Header Ads

জ্যোতি বসু আজ যদি মুখ্যমন্ত্রী থাকতেন তবে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি কতটা কল্কে পেত?

বরিষ্ঠ সাংবাদিক বিশ্বদেব চট্টোপাধ্যায় 
পশ্চিমবঙ্গের প্রয়াত মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসুর জন্মদিন। দীর্ঘ তেইশ বছর পশ্চিমবঙ্গকে শাসন করা এই কমিউনিস্ট নেতা কিছুদিন আগে পর্যন্তও সারা দেশের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দিন মুখ্যমন্ত্রী থাকার রেকর্ডের অধিকারী ছিলেন। ১৯৭৭ সালে বঙ্গে বামফ্রন্ট ক্ষমতায় আসার পরে দীর্ঘ দুই দশক শাসনকার্য চালানোর পরে এই বিলেত-ফেরত ব্যারিস্টার শরীরজনিত কারণে সরে দাঁড়ান। তাঁর ক্ষমতা থেকে সরে দাঁড়ানোর পরেও এক দশক পশ্চিমবঙ্গে বাম শাসন জারি ছিল। ২০১১ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে বামেদের পতন ঘটে এবং ৩৪ বছর পরে পরিবর্তনের শরিক হয় এই রাজ্য।
মমতা ক্ষমতায় আসার পরে আট বছর কাটতে না কাটতেই পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে হিন্দুত্ববাদী চড়া কণ্ঠস্বর শোনা যাচ্ছে। "জয় শ্রীরাম" ধ্বনি শুনে তেড়ে যাচ্ছেন মুখ্যমন্ত্রী স্বয়ং। জর্জরিত তাঁর দলের অন্যান্য নেতা-মন্ত্রীরাও। লোকসভা নির্বাচনে রাজ্যে বিজেপির আসন সংখ্যা একলাফে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৮তে। বলা হচ্ছে, ২২টি আসন পেলেও তৃণমূল কংগ্রেসের অন্ত এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা। যদি জ্যোতিবাবু আজ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী থাকতেন, কতটা আলাদা হত পরিস্থিতি?
প্রথমত, আজ জ্যোতিবাবু যদি তাঁর ক্ষমতার শীর্ষে থাকতেন, তাহলে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির উত্থান কতটা হত বা আদৌ হত কিনা বলা মুশকিল হলেও বিজেপি-শাসিত কেন্দ্রের সঙ্গে রাজ্যের সম্পর্কে যে শৈত্য থাকতো, তা বলাই বাহুল্য। জ্যোতিবাবুর জীবদ্দশাতেই কেন্দ্রে বিজেপি-নেতৃত্বাধীন এনডিএ সরকার গঠন করলেও কয়েকটি কারণে সেই সময়ে কলকাতার সঙ্গে নয়াদিল্লির বিরোধ তুঙ্গে ওঠেনি। বিজেপি কেন্দ্রে এলেও তাদের তখন মিলিজুলি সরকার এবং তাই একবগ্গা হিন্দুত্ববাদী এজেন্ডা দেশের ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া পদ্মবাহিনীর পক্ষে সম্ভব ছিল না। দ্বিতীয়ত, তখনকার বিজেপির শীর্ষ কিছু নেতৃত্বের সঙ্গে জ্যোতিবাবুর ব্যক্তিগত সম্পর্ক খারাপ ছিল না। এক সময়ে তো কংগ্রেসকে ক্ষমতা থেকে দূরে রাখতে কলকাতার ব্রিগেডে অটলবিহারী বাজপেয়ীর সঙ্গে রীতিমতো হাত ধরাধরি করে জনসভা করেছিলেন জ্যোতিবাবু। আর তৃতীয়ত, বিজেপি যখন এদেশের রাজনীতিতে ক্ষমতার অলিন্দে ঘোরাফেরা শুরু করেছে, তখন জ্যোতিবাবু তাঁর রাজনৈতিক কেরিয়ারের প্রায় শেষের দিকে। বৃদ্ধ নেতার পক্ষে নতুন করে বিজেপির সঙ্গে আদর্শগত লড়াই করা হয়তো সহজ ছিল না।
কিন্তু যদি তিনি তাঁর ক্ষমতার শীর্ষে থাকতেন, তাহলে কি সত্যিই বিজেপির পক্ষে আজকে পশ্চিমবঙ্গের মাটিতে মাথা চাড়া দেওয়া সম্ভব হত?
হত কী না, বলা মুশকিল। ত্রিপুরা বা কেরালার দিকে তাকালে বোঝা যায় যে প্রবল বামাধিপত্যের মাঝখানেও সেখানে বিজেপি কিন্তু মাথা তুলেছে এবং বাম ও ডানের লড়াইতে রীতিমতো রক্তাক্ত হয়েছে রাজ্য রাজনীতি। পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রেও অন্যথা হয়তো হত না। কিন্তু একথা ঠিক যে গেরুয়া বাহিনী যতটা মাথা চাড়া দিয়েছে, সেরকম হয়তো জ্যোতিবাবু ক্ষমতায় থাকলে সম্ভব হত না। পশ্চিমবঙ্গে আজ বিজেপির মাথা তোলার কাজে সবচেয়ে বড় সাহায্য করেছে রাজ্যের শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেসই। আদর্শের লড়াই না করে তৃণমূল কংগ্রেসের স্বার্থপূরণের রাজনীতি এই রাজ্যে ক্রমে বিজেপিকে এক বড় জায়গা করে দিয়েছে। পাশাপাশি, সংখ্যালঘু তোষণের অভিযোগে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও আরও কোণঠাসা হয়েছেন এবং বিজেপির তাতে সুবিধা হয়েছে। জ্যোতিবাবুদের দীর্ঘ ৩৪ বছর ধরে ক্ষমতায় থাকার জন্য খুল্লামখুল্লা মুসলিম তোষণের রাজনীতি করতে হয় নি। 
জ্যোতিবাবু ক্ষমতায় থাকলে বিজেপি এই সুবিধাটা পেত না অবশ্যই। পাশাপাশি বাম আমলে যে শক্ত 'স্ট্রাকচারাল পলিটিক্স' পশ্চিমবঙ্গে বিদ্যমান ছিল, তাতে নেতৃত্ববিহীন বিজেপির পক্ষে দাঁত ফোঁটানোর কাজটি সহজ হত না। জ্যোতিবাবু প্রশাসক হিসেবেও কোনওরকম বেগড়বাই বরদাস্ত করার লোক ছিলেন না, যা ১৯৯২-এর বাবরি ধ্বংসের সময়ে দেখা গিয়েছিল। অতএব, রামনবমী বা হনুমান জয়ন্তীতে আজকে পশ্চিমবঙ্গে যে প্রতীকী রাজনীতি ঘটে চলেছে মুহূর্মুহু, তা জ্যোতিবাবুর সময়ে কতটা হতে পারতো, তা নিয়ে নিঃসন্দেহ হওয়া কঠিন। 
বাম আমল হলে বিজেপির পক্ষে আইডেন্টিটির রাজনীতির তাস খেলা সহজ হত না, যা আজকে মমতা স্বয়ং খেলে তাদের সুবিধে করে দিয়েছেন। মতুয়া থেকে শুরু করে পাহাড়ে জনজাতিদের পৃথক রাজনৈতিক সত্ত্বাদান করে মমতা বিজেপিকে অনেকটা সুবিধা করে দিয়েছেন রাজনীতির আঙিনায় বিভাজনের কৌশল নিয়ে লড়ার। জ্যোতিবাবু মুখ্যমন্ত্রী থাকলে বিজেপির এই লক্ষ আদৌ পূরণ হত কি না, তা বুক বাজিয়ে বলার লোক বেশি পাওয়া যাবে না।
(পাঠকের নিজস্ব মতামত)

কোন মন্তব্য নেই

Blogger দ্বারা পরিচালিত.