তাঁকে নাম কে ওয়াস্তে একটা মন্ত্রকে সরে যেতে হয়েছিল--সেখানেও তাঁর মন্ত্রী হিসেবে পারফরমেন্স খারাপ ছিল না। গত দশ বছরে শিক্ষা ব্যবস্থায় পাহাড়প্রমাণ সমস্যা তৈরি হয়ে গেছে--সমস্যার পাহাড়ে বসেই দায়িত্ব পালন করতে হবে ব্রাত্যবাবুকে। অনেকটাই আপোষহীন মানসিকতার রাজনীতিক হিসেবে ব্রাত্যবাবুকে কঠিন লড়াই করতে হবে--তবু আমার বিশ্বাস--তিনি রাজ্যের মেধাবী ছেলেমেয়েদের ভবিষ্যৎ নিয়ে ছেলেখেলা করার কথা ভাবতেই পারবেন না। তারা সুবিচার পাবে। রাজ্যের মেধা রাজ্যেই ধরে রাখার সদর্থক পদেক্ষপ গ্রহণে তিনি সক্ষম হবেন। যদিও একটি অস্বস্তিকর পরিস্থিতির মধ্যে মাঝে মাঝে পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনাও জুড়ে থাকছে তার মন্ত্রকের সঙ্গে !
এবারের নতুন মন্ত্রসভার ছবিটার মধ্যে বেশ কিছু ইতিবাচক ভাবনার প্রতিফলন ঘটেছে বলে আমার মনে হচ্ছে। বিশেষ করে মন্ত্রকের রদবদলের মধ্যে এই ভাবনা স্পষ্ট হয়েছে। ৪৩ জনের মধ্যে নতুন দায়িত্বপ্রাপ্ত ১৬ জনের দক্ষতার কোনো প্রমাণ নেই--সুতরাং তাদের কাজকর্ম না দেখে কিছু বলা সম্ভব নয়। বাকি ২৭ জনের পারফরমেন্স গত দশ বছর ধরে আমরা দেখে আসছি। ব্যক্তিগতভাবে আমি খুব একটা আশাবাদী নই। কারণ, গত দশবছরে দু’চার জন ছাড়া বাকি মন্ত্রীদের কে কোন দপ্তরের মন্ত্রী তা চট করে মনে করার উপায় ছিল না। অনেক সহজ ছিল প্রায় চব্বিশঘন্টা মুখ্যমন্ত্রীকে ঘিরে থাকা আমলাদের নাম ও মুখগুলো মনে রাখা।
এবারেও ব্যাপারটা তেমনই হতে চলেছে। দু’তিন মাসের মধ্যেই মানুষ ভুলে যাবে কে কোন দপ্তরের মন্ত্রী। মন্ত্রীদের স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের কোনো অধিকার থাকবে না--নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে সুস্পষ্টভাবে বিস্তারিত জানিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর অনুমোদন নিতে হবে আগে--তারপর তা বাস্তবায়িত করা যাবে আমলাদের তৈরি কমিটির মাধ্যমেই। এতে অবশ্য কেউ কোনোরকম আপত্তি জানাবার মতো ধৃষ্টতা দেখাবেন না। লালবাতির একটা গাড়ি কপালে জুটে গেলেই যথেষ্ট--জনতার ভিড়ে রাজা সেজে বসার সৌভাগ্যটা তো কিছু কম ব্যাপার নয় !
আমি এখনও মনে করি না--তৃণমূলের এই বিপুল শক্তিতে ফিরে আসাটা মূলতঃ আর্থিক ক্ষমতার ভিত্তিতে শিকড় ছড়ানোর ফলশ্রুতি। বিজেপিকে যেভাবেই হোক ঠেকাতে গণক্ষমতার উত্থানে আর্থিক ক্ষমতার প্রশ্নটি অপ্রাসঙ্গিক-ই থেকে গেছে শেষপর্যন্ত। অর্থনৈতিক সক্ষমতা ছাড়াই এই উত্থান মানুষকে বিস্মিত করেছে নানা কারণেই। রাজনৈতিক ক্ষমতা এখানে বিস্ময়করভাবেই ভিক্ষা ভাতা ভর্তুকি দাক্ষিণ্য সাহায্য অনুদান খয়রাতি নির্ভর থেকেই ক্ষমতায় ফিরতে সাহায্য করেছে। অধোবর্গের রাজনৈতিক গতিপ্রকৃতিও এইসব খয়রাতি নির্ভর রাজনীতিকে ঢালাও সমর্থন করতে কার্পণ্য করে নি। ফলে, অর্থনৈতিক-সামাজিক-শিল্পোন্নয়নের যাবতীয় বিশ্লেষণ পর্যবেক্ষণ গুরুত্বহীন হয়ে গেছে শেষপর্যন্ত। কতটা কি হয়েছে তা আগামী পাঁচবছর প্রমাণিত হবে। নতুন মন্ত্রীসভা গঠনের মাধ্যমে মমতা নতুন সরকারের নতুনভাবে পথ চলার একটা সুস্পষ্ট বার্তা দিলেও তাঁর অনুগামীরা তাঁকে সেই নতুনপথে চলতে কতটুকু সাহায্য করবে তা নিয়ে সংশয় কিন্তু প্রচুর পরিমাণেই থাকছে। কারণ সেই--ক্যাশ ও কোটা সিস্টেম--এর প্রগাঢ় অভ্যাস থেকে বেরিয়ে আসা কতটা সম্ভব হবে তা ভবিষ্যতই বলবে !!

কোন মন্তব্য নেই

Blogger দ্বারা পরিচালিত.