বিশ্বদেব চট্টোপাধ্যায়
রিভিয়্যু পড়েছিলাম, ইচ্ছে ছিল দেখার--কিন্তু এ ছবি টিভির ফিল্ম-চ্যানেলগুলোতে দেখার সুযোগ পাই নি। অনেকেই দেখে থাকবেন--ছবিটি’র নাম ‘নিউটন’ ! এক দেশভক্ত আদর্শবাদী সরকারি কর্মচারী--যাঁকে লোকসভা নির্বাচনে একটি বুথে প্রিসাইডিং অফিসার করে পাঠানো হয়েছিল ছত্তিশগড়ের মাও অধ্যুষিত এলাকায় এমন এক দরজা-জানলা শূন্য প্রাথমিক স্কুলবাড়িতে যেখানে ভোট গ্রহণের কথা সরকারও ভাবে নি। কিন্তু ইভিএম মেশিনে ৫০-৬০% ভোট পড়েছিল এটা দেখানো কোনো সমস্যা ছিল না। সমস্যা দেখা দিল ঐ আদর্শবাদী সরকারী কর্মচারীর একগুঁয়ে জেদের কারণে। তিনি ঐ স্কুলেই ভোট নেবেন। বিএসএফের পোড় খাওয়া এবং সংশ্লিষ্ট এলাকা সম্পর্কে অত্যন্ত অভিজ্ঞ অফিসার কিছুতেই প্রিসাইডিং অফিসারকে নিরস্ত করতে পারলেন না। ফলে ভাঙ্গা স্কুলঘরে ভোটের ব্যবস্থা করতেই হল। মাওবাদীরা ভোট বয়কটের ডাকও দিয়েছিল। স্কুলবাড়ির আশেপাশের ঘরবাড়িগুলো আগুনে পুড়ে কালো কালো ধ্বংসস্তুপের মতো একটা আতঙ্কের আবহও তৈরি করেছিল।
শুরু থেকে শেষপর্যন্ত ছবিটার ফটোগ্রাফি, জঙ্গলের আবহ, হতদরিদ্র ভোটের মানে না বোঝা--এবং কাকে কেন ভোট দিতে হবে--দিলে কি হবে--এসব সম্পর্কে বিন্দুমাত্র জ্ঞান ও আগ্রহ না থাকা মানুষগুলোকে ছবির ফ্রেমে প্রয়োজনানুযায়ী বিভিন্ন অ্যাঙ্গেল থেকে ক্যামেরাবন্দি করার মধ্যে চলিচ্চিত্রায়নের অসাধরণ মেধা যেভাবে আমার মতো দর্শককে মন্ত্রমুগ্ধ করে রেখেছিল তাতে সত্যিই খুব বিস্মিত হয়েছি। ব্যতিক্রমী স্টোরিলাইন নির্ভর এই অনেকটাই ব্যতিক্রমী ও সাহসী ছবি এদেশে রাষ্ট্রীয় পুরস্কার পায় না--কিন্তু বিদেশে হলে বেশ কিছু পুরস্কার পেতে একটুও অসুবিধে হত না। এ ছবিতে দু’চার মিনিট পর পর গাছের ডাল ধরে বা মাটিতে গড়াতে গড়াতে গান ও জড়াজাপ্টির ন্যাকা ন্যাকা বিরক্তিকর একটা দৃশ্যও ছিল না--এমন কী গোটা ছবিতে একটাও গান ছিল না--ভাবা যায় !
ছবিতে এক সেকেণ্ডের জন্যেও অতিনাটকীয়তার লেশমাত্র ছিল না--সত্যি বলতে কি, ছবিতে কেউ বিন্দুমাত্র অভিনয়ও করেন নি--অভিনয় না করেও যে একটা অসাধরণ গোটা হিন্দিছবি তৈরি হয়ে যেতে পারে--এটা বোঝাবার মতো পরিচালক দেশের ইতিউতি থেকে উঠে আসছেন।
ছবিতে ‘অভিনয়’ করেছেন রাজকুমার রাও, রঘুবীর যাদব, পঙ্কজ ত্রিপাঠী এবং রাষ্ট্রীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত মারাঠী নাট্যাভিনেত্রী অঞ্জলি পাতিল। এরা প্রত্যেকই অসাধরণ অভিনয় করেছেন। অঞ্জলি পাতিলের অভিনয় আমি আগে দেখেছি বলে মনে করতে পারছি না। এই ছবিতে তাঁর অভিনয়--বিশেষ করে ভোটের ডিউটি শেষে ফিরে যাওয়ার মুহূর্তে তাঁর অসামান্য এক ঝলক অভিনয় বহুদিন ভুলতে পারব না। পঙ্কজ ত্রিপাঠি এবং রঘুবীর যাদব তো অত্যন্ত শক্তিশালী অভিনেতা--রাজকুমার রাও যে কম যান না সেটা এ ছবির প্রতিটি মুহূর্তে ধরা পড়েছে।
ছবিটা দেখতে দেখতে ভাবছিলাম--এই সাবালকত্বে কবে পৌঁছুবে বাংলা ছবি? ৯৯% বাংলা ছবি বসে বসে দেখার জন্যে যে অসামান্য প্রতিভার প্রয়োজন হয় তার কণামাত্র আমার মধ্যে নেই--অনেকেরই তা নেই আমি জানি। বাংলার কলাকুশলীদের এইসব ছবি দেখা এবং দেখে দেখে শেখা উচিত--যা তাদের মধ্যে প্রায় নেই বললেই চলে। বিশ-পঁচিশ মিনিটের স্বল্পদৈর্ঘ্যের ছবিগুলো থেকেও প্রচুর শিক্ষণীয় বিষয় আছে--এমনটাও এখন যত দেখছি তত বুঝতে পারছি ! যারা এখনও ‘নিউটন’ দেখেন নি তারা দেখতে পারেন--আমার বিশ্বাস খুবই ভাল লাগবে এই ছবি !
কোন মন্তব্য নেই