বিশ্বদেব চট্টোপাধ্যায়
বিজেপি নেতারা সব জানেন--বলতে কি খুব বেশি জানেন--কিন্তু বাংলার রাজনীতিটা বোঝেন খুবই কম। তাঁরা বিশ্বাসই করেন না যে অধিক সন্ন্যাসীতে গোটা গাজনটাই ভেস্তে যায়। যদি এটা বিশ্বাস করতেন তাহলে রাজ্যরাজনীতিতে অত্যন্ত পরিচিত মুখ মুকুল-শুভেন্দু-রাজীব-সব্যসাচী সহ একঝাঁক দাপুটে প্রভাবশালী জনসংযুক্ত নেতাদের প্রচারে নামিয়ে ঝড় তুলতে পারতেন। ভিন রাজ্যের অবাঙালি বিজেপি নেতামন্ত্রীদের মেলা বসিয়ে দিয়ে ফায়দা তোলার মতো কাণ্ডজ্ঞানহীন বেওকুফি করতেন না। গোবলয়ের নেতাদের কথা গোবলয়ের ভোটাররাই গোগ্রাসে গিলবেন--বাংলার ভোটাররা গিলবেন না। মুকুল-শুভেন্দু-রাজীবদের রোড-শো বা জনসভায় যে জনপ্লাবন দেখা যাচ্ছিল অবাঙালি তারকা বিজেপি নেতাদের জনসভায় তা একেবারেই দেখা যাচ্ছে না--নির্বাচনের প্রাক্ মুহূর্তে এ ছবি খুব সঙ্গত কারণেই বিজেপি’র অন্দরমহলে বেশ উদ্বেগ তৈরি করছে।
বাংলায় নানা যুক্তিসঙ্গত কারণেই যোগী আদিত্যনাথের সামান্যতম গ্রহণযোগ্যতা নেই। তবু তাঁকে বার বার বাংলার ভোটারদের সামনে তুলে ধরা হচ্ছে কেন সেটা সঙ্ঘাশ্রয়ীদের বোধগম্য না হলেও রাজনীতিসচেতন নেতাদের তো বোধগম্য হওয়া উচিত। গোবলয়ের নেতামন্ত্রীরা বাংলার রাজনৈতিক সংষ্কৃতির সঙ্গে কতটুকু পরিচিত? তাদের কথা বাংলার মানুষ প্রখর রোদের মধ্যে দাঁড়িয়ে শুনবে কেন? বরং দিলীপ ঘোষ সায়ন্তন বোস শমীক ভট্টাচার্য্যদের কথা লোকে শুনবে--কিন্তু যোগীর কথা এ রাজ্যের মুষ্টিমেয় কিছু সঙ্ঘাশ্রয়ী লোকজন এবং হিন্দীভাষী কিছু ভোটার ছাড়া কেউ শুনতে চাইবে না। বিজেপি’র বঙ্গ নেতারা এটা বুঝেও অমিত শাহ বা জে পি নাড্ডাকে বোঝাবার সাহস পাচ্ছেন না। ফলে সাজানো ঘুঁটি একে একে সরে-নড়ে যাচ্ছে। গোটা রাজ্য দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন গোবলয়ের নেতারা--যাদের কথা সাধারণ মানুষ বুঝতে পারছেন না--বোঝার আগ্রহও দেখাতে চাইছেন না। মানুষ বঙ্গ বিজেপি’র প্রথম সারির নেতাদের কথাই শুনতে চাইছেন--এটা কিন্তু স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে।
টিকিট বন্টন নিয়ে দিকে দিকে যে ক্ষোভ-বিক্ষোভ চলছে তার কারণ অনুসন্ধানে বঙ্গ বিজেপি নেতাদের সক্রিয়তা লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। যদি তারা সক্রিয় হতেন তাহলে দেখতে পেতেন এই সব ক্ষোভ বিক্ষোভের পেছনে কায়েমীস্বার্থের প্ররোচনার পাশাপাশি ভিনরাজ্যের অবাঙালি প্ররোচনাও কাজ করছে। অমিত শাহরা চাইছেন বাংলার পরিবর্তন--কিন্তু নিজের দলের প্রাচীন অচল মানসিকতার পরিবর্তনের কোনো চেষ্টাই করছেন না। ২৯৪-টি আসনে তাদের জিতে আসার মতো ঐসব প্রাচীন অচল মানসিকতার সেন্টিমেন্ট সর্বস্ব নেতাকর্মীদের মধ্যে যে নেই সেটা বুঝলেও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে পারছেন না সঙ্ঘের চাপে এবং কট্টর হিন্দুত্ববাদী বিজেপি’র একাংশ নেতাদের চাপে। এখনও পর্যন্ত চার দফার যে প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে তার মধ্যে খুব কম করে হলেও ৩০% প্রার্থীর জেতার সম্ভাবনা প্রায় নেই বললেই চলে। যারা জেতার কাছাকাছি রয়েছেন তারা যদি বিজেপিতে যোগ দেওয়া তৃণমূল নেতাকর্মী ও সংগঠনের পুরোপুরি সহযোগিতা পান তবেই জিততে পারবেন। গোবলয়ের স্টার নেতারা তাদের জেতাতে পারবেন না। সে ক্ষমতা তাদের থাকলে মুকুল-শুভেন্দু-রাজীবদের প্রয়োজন হত না বিজেপি’র। যাদের যোগদানের ফলে যে বিজেপি বাংলায় পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখা শুরু করল এবং ২০০’র বেশি আসন দখলের লক্ষ্যে ময়দানে ঝাঁপিয়ে পড়ল--সেই বিজেপি তাদের ওপরেই নির্ভরতা কমিয়ে গোবলয়ের নেতা-নেত্রীদের দিয়ে বাংলা জয়ের অবাস্তবাতার দিকেই ঝুঁকে পড়ল। তাদের এই প্রবণতা মানুষ ভাল চোখে দেখছে না। তৃণমূলের সেই অভিযোগ সত্যি বলে ভাবতে শুরু করছে মানুষ--বাংলা অবাঙালি বহিরাগতদের তালুবন্দি হতে চলেছে না তো?
দল ক্ষমতায় এলে ত্রিস্তর পঞ্চায়েত থেকে পুরসভা-কর্পোরেশন অসংখ্য সংস্থা সংগঠনের জন্যে প্রচুর দলীয় নেতা কর্মীর প্রয়োজন হবে। প্রাচীনপন্থী অচল মানসিকতার সাংগঠনিক দক্ষতা মেধাহীন সেন্টিমেন্টাল পুরনো নেতাকর্মীদের পুনর্বাসনের প্রচুর জায়গা থাকবে। সেখান থেকেই তারা ভবিষ্যতের রাজনৈতিক নেতা হয়ে ওঠার সুযোগও পাবেন--তাই এই মুহুর্তে যারা টিকিট নিয়ে দলকে মারাত্মকভাবে বিড়ম্বনায় ফেলছেন তাঁরা সংযত হোন--এই সাধারণ কথাগুলোও বোঝাবার মতো নেতা বঙ্গ বিজেপিতে নেই। নতুন-পুরনোর দ্বন্দ্বকে ইস্যু করে যারা বিজেপি’র বাড়া ভাতে ছাই ফেলছে তাদের মধ্যে ক’জন প্রকৃত বিজেপি রয়েছে সেটা খোঁজার চেষ্টা করছেন না দিলীপবাবুরা।
এরই মধ্যে যাচ্ছেতাই রকমের একটা স্টান্ট দিতে বিচিত্র পোশাকে এবং স্টাইলে বাংলা কথ্যভাষা ভুলে যাওয়া মিঠুন চক্রবর্তীকে মঞ্চে নামিয়ে অতি লঘু মানের ফিল্মি ডায়লগ ঝাড়ানো হল কেন সেটাও অনেকের মাথায় ঢুকলো না। বাংলায় মিঠুনের অভিনয় প্রতিভা নিয়ে যথেষ্ট মুগ্ধতা রয়েছে সন্দেহ নেই--কিন্তু মিঠুনের রাজনৈতিক প্রতিভায় মুগ্ধ মানুষের সংখ্যা কত? বঙ্গ রাজনীতিতে মিঠুনের প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে বিন্দুমাত্র আলোচনা বা চর্চা হয় কি? দেব-মুনমুন-সন্ধ্যা-মিমি-নূসরতদের মতো রাজনীতিতে একেবারেই অপ্রাসঙ্গিক প্রার্থীদের জিতিয়ে আনার যে দম তৃণমূল নেত্রী বা তাঁর দলের ছিল--মিঠুনকে জিতিয়ে আনার সেই দম কি বিজেপি’র এখনও করায়ত্ত হয়েছে? না হলে মোদীর মতো এতবড় মাপের নেতার মঞ্চে মিঠুন ফিল্মি ডায়লগ ঝাড়ার সুযোগ পান কি করে? মানুষ কি তা গিলেছে? নাকি এসব গুরুতর প্রশ্ন নিয়ে মাথা ঘামানোর কোনো প্রয়োজনই মনে হয় নি মিঠুন সঙ্ঘকর্তা মোহন ভগবতের প্রিয়পাত্র বলে? এসব দেখেশুনে মনে করার যথেষ্ট যুক্তি রয়েছে যে--মুকুলকে রাজনৈতিক নীতিগত ভাবনার ক্ষেত্রে নিষ্ক্রিয় করে রাখা হয়েছে বা হচ্ছে। মুকুলের রাজনৈতিক চিন্তাভাবনা সক্রিয় থাকলে একের পর এক এই ধরণের বালখিল্য কাণ্ডকারখানা চলতে পারতো না।
নন্দীগ্রামের ভূমি আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে হঠাৎ করে আদালতের দৃষ্টি আকর্ষণের প্রয়োজন দেখা দিল কেন? নন্দীগ্রাম এমনিতেই মারাত্মক সংবেদনশীল কেন্দ্র এবারে। সামান্য ভুল-ভ্রান্তির চড়া মাশুল গুণতে হবে প্রতিটি দলকেই। খুব মেপে পা ফেলার প্রয়োজন যেখানে সেখানে হঠাৎ করে কবর খোঁড়ার শখ চাগিয়ে উঠল কেন? শেখ সুফিয়ান-আবু তাহের কি সত্যি সত্যি বিজেপি’র সামনে খুব বড় প্রতিবন্ধক হয়ে উঠছিল? ভাবার দরকার ছিল এই স্পর্শকাতর বিষয়টি নিয়ে--বিশেষ করে এই মুহূর্তে। যেচে ইমোশন্যাল অস্ত্র তুলে দেওয়া হল না তো তৃণমূলের হাতে? সত্যাজিৎ ব্যানার্জ্জীকে নিয়ে বিজেপি যতটা মানুষের সেন্টিমেন্টকে উসকে দিতে পারতো এখন ততটা কি পারা যাবে?
বিজেপি’র সীমাহীন অর্থ আছে--বিশাল প্রশাসন আছে--শক্তিশালী তদন্ত সংস্থা আছে--কিন্তু তাদের দুর্বলতা অন্য জায়গায়। থিংকট্যাঙ্ক তো দূরের কথা ছোটখাট ঘটি-বাটিও নেই তাদের হাতে। চিন্তার ভয়ানক দুর্বলতা তাদের প্রকট হচ্ছে মুকুল-শুভেন্দু-রাজীব ও তাদের অনুগামী ও সাংগঠনিক ক্ষমতাকে ঠিকঠাক ব্যবহার করতে না পারার মধ্য দিয়ে। জনা পঞ্চাশেক সঙ্ঘাশ্রয়ী কট্টর হিন্দুত্ববাদী প্রাচীনপন্থী আদি নেতাকর্মীদের দিয়ে রাজ্যজয়ের স্বপ্ন গোবলয়ে দেখা সম্ভব--বাংলায় সম্ভব নয়। যে পথে বিজেপি হাঁটছে সেই পথেই যেতে থাকলে বিজেপি এ রাজ্যে বৃহত্তম দলের মর্যাদার বেশি কিছু পাবে না। ডালুবাবু বলেই দিয়েছেন ত্রিশঙ্কু ফলাফল হলে কংগ্রেস তৃণমূলের পাশেই থাকবে ! ত্রিশঙ্কু ফলাফল হলে ঠিক এমনটাই হবে সন্দেহ নেই। বিজেপি’র হাবভাব দেখে মনে হচ্ছে তারাও নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার আশা ছেড়ে দিয়েছে !!
কোন মন্তব্য নেই