নেতাজি, বিবেকানন্দ ভাঙিয়ে বাঙালিরা আর কতদিন চালাবেন
অমল গুপ্ত গুয়াহাটি
আমাদের প্রধানমন্ত্রী প্রতিবেশী বন্ধু রাষ্ট্র বাংলাদেশ সফরে যাচ্ছেন। তার আগে বঙ্গবন্ধু মুজিবর রহমানের জন্মবার্ষিকী উপলক্ষ্যে টুইটারে তাকে শ্রদ্ধা জানান। তার দুদিন আগে বাংলাদেশের সুনামগঞ্জ জেলার হিন্দু সম্প্রদায়ের ৮টি মন্দির সহ প্রায় ৫০০ গ্রাম জ্বালিয়ে দেওয়া হল। হাসিনা সরকার দুঃখ প্রকাশ করেছেন। বলেছে, শান্তি-সম্প্রীতির দেশ বাংলাদেশ। বাংলাদেশে এই নির্যাতন হেনস্থা নতুন কিছু নয়। অসম তো বাংলাদেশ নয়। এই অসমে ডি ভোটারের নামে, ডিটেনশন ক্যাম্পের নামে, এনআরসির নামে বাঙালিদের হেনস্থা হচ্ছে কেন? বাঙালিরা তো স্বাধীন দেশের নাগরিক। এই দেশে নেতাজি সুভাষ, ক্ষুদিরাম সূর্য্য সেনদের মতো স্বাধীনতা সংগ্রামীদের জন্ম হয়েছে। তাদেরই পূর্বসূরিদের আজ ভিটে-মাটি সুরক্ষিত নয়। বাংলাদেশ, অসম, এমনকি পশ্চিমবঙ্গে কয়েক কোটি বাঙালি ভোট দানের অধিকার সহ সংবিধান প্রদত্ত মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত। তার মধ্যে প্রায় আড়াই কোটি মতুয়া সমাজ।আর নমশুদ্র সম্প্রদায়ের নিম্ন বর্গের মানুষ। আর অসমের পরিস্থিতি বড় জটিল। স্বাধীন ভারতের জেলে যাকে ভদ্র ভাষাতে বলা হচ্ছে ডিটেনশন ক্যাম্প। এই অসমের ৬ টি জেলা কারাগারের মধ্যে ছোট্ট কুঠুরি, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, উপযুক্ত চিকিৎসার ব্যবস্থা নেই। ঠিক মত দু-মুঠো খাওয়া জোটে না। এই অবিচারের বিরুদ্ধে সুপ্রিমকোর্টে পর্যন্ত
দেশের মানবাধিকার সংগঠনগুলো জনস্বার্থে রিট
আবেদন করেছে। কিন্ত কোনো বিচার নেই। আজ পর্যন্ত ৪২৬ জন
বিনাদোষে জেল খাটছেন। ২৭ জন
প্রায় বিনা চিকিৎসায় মারা গেছেন। এছাড়া, ১
লাখের বেশি ডি ভোটার আছে। তাদের ভোট দানের কোনো অধিকার নেই। ডি অর্থাৎ ডাউট ফুল বা
ডিসপিউটেড, সন্দেহ জনক বা বিতর্কিত ভারতের ভোটার অথচ বিতর্কিত
এমন নাগরিক ভু-ভারতে নেই। প্রাক্তন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার টি এন শেষনের সৃষ্টি এই
অদ্ভুত নাগরিক, ১৯৯৭ সালে
ছাত্র সন্থা আসুর চাপে পড়ে নির্বাচন কমিশনার ভোটার
তালিকাতে ভট্টাচার্য, বসু,
রায়, মুখার্জী, আলী হোসেন প্রভৃতি বাঙালি
পদবি নামধারীদের পাশে রুল দিয়ে ডি চিহ্ন লিখে দেওয়া হয়। আজ
তিনদশক ধরে ডি ভোটাররা
সমাজের চোখে অপরাধী। এছাড়াও ১০০টি বিদেশি ট্রাইব্যুনালে
দেড় লক্ষ্যের বেশি মানুষের ভাগ্য ঝুলে
আছে। কবে তারা ভারতীয় হবেন, কবে বিচার পাবে তা
অনিশ্চিত। অসমে তিনবছর ধরে জাতীয়
নাগরিকপঞ্জী হল। ১৬০০ কোটি
টাকা খরচ হল, ৫৫ হাজার সরকারি কর্মচারীকে কাজে লাগানো
হল। শেষ পর্যন্ত ১৯ লাখ ৬ হাজার
৬৫৭ জনকে বাদ দেওয়া হল। গত ৩১ আগস্ট এই প্রতিবেদন প্রকাশ পেল। আজ পর্যন্ত
রেজিস্টার জেনারেল অফ ইন্ডিয়া বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ
করল না। তাদের
নাগরিকত্বের স্থিতি কি, তাদের অধিকার কি, ভারতের নাগরিক তো? সব কিছু অনিশ্চিত। এর মধ্যে
রাজ্য সরকার জানিয়ে দিল তারা এই তালিকা মানবে না। এই তালিকার মধ্যে ১২/১৩ লাখ সেই হতভাগ্য বাঙালি, দেশ
বিভাজন, ৭১ সালের
মুক্তিযোদ্ধ, বাংলাদেশে তার আগে
পূর্ব-পাকিস্তান থেকে নির্যাতিত হয়ে অসম, পশ্চিমবঙ্গ সহ ভারতের
বিভিন্ন অঞ্চলে পালিয়ে আসতে বাধ্য হয়েছিল। আজ ৫০/৬০/৭০ বছর হয়ে গেলো। আজও তারা ভূমিপুত্র হতে পারলো না।
অসমে যাদের খিলঞ্জীয়া বলা হচ্ছে। অসমে
লাখ লাখ বাঙালি কোনো
রকমে মাথা গোজার এক টুকরো স্থান করে নিয়ে
বেঁচে বর্ত্তে আছে। যাদের মানসিক
স্থিতি খুব দুর্বল, তাদের ভয়
দেখিয়ে ভোট আদায় করা খুব সোজা। এই
মানুষগুলোকে কিছুটা প্রাণ
ফিরিয়ে দিত, নাগরিকত্ব সংশোধনী
আইন। বাংলাদেশ পাকিস্থান সহ ৫
টি দেশে যেসব হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ ধর্মের শিকার হয়ে দেশ
ছাড়তে বাধ্য হবে, তাদের এদেশে নাগরিকত্ব দেওয়ার ব্যবস্থা হবে। সংসদে
কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রপ্রতি মন্ত্রী নিত্যনন্দ রাই জানিয়ে দিয়েছেন, এখন
পর্যন্ত রুল তৈরি করা হয়নি। গত ১৮ মার্চ
বললেন, জাতীয় পর্যায়ে এন আর সি নিয়ে কেন্দ্র সিদ্ধান্ত
নেয়নি। এবং তিনি বলেন, কেন্দ্রীয় সরকার কোনো ডিটেনশন
ক্যাম্প গড়তে পারে না। বিদেশি অবৈধ নাগরিকদের বন্দি
রাখার জন্যে রাজ্য সরকারগুলো তা করতে পারে। কয়েকদিন
আগে রাজ্যসভাতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ জানান, এন আর সি
প্রক্রিয়া চলার সময় কোনো রাজ্যে বিদেশি
নোটিস ইস্যু করা যাবে না। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি যেদিন বরাক উপত্যকার
করিমগঞ্জ শহরে বাঙালি
আবেগে উস্কে দিয়ে বাংলায় বললেন, করিমগঞ্জবাসী
কেমন আছেন। সেই দিনেই হ্যা সেই দিন বরাকের শিলচর চার নম্বর
বিদেশি ট্রাইব্যুনাল থেকে কাতিগোড়া
কালাইন গ্রাম পঞ্চায়েত অফিসের
ব্ল্যাক বোর্ড এ বিজয় দাস ও
নুরু দাস নামে দুজনের নামে বিদেশি নোটিশ ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। তাদের দুজনকে ৩১ মার্চের মধ্যে বিদেশি ট্রাইব্যুনাল হাজির
হয়ে ভারতীয় নাগরিকের বৈধ নথিপত্র পেশ করতে হবে। নতুবা বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়া হবে। আজ যদি
নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন চালু থাকতো, নেহেরু
লিয়াকত চুক্তি, মুজিব ইন্দিরা চুক্তি, প্রধানমন্ত্রী
জহরলাল নেহেরু, প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং, উপ-প্রধানমন্ত্রী লালকৃষ্ণ
আদবানিদের সংসদে যে সব প্রতিশ্রতি, আশ্বাস
বাঙালিদের দিয়েছিলেন। তা বাস্তবায়িত হলে এভাবে বাঙালিদের
দ্বিতীয় শ্ৰেণির নাগরিকদের মতো বেঁচে
থাকতে হত না। পশ্চিমবঙ্গ অসমের রাজনীতি বিদ দের
লক্ষ্য এই সব হতভাগ্য বাঙালিদের ভোট। ভোট এসেছে নানা
গাল ভরা আশ্বাস দিতে হবে। ভোট আসবে যাবে। কিন্তু এই লক্ষ কোটি বাঙালির ভাগ্য কোনো
পরিবর্তন হবে না। সে সম্ভবনাও নেই কারণ আত্ম
কেন্দ্রিক, পরনির্ভরশীল, বাঙালি, নিজেরা নিজেদের শত্রু। তারা
শেষের পথে, নেতাজি, রবীন্দ্রনাথ
বিবেকানন্দ নাম ভঙ্গিয়ে আর কত দিন চলা যায়!










কোন মন্তব্য নেই