Header Ads

জ্যোতি বসু’র জন্মের ১০৫ বছর অতিক্রান্ত। ফিরে দেখা !!

বিশ্বদেব চট্টোপাধ্যায় (বরিষ্ঠ সাংবাদিক)
নয়া ঠাহর প্রতিবেদন: আজ ১০৫ পেরিয়ে ১০৬-এ পা দিলেন জ্যোতি বসু ! তাঁকে সামনে রেখে নতুনভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর মরিয়া চেষ্টা করছে কিনা  সিপিএম তা নিয়ে প্রচুর প্রশ্ন থাকলেও তাঁর জন্মদিনে নানান অনুষ্ঠান হবে আজ। কিন্তু এত তাড়াতাড়ি জ্যোতি বসু কেন শুধুমাত্র বাৎসরিক আনুষ্ঠানিকতার মধ্যেই চলে গেলেন সেটা অন্য প্রশ্ন বটে--তবু আজ তাঁর সম্পর্কে কিছু উল্লেখযোগ্য বিষয় নিয়ে তাঁকে একবার ফিরে দেখা যেতেই পারে !
'দিল্লি গিয়েছিলাম৷ ওর (রাজীব গান্ধী) সঙ্গে দেখা হলো ৷ অনেক কথা বললেন ৷ আমি বললাম, সবই তো হলো, আপনি তো দেশটাকে রসাতলে পাঠাচ্ছেন ৷ ওর মাকে আমি চিনতাম ৷ ওকেও ছোটবেলা থেকে চিনি ৷ ওর স্ত্রীর হাতের রান্না খেয়েছি ৷ বললাম, আর যাই করুন, দেশটার বিপদ ডেকে আনবেন না ৷ আপনার বয়স কম, পরামর্শ দরকার হয় বলবেন ৷ দেশের স্বার্থে আমরা সবসময় পাশে আছি ৷' তখন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী ৷ বোফর্স কেলেঙ্কারি নিয়ে দেশ উত্তাল ৷ সভা-সমাবেশে প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে তখন এভাবেই বলতেন জ্যোতিবাবু ৷ শুধু রাজীব নন, ভাষণে নাম না করে প্রতিপক্ষকে আক্রমণ করা ছিল জ্যোতিবাবুর বিশেষ বাচনশৈলী ৷ কখনও কখনও তা শালীনতা ছাড়িয়ে যেত--যেমন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পর্কে বলতেন, 'ওই মহিলা, ফোর টোয়েন্টি ৷ জাল ডিগ্রি ৷' জ্যোতিবাবুর এই কৌশলী ভাষণের জন্যই কি তার বিরুদ্ধে কেউ কোনোদিন মানহানির মামলা করতে পারেনি ?
শরীর-স্বাস্থ্য- 'আমি কখনও মর্নিংওয়াক, যোগাসন, ব্যায়াম -এ সব করিনি ৷ এখন তো আমার আপিস (অফিস) নেই ৷ তাই বিকেলে বারান্দায় একটু পায়চারি করি ৷ তাও রোজ সম্ভব হয় না ৷ কমরেডরা আসেন ৷ তাদের সঙ্গে কথা বলতে হয় ৷' তা হলে সুস্থ থাকার উপায় কী? 'নর্মাল লাইফ ৷ প্রত্যেক মানুষের ফিজিওলজি আলাদা ৷ নর্মাল লাইফের সংজ্ঞাও প্রত্যেকের জন্য আলাদা ৷ এটা নিজেকেই ঠিক করে নিতে হয় ৷' মুখ্যমন্ত্রিত্ব থেকে অবসর নেয়ার পর এক সকালে বলেছিলেন জ্যোতিবাবু ৷ তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের পিছনে শরীর-স্বাস্থ্যের বিশেষ ভূমিকা ছিল, সন্দেহ নেই ৷ মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন সাড়ে তেইশ বছরের মধ্যে দু'চারবার রাইটার্সে ডাক্তার ডাকতে হয়েছিল ৷ সুগার-প্রেশারের বালাই ছিল না ৷ একমাত্র অসুখ ছিল, 'ইরিটেবল বাওয়েল প্রব্লেম', এক জটিল পেটের রোগ ৷
রাইট ব্যাক- 'আমি ছোটবেলায় নিয়মিত ফুটবল খেলেছি ৷ হিন্দুস্থান পার্কে ফুটবল ক্লাব তৈরি করেছিলাম, নাম ছিল ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট ৷ আমি ছিলাম টিমের ক্যাপ্টেন ৷' জ্যোতিবাবু ছিলেন বাঙাল মোহনবাগানি ৷ খালি পায়ে খেলে সাহেবদের টিমকে হারাতে দেখে ছোটবেলাতেই মোহনবাগানের সমর্থক হয়ে যান ৷ কয়েক বছর আগে মোহনবাগান ক্লাবের নির্বাচন উপলক্ষে অনুযোগের সুরে বলেছিলেন, 'ময়দানে এত বিদেশি কেন? আমাদের ছেলেরা কি খেলতে পারছে না মোহনবাগান, ইস্ট বেঙ্গল, মহমেডান আমাদের ঐতিহ্য ৷ ওরা এত বিদেশি খেলালে আমাদের ছেলেরা যাবে কোথায়?' প্রশ্ন ছিল, আপনি এত সব জানলেন কী করে? জবাব এল, 'কেন? আমি তো রোজ খেলার খবর পড়ি ৷'
চাট্টি গরম ভাত খেয়ে বেরবেন- আলিমুদ্দিন স্ট্রিট, রাইটার্স বিল্ডিংসে জ্যোতিবাবুকে দেখা যেত গম্ভীর মুখ ৷ প্রশ্নের মুখে ক্ষিপ্ত ৷ প্রশ্নকর্তা সাংবাদিকের যোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন ৷ সেই তিনিই শহরের বাইরে গেলে স্নেহশীল অভিভাবকের মতো জানতে চাইতেন, 'কোনো সমস্যা হচ্ছে না তো? কোথায় উঠেছেন? এখানে তো থাকার জায়গার বড় অভাব ৷' দার্জিলিং রাজভবনে এক সন্ধ্যায় কথায় কথায় বললেন, 'এটা কিন্তু কলকাতা নয় ৷ সন্ধ্যার পরই সব বন্ধ হয়ে যায় ৷ আপনাদের খবরটবর পাঠানো হয়েছে তো?' আর এক সন্ধ্যায় দীঘায় মৎস্য দপ্তরের বাংলোর বারান্দায় ঘরোয়া আড্ডায় হঠাত্ বললেন, 'আপনাদের তো খাওয়াদাওয়া, ঘুমোতে যাওয়ার ঠিক থাকে না ৷ আমারও এক সময় এমন অনিয়মিত জীবন ছিল ৷ যত সকালেই বাড়ি থেকে বেরোন না কেন, স্নান করে বেরোবেন ৷ আর চেষ্টা করবেন, একটু গরম ভাত খেয়ে বেরোতে ৷ তা হলে সারাদিন ছুটতে পারবেন ৷ চট করে ক্লান্তি আসবে না ৷'
বিচলিত হতেন না-জ্যোতিবাবুর দীর্ঘায়ুর একটি রহস্য নিশ্চয়ই দুর্যোগ-দুর্বিপাকে তার বিচলিত না হওয়া ৷ ১৯৯৪ সাল ৷ পাটনায় সিটুর সম্মেলনের মঞ্চে হঠাৎ বিকট আওয়াজ ৷ ধোঁয়ার কুণ্ডলী ৷ হলো অন্ধকার ৷ কিছুক্ষণ পর আলো ফিরলে দেখা গেল ফাঁকা মঞ্চে একাই বসে জ্যোতিবাবু ৷ আলো ফিরলে পিছন ঘুরে শুধু দেখলেন, কী হয়েছিল ৷ বিপত্তি ঘটেছিল একটা বাতি ফেটে ৷ একবার বিমানে দিল্লি যাচ্ছেন ৷ ইঞ্জিন বিকল হওয়ায় মাঝপথে সে বিমান কলকাতায় ফিরে আসে ৷ ইঞ্জিন বিভ্রাটের খবর শুনে যাত্রীরা যখন আতঙ্কিত, ছোটাছুটি করছেন, তখন জ্যোতিবাবু মগ্ন ছিলেন ম্যাগাজিনের পাতায় ৷ কলকাতায় ফেরার পর সাংবাদিকরা জানতে চাইলেন, 'আপনার মনের অবস্থা তখন কেমন হয়েছিল?' জবাব ছিল, 'কী আবার হবে? আমি দুশ্চিন্তা করে কী করব? আমি তো এক্সপার্ট নই ৷ যা করার তারাই করেছেন ৷'
বডি ল্যাঙ্গুয়েজ-বিশেষ বাচনভঙ্গির মতোই জ্যোতিবাবুর বডি ল্যাঙ্গুয়েজও ছিল স্বতন্ত্র ৷ খবরের কাগজে প্রকাশিত ছবিগুলিতে চোখ বোলালে তার চরিত্রের এই দিকটার আরও ভালো আন্দাজ পাওয়া যেত ৷ তিনি কারও সঙ্গে শরীর ঝুঁকিয়ে, ঘাড় কাত করে কথা বলছেন, এমন ছবি সম্ভবত কোনও চিত্রগ্রাহকের সংগ্রহে নেই ৷ বিশেষ কারও উপস্থিতিতে আহ্লাদিত হওয়া তার ধাতে ছিল না ৷ সে তিনি দেশের প্রধানমন্ত্রী, বলিউড তারকা কিংবা বিদেশি রাষ্ট্রনায়ক যেই হোন না কেন !
আবেগহীন-যুক্তিবাদী-'আমি কমিউনিস্ট ৷ আমার ছেলে তো নয় ৷ আমি তাকে বলতে পারি না, তুমি ব্যবসা কোরো না ৷' চন্দন বসুর ব্যবসায় শ্রীবৃদ্ধি নিয়ে সমালোচনার জবাবে জ্যোতিবাবুর এই আপাত যুক্তিপূর্ণ মন্তব্য পার্টির অনেক নেতানেত্রী পরবর্তীকালে অজুহাত করেছেন ৷ তারা পার্টির জন্য নিজেদের সঁপে দিয়েছেন বটে, কিন্তু ছেলেমেয়েদের দূরে রেখেছেন ৷ তারা বাবা-মা 'র সূত্রে পার্টির সুবিধা নিয়ে ব্যবসায়ী, প্রোমোটার, শিল্পপতি হয়েছেন, স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের উঁচু পদে বসেছেন ৷
টাকা ছাপানোর মেশিন-'ওদের (কেন্দ্রীয় সরকার ) কাছে টাকা ছাপানোর মেশিন আছে, আমাদের (রাজ্য সরকার ) নেই ৷ ওরা যত ইচ্ছে টাকা ছাপিয়ে নেয় ৷ আমাদের দেয় না ৷'
গত শতকের আটের দশকের গোড়ার কথা ৷ রাজ্যের অর্ধেকের বেশি মানুষ তখন নিরক্ষর ৷ ব্রিগেডের সভায় সেই নিরক্ষর, আধা শিক্ষিত মানুষকে কেন্দ্রের বঞ্চনার কাহিনি বোঝাতে এ ভাবেই বলতেন ৷ বিলেত ফেরত্ জ্যোতিবাবু জানতেন কোথায় কী বলতে হয় ৷ তার মতো কাণ্ডজ্ঞানসম্পন্ন মানুষ কম আছে ৷ সমসাময়িকদের থেকে বরাবর এগিয়ে থেকেছেন ওই বিশেষ গুণের জন্যই ৷ প্রখর বাস্তববাদী মানুষটি মার্কসবাদকে দেশের বাস্তববতার সঙ্গে মেলাতে চেয়েছেন ৷ দলের বৈঠকে কেউ লেনিন-স্তালিন কপচালে বলতেন, 'ও সব পরে আলোচনা করা যাবে, আগে বলুন রাজ্যবাসীকে আমরা কী বলব ?'

(পাঠকের নিজস্ব মতামত)

কোন মন্তব্য নেই

Blogger দ্বারা পরিচালিত.