বিশ্বদেব চট্টোপাধ্যায়
এই প্রতিবেদন লেখার সময়েও অফিসিয়ালি ঘোষিত হয় নি নন্দীগ্রামে মুখ্যমন্ত্রী মমতার বিরুদ্ধে শুভেন্দু লড়ছেন কিনা ! যদিও আমার কাছে বিশেষ সূত্র মারফৎ খবর ছিলই--মমতার বিরুদ্ধে শুভেন্দু অধিকারী যেমন লড়াই করার ইচ্ছে জানিয়ে রেখেছেন ঠিক তেমনই বিজেপি'র শীর্ষ নেতৃত্বের কেউ তাঁকে তাঁর ইচ্ছায় সম্মতিও জানিয়ে রেখেছেন। সঙ্ঘ পরিবারের বিশেষ কোনো গূঢ় অঙ্ক যদি এখানে কাজ করার সুযোগ পায় তাহলে শুভেন্দুকে এই কেন্দ্রে টিকিট না দেওয়াও হতে পারে। না দিলে মুখ্যমন্ত্রী প্রায় হারা আসনে সহজ জয় পেয়ে যেতেও পারেন।
এখন প্রশ্ন হল, শুভেন্দুকে এই কেন্দ্রে মমতার বিরুদ্ধে যারা চাইছেন না তাদের গোপন হিসেবটা কি? শুভেন্দু যদি মমতাকে ৩৫ থেকে ৫০ হাজার ভোটে হারিয়ে দেন তাহলে তাঁর মুখ্যমন্ত্রীত্বের দাবিকে অগ্রাহ্য করাটা বিজেপি'র পক্ষে মারাত্মক কঠিন হয়ে উঠবে। ইতিমধ্যেই কোনো কোনো মহল সঙ্ঘ প্রচারক দিলীপ ঘোষ এবং স্বপন দাশগুপ্তকে মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে ভাবছেন এবং সেইভাবেই ঘুঁটি সাজাচ্ছেন। এখনও প্রধানমন্ত্রী মোদী এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ এই লবির সমর্থনে এগিয়ে আসেন নি। তাঁরা চূড়ান্ত ফলাফলের জন্য অপেক্ষা করতে চাইছেন। যারা দিলীপ ঘোষকে মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দেখতে চাইছেন তারা কোনো ঝুাঁক নিতে চাইছেন না। সাংসদ দিলীপ ঘোষ রাজ্য সভাপতি হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবেন এটাই স্বাভাবিক ব্যাপার--নিজে প্রার্থী হলে তাঁকে তাঁর কেন্দ্র নিয়েই ব্যস্ত থাকতে হবে। কারণ, তাঁর খড়গপুর কেন্দ্র এখন এই মুহূর্তে আর খাসতালুক নেই। জিততে হলে প্রচুর মাথার ঘাম পায়ে ফেলতে হবে। অথচ তাঁকে এই মুহূর্তে নির্বাচনে না নামিয়েও মুখ্যমন্ত্রী করা যেতে পারে এবং ছ'মাসের মধ্যে উপনির্বাচনে তাঁকে জিতিয়েও আনা যেতে পারে। কিন্তু তেমন কোনো ঝুঁকি দিলীপ লবি নিতে চাইছেন না। অন্যদিকে স্বপন দাশগুপ্ত বিজেপি'র অন্দরমহলে বিশেষ পরিচিত তাত্ত্বিক মুখ হলেও রাজ্যরাজনীতির ভোটের পরিচিত মুখ নন--তাঁর নিজস্ব সাংগঠনিক কোনো ক্যারিশ্মার ছবি নেই। কলকাতা বা তার আশেপাশে যেখানেই তিনি দাঁড়ান না কেন জেতার জন্যে তাঁকে রীতিমতো মাথার ঘাম পায়ে ফেলতে হবে। এই দুই সঙ্ঘপ্রিয় নেতার প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা একেবারেই উল্লেখযোগ্য নয়--যেখানে শুভেন্দু এইসব প্রশ্নে বেশ এগিয়ে থাকছেন। তাই মমতাকে যদি শুভেন্দু হারিয়ে দিতে পারেন তাহলে বেশ অস্বস্তিকর পরিস্থিতির মধ্যে পড়ে যাবেন কট্টরপন্থী সঙ্ঘানুগামী লবি। বিজেপি'র মুখ্যমন্ত্রী নির্বাচনের নজির থেকেই বোঝা যায়--যোগ্যতার মাপকাঠি হিসেবে সঙ্ঘপরিবারের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার গভীরতাকেই তারা গুরুত্ব দিয়ে থাকে। তাই উত্তরপ্রদেশে আদিত্যনাথ যোগী, ত্রিপুরায় বিপ্লব দেব ! আরও আছেন--বেশি দৃষ্টান্তের প্রয়োজন নেই।
এই নন্দীগ্রাম একদা সিপিএমের অবাধ বিচরণ ক্ষেত্র ছিল। বাঘে গরুতে এক ঘাটে জল খেত। এখন আর সেদিন নেই। এখন তাদের অবস্থা এতটাই করুণ যে প্রার্থী-ই খুঁজে পাওয়া যায় না। তার মানে অবশ্য এই নয় যে, এই কেন্দ্রে সিপিএম তথা বামফ্রন্টের ভোটার বলতে কেউ নেই। দল ছেড়ে অনেকেই অন্য দলে চলে গেলেও এলাকা বিশেষে এখনও কিছু ভোটার থাকলেও নিজেদের দমে লড়াই করার মতো ক্ষমতা আর নেই। সিংহভাগ বুথেই এজেন্ট দেওয়ারও ক্ষমতা নেই। ফলে বাম-কংগ্রেস-আইএসএফ জোটের অন্যতম শরিক আইএসএফকেই আসনটি ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। বিশেষ উদ্দেশ্যেই ভাইজানের প্রার্থীর পাশে দাঁড়াতে চলেছে সিপিএম তথা বামফ্রন্ট এবং কংগ্রেসও। নন্দীগ্রামের ২৫% তথা কমবেশি ৬২ হাজার ভোট থেকে ভাইজান যদি হাজার দশেক এবং বাম-কংগ্রেস মিলিতভাবে হাজার পনের ভোট টানতে পারেন তাহলে ঘন্টা বেজে যেতে পারে তৃণমূল কংগ্রেসের। গত লোকসভা নির্বাচনে নন্দীগ্রামে বিজেপি সেভাবে দাঁত ফোটাতে পারে নি। শুভেন্দুর নিজস্ব সংগঠন এবং ভূমিপুত্র হিসেবে লড়াকু ইমেজে ফাটল ধরাতে পারে নি বিজেপি। একুশের নির্বাচনেও যদি শুভেন্দু প্রার্থী হন তাহলে যতটুকু এখনও তাঁর নিজের তাতে কেউ ভাগ বসাতে পারবে বলে মনে হয় না।
দল ছাড়ার বেশ কয়েক মাস আগে থেকেই শুভেন্দু প্রচুর 'অ-রাজনৈতিক' কর্মসূচীর মাধ্যমে প্রায় নিঃশব্দে নিজের মাটি অটুট রাখার কাজটা যখন করে যাচ্ছিলেন তখন আত্মতুষ্টির চূড়ায় বসে থাকা তৃণমূল কংগ্রেস তো বটেই--তাদের কর্পোরেট কৌশলী প্রশান্ত কিশোরও সে সব দেখা বা বোঝার চেষ্টাই করে নি। তাই যখন শুভেন্দু প্রবল আত্মপ্রত্যয়ের সঙ্গে দাবি করছেন তিনি মমতাকে ৫০ হাজার ভোটের ব্যবধানে হারাবেন তখন অনেকেই তাঁকে কটাক্ষ করে ছড়া লিখছেন। মোটা দাগের কমেডি করে চলেছেন। স্থানীয়ভাবে তাঁর মুখোমুখি দাঁড়াবার কেউ নেই বলেই কলকাতা থেকে সৈন্য সামন্ত পাঠাতে বা নিয়ে আসতে হচ্ছে। যারা নিতান্ত স্থূল কৌতুকাভিনয়ের মাধ্যমে শুভেন্দুকেই বেশ খানিকটা করে এগিয়ে দিয়ে যাচ্ছেন। মহিষাদলের মতো এখানেও ভূমিপুত্র দাবি নিয়ে চর্চা শুরু হয়ে গেছে। নন্দীগ্রাম কেন্দ্রে যত মঠ-মন্দির রয়েছে তার প্রায় সবকটিতেই শুভেন্দুর প্রত্যক্ষ প্রভাব রয়েছে। ফলে ৭৫%-এর সিংহভাগ ভোট শুভেন্দুর দিকে গেলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। আজ বর্ষীয়ান সাংসদ শিশির অধিকারীর দু'একটি মন্তব্যেও শুভেন্দুর জোরালো সম্ভাবনার স্পষ্ট আভাস পাওয়া গেছে।
নন্দীগ্রামকে মুখ্যমন্ত্রী মমতা-ই তীব্র আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে তুলে এনেছেন এখানে নিজেকে প্রার্থী ঘোষণার মাধ্যমে। বেশ কিছু সম্ভাবনা দেখা দিচ্ছে এই কেন্দ্রকে ঘিরে। মমতা জিতে গেলেন--কিন্তু দল হেরে গেল--পরিস্থিতিটা যদি এমন হয় তাহলে ব্যক্তিগত লড়াইয়ের ক্ষেত্রে তাঁর অপ্রতিদ্বন্দ্বী ইমেজ বজায় থাকবে। কিন্তু তার জন্যে তাঁকে নন্দীগ্রামের মাটি আঁকড়ে থাকতে হবে বেশকিছু সময় ধরে। উল্টো দিকে যদি শুভেন্দু হেরে যান এবং তাঁর দল জিতে যায় তাহলে শুভেন্দু'র রাজনৈতিক গুরুত্ব অনেকটাই কমে যাবে। কিন্তু যদি শুভেন্দু জিতে যান এবং দলও জিতে যায় তাহলে এই নন্দীগ্রাম নতুন মুখ্যমন্ত্রীর জন্ম দিতে পারে। বিজেপি মহলে এই সম্ভাবনাই ক্রমশঃ জোরালো হয়ে উঠছে। যদি এরকম হয়--শুভেন্দু জিতলেন কিন্তু দল হেরে গেল--তাহলেও শুভেন্দু'র রাজনৈতিক গুরুত্ব বা প্রাসঙ্গিকতা একটুও কমবে না।
কেউ কেউ বলছেন--নন্দীগ্রাম ভোটসংগ্রামে মমতা হেরে গেলে বা জিতে গেলে বিরাট প্রতিক্রিয়া তৈরি হবে। ২৯ মার্চ পর্যন্ত চলতে থাকা ভোট পর্বের মধ্যে কারুর পক্ষেই জানা সম্ভব হবে না--নন্দীগ্রামে কে জিতলেন বা হারলেন--ফলে গোটা নির্বাচনে এই কেন্দ্র কোনো ইম্প্যাক্টই তৈরি করবে না। যা হবে তা ২'রা মে'র পর হবে।
সাধারণতঃ আবেগের বশে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিতে অভ্যস্ত মমতা নন্দীগামে নিজেকে প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করে দিয়ে মারাত্মক একটা আলোড়ন তৈরি করে ফেলেছেন। শুভেন্দুকে যেমন তীব্র ফোকাসের মধ্যে টেনে এনেছেন তেমনই নন্দীগ্রামকে ফের আর একবার ঐতিহাসিক তাৎপর্যও দিয়ে দিলেন। মমতা যেদিন নিজেকে এই কেন্দ্রের প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করলেন আমি সেইদিনই বলেছিলাম--এ সিদ্ধান্ত তিনি না নিলেই পারতেন। বড্ড বেশি ঝুঁকি নিয়ে নিলেন তিনি। এখন আরও বেশি করেই ঐ কথাটাই আমার মনে হচ্ছে। নন্দীগ্রামের স্থানীয় চিহ্নিত নেতা ও তাদের খেয়োখেয়িতে প্রায় কঙ্কালসার সাংগঠনিক কাঠামোর ওপর ভর করে জিতে আসা মমতার নিজস্ব ভাবমূর্তি দিয়েও রীতিমতো কঠিন ব্যাপার। নির্বাচনের শেষমুহূর্ত পর্যন্ত যদি কুণাল ঘোষ, কল্যাণ ব্যানার্জ্জী, মদন মিত্র, সুজাতা মণ্ডল, সৌগত রায়, কাকলি ঘোষদস্তিদার, সুখেন্দুশেখর রায় প্রমুখ নেতানেত্রীরা মাটি কামড়ে পড়েও থাকেন তাহলেও তাঁর জয়টা নিশ্চিত হওয়া খুবই কঠিন মনে হবে।
আমি জানি, আমার রাজনৈতিক পর্যবেক্ষণের সঙ্গে অন্য কোনো পর্যবেক্ষণ খুব একটা মেলে না। আমি বিষয়গুলোকে সবসময়েই একটু ব্যতিক্রমী দৃষ্টিতে দেখে থাকি। আমার সেই দৃষ্টিই বলছে--মমতা হয়তো তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল সিদ্ধান্তটাই নিয়ে ফেললেন !!
কোন মন্তব্য নেই