প্রসঙ্গ : জনসংযোগে ‘দিদিকে বলো’ !!
বিশ্বদেব চট্টোপাধ্যায়
প্রথমেই একটি সাড়ম্বরে প্রচারিত
খবরকে কেন্দ্র করে একটা ছোট্ট অঙ্ক কষে নিতে হচ্ছে। খবরটা হল--প্রথম এক
দিনেই লক্ষাধিক ফোন ধরেছেন দিদি ! একদিন মানে ২৪ ঘন্টা--২৪ ঘন্টা মানে
১,৪৪০ মিনিট--তার মানে ৮৬,৪০০ সেকেণ্ড ! সেকেণ্ডের হিসেবে যাচ্ছি না।
বিস্ময়কর গতিময়তা মানুষের থাকলেও একটা ফোন করে অন্য দিকে সাড়া পেতে এবং
স্রেফ ‘হাই-হ্যালো’ করতে হলেও কম করেও এক মিনিট--অর্থাৎ ৬০ সেকেণ্ড সময়
লাগার কথা। এই নির্ভেজাল অঙ্ক মোতাবেক ২৪ ঘন্টায় লক্ষাধিক ফোন যাওয়ার কথা
যতটা অসম্ভব তার চেয়ে আরও অনেক বেশি অসম্ভব সারাদিন সব কাজকর্ম শিকেয় তুলে
এই লক্ষাধিক ফোন ধরা বা শুধুমাত্র--‘ঠিক আছে আমি দেখে নেব--নো প্রবলেম !’
এইটুকু কথা বলাও মানুষ তো দূরের কথা অত্যাধুনিক যন্ত্রের পক্ষেও সম্ভব নয়।
তাহলে প্রশান্ত কিশোরের মস্তিষ্কপ্রসূত এই সাড়া জাগানো জনসংযোগ কর্মসূচীর
প্রযুক্তিগত বিষয়টা ঠিক কি রকম?
প্রশান্ত কিশোরের আই-প্যাক সংস্থা
পরিচালিত ও গঠিত এই ‘দিদিকে বলো’ জনসংযোগের পুরোটাই কম্প্যুটর
নিয়ন্ত্রিত--যার ৯০%-ই ভয়েস-রেকর্ডারের মাধ্যমে তৈরি করা হয়েছে। একজন ফোন
করলেই দিদির রেকর্ডেড ভয়েসে--‘ঠিক আছে, আমি দেখে নেব, ধন্যবাদ’ কথাটা শোনা
যাবে না। এটা শুনতে হলে বেশ কয়েকটা ধাপ পেরিয়ে যেতে হবে। তারপরেও নিশ্চয়তা
নেই ঐ কথাগুলো শোনা যাবে কি না ! অনেকেই ‘এরর’-এর ধাক্কায় ছিটকে
যাবেন--অনেকেই সংযোগ স্থাপনেই ব্যর্থ হবেন।
তবে এটা নিশ্চিত
যে--যন্ত্র যদি বিগড়ে না যায় তাহলে আই-প্যাকের রেকর্ড সিস্টেমে দিনে কয়েকশো
অভিযোগ রেকর্ড হবে--অভিযোগের গুরুত্ব অনুযায়ী। নেতাদের বিরুদ্ধে যদি
নালিশ-অভিযোগ বা তাদের তৈরি সমস্যা সংক্রান্ত ফোন যায় তাহলে সেগুলোর গুরুত্ব
বুঝে শর্ট-লিস্টেড করে মুখ্যমন্ত্রীর কাছে পাঠানো হবে--মুখ্যমন্ত্রী
সেগুলো শুনে বুঝে নেবেন তাঁর নেতা-কর্মীরা ঠিক কি করছেন বা ভাবছেন। সেই
মোতাবেক ব্যবস্থা নেওয়া সহজ হবে--এবং সব ব্যবস্থাই আই-প্যাকের পরামর্শ
অনুযায়ী নেওয়া হবে বলেই মনে করা যেতে পারে। কিন্তু এতে জনসংযোগ বলতে যা
বোঝায় তার কতটা কি হবে সেটা জনগণই বুঝে যাবেন সবার আগে। ইতিমধ্যেই অনেকে
বুঝতে পারছেন বলে শোনা যাচ্ছে।
এই ‘দিদিকে বলো’ শীর্ষক অভিনব জনসংযোগ
কর্মসূচী বাজারে চালু করে ফেলে প্রশান্ত কিশোর দলের নেতা-কর্মীদের রীতিমতো
উদ্বেগের মধ্যে ঠেলে দিতে পেরেছেন। এটাই তাঁর লক্ষ্য ছিল। নেতা-কর্মীদের
চাল-চলন কাজকর্ম ঠিক কোন দিশায় চলেছে তার হদিশ পেতে দিনে কয়েকশো ভেসে আসা
ফোনকলের মাধ্যমেই রেকর্ড করে রাখা যাবে এবং সেগুলো বিশ্লেষণ করে প্রশাসনিক
স্তরে যাচাই করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করাও সহজ হবে। মুখ্যমন্ত্রীও
প্রতিনিয়ত তাঁর দলের শীর্ষস্তর থেকে তৃণস্তর পর্যন্ত সাংগঠনিক পরিস্থিতি
সম্পর্কে ওয়াকিবহাল থাকতে পারবেন। আই-প্যাক তাদের কর্পোরেট মেধায় এমনটাই
ভাবছে।
কিন্তু মুশকিল হল--তৃণমূলের তৃণস্তর পর্যন্ত যারা দলের সঙ্গে
যুক্ত রয়েছে তাদের মেধার সঙ্গে আই-প্যাকের মেধার কোনরকম সম্পর্ক বা সাদৃশ্য
নেই। যদি থাকতো তাহলে আই-প্যাকের একের পর এক প্রেসক্রিপশনের ধাক্কায়
বেসামাল হতে হত না। ‘কাটমানি’ সংক্রান্ত পরামর্শের জেরে প্রায় লণ্ডভণ্ড হতে
বসা সংগঠনকে সোজা পায়ে দাঁড় করানোই অসম্ভব হয়ে উঠছে যখন--তখনই আবার একটা
বড়সড় ধাক্কা নেতাকর্মীদের রাতের ঘুম ও খাওয়ার রুচি কেড়ে নিয়েছে। আই-প্যাকের
পরামর্শে দিদি নিদান হেঁকেছেন--নেতা-বিধায়কদের কর্মীদের নিয়ে বিজেপি’র
দাপট বেড়েছে এমন সব অঞ্চলে গিয়ে রাত কাটাতে হবে--অঞ্চলের লোকেদের সঙ্গে
খাওয়া দাওয়া করতে হবে। এতে জনসংযোগ বৃদ্ধি পাবে !
প্রশ্ন হল--দিনের
আলোয় যেসব জায়গায় দলের কাটমানিখোর হিসেবে চিহ্নিত দাগী স্থানীয়
নেতা-কর্মীরা জনগণকে মুখ দেখানোর সাহস পাচ্ছেন না তাঁরা রাতের অন্ধকারে
খানা-পিনা-জনসংযোগ কি করে করবেন?
কেউ কেউ জনা পঞ্চাশেক বন্দুকধারী
পুলিশ-র্যাফ-সিভিক নিয়ে নৈশ অভিযানে গেলেও কাদের নিয়ে যাবেন--নিশ্চিতভাবেই
দাগী দাপুটেদের নিয়েই যাবেন--কিন্তু জনসংযোগ কি হবে? এই গুরুতর প্রশ্নের
উত্তর দেবার দায় আই-প্যাকের নেই। তারা কর্পোরেট পরামর্শ দিতেই
অভ্যস্ত--সুতরাং বাস্তবের মাটিতে দাঁড়িয়ে আত্মরক্ষার কথা নেতা-কর্মীদেরই
ভেবে ঠিক করতে হবে--এবং তাদের নিজস্ব ভাবনা-চিন্তার সঙ্গে আই-প্যাকের ভাবনা
চিন্তা যে অনেকাংশেই মিলবে না তা বলাই বাহুল্য।
একের পর এক
আই-প্যাকের পরামর্শের ঠেলায় প্রাণ ওষ্ঠাগত হয়ে উঠেছে নেতা-কর্মীদের--কিন্তু
বিন্দুমাত্র আওয়াজ তোলা যাচ্ছে না। আই-প্যাকের নির্দেশ মোতাবেক প্রায় সঙ
সেজে বুড়ো থেকে ছোঁড়া সকলকেই ‘দদিকে বলো’ কোরাস গাইতে হচ্ছে !
আমার
একটা সন্দেহ কিন্তু বেশ দানা বাঁধছে। প্রশান্ত-কিশোর তার এই কর্পোরেট
মালমশলা দিয়ে বিজেপি’র রান্নাঘর বেশ সমৃদ্ধ করে তুলেছিল--আজ পর্যন্ত
আই-প্যাক বিজেপি’র বিন্দুমাত্র অস্বস্তির কারণ হয় নি। তার সব ফর্মূলাই
বিজেপি’র জানা এবং প্রতিষেধকও তাদের হাতে তৈরি ! সুতরাং প্রশান্ত কিশোর
বাংলার রাজনৈতিক কালচার--মমতার রাজনৈতিক জীবনের খুঁটিনাটি ইতিহাস, সর্বোপরি
বাংলার মানুষের রাজনৈতিক চেতনা-চিন্তন সম্পর্কে প্রয়োজনীয় সমীক্ষা
বিশ্লেষণ করেছেন বলে আমার মনে হচ্ছে না--করে থাকলে তিনি এই ধরণের একের পর
এক দিশেহারা বেসামাল করে দেওয়ার মতো পরামর্শ দিয়ে এই রাজ্যে বিজেপি’র
স্বস্তি বৃদ্ধি করতেন না। জানি না, মমতা কেন কাদের পরামর্শে বা প্ররোচনায়
এইভাবে পুরোপুরি প্রশান্ত নির্ভর হয়ে উঠলেন ! এইসব পরামর্শের ধাক্কায় যে
তার দলের কাঠামো দ্রুত নড়বড়ে হয়ে পড়ছে তিনি কি সেটা উপলব্ধি করতে পারছেন
না? প্রশান্ত কিশোরের ওপর ১০০% নির্ভরশীল না হয়ে তিনি তাঁর সংগঠনের
খোল-নলচে একেবারে বদলে ফেলছেন না কেন কে জানে ! পাশাপাশি প্রশাসনিক ও
ত্রিস্তর পঞ্চায়েত এবং পুর প্রশাসনের ঘুঘুর বাসাগুলোকে যে অবিলম্বে ভাঙ্গা
জরুরি সেটাও কেন ভাবছেন না বলা মুশকিল। হাতে কিন্তু সময় খুবই কম এবং
প্রতিপক্ষ কংগ্রেস-সিপিএম নয়--মোদী-অমিতের বিজেপি--ফুৎকারে উড়িয়ে দেওয়ার
ভাবনা আত্মঘাতী হতে বাধ্য !!









কোন মন্তব্য নেই