কান্দির সিংহ বংশীয় রাজ বাড়ির ইতিহাস-
ড: তাপস বন্দ্যোপাধ্যায়
এই কৃষ্ণচন্দ্র ছোটবেলা থেকেই খুব ভক্তিমান ছিলেন। তাঁদের কূলদেবতা রাধাবল্লভের মন্দিরে গিয়ে তিনি প্রত্যহ ধ্যানজপ করতেন অল্প বয়স থেকেই।
অল্প বয়স থেকেই তাঁর দয়ালু স্বভাব ও সরলতার খ্যাতি আশেপাশে ছড়িয়ে পড়েছিল।
একদিন রাজবাড়ির কাছে কন্যাদায়গ্রস্ত একজন ব্রাহ্মণ এসে তাঁর কাছে হাজার টাকা
ভিক্ষা চায়। যুবরাজ কৃষ্ণচন্দ্র কোষাধ্যক্ষকে গিয়ে বললেন, সেই টাকা দিয়ে দিতে। কিন্তু কোষাধ্যক্ষ এত
বিপুল পরিমাণ টাকা দিতে ইতস্তত করে। তখন সস্তার বাজার। টাকায় কুড়ি কেজি চাল পাওয়া
যেত। কোষাধ্যক্ষ রাজা প্রাণকৃষ্ণের (কৃষ্ণচন্দ্রের বাবা) কাছে গিয়ে অনুমতি চাইলো।
প্রাণকৃষ্ণ পুত্রকে গিয়ে বললেন – ‘আগে নিজে রোজগার
করো। নিজের রোজগার থেকে দানছত্র করো। রাজকোষের টাকা এভাবে অপব্যয় করা যাবে না’।
এই ঘটনায় যুবক কৃষ্ণচন্দ্র প্রচণ্ড অভিমানাহত হন। পরদিন তিনি গৃহত্যাগ করে (১৭৯২ খ্রি) বর্ধমানে চলে যান। বর্ধমানে গিয়ে সম্যকভাবে পারসি ভাষা শিক্ষা করেন। তখন বর্ধমানের রাজপরিবারের আশ্রয়ে থেকে তিনি লেখাপড়া শিখে বর্ধমান জেলা আদালতের সেরেস্তাদারের চাকরি পান। সেখানে চাকরি করে বিশালাক্ষ্মীপুরের জমিদারী কেনেন। পরে তিনি উড়িষ্যায় যান দেওয়ানের কাজ নিয়ে (১৮০৩ খ্রি) । এই সময়ে তিনি কয়েকটি পরগণার দায়িত্ব পান এবং বিপুল পরিমাণে অর্থ ও সম্পদের মালিক হন। ১৮০৯ খ্রিষ্টাব্দে প্রাণকৃষ্ণ মারা যান। তারপর কৃষ্ণচন্দ্র কান্দিতে ফিরে আসেন। বাবার মৃত্যুর পর পারিবারিক রীতি মেনে পিতৃশ্রাদ্ধ করেন।
এর কয়েক বছর পরে তিনি রসোরার ঘোষ পরিবারের কন্যা কাত্যায়নীকে বিয়ে করেন। বাবার
বিপুল সম্পত্তি ও নিজের কেনা জমিদারী নিয়ে তার মনে কোনো তৃপ্তি ছিল না। তার মন
ধীরে ধীরে বৈরাগ্যের দিকে এগিয়ে যেতে লাগলো। এই সময় একদিন তিনি পালকি করে বাড়ি
ফিরছিলেন। হঠাৎ পথিমধ্যে একটি সুমধুর গান শোনেন। চলন্ত পথে গানের একটি কলি তাঁর
মনে খুব প্রভাব বিস্তার করে। পালকি থেকে নেমে দেখেন — তাদেরই প্রজা একজন ধোপার মেয়ে একটি গান গাইছে –
‘বেলা যে যায়, জলকে চল’। কারও মতে গানের কলিটি ছিল – ‘বেলা যে যায় বাসনা কখন জ্বালাবে !’ ধোপারা কাপড় রঙ করবার জন্যে কলাগাছের পাতার
গোড়ার অংশ বা বাস্না জলে সেদ্ধ করে। একে ‘বাস্না জ্বালানো’ বলা হয়।
কৃষ্ণচন্দ্র বাস্না কথার অর্থ করলেন — বাসনা বা কামনা, আকাঙ্ক্ষা। তিনি
ভাবলেন — বাসনা তো ত্যাগ
করা গেল না। সংসারে শুধুই বন্ধন আর বাসনার বেড়ি চারদিকে। অহরহ সেই বাসনার রজ্জুতে
আবদ্ধ হতে হচ্ছে তাকে। সেই পরমপুরুষের সন্ধান তো পাওয়া গেল না।
তারপরে পারিবারিক উকিল কলকাতার চোরাগানের নীলমণি বসুর হাতে নাবালক পুত্র ও
সমস্ত সম্পত্তি দেখাশোনার ভার দিয়ে তিনি বৃন্দাবন যাত্রা করেন। সঙ্গে নিয়ে যান
প্রায় কুড়ি লক্ষ টাকা। পথিমধ্যে সেই টাকার কিছু অংশ চুরি হয়ে যায়। কিছুদিন কৃষ্ণের
লীলাভূমিতে থাকতে থাকতে তাঁর মনে প্রবল বৈরাগ্য উপস্থিত হয়। এই সময় বৃন্দাবনের
একটি এলাকা সরকারের নিলামে ওঠে। স্থানীয় শেঠরা সেই সম্পত্তি নিলামে ডেকে অধিকার
করে। তিনি তাঁর বালিশের মধ্যে লুকানো বেশি মূল্যের একটি আঙ্টি দিয়ে সেই সম্পত্তি
কিনে নেন। গড়ে তোলেন বিশাল মন্দির। তার চারপাশে অপরূপ ফুলের বাগান। তখন তার
দীক্ষাগ্রহণের বাসনা জাগে মনে। স্থানীয় বৈষ্ণবগুরু কৃষ্ণদাসের কাছে যান। কিন্তু
তিনি বলেন – ‘তোমার এখনো সময়
হয়নি’। কবি কালিদাস রায়ের
ভাষায় –
‘লালাবাবু বৈরাগী গুরুকরণের লাগি / সারা পথ ভরি ভেট উপহার পুঞ্জ।/ বাবাজি
কৃষ্ণদাস যেখানে করেন বাস/ একদা এলেন সেই নিভৃত নিকুঞ্জে’।
এরপর কৃষ্ণচন্দ্র সিংহ সকল টাকাকড়ি বৃন্দাবনের পথে বিলি করে দেন। যাকে পান
তাকেই কৃষ্ণকথা জিজ্ঞেস করেন। কিন্তু কৃষ্ণদাস বলেন – ‘এখনও সেই লগ্ন আসেনি’। এবার তিনি বৃন্দাবনের পথে পথে ভিক্ষা করতে
থাকেন। মাধুকরী থেকে পাওয়া অন্ন ভোজন করেন তিনি। কিন্তু ‘অহং’ যায় না। রূপের, রাজত্বের,
সম্পদের অহমিকা তাকে ছাড়ে
না। একদিন বৃন্দাবনের পথে মাধুকরী করতে গিয়ে দীর্ঘদিনের শত্রু, প্রতিযোগী শেঠদের বাড়ির সামনে উপস্থিত হন।
ভাবেন এই ‘অহমিকা’ তো এখনও যায় নি। এদের বাড়িতে তো ভিক্ষা করা হয়
নি। কবি কালিদাসের ভাষায় – ‘এত ভাবি একেবারে
শেঠের তোরণ দ্বারে/ হাঁকিলেন লালাবাবু শ্রীরাধে গোবিন্দ/শেঠেদের ঘরে ঘরে সে ধ্বনি
সাড়া পড়ে/ ছুটে আসে পরিচর পরিজন বৃন্দ’। এতদিন উভয়ে উভয়ের শত্রু ছিল কিন্তু উভয়েই ছিল কৃষ্ণভক্ত। আগে ঐশ্বর্য্যের
প্রতিযোগিতায় কৃষ্ণচন্দ্রের কাছে হেরে গিয়েছে জগত শেঠ। আজ অন্যভাবে মিলন হলো দুজনে—‘শেঠ কয় জুড়ি পাণি আজ পরাজয় মানি/ ইহলোকে পরলোকে
জিতে গেলে বৈরি’।
তার কিছুদিন পরে গুরু কৃষ্ণদাস এসে হাজির হলেন কৃষ্ণচন্দ্রের কাছে। বললেন –‘এবার তোমার সময় হয়েছে দীক্ষার। তোমার সকল বাসনা
পুড়ে তুমি এখন পরম বৈষ্ণব’। এরপর তাঁর নাম
হলো লালাজি। যারা আগে থেকে তাকে বাবু বলে ডাকতো, এখন তারা বললো লালাবাবু। চারদিকে তখন তার নাম
প্রচারিত হলো। বৃন্দাবনের গোস্বামীরা তাকে দশজন প্রধান বৈষ্ণব তালিকায় স্থান দেন।
তাঁর জন্মভূমি কান্দি পর্যন্ত সেই ‘লালাবাবু’
নাম প্রচারিত হয়। এখন
সকলেই তার আসল নাম ভুলে গিয়েছে। লোকে তাকে লালাবাবু বলে। সাধারণে বলে –- ‘বাবু তো লালা/ আর সব—-’
লালাবাবু মাত্র ৪৬ বছর বয়সে মারা যান। তাঁর অনুরাগী ছিলেন গোয়ালিয়রের রানী।
তাঁর অজান্তে তাঁরই ঘোড়ার পায়ের আঘাতে বৃন্দাবনের পথে লালাবাবুর অকালমৃত্যু হয়।
তখন তাঁর ছেলে শ্রী নারায়ণ সিংহ নাবালক। তাঁর স্ত্রী কাত্যায়নী বিদূষী ও ভক্তিমতি
নারী ছিলেন। তিনি এলাকায় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাদীক্ষা, উন্নয়নের জন্যে প্রায় ষোল লক্ষ টাকা দান
করেছিলেন। প্রত্যেক বছর তিনি ‘অন্নমেরু’
উৎসব করতেন। এই উৎসবে
এলাকার সকল মানুষ কয়েকদিন ধরে খাওয়া-দাওয়া করত। অন্যান্য অতিথিরা বিভিন্ন দান
গ্রহণ করত। ১৮৬২ খ্রিষ্ঠাব্দে তিনি মারা যান। তার ছেলে নারায়ণ এলাকার পানীয় জলের
জন্যে একটি বড় পুকুর খুঁড়ে দিয়েছিলেন। তাঁর নামানুসারে এই পুকুরের নাম হয় নারায়ণধারা।
কৃষ্ণচন্দ্র সিংহ মুর্শিদাবাদ জেলার কান্দি শহরের সিংহ বংশীয় রাজপরিবারের
শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি। কায়স্থকারিকা অনুসারে ( যদিও এই কারিকা এখনও পর্যন্ত ইতিহাসসিদ্ধ
নয়) এই সিংহবংশীয় রাজপরিবারের আদিপুরুষ অনাদিবর সিংহকান্যকুব্জ থেকে নবম শতকে
রাঢ়ের শূর বংশীয় ভূস্বামীর রাজসভায় আসেন। শূর বংশীয় রাজা আদিত্য বা আদিশূর
সিংহবংশীয় অনাদিবরকে ১২৭ খানি গ্রাম দান করেছিল। সেই গ্রামগুলি ছিল মূলত
গঙ্গাতীরবর্তী রাঢ় অঞ্চলের মধ্যেই অবস্থিত। কাটোয়া (তখন কণ্টকদ্বীপ) পর্যন্ত তার
অধিকার বিস্তৃত ছিল। কায়স্থকারিকা থেকে জানা যায় যে — অনাদিবর সিংহপুরে তার রাজধানী স্থাপন ক’রে, সেখানে তিনি সামন্তরাজ বলে অভিহিত হন। এই সিংহপুর গঙ্গার পশ্চিমকুলে ময়ুরাক্ষী
নদীর দক্ষিণে অবস্থিত। এখানে তিনি বিষ্ণু মন্দির, শিবমন্দির, সিংহেশ্বর শিবলিঙ্গ, লক্ষ্মীনারায়ণ শিলা, অতিথিশালাপ্রতিষ্ঠা করেন (৮৮২ খ্রি) । তিনি আদিশূরকে
বার্ষিক দু হাজার স্বর্ণমূদ্রা কর দিতেন। এই সিংহেশ্বরের নামানুসারের সিংহপুর
গ্রামের নামকরণ হয়েছিল। বর্তমানে সেই গ্রামের নাম সিংহারি। তার পাশের গ্রাম গড্ডা।
এই সিংহারী গ্রামই প্রাচীন সিংহপুর বলে কেউ কেউ মনে করেছেন। সিংহলী পুরাণ ‘দীপবংশে’ এই সিংহপুর নগরের কথা উল্লিখিত আছে। এছাড়া ‘মহাবংশ’ এবং ‘কুলবংশ’ হলো ওদেশের
জনপ্রিয় পুরাণ। ওই পুরাণগুলিতে উলেখ করা হয়েছে যে — কোনো এক বিজয় সিংহ একসময় লঙ্কাজয় করেছিলেন।
শ্রীলঙ্কার অধিবাসীরা সে কথা বিশ্বাস করে। বিজয় সিংহের উপাধী সিংহ। তাই শ্রীলঙ্কার
আরেক নাম সিনহল। এই বিজয় সিংহ রাঢ়ের লোক ছিলেন। তার বাড়ি রাঢ়ের সিংহপুর নামক
জায়গায়। সিংহলী পুরাণ অনুসারে বিজয় সিংহের লঙ্কাজয় বুদ্ধের জন্মের আগেই সংঘটিত
হয়েছিল। বঙ্গদেশেও এই লোকশ্রুতি বিভিন্ন এলাকায় শোনা যায়। বিভিন্ন দিক খতিয়ে দেখে
ঐতিহাসিকেরা মনে করেছেন যে — এই কাহিনির মধ্যে
অতিরঞ্জন থাকলেও কিছু সত্য আছে। এই বিজয় সিংহের বাবার নাম ছিল সিংহবলী। তার
নামানুসারেই সিংহপুর নগরী স্থাপিত হয়। প্রাচীন কালে যে সিংহপুর নামক নগরী ছিল তার
একাধিক প্রমাণ পাওয়া যায় বিভিন্ন তথ্যে। কিন্তু এই সিংহপুর ঠিক কোথায় ছিল, তা নিয়ে ঐতিহাসিকেরা একমত হতে পারেন নি।
প্রচলিত ঐতিহাসিক মত হল –এই সিংহপুর
বর্তমানে হুগলি জেলার সিঙ্গুর। কিন্তু এর বিপক্ষে বিভিন্ন যুক্তি উত্থাপন করা যায়।
কারো মতে মুর্শিদাবাদ জেলার কান্দি মহকুমার সিংহারীই হলো সেই প্রাচীন সিংহপুর।
সিংহলী পুরাণের কাহিনি, নিঃশঙ্ক মল্লের
শিলালিপি, শশাঙ্কের আগে এই এলাকায়
শ্রীলঙ্কা থেকে ধাতুসেনের আগমন প্রভৃতির সঙ্গে এই সিংহারী গ্রামের অবস্থানের
সঙ্গতি দেখা যায়।
এই সিংহারির পাশেই গড্ডা নামক গ্রাম আছে। এটা একটা গড় বা দুর্গ ছিল সেটা নাম ও
ভৌগোলিক অবস্থান থেকে বোঝা যায়। গ্রামে প্রাচীনত্বের বহু চিহ্ন ছড়িয়ে আছে। গড্ডা
গ্রামের একটি পুকুরের পাশে প্রাচীন স্থাপত্যের সামান্য কিছু অবশেষ এখনও রয়ে
গিয়েছে। গ্রামের দক্ষিণ দিকের মাঠে কালিদাসের ঢিবি আছে। এর গর্ভে কোনো প্রাচীন
স্থাপত্যের চিহ্ন লুকিয়ে আছে বলে মনে হয়। সিংহারী গ্রামের মাঝে হাতিশালা ছিল। তার
ভিত্তি এখন মাটির গর্ভে। গ্রামের দক্ষিণ দিকে বাঁধাপুকুরের ঘাটে বড় চৌকো পাথর
(ইটের মত) এখনও দেখা যায়। জমিদার বাড়ির ভগ্নাবশেষ আছে সেখানে। ঘাট-সংলগ্ন
স্নানঘরের ভগ্নাবশেষ এখনও দেখা যায়। গ্রামে হরগৌরী বা রুদ্রযামল মূর্তি আছে,
যা এখনও পূজিত হয়।
কায়স্থ কূলপতি অনাদিবর যে এই সিংহপুর গ্রামেই তাঁর রাজধানী স্থাপন করেছিলেন
তার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রমাণ পাওয়া যায়। এই প্রাচীন গড় সিংহপুরই বর্তমানে গড্ডা
সিংহারি নামে পরিচিত। অনাদিবর সিংহ এই সিংহপুরে রাজধানী স্থাপন করার পরে তার উত্তর
পুরুষ আটটি প্রজন্ম এইখানে বসবাস করে। সেই সময়ে ময়ুরাক্ষীর গতিপথ আরও কয়েক কিমি
উত্তরে প্রবাহিত ছিল। কিন্তু খরা ও বন্যার ফলে ময়ুরাক্ষী বারবার গতি পরিবর্তন করায়
এই এলাকা বনায় ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে যায়। সম্ভবত এই কারণে অনাদিবরের নবম
উত্তরপুরুষ লক্ষ্মীধর এখান থেকে বাস উঠিয়ে দেয়। সেই সময়ে লক্ষ্মীধরের ছেলে ব্যাস
সিংহ সেন বংশীয় রাজা বল্লাল সেনের রাজসভায় চাকরি করতে শুরু করে। সেই সময়ে বল্লাল
সেন কঙ্কগ্রাম থেকে ( বর্তমান সালার) তার কুলবিধি প্রচার করে। সেই কৌলিণ্য বিধি
ব্যাস সিংহ মানতে অস্বীকার করে বলে বল্লাল সেনের আদেশে তাকে হত্যা করা হয়। ব্যাসের
ছেলে লক্ষ্মণ সেনের সাজসভায় চাকরি পায়। তার নাম বনমালী। এই বনমালী সিংহ ময়ুরাক্ষীর
মজে যাওয়া স্রোতের পূর্ব পাড়ে, নতুন জেগে ওঠা
চড়ায় যে জঙ্গল ছিল, সেই জঙ্গল কেটে
একটি গ্রাম প্রতিষ্ঠা করে। সেই গ্রামটি বর্তমানে কান্দি নামে অভিহিত। মোর (মজে
যাওয়া ময়ুরাক্ষীর বর্তমান নাম) নদীর পূর্ব তীরে যেখানে নদীটি উত্তর বাহিনী থেকে
পূর্ব বাহিনি হয়েছে সেই ঈষৎ উঁচু বা কাঁধিতে এই বসতি স্থাপিত হয়।
মজে যাওয়া ময়ুরাক্ষী নদী বা বর্তমান মোর নদীর খাত
সিংহে পরিবারের লোকজন ও তার সঙ্গে তাদের কর্মচারী ও কিছু প্রজা সেখানে প্রথম
বসতি করে। বন কেটে এই গ্রাম প্রথম স্থাপন করে বনমালী। তাই তাকে পরে ‘বনকাটি’ বনমালী বলা হয়। ১১৫০ থেকে ১১৬০ খ্রিষ্টাব্দের
কোনো এক সময় এই কান্দি গ্রাম প্রতিষ্ঠা করা হয়।
নতুন এই গ্রামটির নামকরণ কীভাবে হয়েছিল তার কোনো প্রমাণ নেই। তবে শব্দটি ‘কন্দর’ শব্দজাত কিনা এই বিষয়ে সংশয় আছে। ‘ কন্দর’ শব্দটি খুব
প্রাচীন। ঋকবেদের যুগে শব্দটি চলিত ছিল। কাঁদর শব্দটি এই শব্দজাত। বড় নালা অর্থে
যা ব্যবহৃত হয়। ‘কন্দর’ অর্থে বড় খালও বোঝায়। গ্রাম, জনপদ বা কোনো কিছুর সঙ্গে যুক্ত হয়ে খালগুলি
পরিচিত করার রীতি প্রাচীন কাল থেকেই চলিত আছে।
কাঁধাড় বা কাঁধা শব্দটি বাংলার কৃষক সমাজে এখনও প্রচলিত আছে। কোনো বড় পুকুর,
খাল, নদী প্রভৃতি জলাভূমি সংলগ্ন তীর, যা অনেকটা মানুষের কাঁধের মত ঢালু তাকে কাঁধা
বলা হত। এই রকম দুদিক ঢালু স্থলভূমির পরিমাণ যখন এক আড়ার বেশি হলে তখন কাঁধাড়
(স্কন্দ+আড়) বলা হয়। ছোট হলে স্বাভাবিক ভাবে সেটাকে কাঁধি বলা হয়। এইভাবে খাঁদা বা
খাঁদি শব্দ সৃষ্টি হয়েছে। এই ভাবেই কাঁধি ও পরে কাঁদি নামকরণ হয়। ‘ধনাইদহ লিপি’তে ‘খাদাপার’ শব্দটি আছে। খাদ
(<খাত) কথাটি বাংলায় চলিত
আছে। খাদা আর খাদ সমার্থক নয় বাংলায়। খাদ অর্থে খাল। আর খাদা বা কাঁধা অর্থে খালের
পাশের কাঁধ সদৃশ্য নিম্নভূমি। সম্ভবত শব্দটি খাদা <কাঁধা< স্কন্ধ এইভাবে নিষ্পণ্ণ হয়েছে বলেই মনে হয়। মোর
নদীর পূর্ব ও দক্ষিণ পাড়ের এই কাঁধ সদৃশ্য জায়গাকেই কাঁধি বলা হত সেই সময়। সেই
কাঁধি এলাকার জঙ্গল কেটে এই গ্রাম প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বলেই একে কাঁধি বলা হয়েছে।
কাঁধি থেকে এখন কাঁদি বা কান্দি শব্দটি নিষ্পন্ন হয়েছে। স্থানীয় গ্রামনামের সঙ্গে
কাঁধি শব্দটি যোগ করে বিভিন্ন জলাভূমির তীরের নামকরণ হয়েছে মধ্যযুগে। সেই
কাঁধ-সদৃশ তীরের পাটক বা পাড়াকে সেই নামেই অভিহিত করত সাধারণ মানুষ। দুই বাংলা ও
অসমে এই কাঁদি শব্দযুক্ত গ্রামনাম পাওয়া যায় পঞ্চাশের বেশি, যেমন – হাইলা কাঁদি (অসম), মহুড়া কাঁদি,
বেড়া কাঁদি, পদম কাঁদি প্রভৃতি। বনমালী প্রতিষ্ঠিত বর্তমান
আলোচ্য কাঁদি গ্রামটি জম্বুয়া-কাঁদি নামে পরিচিত ছিল বা এখনও আছে।
এই বনমালী সিংহ কাঁদি গ্রামের দক্ষিণে বেতবনের জঙ্গলে অবস্থিত একটি ব্রহ্মশিলা
মূর্তি আবির্ভুত হলে, সেখানে একটি
কালীমন্দির নির্মাণ করেন। নিজেও সেখানে কালীসাধনা করতেন। তখন এই কালীই ছিল
সিংহবংশীয়দের কূলদেবী। বর্তমানে এই দেবী ‘দোহালিয়া কালী’ নামে পরিচিত। পরে
কান্দির সংলগ্ন জেমো রাজাদের অধীনে চলে যায় এই কালী মন্দির। এক সময়ে এই দেবী ছিল
এই উভয় রাজবংশের কূলদেবী।
রুদ্রদেব মন্দিরের পাশের শিব মন্দিরের টেরাকোটার কাজ
মোর নদীতীরে অবস্থিত একটি পীঠে (বর্তমানে হোমতলা) এক বৌদ্ধ তান্ত্রিক বাস
করতেন। বনমালীর পুত্র (মতান্তরে ভাইপো) রুদ্র সিংহ তাঁর ভক্ত ও শিষ্য হন। এই বৌদ্ধ
তান্ত্রিক তীব্বত থেকে এসেছিলেন বলে জানা যায়। এরা বৌদ্ধ মহাযানী সম্প্রদায়ের
কামচক্রযানী গোষ্ঠীর তান্ত্রিক। এই বৌদ্ধ তান্ত্রিকের সঙ্গে আরও একাধিক তান্ত্রিক
সেই সময়ে এই এলাকায় এসে বসবাস করতে শুরু করেন। এদের একজন যেমন কান্দি গ্রামের
পশ্চিমে এসে ঠাঁই নিয়েছিল, তেমনই আরও দুজনের
সন্ধান পাওয়া যায় , যারা এই মোর নদীর
ধারে অবস্থিত বড়ঞা ও লাহারপাড়ায় এসে বসবাস করতে শুরু করে। কান্দির সংলগ্ন এই
তান্ত্রিকের নাম ছিল কামদেব (?)। কামদেব আনীত
বুদ্ধের অক্ষোভ্য মূর্তি এই রুদ্র সিংহ কান্দি গ্রামের পূর্বে একটি গভীর জঙ্গলে
স্থাপন করেন। বর্তমানে সেই মূর্তি রুদ্রদেব নামে পূজিত হয়ে আসছে। যদিও আদি মূর্তি
চুরি হয়ে যায়। দ্বিতীয় মূর্তিও চুরি হয়ে যায় গত শতকের শেষ দিকে। একই রকম মূর্তি
পুনরায় কাশী থেকে নিয়ে এসে স্থাপন করা হয়। বর্তমানে সেই মূর্তিই রুদ্রদেব নামে
পূজিত হয়ে আসছে। স্বাধীনতার আগেই এই রুদ্রদেব স্থানীয় জেমো ও বাগডাঙা জমিদারের
অধীনে চলে যায়।
সিংহ রাজবংশের রাধাকান্ত সিংহ আলীবর্দী খাঁয়ের সময়ে রেশমের ব্যবসা করতেন ও ‘ব্যাঙ্কার’ হিসেবে বেশ প্রভাব বিস্তার করেছিলেন। ইনি
দিল্লির মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলমের দেওয়ান ছিলেন। এই সময়ে তিনি প্রচুর
সম্পত্তির মালিক হন। তিনিই কূলদেবতা হিসেবে রাধাবল্লভ মন্দির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
শোনা যায় কোনো এক দরিদ্র ব্রাহ্মণ তাঁর কূলদেবতা কস্টি পাথরের রাধাবল্লভ বা
কৃষ্ণের মূর্তিটি এই রাধাকান্তকে দিয়েছিলেন। পরে তিনি (মতান্তরে তাঁর নাতি) একটি
ব্রোঞ্জ নির্মিত রাধা মূর্তিটি এর পাশে স্থাপন করেন। রাধাকান্তের নাতি গৌরাঙ্গ কান্দির
সিংহবংশীয়দের রাজবাড়ি প্রতিষ্ঠা করেন। সেই বিশাল রাজপ্রাসাদ ছিল আলীবর্দীর ‘চেহেল সুতুন’ বা ষোল স্তম্ভবিশিষ্ট নবাব প্রাসাদের মত। এই
রাজবাড়ি প্রতিষ্ঠার খবর সিরাজের কানে গেলে তিনি গৌরাঙ্গ সিংহকে বন্দি করেন। পরে
গৌরাঙ্গ সিংহ প্রাসাদের ষোলটি স্তম্ভ ভেঙে দেন। বর্তমানে সেই প্রাসাদই কান্দির
রাজবাড়ি হিসেবে পরিচিত। এই গৌরাঙ্গই রাধাবল্লভের বিশাল মন্দির নির্মাণ করেন। যদিও
সেই মন্দির বর্তমানে পরিত্যক্ত হয়েছে।
এই বংশের সবচেয়ে বিতর্কিত ব্যক্তি হল গঙ্গাগোবিন্দ সিংহ। ইনি
বাংলা-বিহার-উড়িষ্যায় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর শাসনের ভিত্তি শক্ত করতে প্রভূত
সাহায্য করেছিলেন। কথিত আছে অত্যাচারী ওয়ারেন হেস্টিংসের ডান হাত ছিলেন এই
গঙ্গাগোবিন্দ। এদেশীয় অনেক ভূস্বামী ও ছোটখাটো রাজবংশ ধ্বংস সাধনে তিনি সিদ্ধহস্ত
ছিলেন। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীকে সহায়তা করার জন্যে তিনি ব্রিটিশের কাছে প্রচুর ইনাম
পান। এর ফলে তিনি সেই সময়ে বাংলা-বিহার-উড়িষ্যায় অত্যন্ত প্রভাবশালী দেওয়ান হিসেবে
কুখ্যাত হয়েছিলেন। আরেকদিকে তিনি ছিলেন বিলাসী, শিক্ষানুরাগী ও দানশীল। তিনি স্থানীয় ও
নবদ্বীপের বিভিন্ন টোলকে মাসোহারা দিতেন। একাধিক জায়গায় মন্দির প্রতিষ্ঠা
করেছিলেন। দাতা হিসেবে তাঁর খ্যাতি ছিল। কোনো দরিদ্র ব্যক্তি গঙ্গাগোবিন্দের কাছে
কিছু চেয়ে প্রত্যাখ্যাত হয়নি কোনোদিন। তিনি ছিলেন ভীষণ বিলাসী। তিনি তাঁর মায়ের
শ্রাদ্ধে ২০ লক্ষ টাকা ব্যয় করেছিলেন। সোনার পাতা দিয়ে অভ্যর্থনা করা হয়েছিল সকল
অতিথিকে। নিমন্ত্রিত সকল ব্যক্তিকে পুরী থেকে জগন্নাথের প্রসাদ এনে খাওয়ানো
হয়েছিল। তাঁর নাতি লালাবাবুর অন্নপ্রাশনে সোনায় বাঁধানো নিমন্ত্রণপত্র দেওয়া
হয়েছিল অভ্যাগতদের। নবদ্বীপে চারটি মন্দির – গোবিন্দ, গোপীনাথ, মদনমোহন ও কৃষ্ণ মন্দির প্রতিষ্ঠা করে
দিয়েছিলেন তিনি। এই গঙ্গাগোবিন্দের নাতি ছিলেন কৃষ্ণচন্দ্র, যিনি লালাবাবু নামেই বেশি পরিচিত।
লালাবাবুর দেহত্যাগের পর তাঁর স্ত্রী কাত্যায়নী কান্দি রাজবাড়ির কর্ত্রী হন।
তাঁর ছেলে নারায়ণচন্দ্র সিংহ। তিনি ভালো পার্সি জানতেন। শোনা যায় তিনি বিষ খেয়ে
আত্মহত্যা করেছিলেন। তার তিন স্ত্রী। দ্বিতীয় স্ত্রী তাঁর জীবদ্দশায় দুই কন্যা
রেখে মারা যান। প্রথম স্ত্রী কাত্যায়নী রসোরার হরিমোহন ঘোষকে দত্তক নেন। তখন তার
নাম হয় প্রতাপচন্দ্র। তার ছোট স্ত্রী দত্তক নেন ওই পরিবারেরই রামমোহন ঘোষকে। তার
নাম হয় ঈশ্বরচন্দ্র সিংহ। এই প্রতাপচন্দ্র (১৮২৭ খ্রি) কান্দি ইংরেজি হাইস্কুল
প্রতিষ্ঠা করেন ( ১৮৫৯ খ্রি) । এই সময় কান্দির মহকুমা-শাসক ছিলেন মদনমোহন
তর্কালঙ্কার। নাট্যামোদী প্রতাপচন্দ্র কান্দিতে একটি নাট্যশালা করেন। সেখানে নাটক
দেখার জন্যে আমন্ত্রিত হন বিদ্যাসাগর। এখানে রামনারায়ণের ‘রত্নাবলী’ নাটকের অভিনয়ের উদ্যোগ হয়। মদনমোহন তর্কালঙ্কার
(তখন তিনি কান্দি আদালতের জজ পণ্ডিত) হিসেবে এই মঞ্চায়নে আপত্তি করেন। পরে
একরাত্রি অভিনয়ের পরে এই নাট্যশালায় ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসগরের পরামর্শে একটি ইংরেজি
হাইস্কুল প্রতিষ্ঠিত হয়। এই পরিবারের বিমলচন্দ্র সিংহ ছিলেন বিধানচন্দ্র রায়ের
রাজ্যসরকারের মন্ত্রীসভার ভূমিরাজস্ব মন্ত্রী। প্রয়াত অতীশচন্দ্র সিংহ ছিলেন এই
পরিবারের। বর্তমানে ভারতবর্ষের বিখ্যাত পরমাণু বিজ্ঞানী বিকাশচন্দ্র সিংহ এই
পরিবারের মানুষ।
কে আর এইচ
আলুমিনি এসোসিয়েশনের সৌজন্যে














কোন মন্তব্য নেই