Header Ads

নির্বাচনী বাতাবরণে বাড়ছে উত্তাপ !!

 বিশ্বদেব চট্টোপাধ্যায়

গতকাল নবান্ন থেকে মুখ্যমন্ত্রী রাজ্যপালের সঙ্গে 'সৌজন্য সাক্ষাৎ'-এর জন্য সময় চেয়ে রাজভবনে গিয়েছিলেন রাজ্যপালকে 'ইংরেজি নববর্ষের শুভেচ্ছা' জানাতে। সৌজন্যমূলক শুভেচ্ছা বিনিময়ের জন্যে এক ঘন্টা সময় কেন লাগলো তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে রীতিমতো বেশ কিছু জল্পনা তৈরি হয়েছে। আসলে মুখ্যমন্ত্রী গতকালই খবর পেয়ে থাকবেন যে, আগামী ১৫ ফেব্রুয়ারির মধ্যেই নির্বাচন কমিশন বিধানসভা নির্বাচনের বিজ্ঞপ্তি জারি করতে চলেছেন। রাজ্যপাল এই নির্বাচন প্রসঙ্গে কি ভাবছেন বা তিনি কি রিপোর্ট কেন্দ্রকে পাঠাতে চলেছেন সে সম্পর্কে কিছু আভাস পাওয়ার পাশাপাশি তিনি কি চান সেটাও রাজ্যপালের মাধ্যমে কেন্দ্রকে জানানোর জন্যেও তাঁর সৌজন্য সাক্ষাৎকার এক ঘন্টা ধরে চলতেই পারে। মুখ্যমন্ত্রী ৭ দিনের বদলে খুব বেশি হলে তিন দফায় নির্বাচন চাইতে পারেন, রাজ্যপুলিশের নিয়ন্ত্রণেই তিনি কেন্দ্রীয়বাহিনীকে ব্যবহারের দাবি জানাতে পারেন। প্রশাসনিক রদবদলে রাজ্যসরকারের সম্মতি যাতে থাকে সেটাও তিনি দাবি করতে পারেন। অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই তিন-চারটি দাবি নিয়ে আলোচনা কিছুটা দীর্ঘ হতেই পারে এবং সেটা অম্ল-মধুরও হতে পারে। এই সৌজন্য সাক্ষাৎ সম্পর্কে মুখ্যমন্ত্রী বা রাজ্যপাল--কেউই কোনোরকম সঙ্কেত দেন নি। কাজেই জল্পনা বেড়েই চলেছে। সেটা আরও ডালপালা মেলছে আজই কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ রাজ্যপালকে জরুরি তলব করায়। ফলে প্রশাসনিক উত্তাপ যে বাড়ছে তাতে সন্দেহ নেই।

রাজনৈতিক উত্তাপও যে রীতিমতো বাড়ছে সেটা বোঝা গেল আজ নন্দীগ্রামে শুভেন্দুর ডাকা জনসভার চেহারা দেখে। এই জনসভাকে কেন্দ্র করে যথারীতি দেউলিয়া রাজনীতির কিছু ছবি জনগণ দেখতে পেল। শুভেন্দু'র চ্যালেঞ্জকে ভণ্ডুল করার জন্যে--দলীয় পতাকা ছেঁড়া ও পোড়ানোর হাস্যকর অভিযোগে নন্দীগ্রামের বিভিন্ন প্রান্তে তৃণমূলের মিছিল বের করা ও সভাচলাকালীন কিছু উত্তেজনা তৈরি করার মধ্য দিয়ে রুগ্ন রাজনীতিই প্রকট হল। শেখ সুফিয়ানের শারীরিক ভাষার মধ্যেই ফুটে উঠছিল হার মানার অসহায় অভিব্যক্তি। মেদিনীপুরকে কলকাতার নেতামন্ত্রীদের দিয়ে যে সামলানো যাচ্ছে না সেটা আর আড়াল করা যাচ্ছে না। প্রাক্তন নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে টেক্কা দিতে বর্তমানে তাঁর নেতা দিলীপ ঘোষকে নিয়ে নন্দীগ্রামে জনসভা করলেন শুভেন্দু অধিকারী। ছিলেন মুকুল রায় ও কৈলাশ বিজয়বর্গীয়ও। নিজ-গড়ে সেই সভাতেও বিড়ম্বনায় পড়তে হল শুভেন্দু অধিকারীকে। বিজেপিতে যোগ দেওয়ার পর বিপুল জনসমাগম হলেও সভা প্রায় 'ভণ্ডুল' হতে বসেছিল তাঁর।

মুকুল রায়ের পর তখন কৈলাশ বিজয়বর্গীয় বক্তব্য রাখছেন। বারবার একটা বিশৃঙ্খলা হচ্ছিল সভাস্থলে। বারবারই বক্তৃতা থামিয়ে উপস্থিত কর্মী-সমর্থকদের শান্ত হওয়ার বার্তা দিতে হচ্ছিল। ফের উপস্থিত কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে হইহুল্লোড় পড়ে যায়। সভা প্রায় পণ্ড হয়ে যাওয়ার জোগাড়। বাধ্য হয়েই শুভেন্দুকে মাইক্রোফোনে দিতে হয় বার্তা।

সভাস্থলে উপস্থিত কর্মী-সমর্থকদের একাংশ তখন উঠে পড়েছেন। সভাস্থল ছাড়তে শুরু করেছেন। তখন শুভেন্দু মাইক্রোফোন হাতে বলে ওঠেন, আমি শুভেন্দু অধিকারী বলছি। আমাকে বিশ্বাস করেন তো? তাহলে বসে পড়ুন। ততক্ষণে অনেকে চলে যেতে গিয়েও আবার বসে পড়েন প্রিয় শুভেন্দুর আবেদনে।

এরপর দিলীপ ঘোষ বলেন, সভা ভণ্ডুল করে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছিল। নন্দীগ্রামে বিজেপির সভায় এত ভিড় দেখেই চক্ষু চড়কগাছ হয়ে যায়। তারই জেরে এই সভা ভণ্ডুলের চেষ্টা করা হয় বলে তৃণমূলের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন দিলীপবাবু। আর শুভেন্দু বলেন, ঢিল মেরে প্ররোচনা দিয়ে এই সভা ভণ্ডুলের চেষ্টা করা হয়েছে।

এদিকে যখন নন্দীগ্রামে শুভেন্দুর জনসভার মঞ্চে মুকুল রায় কৈলাস বিজয়বর্গীয় দিলীপ ঘোষরা বক্তৃতা দিচ্ছিলেন এবিপানন্দ তখন বরানগরে বক্তৃতারত সৌগত রায়ের ভাষণ শোনাচ্ছিল জনগণকে ! সন্ধ্যা সাতটায় 'সুমনের জলসাঘর'-এ আয়োজিত যুক্তিতক্কো'র অনুষ্ঠানে রাজনৈতিক ব্যক্তিদের বক্তব্য শোনার আগ্রহ আমার কোনো কালেই থাকে না--কারণ, তাঁরা কি বলবেন বা মানুষকে বোঝাবার চেষ্টা করবেন তা আমার মুখস্থই থাকে। শুনছিলাম অরাজনৈতিক বক্তাদের বক্তব্য। এর মধ্যে অনিন্দ্য-রুদ্রনীল-তিলোত্তমা'র বক্তব্য শ্রুতিগ্রাহ্যতা আদায় করে নিতে পেরেছে। ওপেন ফোরামে একটি প্রশ্নের উত্তরে যখন রুদ্রনীল মুখ খুলছিলেন তখন চোখে চোখে ইশারার পর হঠাৎই জলসাঘরের সঞ্চালক রুদ্রনীলকে থামিয়ে দিয়ে তৃণমূলনেতাকে কিছু বলবেন কিনা জিজ্ঞেস করতেই তৃণমূল নেতা অত্যন্ত তাৎপর্য্যপূর্ণ কয়েকটি মন্তব্য করে রুদ্র্রনীলকে নির্বাক্ হয়ে তাকিয়ে থাকতে বাধ্য করলেন ! আমি সাধারণতঃ 'সুমনের জলসাঘর' দেখি না--কারণ, দেখার যোগ্য বা শোনার যোগ্য প্রায়শঃই কিছু থাকে না, শুধু বিশেষ পছন্দের ঢাকে কাঠি নাচানো ছাড়া। যে ধরণের নির্বোধ চিৎকার এবং মেছোবাজারকে হার মানানো হল্লা চলে এইসব আসরে তা ভদ্রলোকদের পক্ষে খুব বেশি সহ্য করা সম্ভব হয় না। দুর্ভাগ্যবশতঃ এই ধরণের অশ্রাব্য বৈঠকে যারা অংশ নেন তাদের মধ্যে প্রায়শঃই অধ্যাপক-শিক্ষক এবং রাজনৈতিক দলের প্রতি নিঃশর্ত আনুগত্যে আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা কিছু প্রতিনিধিও থাকেন। আমি কিছুতেই ভেবে উঠতে পারি না--এরা কি করে এইরকম আচরণ সংবাদমাধ্যমের বৈঠকখানায় বসে করতে পারেন ! নির্বাচন এগিয়ে আসছে--এই ধরণের বৈঠকের আয়োজনের সংখ্যাও বাড়বে ! নতুন করে সেজেগুজে ওঠা এবিপানন্দ কি একটু দলনিরপেক্ষ হতে পারতো না? তাদের এই অবস্থান যে তিন মাস পরেও একই রকম থাকবে--এমন নিশ্চয়তা কি থাকছে? অবশ্য সংবাদ চ্যানেলের রাতারাতি পাল্টি খাওয়ার নজির খুব কম নেই !

ইতিমধ্যেই বাজারে শোনা যাচ্ছে--প্রশান্ত কিশোর নাকি তৃণমূল কংগ্রেসের প্রার্থী তালিকায় ২০০ নতুন মুখ আনার পরামর্শ দিচ্ছেন ! মুখ্যমন্ত্রী সেটা মেনে নেবেন কিনা সেটা অবশ্য কেউ জানে না। কিন্তু যদি তিনি এই পরামর্শ মেনে নেন তাহলে পুরনো ২০০ প্রার্থীর মধ্যে খুব কম করেও ১৫০ জনকে হারাতে হবে। কারণ, এমনিতেই ১৫০ জনের মতো প্রার্থী টিকিটের অনিশ্চয়তার পাশাপাশি হেরে যাওয়ার আতঙ্কে অস্থির হয়েই রয়েছেন। টিকিট না পেলে খুব সহজেই দল ছেড়ে অন্য দলে নাম লেখাতে তাদের বিশেষ অসুবিধে হওয়ার কথা নয়। সুতরাং নির্বাচনী উত্তাপ যে যথেষ্ট পরিমাণে বাড়তে চলেছে তাতে কোনো সন্দেহই নেই।

কোন মন্তব্য নেই

Blogger দ্বারা পরিচালিত.