Header Ads

১৫৪ জন চা শ্ৰমিকের মৃত্যুকে ঘিরে বিধানসভায় হুলস্থুল, ওয়াকআউট, মুলতুবি প্ৰস্তাব

সৰ্বদলীয় এক প্ৰতিনিধি দল সেখানে যাবে 

সরকার বললে এখনই পদত্যাগ করার হুমকি আবগারিমন্ত্ৰী পরিমল শুক্লবৈদ্যর

অমল গুপ্ত, গুয়াহাটিঃ  অসমে গত ২১ ফেব্ৰুয়ারি থেকে ২৫ ফেব্ৰুয়ারি পৰ্যন্ত উজান অসমের গোলাঘাট এবং যোরহাট জেলায় দেড় শতাধিক চা শ্ৰমিকের মৰ্মান্তিক মৃত্যুকে ঘিরে রাজ্য ও দেশ জুড়ে তোলপাড়, আজ অসম বিধানসভা সেই মৃত্যুকে ঘিরে উত্তপ্ত হয়ে উঠে। বিরোধীদলগুলি সদনের স্বাভাবিক কাজ কৰ্ম স্থগিত রেখে মুলতুবি প্ৰস্তাব উত্থাপনের দাবি জানান। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে অধ্যক্ষ  বিধানসভা মুলতবি করে দেন। কংগ্ৰেসের আব্দুল খালেক, দেবব্ৰত শইকিয়া, রূপজ্যোতি কুৰ্মি, কমলাক্ষ দে পুরকায়স্থ, আমিনুল ইসলাম প্ৰমুখ মুলতুবির দাবিতে হুলস্থুল পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। পুনরায় বিধানসভা বসলে কংগ্ৰেস, এআইইউডিএফ, অগপ পুনরায় মুলতুবি প্ৰস্তাবের দাবিতে সরব হয়ে উঠলে অধ্যক্ষ সেই প্ৰস্তাব অগ্ৰাহ্য করেন। প্ৰতিবাদে কংগ্ৰেস  বিধানসভা ওয়াকআউট করে। অধ্যক্ষ হিতেন্দ্ৰ নাথ গোস্বামী মুলতুবি প্ৰস্তাব অগ্ৰাহ্য করলেও বিষয়টি অত্যন্ত জরুরি এবং স্পৰ্শকাতর বলে এই বিষয়টি নিয়ে জিরো আওয়ারে আলোচনার সুযোগ দেন। প্ৰেশ্নাত্তর পত্ৰ বাতিল করে দিনভর সুরা ট্ৰ্যাজেডি নিয়ে আলোচনা হয়। সরকারের পক্ষে সংসদীয় পরিক্ৰমামন্ত্ৰী চন্দ্ৰমোহন পাটোয়ারি, স্বাস্থ্যপ্ৰতি মন্ত্ৰী পিযুষ হাজরিকা এবং চা শ্ৰমিক কল্যাণ মন্ত্ৰী পল্লব লোচন দাস সরকারের স্থিতি স্পষ্ট করেন। আবগারি মন্ত্ৰী পরিমল শুক্লবৈদ্যও ১৫০জন  শ্ৰমিকের মৃত্যুতে গভীর শোক প্ৰকাশ করে বলেন, দুভাগ্যজনক ঘটনা। তিনি বলেন, বরাকের চা বাগান অঞ্চলে তার বাস চা বাগানদের শ্ৰমিকদের মাদক দ্ৰব্য অভিযানে তিনি অংশগ্ৰহণ করে। নিয়তির কি পরিহাস আজ তাকেই চা শ্ৰমিকদের মৃত্যুর জন্য দায়ী করা হয়েছে। সরকার চাইলে তিনি এখনই পদত্যাগ করতে পারে। তিনি বলেন, মহাত্মা গান্ধীর আদৰ্শে উজ্জীবিত হয়ে অসমের চা বাগানগুলিতে একদিন আফিং খাওয়ার বিরদ্ধে অভিযান চালানো হয়েছিল। আজ সেই চা বাগানগুলিতে অবৈধ মদে রমরমা। তিনি সরকারের দায়িত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, ৯ ফেব্ৰুয়ারি অসম সরকার এক নিৰ্দেশযোগে সরকার জেলা প্ৰশাসনগুলিকে অবৈধ মদ ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্ৰহণের জন্য কড়া নিৰ্দেশ দিয়েছিল। পুনরায় জানুয়ারি মাসে প্ৰতিটি জেলায় মাদক বিরোধী অভিযান এবং সজাগতা অভিযান চালানো হয়। আবগারি আইন সংশোধন করে দোষীদের শাস্তির মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। এ পৰ্যন্ত ২৭ হাজার অবৈধ মদের কারবারিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্ৰহণ করা হয়েছে। বিধানসভায় অধিকাংশ সদস্য অবিলম্বে লালিগুড় নিষিদ্ধ করার দাবি জানায়। অধিকাংশ বিধায়কদের অভিযোগ গবাদি পশুর খাদ্য লালিগুড়ে সঙ্গে ইউরিয়া, অ্যামনিয়া প্ৰভৃতি নিষিদ্ধ দ্ৰব্য মিশিয়ে চোলাই মদ বিক্ৰি করা হচ্ছে। এই ব্যবসার সঙ্গে আবগারি বিভাগের এবং পুলিশের একাংশ যোগসাজস করে এই চোলায় মদের ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। বিহার, মিজোরামের মত অসমে মদহীন রাজ্য হিসাবে ঘোষণার দাবি জানান। এর জবাবে আবগারিমন্ত্ৰী পরিমল শুক্লবৈদ্য বলেন, চোলায় মদ বিক্ৰি বন্ধ করা যাচ্ছে না। তা তাদের নিয়ন্ত্ৰণে নেই। লালিগুড়ের বিষয়টি খাদ্য ও সরবরাহ বিভাগের অধীনে পরে। অধ্যক্ষ হিতেন্দ্ৰ নাথ গোস্বামী জরুরি ভিত্তিতে মুখ্যমন্ত্ৰী সৰ্বানন্দ  সনোয়ালের সঙ্গে কথা বলে লালিগুড় নিষিদ্ধ করার জন্য ব্যবস্থা গ্ৰহণের নিৰ্দেশ দেন। আবগারি মন্ত্ৰী বলেন, অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া হবে। মুখ্যমন্ত্ৰী সৰ্বানন্দ সনোয়ালের নিৰ্দেশ ক্ৰমে অসম সরকারের পক্ষে সংসদীয় পরিক্ৰমামন্ত্ৰী চন্দ্ৰমোহন পাটোয়ারি সরকারের স্থিতি স্পষ্ট করেন, তিনি বলেন, সৰ্বমোট ১১৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। গোলাঘাটে ৯৫ জন ৬৬ জন পুরুষ, ২৯ জনী মহিলা এবং যোরহাটে ৫৯জন মৃত্যু হয়েছে। উজান অসমের কমিশনারের নেতৃত্বে উচ্চ পৰ্যায়ে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। রাজ্যে পুলিশ কুলধর শইকিয়াকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, এই ঘটনার প্ৰকৃত কারণ খুঁজে বার করে অপরাধীদের কঠোর থেকে কঠোরতম শাস্তি প্ৰদানের ব্যবস্থা করার জন্য নিৰ্দেশ দেওয়া হয়েছে। মুখ্যমন্ত্ৰী নিৰ্দেশক্ৰমে নিহত আত্মীয়দের ২ লক্ষ টাকা এবং এই ঘটনায় গুরুতর অসুস্থদের ৫০ হাজার টাকা করে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কথা ঘোষণা করা হয়েছে। রাজ্যে একজন চা শ্ৰমিকও যাতে চোলাই মদের বলি না হয়, তা সুনিশ্চিত করা হবে। কংগ্ৰেসের রূপজ্যোতি কুৰ্মির প্ৰস্তাব মেনে যে সব পরিবারের স্বামী-স্ত্ৰী দুই জনেরই মৃত্যু হয়েছে তাদের জীবিত শিশুসন্তানদের প্ৰতিপালন করার দায়িত্ব সরকার নেওয়ার কথা বিবেচনা করবে। মন্ত্ৰী বলেন, রাজ্যে যথেষ্ট পরিমাণ ঔষুধ পত্ৰ আছে, চিকিৎসায় কোনও গাফিলতি করা হয় নি। স্বাস্থ্যপ্ৰতি মন্ত্ৰী পিযুষ হাজরিকা জানান, মুখ্যমন্ত্ৰী সৰ্বানন্দ সনোয়াল এবং স্বাস্থ্যমন্ত্ৰী হিমন্ত বিশ্ব শৰ্মা সরকারি কাজের জন্য বাইরে আছেন। তারা গোলাঘাট এবং যোরহাট মেডিকেল কলেজে ভৰ্তি শ্ৰমিকদের চিকিৎসার জন্য রাত দিন কাজ করে যাচ্ছেন। সব ঔষুধ পত্ৰ যাতে পাওয়া যায় তা সুনিশ্চিত করা হয়েছে। গতকাল ১-২ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গিয়েছিল তারপর আর মৃত্যুর খবর আসে নি। তিনি কংগ্ৰেসের দিকে আঙুল তুলে বলেন, আগে কংগ্ৰেস রাজত্বে ওদালগুড়ি, কোকরাঝাড় সহ  সাম্প্ৰদায়িক সংঘৰ্ষের জন্য কয়েক শো লোকের মৃত্যু হয়েছিল তখন তো কেউ বিধানসভা মুলতুবি প্ৰস্তাব উত্থাপন করে নি। কংগ্ৰেসের রূপজ্যোতি কুৰ্মি, এআইইউডিএফ-র আমিনুল ইসলাম, বিপিএফ-র কমল সিং নাজারি প্ৰমুখ বিধানসভার নেতৃত্বে এক সৰ্বদলীয় প্ৰতিনিধিদল গোলাঘাট এবং যোরহাটে পাঠানোর দাবি জানান।অধ্যক্ষ ঘোষণা করেন, সৰ্বদলীয় এক প্ৰতিনিধি দল সেখানে যাবে এবং পরিস্থিতি খতিয়ে দেখে উপযুক্ত পদক্ষেপ গ্ৰহণের জন্য সরকারকে পরামৰ্শ দেবেন। কংগ্ৰেসের রকিবুল হোসেন দাবি জানান, ২ লক্ষ নয় ৫ লক্ষ করে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। কংগ্ৰেসের অজন্তা নেওগ এই সুরা ট্ৰ্যাজেডিকে এই শতাব্দীর বৃহত্তম ট্ৰ্যাজেডি বলে উল্লেখ করে বলেন, আবগারি বিভাগের নেতৃত্বে সিণ্ডিকেট রাজ চলছে। অগপর বৃন্দাবন গোস্বামী এই ঘটনাকে মৰ্মান্তিক ঘটনা বলে উল্লেখ করে বলেন, চোলাই মদ এবং মাদক দ্ৰব্য ব্যাপক হারে প্ৰচলনের ফলে যুব প্ৰজন্ম আজ পঙ্গু হয়ে যাচ্ছে। সরকারের কোনও নিয়ন্ত্ৰণ নেই। সরকারের মদ নিবারণী সমিতি আছে, তার কোনও কাজ নেই। এআইইউডিএফ-র আমিনুল ইসলাম বলেন, আলোচনার জন্য আলোচনা নয়, বিহারের মত রাজ্যকে সুরামুক্ত রাজ্য হিসাবে ঘোষণা করতে হবে, সিবিআই তদন্ত দাবি জানিয়ে বলেন, আবগারি বিভাগের সঙ্গে সরকারের কোন কোন অফিসার উৎকোচ নিচ্ছে তা খুঁজে বার করতে হবে। কংগ্ৰেসের দেবব্ৰত শইকিয়া অভিযোগ করেন রাজ্যে যখন সুরা ট্ৰ্যাজেডি ঘটল তখন বিজেপি নেতারা ডিব্ৰুগড়ে নাচে-গানে ব্যস্ত। তেরেস গোয়ালা বলেন, বিট্ৰিশ আমল থেকে চোলাই মদ চলছে। নিৰ্বাচনে ভোটারদের মধ্যে মদ বিতরণ করবো না, এমন প্ৰতিজ্ঞা করতে হবে রাজনৈতিক দলগুলিকে। চা শ্ৰমিক কল্যাণ মন্ত্ৰী পল্লব লোচন দাস অভিযোগ করেন, বিট্ৰিশ আমল থেকেই চা শ্ৰমিকদের নানা ভাবে অবহেলা করা হচ্ছে। সাংগঠনিকভাবে চা শ্ৰমিকদের দূরে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। তাদের চিকিৎসা ব্যবস্থা, শিক্ষা-দীক্ষা কোনও ক্ষেত্ৰে উন্নয়ন হয় নি। তিনি প্ৰতিজন বিধায়ককে চা বাগান অঞ্চলগুলিতে গিয়ে চোলাই মদ বিরোধী সজাগতা বৃদ্ধির জন্য আহবান জানান। অগপর রমেন্দ্ৰ নারায়ণ কলিতা অভিযোগ করেন, বিহার-উত্তর প্ৰদেশে গরুকে খাওয়ানো লালিগুড় অসমে কি করে আসছে? তিনি অভিযোগ করেন, চোলাই মদের মধ্যে ইউরিয়া, অ্যাসিড মিলানো হচ্ছে। রোজলিনা তিৰ্কি, সঞ্জয় কিষাণ, রাজদ্বীপ গোয়ালা, দুৰ্গা ভূমিজ প্ৰমুখ বক্তব্য রাখেন। রাজদ্বীপ গোয়ালা বলেন, বরাকে ব্যাপক হারে মাদক দ্ৰব্যের কারবার চলছে, তা নিয়ন্ত্ৰণ করতে পারচ্ছে না সরকার, তিনি বলেন শুধু ক্ষতিপূরণ দিয়ে এই গুরুতর সমস্য সমাধান করা যাবে না। নিৰ্দল সদস্য ভূবন পেগু অভিযোগ করেন, চা বাগানে ব্যাপক হারে কীটনাশক ঔষুধ প্ৰয়োগ করার ফলে মানুষের স্বাস্থ্যজনিত ক্ষতি তো হচ্ছেই পশু-পাখীরাও মারা যাচ্ছে।

বিধানসভায়  কংগ্ৰেসের আব্দুল খালেক, কমলাক্ষ দে পুরকায়স্থ এবং এআইইউডিএফ-র আমিনুল  ইসলাম প্ৰমুখ বিভিন্ন সংবাদ পত্ৰে প্ৰকাশিত বরপেটার একই পরিবারের তিন সেনা জওয়ানকে বিদেশী সাজানোর অভিযোগ উত্থাপন করে ন্যায় বিচারের দাবি জানান। বরপেটা জেলার কলগাছিয়ার বরডাঙ্গা গ্ৰামের স্থায়ী বাসিন্দা আব্দুল হামিদের তিন পুত্ৰ শহিদুল ইসলাম, দেলবর হোসেন এবং মিজানুর রহমান তিনজনই সেনা কৰ্মী। এই তিনজনকেই বিদেশী সাজিয়ে বরপেটা জেলা প্ৰশাসন হয়রাণি করছে অভিযোগ তুলে সরকারের দৃষ্টি আকৰ্ষণ করে।

No comments

Powered by Blogger.