ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার বাঙালিরা নিজেদের বাঙালি পরিচয় দিতেও ভয় পায়
প্রশান্ত চক্রবর্তী
গুয়াহাটিতে বইমেলা চলছে। সেদিন বইমেলায় অসম প্রকাশন পরিষদের সাহিত্য পত্রিকা "প্রকাশ"-এর উদ্যোগে সোশ্যাল মিডিয়ায় সাহিত্যচর্চা নিয়ে একটি আলোচনাসভা হলো। এই অভাজন সেটার উদ্বোধক, আর সঞ্চালক স্বনামধন্য অসমিয়া সাহিত্যিক ফণীন্দ্রকুমার দেব চৌধুরী। তিনটি জনপ্রিয় অসমিয়া ফেসবুক গ্রুপের এডমিন ও কাণ্ডারীরা এতে অংশগ্রহণ করেছেন। "ফটা ঢোল"(ফাটা ঢোল) "অসমিয়াত কথাবতরা"(অসমিয়াতে কথাবার্তা) আর "অর্ধ আকাশ"। "অর্ধ আকাশ"টি একান্তই নারীদের গ্রুপ। বাকিদুটো অপেন। প্রত্যেকটি গ্রুপে লাখের ওপর সদস্য।
দীর্ঘ তিন ঘণ্টার আলোচনা, আড্ডা। মঞ্চে বসতেই নজরে পড়েছিল এক অসমিয়া তন্বী সুন্দরী সামনের সারিতে বসা। গলায় একটি স্থানীয় অলংকার। ওতে লেখা রবীন্দ্রনাথের একটি বহুশ্রুত গানের প্রথম কলি~"তুমি রবে নীরবে"(ছবি দিলাম, জুম করে দেখুন)। অনুষ্ঠানের শেষে ওঁর সাথে পরিচয় হলো। মেঘনা চৌধুরী। আদি বাড়ি গোয়ালপাড়ায়। বিয়ে হয়েছে উজান অসমে। আর চাকরি অসম সরকারের তথ্য ও জনসংযোগ দপ্তরে। মেঘনা "অর্ধ আকাশ" গ্রুপে দুরন্ত উপন্যাস লিখে রাতারাতি হইচই ফেলে দিয়েছেন। মেঘনা অসমিয়াতে নতুন করে এমন একটা উপন্যাস লিখছেন~যার পটভূমি পূর্ব ও পশ্চিমবঙ্গ মিলে অবিভক্ত বঙ্গদেশ। কাল : ১৮৮০।
এরকম অসংখ্য মেঘনা আছেন অসমিয়া সমাজে।
গুয়াহাটি বইমেলায় বাংলা বইয়ের সবচেয়ে বেশি ক্রেতা কারা জানেন? অসমিয়া মানুষ। কি, বিশ্বাস হচ্ছে না? চলুন~কলকাতার 'চক্রবর্তী চ্যাটার্জি', 'দেবসাহিত্য' আর 'গিল্ড' এসেছে। জিজ্ঞেস করে আসি? অসমের উচ্চ শিক্ষিত অসমিয়া মানুষ আজও বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতিতে ডুবে আছেন। ভালোবেসে পড়েন, শোনেন, দেখেন। রবীন্দ্রনাথে, জীবনানন্দে, জয় গোস্বামীতে অবগাহন করেন। সুনীল শীর্ষেন্দু থেকে বিনোদ ঘোষাল অব্দি তাঁদের আনাগোনা। সেই তুলনায় ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার বাঙালিরা কতটা অসমিয়া সাহিত্য পড়েন?! বাঙালি ঘরের ছেলেপুলেরা ইংরেজি মাধ্যমে দৌড়ুচ্ছে। শহরনগর তো আগেই গেছে, এখন গাঁ-গঞ্জও। একের পর এক বাংলা মাধ্যমের স্কুল ইংরেজি বা অসমিয়া মাধ্যমে রূপান্তরিত হচ্ছে(মালিগাঁওর নেতাজি বিদ্যাপীঠ ইতিমধ্যে ইংরেজি মাধ্যম হয়ে গেছে)। যেকয়টা বাংলা স্কুল আছে~সেগুলোর অন্তিম দশা যেন। সেই গৌরবধারা নেই। ওইসব স্কুল থেকেই কত বড় বড় মানুষ জন্মেছেন। গুয়াহাটির পল্টনবাজার বাংলা স্কুলটির ছাত্র স্বনামধন্য ইতিহাসবিদ গৌতম ভদ্র (কলকাতায় থাকেন) বা ড. অমলেন্দু গুহ কিংবা অসমের জনপ্রিয় গায়ক পুলক ব্যানার্জি। এইসব স্কুল আজ ম্রিয়মাণ। সমাজের অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা মানুষদের ছেলেপুলেরাই ওইসব স্কুলে পড়ে। সেই তুলনায় অসমিয়া, বড়ো বা অন্যান্য মাধ্যম এখনও উজ্জ্বল। অসম সাহিত্য সভা দীর্ঘদিন ধরে সরকারের পেছনে লেগেছিল। ওই চাপে অসম সরকার এখন নতুন আইন এনেছে, সরকারি, বেসরকারি সমস্ত স্কুলেই মাতৃভাষা(বলা ভালো প্রথম ভাষা)পড়ানো বাধ্যতামূলক। ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায় মূল ভাষা অসমিয়া ও বড়ো। আর মূল সংযোগী ভাষা~অসমিয়া। সেক্ষেত্রে বাঙালি ঘরের বিদার্থীরাও অসমিয়া শিখবে। শেখা উচিত। অসমিয়া ভাষাসাহিত্য পড়া উচিত। অসমের মূল জনসংযোগী ভাষা বা লিংগুয়া ফ্রাংকা অসমিয়াকে জানতেই হবে। কিন্তু ঘরের ভাষা বাংলাটাকে বিসর্জন দিয়ে তো নয়। বাংলা ও অসমিয়া আমাদের মাতৃভাষা ও ধাত্রীভাষা।
ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার বাঙালিরা (পড়ুন হিন্দু বাঙালিরা) এখনও একটা নিজস্ব পকেটে পকেটে আবদ্ধ। অন্যান্য জনজাতিরা, বড়ো, মিসিং, কার্বি, ডিমাসা, রাভা হাসং~সবাই বাৎসরিক সাহিত্যসংস্কৃতিমূলক মেলা করে। সবারই নিজস্ব সাহিত্যসভা আছে। নেই শুধু এখানকার বাঙালির। কেননা~বাঙালি একাই একশ, কিন্তু একশ বাঙালি একসাথে চলতে পারে না।
ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার অন্যতম প্রাচীন নাট্যমঞ্চ তথা পাবলিক হল গুয়াহাটির পানবাজার শুক্রেশ্বরে অবস্থিত "আর্যনাট্য সমাজ"(১৮৯৬) দখল করা হয়, পরে পর্যায় ক্রমে ভেঙে ফেলা হয় কয়েক বছর আগে। ওই সভাগৃহে পদার্পণ করেছেন~স্বামী বিবেকানন্দ, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ, স্যার আশুতোষ, সুসাহিত্যিক শরৎচন্দ্র, নেতাজি সুভাষচন্দ্র, ভাষাচার্য সুনীতিকুমার, রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়, পূজ্যপাদ গড়মুর সত্রাধিকার, কর্মবীর নবীনচন্দ্র বরদলৈ, বিশ্ববিশ্রুত বিজ্ঞানী মেঘনাদ সাহা, ডা, নীলরতন ধর, দেশভক্ত তরুণরাম ফুকন, 'বাঙালির ইতিহাস'-প্রণেতা নীহাররঞ্জন রায়, ড. রাধাকুমুদ মুখোপাধ্যায়, 'শনিবারের চিঠি'-র সম্পাদক সজনীকান্ত দাস, হুমায়ুন কবীর, ভারতরত্ন গোপীনাথ বরদলৈ প্রমুখ। ভাবুন!!!! ড. ভূপেন হাজরিকা ও কলাগুরু বিষ্ণু রাভার 'মুক্তিদেউল' ওখানেই প্রথমে অভিনীত হয়।
অমন গৌরবোজ্জ্বল সভাগৃহটি যখন ভাঙা হয়~গুয়াহাটির তথাকথিত সাহিত্য সংস্কৃতি 'সমাজ'-এর বাঙালিদের মুখেমুখে আমসি ছিল। অথচ, এই প্রেক্ষাগৃহ রক্ষা করার জন্য সাহিত্য অকাদেমি ও সংগীতনাটক অকাদেমিপ্রাপ্ত প্রয়াত অরুণ শর্মা আর যশস্বী নাট্যব্যক্তিত্ব, চলচ্চিত্রঅভিনেতা কুলদাকুমার ভট্টাচার্যর নেতৃত্বে সমিতি তৈরি করেছিল অসমিয়া সমাজ। মসদ্দর হুসেন আর এই অভাজন ছিল সম্পাদক। আমি গুয়াহাটির বাঙালি সমাজ-এর মুখিয়ালদের জনে জনে বলেছি। সভা করেছি। প্রায় হাতেপায়ে ধরেছি। সভায় দেখেছি~এরা 'ঠেলাঠেলির ঘর, খোদায় রক্ষা কর্' নীতি নিয়ে যে যার গর্তে ঢুকে পড়েছিল।
প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী মনোমোহন সিংহ দায়িত্ব নিয়ে(অসম থেকে রাজ্যসভার সাংসদ ছিলেন) গুয়াহাটিতে এসে একটি নৈশ ভোজের আয়োজন করেন। হোটেল ব্রহ্মপুত্র অশোকে। ওখানে অসম সাহিত্য সভা, বড়ো সাহিত্য সভা সহ অসমের সমস্ত জনগোষ্ঠীয় সাহিত্যসভাকে নেমতন্ন করেছিল প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর। এক লেডি ডেপুটি কমিশনার লেভেলের অফিসার আমাকে ফোন করেন~বাংলা সাহিত্য সভাকে নিমন্ত্রণ করার জন্য। কিন্তু গুয়াহাটির বাঙালিদের সাহিত্যসভা কই? আমি সবিনয়ে সেকথা জানাতে তিনি অবাক। এত্ত এত্ত বাঙালি~এদের কোনো সাহিত্যসভা নেই!!!
আমি বললাম~আছে একটা, সেটা আমারই প্রচেষ্টায় তৈরি হয়েছিল। ওটা এখন শখের সাহিত্যবাসর। বছরে একটা রবীন্দ্রজয়ন্তী, দুটো অমুকতমুকের গপ্পপাঠ~এইসব নিয়ে এরা মেকি বাঙালিয়ানায় ডোবা। ওই যে ঘটনাটা মনে আছে? বঙ্কিমের কমলাকান্ত গেছেন বড়বাজারে। গিয়ে দেখেন~কতকগুলো অপক্ব কদলী। কমলাকান্ত জিজ্ঞেস করেছেন~এগুলি কী? উত্তর এল~'বাঙ্গালা সাহিত্য'। বেচিতেছে কে? উত্তর~ আমরাই। কিনিতেছে কে~আমরাই। এদেরও এই দশা। এরা পরস্পরের পিঠ চাপড়ায়। ঘামাচি খুঁটে দেয়। শখের লিটল ম্যাগ করে। সংকলন করে। অসমিয়া জাতীয় জীবনের মূল স্রোতকে এরা বরণ করে না। মূল অসমিয়াভাষী সমাজকে এরা আপন করতে চায় না। মেশে না। অসমের বৃহত্তর সমাজজীবনের এরা অঙ্গ হতে চায় না। এক অসমিয়া বন্ধু ঠাট্টা করে কাগজে আমাকে বলেছিল ~'ঘেট্টো' বাঙালি(Getto~a part of a city, especially a slum area, occupied by a minority group or groups)। ঠিকই বলেছে। নিজেদের পকেটে পকেটে ঢুকে এরা নিরাপদ অনুভব করে। অসমের সমস্ত জনগোষ্ঠীরই নিজস্ব সাহিত্য সভা, বাৎসরিক উৎসব আছে। এদের নেই। প্রকাশ্যে 'বাঙালি' পরিচয়টি দিতেও ভয়। এদের মধ্যে প্রবল উদ্বাস্ত মানসিকতা। কয়েকবছর আগে, শিলঙে লিটল ম্যাগ সম্মেলন করবে, আমি বললাম~ওখানকার সব বাংলা ও অসমিয়া স্কুল বন্ধ হয়ে গেছে~বাংলা পড়ার লোকই তো কমে এসে তলানিতে, ওইসব করে কী হবে। পরে শুনি~দিনে পদ্য রাতে মদ্য। গুয়াহাটি তিনসুকিয়ায়ও এইসব হলো। অথচ বাংলা বিভাগগুলোয় ছাত্রছাত্রী নেই। ওই জনাকয় লোক নিজেরাই নিজেদের মধ্যে তথাকথিত সাহিত্যচর্চা করে। বড়ো, বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী, কার্বি-ডিমাসা ইত্যাদি জনগোষ্ঠীর মধ্যে যে স্বাজাত্যবোধ আছে~সেটাও এদের নেই।
কেন্দ্র সরকার নতুন শিক্ষানীতিতে মাতৃভাষার বা স্থানীয় ভাষায় শিক্ষার কথা ঘোষণা করেছেন। রবীন্দ্রনাথ~সেই কবে বলেছিলেন, "ইংরেজি আমাদের কাজের ভাষা, ভাবের ভাষা নহে"। আন্তর্জাতিক সংযোগ ইংরেজিতে, রাষ্ট্রীয় সংযোগ হিন্দিতে, প্রাদেশিক সংযোগ অসমিয়াতে রেখেও তো আমরা নিজের সত্তার ভাষাকে বজায় রাখতে পারি। আজকের পৃথিবী বহুভাষাভাষীর পৃথিবী। কিন্তু মননের ভাষা তো সবারই থাকে। কার্বিভাষী রংবং তেরাং বাড়িতে কার্বি বলেন। কিন্তু অসম সাহিত্য সভার সভাপতি ছিলেন। লিখেছেন ''রংমিলির হাঁহি"-র মতন কালজয়ী রচনা।
পকেটে চিরকুট(এখন মোবাইলে), কবিতা~চিবিয়ে-চিবিয়ে দুটো রবীন্দ্রসংগীত, পাড়ায় কালিবাড়ি, দুগ্গাপূজা, শনির থান~কলোনির আঁটোসাটো এইটুকুনসব ঘর, রেলের জমিতে ক্লাবের নামে তাস, মদ~অনাবশ্যক হুল্লোড়...এই 'ঘেট্টো'-জীবনই তো শেষ কথা নয়। বইমেলায় অসমিয়া ঔপন্যাসিক রজনীকান্ত বরদলৈর ওপর আলোচনাচক্র হবে~রজনীকান্ত যেহেতু বঙ্কিমচন্দ্রকে অনুসরণ করেছেন কিছু ক্ষেত্রে তাই একজন বাঙালি বক্তার প্রয়োজন। কিন্তু কাউকে পাইনি। অসমিয়া টিভিতে টক-শো। টিভির লোকেরা আমাকে বলে~'এজন বাঙালি বক্তা দিয়ক', কেউ যেতে রাজি না। ভয়। গা বাঁচিয়ে চলা। "পাছে লোকে কিছু বলে"। অসমিয়া সমাজের একটা বিরাট অংশ সৌহার্দ্যের হাত বাড়াতে চায়। আমরা নিজস্ব চৌহদ্দি ভাঙতে রাজি নই। দুবছর আগে, বইমেলার মাঠে~"বরাক উৎসব" করেছি আমরা। দিনভর। ভাবা যায়? বইমেলার মাঠে অনুজবন্ধু সুশান্ত চৌধুরী (বাপি)অসমিয়া গান গাইছিল~অসমিয়া দর্শকেরা ওকে বারবার মান্না দে, হেমন্ত মুখার্জি গাইবার জন্য অনুরোধ করছিল।
নিজের বৃত্তের বা গর্তের মধ্যে গল্পকবিতাপাঠ করে আত্মতৃপ্তিতে ভোগা এইসব 'ঘেট্টো' বাঙালিদের ঠিক এইজন্যই অসমিয়াদের একটা মহল তাই বিশ্বাসে নেয় না। একটা দূরত্ব অহরহ তৈরি হয়েই চলছে। সেটা বাড়তে বাড়তে রাজনৈতিক স্তর সেই স্বরাজোত্তর সময় থেকেই জমে পাহাড়। অসমিয়া-বাঙালি সংকটের মূল বীজ কিন্তু এখানেই। ইতিহাস সেটাই বলে।









কোন মন্তব্য নেই