Header Ads

মানকুমারী বসু : প্রয়াণ দিবস !!

বিশ্বদেব চট্টোপাধ্যায়



উনবিংশ শতাব্দীর প্রখ্যাত মহিলা কবি মানকুমারী বসু। এই খ্যাতিমান কবি ১৮৬৩ সালের ২৩ জানুয়ারী যশোর জেলার কেশবপুর থানার শ্রীধরপুর গ্রামে মাতুলালয়ে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পৈত্রিক নিবাস কেশবপুর থানার সাগরদাঁড়ী গ্রামে। তিনি মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের পিতৃব্য রাধামোহন দত্তের পুত্র আনন্দ মোহন দত্তের কনিষ্ঠ কন্যা।

শিশুকালে মানকুমারী বসুর বিদ্যাশিক্ষার সূচনা হয় পারিবারিক পরিবেশে পিতার নিকটে। বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে তিনি মহাভারত, রামায়ণ প্রভৃতি ধর্মীয় গ্রন্থগুলি আয়ত্ত করে ফেলেন।
শৈশবকাল থেকেই লেখা-লেখির ব্যাপারে ছিল তাঁর প্রবল আগ্রহ ও আকর্ষণ। এই অল্প বয়সেই তিনি গদ্য ও পদ্য রচনায় হাত দেন। সংগীতের প্রতিও ছিল তাঁর প্রবল আকর্ষণ। তিনি কীর্তনের আংশবিশেষ মুখস্থ করে নির্ভুলভাবে মধুর কণ্ঠে গাইতে পারতেন।
তাঁর লেখা কবিতার অংশবিশেষ :
“জল শুকাইয়া কূপ হয়ে গেছে মাটি
গাভীতে খেতেছে তাহে ঘাস চাটি চাটি,
আসিয়া সখী তেলেনী মারে ঝাটা লাঠি,
মোর মনে হয় বাবা, তার নাক কাটি।”
বিবাহের পর স্বামীর উৎসাহ ও অনুপ্রেরণায় কবি মানকুমারী বসুর কবিতা লেখার নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়। ১৮৭৭ সালে স্বামী বিবুধশঙ্কর বসু কলকাতায় অবস্থানকালে মান কুমারী বসু ‘পুরন্দরের প্রতি ইন্দুবালা’ নামক অমিত্রাক্ষর ছন্দে একটি কবিতা লিখে স্বামীকে পাঠিয়ে দেন।
কবিতাটির অংশবিশেষ :
“দুরন্ত যবন সবে ভারত ভিতরে
পসিল আসিয়া, পুরন্দন মহাবলি
কেমনে সাজিল বনে, প্রিয়তমা তার
ইন্দুবালা কেমনে বা করিলা বিদায় ?
কৃপা করি কহ মোরে হে কল্পনা দেবী।
কেমনে বিদায় বীর হল প্রিয় কাছে। ”
পরবর্তীতে কবিতাটি ঈশ্বরগুপ্ত সম্পাদিত মাসিক ‘সংবাদ প্রভাকর’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। মান কুমারী বসুর এটিই মুদ্রিতাকারে প্রথম প্রকাশিত কবিতা।
উনিশ শতকের গীতি কবিতার মানকুমারী বসুর কাব্য একটি উল্লেখযোগ্য সংযোজন। তাঁর প্রথম প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ ‘প্রিয় প্রসঙ্গ’ ১৮৮৪ সালে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়। ১৮৯৬ সালে কাব্য ‘কুসুমাঞ্জলী’, ১৯০৪ সালে ‘বীর কুমার বধ’, ১৯২৪ সালে ‘বিভূতি’, ‘পুরাতন ছবি’, ও ‘শুভ সাধনা’ প্রভৃতি কাব্যগ্রন্থগুলি প্রকাশিত হয়।
উপন্যাস ও ছোটগল্প লেখার ক্ষেত্রেও মানকুমারী বসুর হাত ও হৃদয় সচলসিদ্ধ। ১৮৮৮ সালে ‘বনবাসিনী’, ১৯২৬ সালে ‘সোনার সাখা’ এবং ছোট গল্প ‘রাজলক্ষ্ণী’, ‘অদৃষ্ট চক্র’ গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হলে পাঠকসমাজে তাঁর জনপ্রিয়তা ব্যাপক বৃদ্ধি পায়।
মানকুমারী বসু তাঁর সাহিত্যকর্মের স্বীকৃতি স্বরূপ দুর্লভ সম্মান ও মর্যাদায় প্রতিষ্ঠা লাভ করেন। ১৯৩৯ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক তাঁকে ‘ভুবন মোহিনী স্বর্ণপদক" এবং ১৯৪১ সালে ‘জগত্তারিনী সুবর্ণ পদক’ প্রদান করা হয়।
সমাজের বিভিন্ন সমস্যাবিষয়ক প্রবন্ধ লেখায় তিনি ছিলেন সিদ্ধহস্ত। অন্তপুর শিক্ষার জন্য ‘শিক্ষায়িত্রী’, পল্লীগ্রামে স্ত্রী চিকিৎসক ও ধাত্রীর আবশ্যকতা বিষয়ে এবং সমাজের দুর্নীতি ও কুসংস্কার নিবারণের জন্য মূল্যবান কয়েকটি প্রবন্ধ লিখে তিনি পুরস্কৃত হন। মানকুমারী বসুর গৌরবময় কৃতিত্বের সম্মান প্রদর্শনপূর্বক ভারত সরকার ১৯১৯ সাল থেকে তাঁকে অমৃত্যু বৃত্তি প্রদান করেন।
১৮৭৩ সালে কলকাতা মেডিকেল কলেজের ছাত্র বিবূধশঙ্কর বসুর সাথে মাত্র দশ বছর বয়সে তাঁর বিবাহ হয়। মানকুমারী বসুর শশুরবাড়ী ছিল কেশবপুর থানার বিদ্যানন্দকাটি গ্রামে। শ্বশুর রাস বিহারী বসু ছিলেন তৎকালীন বৃটিশ সরকারের একজন নামজাদা ডেপুটি ম্যজিষ্ট্রেট। তাঁর স্মৃতি স্মরণ করে রাখার জন্য ‘রাস বিহারী ইনস্টিটিউট’ নামে তাঁর জন্মভূমি বিদ্যানন্দকাটিতে একটি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন।
১৮৮০ সালের ৩০ ডিসেম্বর তাঁদের একমাত্র কন্যা প্রিয়বালার জন্ম হয়। ১৮৮২ সালে বিবূধশঙ্কর কলকাতা মেডিকেল কলেজ থেকে এল. এম. এফ পাশ করে প্রথমে কলকাতায় পরে সাতক্ষীরায় ডাক্তারী শুরু করেন।
১৮৮২ সালে এক দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে মানকুমারী বসুর স্বামী বিবূধশঙ্কর বসু সাতক্ষীরায় মৃত্যুমুখে পতিত হন।
স্বামী মৃত্যু বেদনায় বিরহিনী মানকুমারী বসু স্বামীর মনোবাঞ্ছাকে স্মরণযোগ্য করে রাখার জন্যে এবং বিধবা নারীদের কর্তব্যকর্মে অনুপ্রেরণার উৎস হিসেবে সাহিত্য সাধনায় পূর্ণোদ্যমে আত্ননিয়োগ করেন।
বাংলা সাহিত্যের এই সুলেখিকা আজীবন সাহিত্য সাধনা করে আশি বৎসর বয়সে ১৯৪৩ সালের ২৬ ডিসেম্বর কন্যা প্রিয়বালার খুলনাস্থ বাড়ীতে মৃত্যুবরণ করেন।
খুলনার ভৈরব নদীর তীরে তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়। মৃত্যুর পুর্বে মধুসূদনের সমাধিলিপির ভাব অবলম্বনে ‘অন্তিম’ শীর্ষক জীবনের শেষ কবিতাটি তিনি রচনা করেন।
কবিতাটির অংশ বিশেষ
যে কুলে জন্মিলে কবি শ্রী মধুসূদন
সে কুলে জন্ম মম বিধির আদেশ,
মাতা শান্তমনি পিতা আনন্দমোহন
বিধুব শঙ্কর বসু পতিদেব মম।
যদি প্রিয় বঙ্গবাসী ভালবাস মোরে
ক্ষণেক দাঁড়ায়ে দেখ তটিনীর তীরে,
স্নেহমতি মা জননী বসুমতি কোলে
বঙ্গের মহিলা কবি রয়েছে ঘুমায়ে।

কোন মন্তব্য নেই

Blogger দ্বারা পরিচালিত.