‘কে গেল আর কে এল সে সব উপেক্ষা করুন’ !!
বিশ্বদেব চট্টোপাধ্যায়
গতকালের ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠকে তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে এ কথা বলতে হয়েছে দলীয় নেতা-কর্মীদের মনোবল অটুট রাখতে--আশ্বস্ত করতে। পুকুরে বা জলাশয়ে এক টুকরো ঢিল পড়লেও তার বেশ কিছু তরঙ্গরেখা পাড়ে এসে ধাক্কা মারে। দলের আনাচেকানাচে বিদ্রোহ ও ভাঙনের যে বড় বড় ঢেউ তৈরি হচ্ছে তাতে মনোবল যে হু-হু করে তলানিতে গিয়ে ঠেকছে এটা নেত্রীর বুঝতে মোটেও অসুবিধে হচ্ছে না। মাসখানেকের মধ্যেই নির্বাচনের বিজ্ঞপ্তি ঘোষিত হতে চলেছে--যাকে বলে শিরে সংক্রান্তি পরিস্থিতি ! এর মধ্যে চতুর্দিকে বিদ্রোহের ভাঙনের বাজনা যে ভাবে কানের পর্দা ফাটিয়ে চলেছে তাতে দলীয় নেতাকর্মীদের চাঙ্গা রাখার জন্যে অক্সিজেন জোগাতেই হবে--তাই ‘কে গেল আর কে এল সে সব উপেক্ষা করুন’ বলতেই হচ্ছে। যদিও দল থেকে কে যাচ্ছে বা আসছে তা উপেক্ষা করা মোটেও খুব সহজ বিষয় নয়। দলে আসা-যাওয়ার ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া যে কতটা কি হতে পারে তা সক্রিয় রাজনৈতিক নেতা-কর্মীরা জানেন নিজেদের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়েই !
তৃণমূল থেকে মুকুল রায় বেরিয়ে এসে বিজেপিতে
যোগ দেওয়ার আগে পর্যন্ত এ রাজ্যে বঙ্গ বিজেপি’র রাজনৈতিক প্রাসঙ্গিকতার ইতিহাস যদি কেউ
নাড়াচাড়া করেন তাহলে দেখতে পাবেন এ রাজ্যে বিজেপিকে নিয়ে তেমন কোনো মাথাব্যথা
প্রায় কারুরই ছিল না। বিজেপি এই রাজ্যে শেকড় ছড়ানোর সুযোগ পায় তৃণমূল কংগ্রেসের
সৌজন্যেই এবং যখন তৃণমূল-বিজেপি’র ভাই-ভাই রাজনীতির রমরমা চলছিল তখন মুকুল রায় তৃণমূলেরই দাপুটে
সেকেণ্ড-ইন-কম্যাণ্ড ! তারপর গঙ্গা দিয়ে অনেক জল গড়িয়ে গেছে। বাড়বাড়ন্ত হয়ে উঠেছে
দলবদলুদের নিয়ে অনৈতিক আদর্শহীন রাজনৈতিক সংষ্কৃতি--এই চূড়ান্ত অনৈতিকতাকে বৈধতা
দিতে হাস্যকর সব যুক্তি পাল্টা যুক্তির আমদানিও করা হয়েছে বা হচ্ছে এখনও। তবু এত
কিছুর পরেও মুকুল রায় বিজেপিতে আসার আগে পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গের যত্রতত্র গেরুয়া
রঙের দাপট দেখা যায় নি। মুকুল রায় তাঁর বেশ কিছু অনুগামী নিয়ে তৃণমূল থেকে বেরিয়ে
এসে বিজেপিতে যোগ দিয়েছিলেন। তাঁর দলত্যাগও ‘কে গেল এল ভাবার দরকার নেই--এক লক্ষ ও রকম
মুকুল রেডি আছে’
মার্কা
ঔদ্ধত্য প্রকাশের মাধমে উড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হলেও নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া ঠেকানো
যায় নি--রীতিমতো আত্মঘাতী হয়ে উঠেছিল। তারপর শুভেন্দুও বেরিয়ে এলেন বেশ কিছু
অনুগামী ও বিদ্রোহী নেতা কর্মীদের সঙ্গে নিয়ে। এবারের প্রতিক্রিয়া আরও মারাত্মক
নেতিবাচক হয়ে দেখা দিচ্ছে।
শুভেন্দু বিজেপিতে যোগ দেওয়ার আগেও এ রাজ্যে
কেন্দ্রীয় নেতারা এসেছেন--মিটিং-মিছিল করেছেন--কিন্তু শুভেন্দু দলে যোগ দেওয়ার পর
রাতারাতি জেলায় জেলায় বিজেপি’র মিটিং-মিছিলের পরিবর্তিত চেহারার সঙ্গে কেউ কি কোনো মিল খুঁজে পাচ্ছেন? আমি তো রাতারাতি এই পরিবর্তনের
চেহারা দেখে আশ্চর্য্য হয়ে যাচ্ছি--যদিও আমি নিজেই লিখেছিলাম--শুভেন্দু’র দলত্যাগের মারাত্মক নেতিবাচক
প্রতিক্রিয়া পড়তে চলেছে তৃণমূল কংগ্রেসে এবং অভাবিত ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি হবে
বিজেপিতে। কিন্তু তাই বলে এত তাড়াতাড়ি এতটা প্রতিক্রিয়া আমিও ঠিক আশা করি নি।
বিজেপি’র কট্টর রক্ষণশীল শূন্যকলস গোষ্ঠী
অবশ্য মুকুল বা শুভেন্দু’র প্রভাবকে মেনে নেবেন
না--নিচ্ছেনও না--তাঁদের ধারণা যা কিছু হচ্ছে তা শুধুমাত্র রাম-লক্ষণ শাহ-মোদী’র ম্যাজিকেই হচ্ছে। এইসব
বাক্-সর্বস্ব আদি বিজেপিদের ধারণা নিয়ে বেশি কথা বলার প্রয়োজন নেই। মুকুল বা
শুভেন্দু তৃণমূল ছেড়ে বিজেপিতে এসে কতটা কি করতে পারলেন সেটা সেই মুহূর্তেই বুঝতে
অসুবিধে হবে না যে মুহূর্তে তিতিবিরক্ত হয়ে উপযুক্ত মর্যাদা না পেয়ে মুকুল ও
শুভেন্দু যদি বিজেপি ছেড়ে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হন। আমি যতটুকু বুঝতে
পারছি--মুকুল শুধুমাত্র তাঁর অপমান ও হেনস্থার উপযুক্ত জবাব দেওয়ার জন্যেই দল
ছেড়েছেন--জবাব না দেওয়া পর্যন্ত তিনি শান্ত হবেন না এবং বিজেপিকে ছাড়বেন না--তবে
তাঁর উদ্দেশ্য পূরণের পর তিনি কি করবেন তা বলা খুবই শক্ত। কারণ, মুকুলকে উপযুক্ত মর্যাদা দেওয়ার
প্রশ্নে বিজেপিও মোটেও সুবিচার করছে না। তারা হয়তো এই ভেবে ভয় পাচ্ছে--মুকুল তৃণমূল
ছাড়লেও মুকুলের হৃদয় থেকে তৃণমূল এখনও বিদায় নেয় নি ! মুকুলের গুরুত্ব ও
প্রয়োজনীয়তা বোঝার ক্ষমতা
তৃণমূল যেমন শেষপর্যন্ত হারিয়ে
ফেলেছিল--বিজেপিও হয়তো হারিয়ে ফেলবে--হারিয়ে টের পাবে মুকুলকে হারালে কতটা কি যায়
বা আসে!
মূলায়ম-লালু-মায়াবতী-জয়ললিতাদের দলের মতো
তৃণমূল কংগ্রেসের গঠনতন্ত্রেও অ্যাডহকতন্ত্র ছাড়া গণতান্ত্রিকতার কোনো স্পেস
নেই--ফলে জেলাস্তর থেকে ভোটের মাধ্যমে তৃণমূলের ওয়ার্কিংকমিটি গঠিত হয় না বলেই
মুকুল-শোভন-শুভেন্দু’র জায়গায় শোভনদেব-চন্দ্রিমা-মলয়
ঘটকদের অন্তর্ভুক্ত করে নেওয়া হল এবং বেশ মজার এবং আশ্চর্য্যরে বিষয়
হল--মুকুল-শুভেন্দু সারদা-নারদা কেলেঙ্কারীতে অভিযুক্ত হয়ে একদিনের জন্যেও জেল
খাটেন নি এবং শুভেন্দুকে কাগজে মুড়ে টাকা নিতে দেখা গেলেও আরও কাউকে কাউকে টাকা
নিতে দেখা গেছে যাদের কেউ কেউ সর্বোচ্চ কমিটিতে এখনও রয়েছেন! তবু নৈতিকতার
প্রশ্নে চুপ করে না থেকেও যখন কেউ মুকুল-শুভেন্দু’র নৈতিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তখন হাসাহাসি
করা ছাড়া মানুষের আর করারই বা কি থাকে! মানুষ তাই হাসাহাসিই করছে--কিন্তু
নেতা-নেত্রীরা তা দেখার ক্ষমতা হারিয়ে বসেছেন! তাই তাঁরা যা উপেক্ষা করার কথা
ভাবার চেষ্টা করেন মানুষ তা করে না। এর যে প্রতিক্রিয়া হওয়ার কথা আসলে সেটাই এখন
স্পষ্ট হচ্ছে।
আজই দেখলাম কেউ বেশ রসিয়ে বলছেন--বিজেপি’র তিনটি ভাগ, আদি নব্য পর্যটক! যিনি বলছেন তিনি
বলার আগে একবারও কান পেতে শোনার চেষ্টা করেন নি তাদেরও তিনটে ভাগ অনেক দিন থেকেই মানুষ
দেখে আসছে--আদি নব্য তৎকাল! আদিদের সিংহভাগই এখন প্রায় বিলুপ্ত প্রজাতি হয়ে গেছে।
এখন নব্য ও তৎকালদের মধ্যেই শুরু হয়ে গেছে শুম্ভ-নিশুম্ভের লড়াই। বিজেপিতে
আদি-নব্য’র লড়াই সামলাবার জন্য রয়েছে তাদের
পর্যটক নেতারা--কিন্তু তৃণমূলের আদি-নব্য-তৎকালের লড়াই সামলাবার কেউ নেই। কারণ
লড়াকুরা জানে তাদের দুষ্টুমিকে কেউ সিরিয়াসলি নেয় না--একটু-আধটু ধমক-চমকের মধ্যেই
সামলানোর ব্যাপারটা সীমাবদ্ধ রাখা হয়--সুতরাং নব্য এবং তৎকালরাই ঘূণপোকা হয়ে
দলের কাঠামোটাকেই নিঃশব্দে ঝাঁঝরা করে দেওয়ার কাজটুকু করে চলেছে--সময়মতো পাল্টি
খেতে তাদের একমিনিটও সময় লাগবে না। শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত কুরেকুরে খাওয়ার সুযোগটুকু চেটে যাবে।
এই অবস্থাটা কিন্তু একদিনে হয় নি। ধীরে ধীরে
একের পর এক ভুলের পথ ধরে এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। আজ বিজেপি’র প্রতিটি মিটিং-মিছিলের চেহারা
দেখে মনে হচ্ছে ২০১১’র আগের তৃণমূলের মিটিং-মিছিলের
রিভার্স ছবি দেখছি আরও খানিকটা বিস্ফোরকের চেহারায়। বিশেষ করে শুভেন্দু বিজেপিতে
যোগ দেওয়ার পর যেন জোয়ার এসে গেছে দলের প্রতিটি স্তরে। শুভেন্দু’র অনুগামীদের নিয়ে অনেক
ঠাট্টা-মশকরা করা হয়েছে--এখনও করা হচ্ছে--কিন্তু সে সবই এখন ব্যুমেরাং হয়ে যাচ্ছে।
আমি আমার বহু লেখায় অনেক আগে থেকেই এই
সম্ভাবনার কথা বলে আসছিলাম। যা যা বলেছি--হুবহু সেরকমই ঘটে চলেছে এখন। এখনও তো বহু খেলা
বাকি! বাকি আছে ‘বহিরাগত’ ও ‘পর্যটক’ তত্ত্বের মারাত্মক আত্মঘাতী প্রতিক্রিয়া। রাজ্যের বহিরাগত
অসংখ্য প্রশাসনিক আধিকারিক,
ব্যবসায়ী, শিল্পপতি সহ অন্যান্য রাজ্যে ‘বহিরাগত’ বাঙালিদের প্রতিক্রিয়া। তুমুল
আলোড়ন তৈরি হচ্ছে এই দুই তত্ত্ব নিয়ে--তাত্ত্বিকদের কানে সেসব ঢুকছে না। সময়
বিশেষে বোধহয় এরকমটাই হয়!!









কোন মন্তব্য নেই