Header Ads

ঐতিহাসিক শহর ধুবুড়ির সংখ্যালঘু বাংলাভাষী হিন্দু মুসলিম মানুষ অসমের পরম্পরাগত বিহু সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রেখেছে

অমল  গুপ্ত,  ধুবুড়ি থেকে ফিরে : ব্রহ্মপুত্র, গদাধর প্রভৃতি নদ-নদী  তীরবর্ত্তী ঐতিহাসিক বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী শহর   ধুবুড়ির এক উজ্জ্বল ইতিহাস আছে।  অসমের এক অংশকে পাকিস্তান ভুক্তির হাত  থেকে  রক্ষা করতে এই   শহরেই এক গোপন বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সেই   বৈঠকে তদানীন্তন  কংগ্রেস দলের সর্বভারতীয়  সভাপতি  নেতাজি সুভাষ  চন্দ্র বসু  অন্যান্য  কংগ্রেস  সমর্থকদের নিয়ে বিরোধী দলের সদস্য গৌরীপুরের রাজা প্রভাত চন্দ্র  বড়ুয়ার উপর  চাপ সৃষ্টি করে  দলে এনেছিলেন। পরে রূপনাথ ব্রহ্মমৌলানা আব্দুল হামিদ খান  ফখরুদ্দিন  আলী আহমেদ প্রমুখদের একজোট করে  শিলঙে আসামের রাজধানীতে গিয়ে মুসলিম লীগের মুখ্যমন্ত্রী মৌলভী সৈয়দ স্যার মহম্মদ  সাদুল্লা  সরকারের বিরুদ্ধে  অনাস্থা  প্রস্তাব উত্থাপনে মুখ্য ভূমিকা পালন  করে ছিলেন। এই  সরকার আসামকে পাকিস্তানের  অন্তর্ভুক্তের  পক্ষে ছিলেন। সেই অনাস্থা  প্রস্তাবে   সাদুল্লা  সরকারের পতন ঘটে কংগ্রেস দলের  মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে গোপীনাথ বড়দলৈ   শিলঙের মসনদে বসে আসামকে রক্ষা করেন। সেই উজ্জ্বল ইতিহাস অসমের জাতীয়তাবাদী  মহল মনে রাখে না।  দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস, স্বামী বিবেকানন্দ, প্রমুখদের  স্মৃতি বিজরিত ধুবুড়িতে প্রথম   বিহু উৎসব উপভোগ করার সৌভাগ্য হল। তিন-চারদিন ছিলাম। ১৯ লাখের বেশি জনসংখ্যার জেলা সংখ্যাগরিষ্ঠ  মুসলিম সম্প্রদায়ের বাস। ২০১১ সালের জনগণনা অনুযায়ী তাদের সংখ্যা ৭৯.৬৯ শতাংশ। সবার মাতৃভাষা বাংলা, আর ১৯.৯২ শতাংশ হিন্দু তাদের অধিকাংশ বাঙালি। চর অঞ্চলের   সীমান্তবর্তী   জেলার  মুসলিম  সম্প্রদায়ের। মানুষগুলো যে অসমীয়া ভাষা কৃষ্টি  ধরে রাখতে পারে  তা রাজ্যের জাতীযতাবাদী  মহল বিশ্বাসই করতে পারে না। তাদের ধারণা, সবাই বাংলাদেশি,   আর চর অঞ্চল, সেখানে সবাই   মৌলবাদী, জেহাদি, বাংলাদেশি অসমের ভাষা-সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধা নেই। এই জেলার ডেপুটি  কমিশনার দেবকুমার কলিতাকে সভাপতি মনোনীত করে গত ১৪  এপ্রিল ধুবুড়ির রাজা প্রভাত  চন্দ্র বড়ুয়া   ময়দানে দিনভর বিহু উৎসব পালন করা হল। কার্যকরী সভাপতি প্রণবা শীষ  রায়, সাধারণ সম্পাদক শিমুল সরকার  প্রমুখ বাঙালি  কর্মকর্তারা ধুতি-পাঞ্জাবি পড়ে , অধ্যাপিকা জুঁই দাস  বাঙালি হয়েও  সমগ্র   অনুষ্ঠান   এনকারিং করলেন  অসমীয়াতে একটি  শব্দও বাংলাতে বললেন    না। 

এই বিহু উৎসবের  স্মারক গ্রন্থ সখিয়োতী  সম্পাদনা করেন  জাকির হোসেন, তিনিও বাঙালি মুসলিম তিন  বাঙালি মুসলিম পরিবারের  শিশু কন্যা  আফ্রিকান রহমান ওরফে বৃষ্টি, ওয়াজিয়া এবং মুবাসিরা  গোয়ালি  নৃত্য পরিবেশন করে। ধুবড়ি আদালতের এডভোকেট  মহুয়া দাস অন্যান্য গৃহ বধূদের সঙ্গে   নাচলেন। প্রায় সবাই বাঙালি পরিবারের। নগণ্য সংখ্যক অসমীয়া  শিল্পী ছিলেন।  বিহু  উৎসবের কর্মকর্তাদের অন্যতম  ছিলেন  গুয়াহাটি  দূর দর্শনর বিশেষ সংবাদদাতা আশিকুর রহমান ওরফে মুকুট এই উৎসবের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে  জড়িয়ে তিনি  অসমীয়া সংবাদ জগৎকে সমৃদ্ধ করে  চলেছেন। তিনি কিন্তু বাঙালি ঘরানার। অসমের জাতীয় উৎসবকে কেন্দ্র করে ধুবুড়ি যে বাঙালি  ছেলে-মেয়েদের মধ্যে প্রবল উৎসাহ দেখলাম। বিহু আগের দিন রাতে   কপৌ ফুল নিয়ে  চিন্তা, যে ফুল মাথার খোঁপাতে  গুজতে না পারলে  বিহু নৃত্য   সম্পূর্ণ হবে না। ইংরেজিতে Dendrobiam aphyllum বলে যা অর্কিড  বলে দেশে পরিচিত। অসমে প্রাইব ১২০০ প্রজাতির অর্কিড পাওয়া যায়। এক বর্ণময়   পরগাছা  ফুল  যা অসমের যৌবন মহোৎসব বিহু উৎসবের  জীবন। দুর্গাপূজার আগে যেমন   শিউলি ফুল আগমনির জানান দেয়, ঠিক তেমনি  বিহু উৎসবের আগে আগে  গাছে গাছে কৌপ ফুল  শোভা পায়। এই ফুল না পেলে  টগর ফুল  হলেও চলবে। মেয়ে বিহু নাচবে।বাবা ছুটলেন গৌরীপুর টগর ফুল আনতে। তিতির  সূচ  সুতা  দিয়ে মালা গেঁথে দিল বোন বৃষ্টি নাচবে বলে। টগর শিশুর 

প্রতীক আর   কপৌ ফুল যৌবনের প্রতীক  বড় মেয়েদের  জন্যে, বিহুৰ আগের দিন   বাঙালি মা তার   শিশু কন্যাকে বিহু নাচের গানের  মহড়া দিল, গছ আগত কুঁহি পাত, তাতে  শুনো কুলির মাতঢোল পেপা বাজিছে, নাহর টগর ফুলিছে, বিহু বিহু লাগিছে।  বিহু প্রতি এত  আগ্রহ, এত উৎসাহ,  এত   আন্তরিকতার কথা  দিসপুর জানে কি? তারা জানে কি  নেতাজি  বিবেকানন্দের স্মৃতি বিজরিত  বাঙালি প্রধান  শহরের হিন্দু মুসলিম সবাই মিলে  অসমীয়া ভাষা  কৃষ্টি  সংস্কৃতিকে রক্ষা করছে আর তার বিপরীতে দিসপুর কি  দিচ্ছে ডিটেনশন ক্যাম্প, ডি ভোটার, এন আর সি  আর নানা ধরনের  হেনস্থা।


কোন মন্তব্য নেই

Blogger দ্বারা পরিচালিত.