হোজাই, লামডিং অসমের বাঙালিদের স্বাভিমান, সেই কেন্দ্রের দিকে সবাই তাকিয়ে
অমল গুপ্ত, গুয়াহাটি
বিজেপি
সরকারের সময় অসমে দ্বিতীয়দফা
নির্বাচন। এই বিজেপি সরকার জাতীয়
নাগরিকপঞ্জি রূপায়ণ করেও থমকে
গেছে। বছর ঘুরতে চললো
নাগরিকপঞ্জি থেকে ১৯ লাখ ৬ হাজার ৬৫৭ জনকে
বাদ দেওয়া হয়েছে। তাদের ভোট দানের অধিকার থাকবে কি? কারণ
বৃহৎ সংখ্যক ডি ভোটারদের নাম তালিকা থেকে বাদ গেছে। ১৯৯৭ সাল থেকে ডি
ভোটারদের ভোট দানের মত সংবিধান প্রদত্ত অধিকার থেকে বঞ্চিত করে রাখা হয়েছে। এবার
তারা কি করে ভোট দেবেন? যার তত্ত্বাবধানে এই নাগরিকপঞ্জি প্রস্তুত করা
হয়েছে, সেই সুপ্রিমকোর্টের
প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি রঞ্জন গগৈ জোরালোভাবে দাবি করেছেন তালিকায়
সঠিক সন্দেহর কারণ নেই, অথচ বিজেপি সরকার বলছে, এই
তালিকা তারা মানবেন না। লক্ষ লক্ষ বাংলাদেশির নাম ঢুকে গেছে। এই ১৯ লাখ তালিকা ছুট বাংলাভাষী হিন্দুদের
সংখ্যা সর্বাধিক তাদের অধিকাংশের বাস মধ্য অসমে, নগাঁও, হোজাই, লামডিং, জাগিরোড প্রভৃতি
কেন্দ্রে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে।
বরাক উপত্যকা নিয়ে প্রায় ৯০ লাখ বাঙালি
হিন্দু আজ উপেক্ষিত নানা বঞ্চনার শিকার। মধ্য অসমের হোজাই, লামডিং অসমের বাঙালিদের স্বাভিমান, অর্ত্ম মর্যাদার কেন্দ্র।
এই অঞ্চল থেকে বাংলাভাষা
অধিকারের আন্দোলনের সূত্রপাত হয়। নিজেদের
ভাষা-সংস্কৃতি তুলে ধরতে প্রাণ পণ
লড়ে যাচ্ছে দুই কেন্দ্র। বিজেপি এই দুই
কেন্দ্রে আছে। ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার সংখ্যা গরিষ্ঠ
হিন্দু বাঙালি অধ্যুষিত কেন্দ্র হোজাই ১৯৫৯ সালে
ডিলি মিটেশন হওয়ার পর বিধানসভা কেন্দ্র হিসেবে
মর্যাদা পায়। প্রথম বিধায়ক মহম্মদ ইদ্রিস, তারপর পাঁচবার বিধায়ক হয়েছেন শান্তিরঞ্জন দাস গুপ্ত। ১৯৮৩ সালে
সাধনরঞ্জন সরকার জয়ী হন। পরে আসেন ডাক্তার
অর্ধেন্দু কুমার দে। এই হোজাই শহর বাঙালিদের
রাজনৈতিক নিরাপত্তা প্রদান করেছিল। গোলাম ওসমানীর মত মানুষেরা শহরে
ইউ এম এফ দল গঠন করে সারা রাজ্যে প্রভাব সৃষ্টি করতে সক্ষম
হয়েছিলেন। ১৭ জন বিধায়ককে বিধানসভায় পাঠাতে সামর্থ হয়েছিলেন। অসমের
হিন্দ মুসলিম বাংলাভাষী মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করতে এক
ভূমিকা নিয়েছিল এই ঐতিহাসিক হোজাই শহর। আবার এই শহরে বদরুদ্দিন আজমলের এআইইউডিএফের
জন্ম হয়। যেখানে বাঙালি হিন্দুদের কোনো
স্থান নেই বললেই চলে। আবার এই শহরের উপকণ্ঠে
আরএসএস-এর প্রধান কেন্দ্র গীতাশ্রম। বিজেপি
দলের শক্তিশালী ঘাঁটি। আরএসএসের
সুপ্রিমো সর্বভারতীয় তাত্ত্বিক
নেতা মোহন ভাগবত এই শহরে কাটিয়ে
যান। তাই রাজনৈতিক দিক থেকে খুবই গুরুত্ব পূর্ণ কেন্দ্র, বরাক উপত্যকাও তাকিয়ে থাকে হোজাইয়ের
রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের দিকে। শুধু রাজনৈতিক দিক থেকে নয়, অর্থনীতির দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ এই
নবগঠিত জেলা হোজাই। রাজ্যের ধান উৎপাদন করে সর্বোচ্চ পরিমান। তাই ভান্ডার বলেও
পরিচিত। তাছাড়া, হোজাইবাসী সাংসদ
বদরুদ্দিন আজমল এই শহরকে সারা
বিশ্বের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন।
তার ব্যবসার কাঁচামাল
আগর এই শহরে প্রস্তুত হয় যা থেকে
উন্নতমানের সুগন্ধ সমগ্র
বিশ্বের শ্রদ্ধা আদায় করতে
সমর্থ হয়েছে। তা কি অসমবাসীর গর্ব নয়? এই সবদিক
থেকে হোজাইয়ের গুরুত্ব সমধিক। তাই বিধানসভাতে এমন কোনো
প্রার্থীকে নির্বাচন করা উচিত যার বাঙালি
স্বাভিমান থাকবে, নিজস্ব
ভাষা-সাংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধা থাকবে।
বিজেপি বিধায়ক শিলাদিত্য দেব তার
নেতা-মন্ত্রী হিমন্তবিশ্ব শর্মার গোপন এজেন্ডা সফল করতে সময় পার
করলেন। শুধুই হিন্দু মুসলিম বিভাজন, মুসলিম বিরোধী
স্লোগান আর আপত্তিকর নানা
মন্তব্য তাতে শিলাদিত্যের থেকেও
বাঙালি জাতির ক্ষতি হয়েছে বেশি। বাঙালিরা উদার
মানসিকতার। বিভাজনের রাজনীতি করে না। আসন্ন
নির্বাচনে বিজেপি তালিকা
ছুট ১৯ লাখের
ভোট পাবে কি? আর মুসলিমদের ভোট নিয়েও
সন্দেহ আছে। বাঙালি হিন্দু ভাগ হবে। তাই শিলাদিত্যকে
কঠিন প্রতিদ্বন্দীর সম্মুখীন হতে হবে। তবে ব্যক্তি
শিলাদিত্য গুরুত্ত না পেলেও বিজেপি দল হিসেবে গুরুত্ব পাবে, বিজেপি রাজ্যের পরিকাঠামো উন্নয়নে বেশ
কিছু কাজ করেছে। তা অস্বীকার করা যাবে না। হোজাই
কংগ্রেস দলের ভিত্তি আছে। গত
নির্বাচনে পরাজিত ডাক্তার অর্ধেন্দু কুমার দে
তার পুত্র অনিরুদ্ধ দেকে প্রোজেক্ট
করতে চাইছেন। কংগ্রেস
স্থানীয় যুবনেতা বিশ্বজিৎ ঘোষ, দেবব্রত সাহা, শংকর
মালাকার, সুপ্রতিম কর প্রমুখরা
প্রার্থীর জন্যে চেষ্টা করছেন। ঝিল্লি চৌধুরীর নামও শোনা যাচ্ছে। নগাঁওয়ের
আদি বাসিন্দা রাজ্যের বাঙালি হিন্দুদের বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে জড়িয়ে
আছেন চিত্তরঞ্জন পাল।
চিত্ত
রঞ্জন পাল, প্রদেশ কংগ্রেস
সভাপতি রিপুন বরা তার নাম প্রস্তাব করেছেন বলে রাজীব
ভবন সূত্রে জানা গেছে। সূত্রটি জানান,
হোজাই, লামডিঙের বাঙালি
ভোটারদের জটিল নানা সমস্যা সম্পর্কে চিত্ত
পাল অবগত। তার সম্ভবনা উজ্জ্বল। অপরদিকে, লামডিঙের
যোগ্য প্রার্থী স্বপন
কর। বিজেপির হাওয়াতে তিনি পরাজিত হয়েছিলেন। এবার সেই
হাওয়া নেই। লামডিঙের দেবেশ চক্রবর্তী বিধানসভার
অধ্যক্ষ পদে আসীন হয়ে লামডিঙের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করেছিলেন।
বিধানসভায় বাঙালির স্বাভিমানকে তুলে ধরছিলেন। বিজেপির পরিকাঠামো উন্নয়ন
বিশেষ প্রভাব ফেলবে
না রেল শহরে। লামডিঙের লক্ষ লক্ষ মানুষ বছরের
পর পাট্টা পাননি। বিজেপি ভূমিপুত্রকে পাট্টা দিচ্ছে, লামডিঙে ৬০/৭০ বছর বসবাস করার পরও
ভূমিপুত্র হতে পারলেন না। লামডিং
রেল শহর প্রায় ৭০ শতাংশ
মানুষ রেলের জমিতে বসবাস করে। রেল যেভাবে বেসরকারিকরনের
দিকে ঝুঁকেছে তাতে ব্যাপক
উচ্ছেদের এক এক আতঙ্ক থেকেই যায়। বর্তমান
বিজেপি বিধায়ক শিবু মিশ্র কি আজ পর্যন্ত রেল কর্তৃপক্ষের
সঙ্গে একটিও বৈঠক করেছেন? মেয়াদি পাট্টা প্রদান
নিয়ে বাঙালিদের সঙ্গে চরম
বঞ্চনা করা হল, সে
ব্যাপারে বিধানসভাতে একটি শব্দও খরচ করতে
এই প্রতিবেদক দেখেনি। স্বপ্নন
কর রেল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কয়েক দফা কথা বলেছিলেন। রাজ্য বাজেটে সব বিধানসভা নিয়ে
আলোচনা হয়। লামডিং রেল এলাকার বাইরে লক্ষ লক্ষ ভূমিহীন
মানুষের সমস্যার কথা স্থান পায় না কেন? লামডিঙের
শিক্ষিত বেকারদের নিয়ে কেউ ভাবে না। শহরের উপকণ্ঠে হাজার হাজার বিঘা আখ
উৎপাদিত হয়। হিন্দিভাষী মানুষ অশেষ কষ্ট করে তা উৎপাদন করে তাদের
উন্নয়নের কথা, হাজার হাজার মেট্রিক
টন গুড় উৎপাদিত হয়, সব গুড় নাগাল্যান্ডে চলে
যায়। এই গুড় দিয়ে মদ তৈরি হয়। কত কোটি
টাকার ব্যবসা? বিধায়ক
মিশ্র সরকারকে অবগত করেছেন কিনা।
বহুদিন পর লামডিঙে গিয়ে দেখলাম লামডিং আছে লামডিঙেই। সেই মদ,
সেই জুয়ার বোর্ড, রেলের তেল
চুরি, জঙ্গল সব শেষ। তবে রেল স্টেশনগুলোর উন্নয়ন
চোখে পড়ার মত। কংগ্রেস দল আবার স্বপন করকে প্রার্থী
করবে তা প্রায় পাকা। বিজেপি সুশীল দত্তকে
প্রার্থী করতে পারে, তবে
শিবু মিশ্রের পাল্লা ভারী। যেই হন না কেন লামডিঙের রেলের
জমি বেদখল সমস্যা, মিয়াদি পাট্টার সমস্যা সমাধান
করতে না পারলে লামডিঙের স্বাভিমান, মর্যাদা সব ধূলায় লুটিয়ে যাবে। দিসপুর
মোটেই চায় না বিজন সিংহের
মত নেতাজি প্রেমী, বাঙালি
প্রেমী আর কারো উত্থান হোক।









কোন মন্তব্য নেই