Header Ads

আওকিগাহারা অরণ্য

বিশ্বদেব চট্টোপাধ্যায়

যেখানে আত্মহত্যার জন্য দলে দলে ছোটে মানুষ। জাপানের আওকিগাহারা অরণ্যের কুখ্যাতি চলে আসছে সেই প্রাচীনকাল থেকেই। জাপানি পৌরাণিক কাহিনীতে উল্লেখ আছে এই অরণ্যে বাস করে ভূত-প্রেত আর দেব-দৈত্য। ১৯৬০ সালে দেশটির বিখ্যাত উপন্যাসিক সেইচো মাটসুমোটো তার জনপ্রিয় উপন্যাস ‘নামি নো টো’র (তুরঙ্গদুর্গ) সমাপ্তি টানেন এই অরণ্যেই। তার উপন্যাসের নায়ক-নায়িকা এখানে এক সঙ্গে আত্মহত্যা করেন। এমনিতেই আত্মহত্যার জন্য দলে দলে লোকজন ছুটে আসতো এই অরণ্যে। তার উপর আবার উপন্যাসের নায়ক-নায়িকার প্রেমের সমাপ্তি এই গভীর অরণ্যে, বইটি বাজারে আসার পর সেখানে আত্মহত্যার সংখ্যা আরো বেড়ে যায়। নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর অরণ্যটিকে অনেকে বলে থাকেন গাছের সমুদ্র। কারণ এখানে গাছপালার ঘনত্ব এতো বেশি যে বাতাস পর্যন্ত প্রবেশ করতে পারে না। বাস করে না কোনো পশুপাখি। খুবই নিরিবিলি ও শান্ত থাকে এখানকার পরিবেশ। জাপানের ফুজি পর্বতমালার পাদদেশের উত্তর-পশ্চিমে বনটির অবস্থান। ফুজি পবর্তমালা থেকে নির্গত আগ্নেয়শিলার উপর অরণ্যটি গড়ে উঠেছে। বনের ভূত্বক খুবই এবড়ো-থেবড়ো। অরণ্যে কেউ আত্মহত্যার উদ্দেশ্যে প্রবেশ করলে তাকে খুঁজে পাওয়া বড়ই দুষ্কর। ২০০২ সালে এখান থেকে উদ্ধার করা হয় ৭৮টি মৃতদেহ। ২০০৩ সালে এ সংখ্যা এসে দাঁড়ায় ১০০তে। পরের বছর পাওয়া যায় ১০৮টি মৃতদেহ।

২০১০ সালে ২৪৭ জন আত্মহত্যার প্রচেষ্টা চালালেও সফল হয় মাত্র ৫৪ জন। ১৯৭০ সাল থেকে প্রতিবছর সেনাবাহিনী, পুলিশ ও ভলান্টিয়াররা সাংবাদিকদের উপস্থিতিতে মৃতদেহ উদ্ধারে বনে অভিযান চালায়। আত্মহত্যা ঠেকাতে অরণ্যের বিভিন্ন প্রান্তে ইংরেজি ও জাপানি ভাষায় বিভিন্ন চিহ্ন আঁকা হয়েছে। লাগানো হয়েছে নানা সাইন বোর্ড। বনের আশপাশের গ্রামের মানুষও প্রতিবছর এতো মানুষের মৃত্যু দেখে দেখে ক্লান্ত। তারা বনের প্রবেশমুখ গুলোতে সিসিটিভি ক্যামেরা বসিয়েছে। ৪৬ বছর বয়সী টারো একটি লোহাপ্রস্তুতকারী কোম্পানিতে চাকরি করতেন। হঠাত্ তাকে চাকরি থেকে বহিষ্কার করা হলো। হতাশায় মূহ্য টারো একটি নোট লিখলেন ‘আমার বেঁচে থাকার ইচ্ছা ফুরিয়ে গেছে। আমি আমার চাকরি-পরিচয় সবই হারিয়েছি। তাই আমি আর এই পৃথিবীতে বেঁচে থাকতে চাই না। তাই আমি সেখানে যাচ্ছি। তিনি করলেন কী- তার হাত লম্বা করে ছিঁড়ে ফেললেন, ভেবেছিলেন এতে রক্তক্ষরণ হয়ে তার মৃত্যু ঘটবে; কিন্তু কপাল মন্দ- তার মৃত্যু হলো না। বনে ঘুরে বেড়াতে লাগলেন। ক্ষুধা ও পিপাসায় কাতর তারো কয়েক রাত এক ঝোপের মধ্যে পড়ে রইলেন। শরীরে দেখা দিল পানিশূন্যতা। প্রচণ্ড ঠান্ডায় পায়ে ফ্রস্টবাইট দেখা দিল। পরে এক হাইকার টারোকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করে।

কোন মন্তব্য নেই

Blogger দ্বারা পরিচালিত.