বাংলা ভাষা আন্দোলনে শহীদদের অন্যতম ছিলেন Dhirendra Dutta তাকে নৃশংস তার হত্যা করে
শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত।
ডিসেম্বর বিজয়ের মাস, ভারতীয় ভাষা পরিবারের ঐতিহ্যবান শাখা বাংলাভাষার ভিত্তিতে গঠিত হওয়া রাষ্ট্রের অঙ্কুর প্রোথিত হয়েছিল যে মাসে।খান সেনার নরখাদক বাহিনীর শীর্ষ নরখাদক আমের আবদুল্লাহ খান নিয়াজির আত্মসমর্পনের ছবি বাংলাদেশ তথা উপমহাদেশের ইতিহাসের মাইলস্টোন।জেনারেল অরোরার সামনে হোস্টলার খুলে রাখা একটা সমাপতন।শুরু কিন্তু বহু আগে।১৯৪৮ সালে।যার সঙ্গে জুড়ে যান কুমিল্লার এক উজ্জ্বল সন্তান ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত।ভারতে স্বাভাবিক ও সম্পন্ন জীবনযাপনের হাতছানি ছেড়ে যিনি পরে রইলেন মাতৃভূমি কুমিল্লার মাটিতে।
১৯৪৮সালের মার্চ মাস।স্থান নবজাতক রাষ্ট্রের রাজধানী করাচি।মহাম্মদ আলী জিন্নার সাধের পাকিস্তানে তখন একটাই ভাষার আধিক্য।উর্দু।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে চোস্ত ইংরেজিতে সেকথা জানিয়ে দিয়ে গেছেন।'উর্দু এন্ড অনলি উর্দু শ্যাল বি দ্য ষ্টেট ল্যাঙ্গুয়েজ অফ পাকিস্তান'।
ডঃ অশোক মিত্র নিজে ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্ট্রাল হলে।আবেগে উদ্বেলিত ছাত্ররা আওয়াজ তোলে 'কায়েদে আজম জিন্দাবাদ,রাষ্ট্র ভাষা বাংলাও হোক'।নবগঠিত পাকিস্তানের প্রতি কোনও বীতরাগ গরিষ্ঠ বাঙালি মুসলমান ছাত্রছাত্রীদের ছিল না।তাঁদের দাবী মাতৃভাষা সমমর্যাদার আসন পাক।ক্রুদ্ধ নয়নে, রোষায়িত ভঙ্গিমায় ক্ষয়রোগ আক্রান্ত ভারতীয় লিব্রেলদের নয়নের কর্নিয়াকায়েদে আজম হলত্যাগ করেন।ঐটা বোধয় জনৈক ক্ষয়রুগীর জীবনের সবচে বড় সাফল্যের কবর খোঁড়ার সূত্রপাত ঘটিয়েছিল।
যাই হোক ৪৮এর ফেব্রুয়ারিতে করাচিতে ফিরে যাওয়া যাক।করাচির অধিবেশন ছিল আক্ষরিক অর্থে ঐতিহাসিক।পাকিস্তানের গণপরিষদের আসনে সেদিন মুলতুবি আনলেন কুমিল্লার এক আইনজীবী।ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত।রাষ্ট্রভাষার প্রশ্নে যুক্তি তাঁর শানিত।
“দেশের ছয় কোটি নব্বই লক্ষ নাগরিকের মধ্যে চার কোটি চল্লিশ লক্ষ মানুষ বাংলা ভাষায় কথা বলেন। তা হলে আপনিই বলুন মহাশয়, রাষ্ট্রভাষা কী হওয়া উচিত?... একটা রাষ্ট্রের রাষ্ট্রভাষা তো সেই ভাষাই হওয়া উচিত, যাতে বেশির ভাগ মানুষ কথা বলেন।” তৎকালীন নবগঠিত পাকিস্তানের জনসংখ্যা ভিত্তিক পরিসংখ্যান ধীরেন্দ্রনাথের বক্তব্যকেই তুলে ধরবে।তিন জনের থেকে সমর্থন পেলেন।
জবাবি উত্তরে লিয়াকত আলী ধীরেন্দ্রনাথকে ব্যক্তিগত আক্রমণ করলেন।বাংলার মুসলিম লীগের হোতারা নিশ্চুপ রইলেন।
লিয়াকত বললেন “উপমহাদেশের কোটি কোটি মুসলমানের দাবিতে পাকিস্তানের জন্ম এবং তাঁদের ভাষা উর্দু। কাজেই বেশির ভাগ জনগণ যে-ভাষায় কথা বলেন, তাকে প্রাধান্য দিতে যাওয়া ভুল হবে।” তিনি পাকিস্তানকে ‘এক জাতি, এক দেশ, এক ভাষা’র তকমা দিতে চাইলেন, ১১ মার্চ গণপরিষদে ‘রাষ্ট্রভাষা উর্দু’ মর্মে বিল পাশ হল।এখনও সেবিলের জোরে ভূমিজ পাঞ্জাবি, বালুচি, সিন্ধি, কচ্ছি, মেমনি ,পুস্তু ভাষা ব্রাত্য।ইসলাম ও একমাত্র উম্মাহর ধোঁয়াটে, কাঠামোহীন, অবাস্তব নেশনের ধারণা ছাড়া পাকিস্তানের কোনও বুনিয়াদ ছিল না।বাংলা ভাষার পক্ষে মশাল জ্বালিয়ে রাখলেন ধীরেন্দ্রনাথ।পক্ষে কেবল তিনজন প্রতিনিধি।
প্রেমহরি বর্মা, ভূপেন্দ্র কুমার দত্ত এবং শ্রীশচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়।বিপুল ভোটে উর্দু রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃত পেল।কি অদ্ভুত অধিবেশনে স্পিকার একজন বাঙালি ।তাজিমুদ্দিন খান।
ধীরেন্দ্রনাথ তেঁজগাঁও বিমানবন্দরে ফিরে অভূতপূর্ব জনসমর্থন পেলেন।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা দুহাত ভরে সমর্থন দিলেন বাংলা ভাষার এই দুরন্ত ক্রুসেডারকে।১১মার্চ সাবেক পূর্বপাকিস্তানে পালিত হলো বাংলা ভাষা দিবস।
এককথায় রাষ্ট্রের চোখে তখন থেকেই শূলের মতো বিঁধেছিলেন ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত।৬৫র ভারত পাক যুদ্ধে গৃহবন্দি হলেন।আর একাত্তরে ময়নামতির সেনা ক্যাম্পে পাকি নরমেধের অন্যতম বলি হলেন ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত।
কি ভাবে?কুমিল্লার ময়নামতির সেনাক্যাম্পের খৌরকার রমণী শীলের সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন রশীদ হায়দার।নিজের বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিগ্রন্থে তাঁর উল্লেখ নিম্নরূপ।
'ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের উপর যে অমানবিক নির্যাতন হয়েছে তা দেখে কোন সুস্থ ও বিবেকবান মানুষের চোখের জল সংবরণ করা সম্ভব নয়। সাখাওয়াত আলী খান প্রদত্ত এক সাক্ষাৎকারে জানা যায়
“ধীরেন বাবু সম্পর্কে বলতে গিয়ে রমণী শীলের চোখের জল বাঁধন মানেনি। মাফলারে চোখ মুছে তিনি বলেন, ‘আমার সে পাপের ক্ষমা নেই। বাবু স্কুলঘরের বারান্দায় অতি কষ্টে হামাগুড়ি দিয়ে আমাকে জেজ্ঞেস করেছিলেন কোথায় প্রস্রাব করবেন। আমি আঙ্গুল দিয়ে ইশরায় তাকে প্রস্রাবের জায়গা দেখিয়ে দিই। তখন তিনি অতি কষ্টে আস্তে আস্তে হাতে একটি পা ধরে সিঁড়ি দিয়ে উঠানে নামেন। তখন ঐ বারান্দায় বসে আমি এক জল্লাদের দাড়ি কাটছিলাম। আমি বারবার বাবুর দিকে অসহায়ভাবে তাকাচ্ছিলাম বলে জল্লাদ উর্দুতে বলে, ‘এটা একটা দেখার জিনিস নয়-নিজের কাজ কর।’ এরপর বাবুর দিকে আর তাকাবার সাহস পাইনি। মনে মনে শুধু ভেবেছি বাবু জনগণের নেতা ছিলেন, আর আজ তাঁর কপালে এই দুর্ভোগ। তাঁর ক্ষতবিক্ষত সমস্ত দেহে তুলা লাগান, মাথায় ব্যান্ডেজ, চোখ ও হাত বাঁধা অবস্থায় উপর্যুপরি কয়েকদিনই ব্রিগেড অফিসে আনতে নিতে দেখি।”
এভাবেই জনসমক্ষে ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের শেষবার দেখা যায়।তাঁর দেহ পাওয়া যায়নি।পরবর্তী কালে তাঁর উত্তরপুরুষ তাঁর স্থাবর, অস্থাবর সম্পত্তি দাবি করতে গেলে, মৃত্যুর শংসাপত্র চাওয়া হয়।অনাদায়ে তাঁকে ফেরার ঘোষণা করা হয়।কারণ সেটি বঙ্গবন্ধুর মৃত্যু পরবর্তী বাংলাদেশ।যেখানে রাষ্ট্রপিতার ঘাতকের দল কেউ বাংলাদেশের দূতাবাসে ও প্রশাসনে সর্বোচ্চ সম্মান নিয়ে চাকুরীরত।
আজ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে এই মহান ভাষাসৈনিককে আমাদের শ্রদ্ধাঞ্জলি |
© সম্রাট চক্রবর্তী
তথ্যসূত্রঃ
ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস, বদরুদ্দীন ওমর।
আনিসুজ্জামান, রশীদ হায়দার ও মিনার মনসুর সম্পাদিত (১৯৯৫)। শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত।
বাংলার ইতিহাস জানতে চান ? যদি প্রকৃত ইতিহাস জানতে চান তাহলে অবশ্যই পড়ুন ইতিহাসবিদ রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের বই "বাঙ্গালার ইতিহাস" । বাংলার ইতিহাস নিয়ে এইরকম গবেষণামূলক বই একটিও নেই ।
আমাজন লিংক : https://amzn.to/3MP7d4v








কোন মন্তব্য নেই