Header Ads

আজও বরাক উপত্যকা বঞ্চনা ও অবহেলার শিকার

অমল গুপ্ত, গুয়াহাটি: আজ বিধানসভায় বরাক নিয়ে আলােচনায় কংগ্রেসের বিধায়ক কমলাক্ষ্য দে পুরকায়স্থ বলেন, সিলেট ভারতে ছিল, একাংশ সিলেট আজও ভারতে আছে। আমরা ভারতেরই সন্তান। কিন্তু আমাদের প্রতি দিসপুরের বৈষম্য-বঞ্চনা বন্ধ হচ্ছে না। বরাকে ১৯৬১ সালে ভাষা আন্দোলনে ১১ জন বাঙালি যুবকেরা প্রাণ দিলেন। পরে মনিপুরি মহিলাসহ আরও দু'জন বাংলা ভাষার জন্য প্রাণাহুতি দিয়েছেন। কিন্তু আজও তাদেরকে শহীদ হিসেবে মর্যাদা দেওয়া হল না। তারা উপযুক্ত ক্ষতিপূরণও পেল না। শিলচর স্টেশনকে আজও ভাষা শহীদ স্টেশন হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হল না—কেন্দ্রীয় সরকারের সবুজ সংকেত পাওয়া সত্বেও। অসম চুক্তির ৬নম্বর ধারা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ১৩ জন সদস্য বিশিষ্ট এক উচ্চ পর্যায়ের কমিটি গঠন করা হল। সেখানে বৃহত্তম বাঙালি জনগােষ্ঠীর কোনও প্রতিনিধিকে অন্তর্ভুক্ত করা হল না। উপজাতি গােষ্ঠীর কাউকেও গ্রহণ করা হল না। গত বাজেটে বরাকের উন্নয়নে বহু প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, তার কিছুই বাস্তবায়িত হয়নি। পাঁচগ্রাম পেপার মিল বন্ধ হয়ে গেছে। খাদ্য ও চিকিৎসার অভাবে ৪৬ মানুষ আত্মহত্যা করেছে। সেই পেপার মিল খােলার জন্য প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মােদী ও মুখ্যমন্ত্রী সর্বানন্দ সনােয়াল বহু প্রতিশ্রুতি দিয়ে গেছেন। জাগীরােড, পাঁচগ্রাম পেপার মিলদুটি আজও বন্ধ। বিদ্যুৎ ছাড়া উন্নয়ন হয় না। গতকাল করিমগঞ্জে ২৪ ঘণ্টা লােডশেডিং ছিল। ২০১৩ সাল থেকে কেভি লাইনের কাজ শুরু হয়েছে। ৯৩ টি টাওয়ারের মধ্যে মাত্র ১৩ টি টাওয়ার নির্মাণ করা হয়েছে। তিনি বিধানসভার সামনে বিদ্যুতের দাবিতে অনশনে বসেছিলেন। বিজেপি-র দিলীপ পাল দাবি করেন, বিজেপি আসার পর বরাকে অনেক পরিবর্তন হয়েছে। বিদ্যালয়, চা শিল্প প্রভৃতির ক্ষেত্রেও যথেষ্ট উন্নতি হয়েছে।
উপজাতিদের জমি বেদখল করা হয়েছিল। বন ও পরিবেশ মন্ত্রী পরিমল শুক্লবৈদ্যের উদ্যোগে তা বেদখলমুক্ত করা সম্ভবপর হয়েছে। অগপ-র রমেন্দ্র নারায়ণ কলিতা এবং  বিজেপি-র সভাপতি রঞ্জিত দাস অভিযােগ করেন, দুর্নীতির জন্য বরাকের উন্নয়ন থমকে দাঁড়িয়েছে। রমেন্দ্র নারায়ণ তার অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে বলেন, বরাকের মানুষের মানসিকতা ছিল—টাকা ছাড়া চাকরি হয় না। আমাকেও লক্ষ্মীপুরে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, চাকরি পেতে হলে কত টাকার প্রয়ােজন? রঞ্জিত দাস মুখ্যমন্ত্রী সর্বানন্দ সনােয়ালের প্রশংসা করে বলেন, তিনি পঁচিশ বার বরাক ভ্রমণে গিয়েছে। আমিও কমদিন যাইনি। এর ফলে বরাক-ব্রহ্মপুত্রের মানসিকতার দূরত্ব অনেকটাই কমেছে। আগে অনেকে বরাককে শাস্তিমূলক বদলির জায়গা হিসেবে জানতেন। এখন সেই পরিস্থিতি পাল্টেছে। তবে দুর্নীতি না কমলে বরাকের সার্বিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। তাই দুর্নীতি কমাতেই হবে।
বরাকের তিনটি সার্কিট হাউসের তুলনামূলক বিচার করে বলেন, শিলচরের সার্কিট হাউসের আলুভাজা আর ডাল ছাড়া ভালাে কিছু পাওয়া যায় না। আমরা সিদল-সহ ভালাে মাছ খেতে চাই। এআইইউডিএফ-এর বিধায়ক মামুন ইমদাদুল হক চৌধুরী দুই উপত্যকার সমন্বয়ের উপর জোর দিয়ে বলেন, ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার এক বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী বলেছিলেন, অসম থেকে বরাককে হেঁটে বাদ দিতে হবে। সেই বুদ্ধিজীবী হয়তাে জানেন না, জনগণনা অনুযায়ী বরাকে হিন্দু ধর্মাবলম্বী মানুষের সংখ্যা ৫১ শতাংশেরও বেশি। এই ধরনের মনােভাবের জন্য বরাক উপত্যকার পৃথকতাবাদী আন্দোলন জোরালাে হয়েছে।
কংগ্রেসের রূপজ্যোতি কুর্মি অসমিয়া বাঙালির সুসম্পর্কের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, ভূপেন হাজরিকার মতাে সঙ্গীতজ্ঞ, আনন্দরাম বরুয়ার মতাে বিশিষ্ট পণ্ডিত কলকাতার জল-হাওয়াতে প্রতিভা বিকাশের সুযােগ পেয়েছিলেন বাঙালিদের অবদানের জন্য। বিজেপির কৃষ্ণেন্দু পাল বলেন, চা বাগানের মালিকগােষ্ঠী শুধুই মুনাফা লুটছে। নতুন প্লান্টেশন হচ্ছে না, বিনিয়ােগও হচ্ছে না। বিষ্ণুপ্রিয়া মনিপুরি বস্ত্রশিল্প উন্নয়নে খুবই পারদর্শী। তাদের জন্য এক প্রকল্প স্থাপনের দাবি জানান। পানীয় জলের দুরবস্থা তুলে ধরে কৃষ্ণেন্দু পাল বলেন, ১৪৩ টি জলপ্রকল্পের মধ্যে ৮০ শতাংশ বাতিল হয়ে গেছে। রাজদ্বীপ গােয়ালা লক্ষ্মীপুরের মিষ্টি আনারসকে বাজারজাত করে শিল্প স্থাপনের দাবি জানান।
হস্ত-তাঁত শিল্প উন্নয়নের দাবি জানালে বস্ত্রশিল্প মন্ত্রী রঞ্জিত দত্ত বলেন—সেই দাবি মেনে নেওয়া হয়েছে। তিনি ভূবন পাহাড়, মালেডহর, খাসপুর প্রভৃতিকে পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তােলার আহ্বান জানান। সেইসঙ্গে আদম টিলা এবং বাঁশকান্দি গ্যাস প্রকল্প দুটি চালু করারও দাবি জানান। কংগ্রেস বিধায়ক রাজদ্বীপ গােয়ালা বলেন, পরিমল শুক্লবৈদ্যের নেতৃত্বে বরাকের উন্নতি হচ্ছে। মহেশ্বর বড়াে বলেন, বরাকের ক্ষুদ্র জনগােষ্ঠী খাসি ও রিয়াং, রংমাইল, মার প্রভৃতি জনগােষ্ঠীর জমির অধিকার দেওয়া হচ্ছে না, তিনি তাদের দুরবস্থার কথাও তুলে ধরেন। আমিনুল হক লস্কর জানান, পাহাড় লাইনের টানেলগুলি সিঙ্গেল লাইনের জন্য তৈরি হয়েছিল। তাই বিকল্প রাস্তার কথা ভাবতে হবে। লংকাচন্দ্রনাথপুর দ্বিতীয় বিকল্প রেললাইনের কথা ভাবতে হবে। তাছাড়া নেলি থেকে হারাঙ্গাজাও দ্বিতীয় সড়কের কথাও ভাবা যেতে পারে। আজকের আলােচনায় নিজামুদ্দিন লস্কর, আব্দুল আজিজ খান, আমিনুল হক লস্কর, জামালুদ্দিন আহমেদ, কিশাের নাথ, রিতুপর্ণ বরা, প্রদীপ হাজরিকা প্রমুখ দীর্ঘ আলােচনায় অংশ গ্রহণ করেছিলেন।

কোন মন্তব্য নেই

Blogger দ্বারা পরিচালিত.