Header Ads

জঙ্গিপুরের প্রণববাবুর প্রতি নয়া ঠাহর গোষ্ঠীর এক ভিন্নধর্মী স্মৃতিচারণ


চলে গেলেন দেশের প্ৰাক্তন রাষ্ট্ৰপতি প্ৰণব মুখোপাধ্যায়। একদিকে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ, অস্ত্ৰপচার তারপর আবার অতিমারি কোভিড সংক্ৰমণ। একসঙ্গে এতোগুলো ধাক্কা সামলাতে পারলেন না। জীবনের লড়াইয়ে হার মানলেন। আমরা একজন প্ৰবীণ রাজনীতিবিদ, দক্ষ প্ৰশাসককে হারালাম। সোমবার বিকেল পৌনে ৬ টা নাগাদ তাঁর ছেলে অভিজিৎ মুখোপাধ্যায় বাবার মৃত্যু সংবাদ টুইট করে জানান। প্ৰাক্তন রাষ্ট্ৰপতির মৃত্যুতে ৭ দিনের রাষ্ট্ৰীয় শোক ঘোষণা করেছে কেন্দ্ৰ। প্ৰবীণ এই দুঁদে রাজনীতিবিদের সান্নিধ্যে তো অনেকেই এসেছেন। কাজের সূত্ৰে একমাত্ৰ বাঙালি রাষ্ট্ৰপতির সান্নিধ্য পেয়েছেন প্ৰাক্তন সেন্ট্ৰাল বোৰ্ড অফ এক্সসাইজ অ্যান্ড কাস্টমস-এর চেয়ারম্যান সুমিত দত্ত মজুমদার। তিনি মূলত অসমের শিলচরের লোক। প্রখ্যাত আন্তৰ্জাতিক সাংবাদিক ও নয়া ঠাহর-এর রাষ্ট্রীয় পরামৰ্শদাতা সম্পাদক রত্নজ্যোতি দত্তের অনুরোধে প্ৰাক্তন রাষ্ট্ৰপতি মৃত্যু সংবাদ পেয়ে অকপটে ‘নয়া ঠাহর’ কে প্ৰাক্তন রাষ্ট্ৰপতির সঙ্গে কাটানো মূহুৰ্তগুলির কথা অসমের শিলচরের সুমিতবাবু স্মৃতিচারণ করলেন। সেই কথাগুলোই নয়া ঠাহর-এর পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হল। এই প্ৰতিবেদনটি তৈরি করেছেন নয়া ঠাহর-এর সহযোগী সম্পাদক রিংকি মজুমদার । 

 সেন্ট্ৰাল বোৰ্ড অফ এক্সসাইজ অ্যান্ড কাস্টমস-এর প্ৰাক্তন চেয়ারম্যান সুমিত দত্ত মজুমদার

সুমিত দত্ত মজুমদার স্মৃতিচারণ  - ২০০৯ সালের মাঝামাঝি সেন্ট্ৰাল বোৰ্ড অফ এক্সসাইজ অ্যান্ড কাস্টমস-এর সদস্য হই তখন থেকে আমার তাঁর (প্ৰণব মুখোপাধ্যায়) সঙ্গে বিশেষ অনুষ্ঠানে সাক্ষাৎ হয়। তার আগে জানতাম, কিন্তু ব্যক্তিগত ভাবে কথা হয়নি। তারপর যখন আমি ২০১০ সালে ১ ডিসেম্বর আমি সেন্ট্ৰাল বোৰ্ড অফ এক্সসাইজ অ্যান্ড কাস্টমস-এর চেয়ারম্যান হলাম, তখন আমি প্ৰথম তাঁর কাছে গেলাম তাঁর একটা সাধারণ একটা ব্ৰিফ নিতে। তখনই তাঁর সঙ্গে কথা বলে ভালো একটা সম্পৰ্ক গড়ে ওঠে।  প্ৰথম আলাপেই তিনি বললেন আমি আপনার খবর পেয়েছি। আপনি আপনার মতো করে কাজ করে যান । তিনি খুব একটা ভালো কথা বলেছিলেন- তাঁর কথায় আমি কনফিডেন্স পেয়েছিলাম চেয়ারম্যান হিসেবে কাজ করা কালিন । বলেছিলেন - দেখুন আমরা রাজনীতি করি, আমাদের কাছে অনেক রকমের অনুরোধ আসে, আপনাকে আমি পাঠাবো ওগুলো। তবে, আপনি আপনার মতো মতামত দেবেন। আপনি যদি কাজটা পারেন করবেন, না করতে পারলে আমাকে বলে দেবেন। তারপর, কোনও কোনও ক্ষেত্ৰে যদি দরকার হয় আমি আপনাকে ওভাররুল করবো। আমি বললাম, স্যার সেটা তো আপনি করতেই পারেন। কোনও অসুবিধে নেই। আপনি ফাইলে শুধু অৰ্ডার দেবেন আর আমি তরিৎ গতিতে সেটা ইমপ্লিমেন্ট করবো। আমার এখনও মনে আছে তিনি হেসে ফেলেছিলেন। সেইভাবেই শুরু হয়। তিনি পরিষ্কার বুঝিয়ে দিলেন যে আমি আমার মতো করে কাজ করার স্বাধীনতা পাবো। তারপর আমাকে বললেন- যে জিএসটি আসছে সামনে আপনার তো প্ৰচুর কাজ আছে। ওটা আপনাকে একটু দেখতে হবে। সেন্ট্ৰাল এক্সাইজের একটা বিরাট ভূমিকা আছে। আরেকটা মজার কথা ছিল। আমি বলেছিলাম আমি তো সেন্ট্ৰাল এক্সাইজ-এ কাজ কখনো করিনি, আর সেন্ট্রাল এক্সাইজের বেশিরভাগ মেন আইটেম হবে জিএসটির। আমি বলেছি দেখে নেব। সেন্ট্ৰাল এক্সাইজে কাজ করিনি, বেশিরভাগ কাস্টমস-এ কাজ করেছি। তিনি বলেন ওটা আরও ভালো হয়েছে। আপনি সেন্ট্ৰাল এক্সাইজের যে চাপ থাকে সেটা আপনার ওপর পরবে না। আমি মনে আরও আত্মবিশ্বাস পেয়ে গেলাম। এ ধরনের কথাগুলো একমাত্ৰ ইন্টালেকচ্যুয়েল মানুষগুলোই বলতে পারেন। সেই হচ্ছে শুরু, তারপর.... জিএসটি নিয়ে নানা কাজে আমি ওনার থেকে সাপোৰ্ট পেয়েছি। একটার পর একটা নতুন আইডিয়া নিয়ে গেছি, আর একটার পর একটা তিনি সেগুলো ক্লিয়ার করেছেন। আমার এখনও মনে আছে – ২০১১ সালে আমি রিটায়ার করি। আমার রিটায়ারমেন্টের দিন তিনি বললেন আপনাকে আরও কয়েকটা মাস যদি পাওয়া যেতো, তা হলে ভালো হতো। আমি বললাম যা পেয়েছি যথেষ্ট। তারপর তিনি রাষ্ট্ৰপতি হয়ে দিল্লিতে চলে যান। তাঁর দিল্লির তালকোটরা রোডে বাড়িতেও আমি গেছি। সর্বদা সাদর অভ্যৰ্থনা পেয়েছি।
 
তারপর, আমার এখনও মনে আছে, ২০১৪ সালে জানুয়ারিতে আমার স্ত্ৰী মারা গেছেন। তিনি তখন রাষ্ট্ৰপতি। তিনি আমাকে ফোন করে পত্নী বিয়োগের খবর নিয়েছেন। শোক প্ৰকাশ করেন। বলেন তাঁর সঙ্গে দেখা করতে। রীতিমতো আন্তরিকতার সঙ্গে ভারতের রাষ্ট্রপতি থাকাকালিন আমার খবর নিলেন এটা তো জীবনের অনেক বড় পাওনা।

তাঁর রাষ্ট্ৰপতি ভবনের অফিসেও গেছি । আমি যখন প্ৰথম জিএসটির ওপর বই লিখি, আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, "স্যার, আপনি কি আমার বইটা রিলিজ করতে পারবেন"। তিনি বলেছিলেন রাষ্ট্ৰপতি কখনও বই রিলিজ করতে পারেন না, তা প্ৰোটোকলের বাইরে। তবে, বইয়ের প্রথম কপিটা গ্ৰহণ করতে পারবো। আমি দিয়েছিলাম সেটা। নাম ছিল জিএসটি ইন ইন্ডিয়া - ইটস ট্রাভেলস, ট্রাইবুলেশন্স এন্ড চ্যালেঞ্জেস অ্যাহেড। চতুৰ্থ বই যখন লিখলাম - জিএসটি এক্সপ্লেইনেড ফর কমন ম্যান, তখন তিনি রাষ্ট্ৰপতি পদ থেকে অবসর নিয়েছেন। আমি গিয়েছিলাম তাঁর নুতন দিল্লির রাজাজি মার্গের বাংলোতে। বই রিলিজ করার অনুরোধে এক কথায় রাজি হয়ে গেলেন। বলেন রিলিজ করে সবার সঙ্গে কথাবাৰ্তা বলে প্যানেল আলোচনা শুরু হওয়ার সময় বেরিয়ে আসবো। গভৰ্নমেন্টের অন্দরমহল নিয়ে কথাবাৰ্তা হতে পারে এবং প্ৰাক্তন রাষ্ট্ৰপতি হিসেবে ওসবের মধ্যে থাকা উচিত নয়, তিনি বলেন। এই হলেন প্ৰণব মুখোপাধ্যায়। সর্বদা প্রোটোকল মেনে চলতেন। তাঁর ছেলে অভিজিৎ মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গেও দেখা সাক্ষাৎ হতো। প্ৰণববাবুর কাছ থেকে বহুমূল্য উপদেশ পাওয়া যেতো।
আমার শেষ বই গতবছর দিল্লির প্রকাশন সংস্থা নিয়োগী বুকস থেকে প্ৰকাশ হয়। নিয়োগী বুক্স এর ডাইরেক্টর নিৰ্মল কান্তি ভট্টাচাৰ্য আমাকে দিয়ে ‘জিএসটি এক্সপ্লেন ফর কমন ম্যান’ লিখিয়েছিলেন। প্ৰণববাবু বলেছিলেন- সাধারণ মানুষের জিএসটি নিয়ে এরকম একটা বইটা পড়ার  খবু দরকার। এরপর ৩৭০ ওপর বই ৩৭০ এক্সপ্লেন ফর কমন ম্যান বইটি চলতি বছরের জানুয়ারিতেই রিলিজ হয়। বইটার নামটা দেখেই বললেন- সাধকের রোগ প্ৰাৰ্থণা। আমি বললাম – সাধক রোগ ভিক্ষা করছে ভগবানের কাছে। তারপর বললেন- তুমি ইকনমি নিয়ে লেখ। আমার লাস্ট বইটা পড়ে দেখ এগুলো দেশের জন্য ভীষণ দরকার। ইউ আরইনভাইটিং ট্ৰাবলস। আসলে তিনি চাইতেন না আমি কোনও বিতৰ্কে জড়িয়ে পরি। সেটাই ছিল আমার শেষ দেখা প্ৰণব মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে।

তাঁর বহু কথা আমার মনে পড়ছে। তাঁর স্মৃতিচারণ করতে করতে শিলিগুড়ির কথা মনে পরে। অসমের শিলচরের তিনি বেশ কয়েকবার গেছেন। গুরুচরণ কলেজের কথা তাঁর মনে ছিল। ২০১১ সালে শিলিগুড়িতে ফুলবাড়িতে ল্যান্ড কাস্টমস স্টেশনের উদ্বোধনের অনুষ্ঠানে দেখা হয়। সেই দিনগুলো আর তাঁর সঙ্গে কাটানো সময়গুলো কথা কখনও ভোলার নয়।

 একজন প্ৰবীণ রাজনীতিবিদ হিসেবে প্ৰণব মুখোপাধ্যায়কে কতটুকু চিনতেন সে সম্পর্কে যদি একটু বলেন? এই প্ৰতিবেদকের প্ৰশ্নের জবাবে তিনি বললেন- একজন রাজনীতিবিদ হিসেবেও আমি তাঁকে দেখেছি। মনমোহন সিং যে  এম্পাওয়ার গ্ৰুপ অফ মিনিস্টার্স  করেছিলেন, সেগুলোর ৯০ শতাংশেরই তিনি ছিলেন চেয়ারম্যান। তাহলে, বুঝতেই পারছো তিনি কত বড় মাপের নেতা ছিলেন। সুন্দরভাবে সবার সঙ্গে মানিয়ে চলতেন। তবে আমি এও দেখেছি, ফোনে কাউকে কাউকে বকাবকি কিংবা কড়া কথাবাৰ্তা বলতেও শুনেছি। তবে, তাঁর সঙ্গে রাজনীতি নিয়ে কোনও দিন আলোচনা হয়নি।
 আন্তর্জাতিক সাংবাদিক রত্নজ্যোতি দত্ত রাষ্ট্রপতি ভবনে রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়ের সাথে। (চিত্র: ২০১৫, ফাইল থেকে)

জঙ্গিপুরের প্রণববাবু
প্ৰসঙ্গক্ৰমে, প্রখ্যাত আন্তৰ্জাতিক সাংবাদিক ও নয়া ঠাহর রাষ্ট্রীয় পরামৰ্শদাতা সম্পাদক রত্নজ্যোতি দত্ত প্ৰাক্তন রাষ্ট্ৰপতি প্ৰণব মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে কাটানো কিছু মূহুৰ্ত পাঠকদের সঙ্গে শেয়ার করলেন। প্ৰশ্ন করেন পশ্চিমবঙ্গের জঙ্গিপুর সম্পৰ্কে। তিনি জানান- তিনি যখন পিটিআইয়ে সিনিয়র রিপোৰ্টার ছিলেন, তখন প্ৰণব মুখোপাধ্যায় প্রতিরক্ষা মন্ত্ৰী ছিলেন। দিল্লির পিটিআই-এর হেড অফিস আমন্ত্রিত হয়ে এসেছিলেন রিপোৰ্টারদের সাথে কথাবার্তা বলার জন্য ।  পিটিআই-এর রিপোৰ্টাররা সকলেই খুব উৎসুক ছিলেন প্ৰণব মুখোপাধ্যায়কে প্ৰশ্ন করার জন্য। সময়ে প্রায় শেষ হয়ে এসেছিলো সে সাক্ষাৎকার পর্বের। সবার শেষে সাংবাদিক রত্নাজ্যোতিবাবু অতি উৎসাহের সাথের প্রশ্ন করেন পশ্চিমবঙ্গের জঙ্গিপুর সম্পর্কে। "হাউ ডু ইউ ফিল টু বি ইলেকটেড ফ্ৰম জঙ্গিপুর লোকসভা কনস্টিটিউয়েন্সি দিস টাইম"। ‘জঙ্গিপুর’ নামটা শুনেই চেয়ারে পুনরায় বসে পড়লেন। উত্তর দিতে গিয়ে তিনি খুব ভাবুক হয়ে গেলেন। বললেন- জঙ্গিপুরের মানুষ আমার রাজনৈতিক জীবনের এক বিরল সম্মান আমাকে দিয়েছেন। জীবনের প্রথমবারের মতো আমাকে লোকসভায় পাঠিয়েছেন। আমি তাদের প্ৰতি সারা জীবন বাধিত থাকবো। আমাকে এই কথা মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ। এই বলেই সেদিনর পিটিআইয়ের সাংবাদিকদের সাথে এক্সক্লুসিভ কথাবার্তার যবনিকা ঘটে।

কোন মন্তব্য নেই

Blogger দ্বারা পরিচালিত.