Header Ads

কাছাড়ের বড়খলা অঞ্চলের কমিউনিস্ট আন্দোলনের পুরোধা ব্যক্তিত্ব ছিলেন সোনা সিংহ



ধরিত্রী শর্মা, মণীন্দ্র সিংহ 
তোনজম সোনা সিংহ বিষয়ে কিছু লিখতে গেলে তার কৈশোর বয়সের কথা সর্বাগ্রে মনে আসে। মনে আসে তেভাগা আন্দোলনের ইতিহাস। প্রখ্যাত কমিউনিস্ট নেতা, মনিপুরের জননায়ক হিজম ইরাবত সিংহের সংস্পর্শে আসেন কিশোর বয়সেই এবং তাঁরই বামপন্থী আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন কমরেড সোনা সিংহ। কাছাড়ের বড়খলা অঞ্চলের জারইলতলার ভিতর গঙ্গাপুরের বাসিন্দা তোনজম সোনা সিংহ জন্মগ্রহণ করেন ১৯২৯ সালে। নিজের সব ধরনের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য ত্যাগ করে সাধারণ খেটে খাওয়া শ্রমিক-কৃষক ও মেহনতি মানুষের মধ্যে থেকে তাদেরকে সংগঠিত করতে বরাক উপত্যকার বিভিন্ন গ্রাম শহর ঘুরে অক্লান্ত পরিশ্রম করতেন।
১৯৪৫ সালের মে মাসে বর্তমান বাংলাদেশের ময়মনসিংহ জেলার নেত্রকোণায় নিখিল ভারত কৃষক সভার এক ঐতিহাসিক সম্মেলনে যোগদানের জন্য কমিউনিস্ট পার্টির নেতা, সদস্যদের ছাড়াও ভিতর গঙ্গাপুর এলাকার সাংস্কৃতিক কর্মীরাও অংশগ্রহণ করেছিলেন। সেই দলে ছিলেন ইরাবত সিংহ, গৌরনিতাই সিংহ, কামিনী সিংহ, চন্দ্রকুমার সিংহ, চন্দ্রেশ্বর সিংহ, গৌরমনি সিংহ, ফল সিংহ, বাবুরেন সিংহ ও জ্ঞানেন্দ্র সিংহ। সেই সম্মেলন থেকে তৎকালীন পূর্ববঙ্গ ও বরাক উপত্যকার কৃষকরা আন্দোলনের নতুন দিশা ও প্রেরণা পেয়েছিলেন।
চল্লিশের দশকে বড়খলার একটি মনিপুরি গ্রাম রংঘরে অনুষ্ঠিত খেতমজুর সম্মেলনে শ্রেণি সংগ্রাম এবং সংঘর্ষের রণনীতি গৃহীত হল। অভূতপূর্ব ওই খেতমজুর সম্মেলনের পর ডিব্রুগড়ে গণনাট্য সংঘের সম্মেলন ও রাজ্যিক শান্তি সম্মেলনে যোগ দেবার ডাক আসে। ১৯৪৯ সালের ১৫, ১৬ ও ১৭ জুলাই সম্মেলনে প্রতিনিধি হিসাবে কমিউনিস্ট পার্টি থেকে যোগ দেন তরুণ কৃষক নেতা সোনা সিংহ ও অনুরূপা বিশ্বাস। সম্মেলনের দুদিন আগে বিহাড়া স্টেশন থেকে তারা ট্রেনে চেপে ডিব্রুগড়ে পৌঁছলেন পরের দিন রাত বারোটা নাগাদ।  সম্মেলন শুরুর আগেই ভোর হতে না হতেই বিশাল পুলিশ বাহিনী ঘিরে ফেলল নালিয়াপুল রেল মজদুর কলোনি। সে সময় কলোনির গেটে পুলিশ বাহিনীকে বাধা দিতে গিয়েছিল প্রচুর শ্রমিক ও পার্টির কর্মীরা। সবাই দল বেঁধে গিয়ে পুলিশ বাহিনীর মুখোমুখি হয়েছিল। তারপর গুলি চলল। অন্তত সাতজন ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান। ঘর থেকে টেনে টেনে পুরুষদের পেটাতে পেটাতে নিয়ে গেল পুলিশ। নালিয়াপুলের এই ঘটনা ইতিহাস হয়ে রইল।
               ১৯৪৯-এর ১ ডিসেম্বর বড়খলায় ঘটে গেল এক অবিস্মরণীয় ঘটনা। বরাক উপত্যকায় তেভাগা সংগ্রামে কৃষকদের জঙ্গি আন্দোলনের ওটাই ছিল শীর্ষবিন্দু। মাঠের ধান কেটে গোলাজাত করার সময় কৃষকরা স্থির করল এবার তারাই গোলায় ধান তুলবে। দেখতে দেখতে মাঠে মাঠে ধান কাটার ধুম পড়ে গেল। বিতর্কিত জমিগুলোর ধান কাটার দায়িত্ব নিল কৃষক সভা। এমনই এক উচ্ছেদ জমির ধান কাটার দিন পড়ল নভেম্বরের শেষ তারিখে। সকাল হতেই লাল ঝাণ্ডা নিয়ে, গান গেয়ে,  স্লোগান দিয়ে একটা ছোটোখাটো দল এগিয়ে গিয়ে নামল নির্দিষ্ট জমিতে। হাতে হাতে ধান কাটা শেষ হয়ে গেল দুপুরের মধ্যে। ধানের আটিগুলো জমা করা হল ভিতর গঙ্গাপুর ও পাঞ্জিগ্রামের মাঝখানের এক গ্রামের বাড়ির উঠানে। সঙ্গে সঙ্গে ধান মাড়াই করে বিলি করে দেওয়া হয় উচ্ছেদ চাষি ও ভূমিহীন খেতমজুরদের মধ্যে। পরের দিন সকালবেলা ভিতর গঙ্গাপুরে পার্টির লোকাল কমিটির সভা বসেছে, আগের দিনের ঘটনার বিশ্লেষণ ও পরবর্তী কর্মপন্থা নির্ধারণের জন্য। লোকাল কমিটির নেতৃত্বে ছিলেন জয়কুমার সিংহ, গৌর সিংহ, গৌরহরি সিংহ ও সোনা সিংহ।  তখন হবে সকাল দশটা। একজন কর্মী এসে খবর দিল গাড়ি ভর্তি পুলিশ এসে পাঞ্জিগ্রামে নেমে পড়েছে। নির্ভয়ে তরুণ নেতারা ও তার সঙ্গে ছাটাই চা-শ্রমিক সনাতন বাউরি বেরিয়ে পড়লেন। ভিতর গঙ্গাপুর ছাড়িয়ে মাঠের পর মাঠ তারপর পাঞ্জিগ্রামের পেছনে গাছগাছালির দুর্ভেদ্য দেওয়াল। মাঠের মাঝখানে গুলি চলল, শহিদ হলেন জয়কুমার সিংহ, গৌরহরি সিংহ, গৌর সিংহ আর সনাতন বাউরি। ধানের মাঠ রক্তে লাল হল। এদিনই পরে শহিদ হলেন আরেক মহিলা, পাঞ্জিগ্রামের ইমাচৌ দেবী। মুহূর্তের মধ্যে গ্রামের নারী-পুরুষ নির্বিশেষে ঝাঁটা, লাঠি ইত্যাদি হাতে নিয়ে এগিয়ে এসে জড়ো হয়েছিলেন ওই রক্তাক্ত জমিতে, এগিয়ে গিয়েছিলেন পুলিশের মুখোমুখি হতে। মৃতদেহগুলি গাড়িতে তুলে পুলিশ দ্রুত পালিয়েছিল শহরের দিকে। তেভাগার এই আন্দোলনের অন্যতম সক্রিয় কর্মী ছিলেন কমরেড সোনা সিংহ।
কমিউনিস্ট পার্টির উপর নিষেধাজ্ঞা তুলে দেওয়ার পর পার্টির নেতা-কর্মীরা মুক্ত চলাফেরা করার সুযোগ পান। সোনা সিংহও পার্টির কাজের সাথে সাথে কৃষিকাজ ও ব্যবসার কাজ শুরু করেন। ১৯৬০ সালে অবিভক্ত সোনাপুর গাঁও পঞ্চায়েতের সভাপতি নির্বাচিত হন। সভাপতি থাকাকালে এলাকার উন্নয়নের জন্য সরকারের কাছ থেকে বিভিন্ন প্রকল্প আদায় করেছিলেন।
নকশালবাড়ি বিদ্রোহের পর সংশোধনবাদী পথ ও বিপ্লবী পথ নিয়ে বিতর্ক দেখা দেয় এবং ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী-লেনিনবাদী) গঠিত হয়। সিপিআই (এম-এল) -এর জন্মলগ্ন থেকেই কমরেড সোনা সিংহ কমিউনিস্ট আন্দোলনের এই বিপ্লবী ধারার সাথে নিজেকে যুক্ত করেন। এর পর থেকেই জাতি-বর্ণগত শোষণের বিরুদ্ধে এবং সমাজ পরিবর্তনের লক্ষ্যে পিসিসি সিপিআই (এম-এল) -এর নির্দেশে শ্রমিক-কৃষকের বিপ্লবী সংগঠন গড়ে তুলতে ব্রতী হন। এই বিপ্লবী সংগঠন গড়ে তুলতে তিনি বরাক উপত্যকা তথা আসামের বিভিন্ন প্রান্তে ঘুরে বেড়ান ও গ্রামীণ মেহনতি মানুষদের মধ্যে সংগঠন গড়ে তোলার কাজ করেন। কমরেড সোনা সিংহ ছিলেন অসীম সাহসী। পার্টির আÍগোপনকারী সর্বক্ষণের কমরেডদের নিয়ে গ্রামাঞ্চলে ঘুরে ঘুরে বিপ্লবী কাজকর্ম চালিয়ে গেছেন। এমনকি দেশে জরুরি অবস্থা চলাকালীন সময়েও তা অব্যাহত ছিল। পার্টির বিপ্লবী কর্মসূচি প্রচারের লক্ষ্যে শিলচর লোকসভা আসনেও তিনি একবার পিসিসি সিপিআই (এম-এল) দলের হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন ও ট্রেড ইউনিয়নের সাথেও জড়িত ছিলেন তিনি। মনিপুরি সাহিত্য পরিষদ, আসাম-এর বড়খলা শাখার সভাপতি থাকাকালে মনিপুরি সাহিত্য ও সংস্কৃতির উন্নতির জন্য বিভিন্ন কাজ করে গেছেন সোনা সিংহ। মনিপুরিদের নিজস্ব সংগঠন পরিচালনার ক্ষেত্রেও তিনি সর্বদা মেহনতি মানুষের ঐক্যের বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে সব জনগোষ্ঠীর ঐক্যের জন্য মতাদর্শগত সংগ্রাম করতেন। তিনি সকল  ধর্মীয় ও জনগোষ্ঠীগত সংকীর্ণতার বিরোধিতা করেছেন আজীবন। জীবনের শেষদিন পর্যন্ত তিনি পিসিসি সিপিআই (এম-এল) পার্টির সদস্য ছিলেন ।
গত ২৯শে অক্টোবর ২০১৮, সোমবার সকাল ৮.২০ মিনিটে ৮৯ বছর বয়সে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। দুই পুত্র, দুই কন্যা, নাতি-নাতনি সহ রেখে গেছেন অসংখ্য গুণমুগ্ধ। তাঁর মৃত্যুতে তেভাগা শহিদ স্মৃতিরক্ষা কমিটি বড়খলা, অসম মজুরি শ্রমিক ইউনিয়ন এবং বিভিন্ন  সংগঠন ও ব্যক্তি গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। আজীবন কমিউনিস্ট, মেহনতি মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ের বীর সেনানী কমরেড তোনজম সোনা সিংহ অমর হয়ে থাকবেন আমাদের স্মৃতিতে।

কাছাড়ের বড়খলা অঞ্চলের কমিউনিস্ট আন্দোলনের পুরোধা ব্যক্তিত্ব কমরেড সোনা সিংহ


চন্দন সেনগুপ্ত
আজ থেকে প্রায় পঞ্চাশ বছর আগে ১৯৬৯ সালের অক্টোবর মাসে সোনাদার সাথে আমার প্রথম পরিচয়। বয়সের হিসাব মনে হয় তাঁর নিজেরই জানা ছিল না। ১৯৪২ সালে জননেতা হিজম ইরাবত সিংহ যখন বড়খলায় আসেন কমিউনিস্ট আন্দোলনের প্রসারে, তখন সোনা সিংহ ছিলেন ১৪ বছরের কিশোর, তা তিনি আমাদের বলেছেন। ছোটো বয়সে আমরা জানতাম যে বড়খলা ও পাথারকান্দি হচ্ছে কমিউনিস্টদের শক্তিশালী সাংগঠনিক কেন্দ্র। তখন আমার ধারণা ছিল যে মনিপুরি মাত্রেই কমিউনিস্ট। যদিও সে বয়সে কমিউনিস্ট আন্দোলন নিয়ে আমার তেমন আগ্রহ ছিল না।
১৯৬৭ সালে নকশালবাড়ি কৃষক আন্দোলন সংগঠিত হওয়ার সময়ে আমি উজান অসমের নাহারকাটিয়া বিদ্যামন্দির স্কুলে সহকারী প্রধান শিক্ষক হিসেবে চাকরি করতাম। নকশালবাড়ি আন্দোলনের ঘটনাপ্রবাহ আমার চিন্তা-চেতনাকে উদ্বুদ্ধ করে এবং চাকরি ছেড়ে দিয়ে বিপ্লবী আন্দোলনে যোগ দেওয়ার প্রস্তুতি নিই। তখনই একবার গুয়াহাটি থেকে শিলচরে আসার সময় বাসে একজন ভদ্রলোকের কাছ থেকে দক্ষিণ দেশনামক একটি পত্রিকা পড়ার সুযোগ পেলাম, যেখানে নকশালবাড়ি আন্দোলনের খবরাখবর ছিল। পরে জানতে পেরেছিলাম সহযাত্রী ভদ্রলোক না কি বিপ্লবী কার্যকলাপের জন্য পুলিশের গুলিতে শহিদ হন। পরবর্তীতে আমি এই পত্রিকাটির গ্রাহক হই। সে সময়েই একজন ভদ্রলোক একদিন আমার বাড়িতে এলেন। তার সাথে বিপ্লবী রাজনীতি নিয়ে আলোচনা হয় এবং আমি সেই কর্মকাণ্ডের সাথে যুক্ত হওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করলাম। তখন তিনি লেনিনের একটি উদ্ধৃতি দিয়ে বলেছিলেন — ‘organ itself is an organization’ এবং আমাকে পত্রিকা প্রকাশনার কাজ করতে উৎসাহিত করলেন। সেটা আমার মনে খুব দাগ কেটেছিল। সেই ভদ্রলোক ছিলেন নকশালবাড়ি আন্দোলনের নেতা সৌরিন বসু। এরপরই আমি আহুতিনামে একটি পত্রিকা সম্পাদনার কাজ শুরু করি ও তাতে নকশালবাড়ির খবরাখবর প্রাধান্য সহকারে ছাপতে থাকি।
আহুতিপত্রিকার প্রতিটি সংখ্যায় সুকান্ত ভট্টাচার্যের কবিতার একটি লাইন থাকত — ‘বিপ্লব স্পন্দিত বুকে মনে হয় আমিই লেনিনপত্রিকাটির তিন চারটি সংখ্যা ছাপার পর একদিন হঠাৎ সোনা সিংহ ও দ্বিজমনি সিংহ এসে আমার কাছে জানতে চাইলেন যে আমি কি আমাকে লেনিনমনে করি ? আমি সেদিন বহু কষ্টে তাদেরকে বোঝাতে পেরেছিলাম যে সেটা সুকান্তের একটি কবিতার লাইন।
১৯৪২ সাল থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত সোনাদা কমিউনিস্ট রাজনীতির সাথে যুক্ত ছিলেন।  ভিতর গঙ্গাপুরের গৌরনিতাই সিংহ, চন্দ্রেশ্বর সিংহ ও অন্যান্যদের সাথে মিলে মেহনতি মানুষের মুক্তি ও সাম্যবাদ প্রতিষ্ঠার জন্য অবিরত চেষ্টা চালিয়ে গেছেন। কমিউনিস্ট আন্দোলনের প্রসারের জন্য শিলচর লোকসভা আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাও করেছিলেন। অবিভক্ত সোনাপুর জিপির সভাপতি নির্বাচিত হয়ে এলাকার জনগণের স্বার্থে কাজ করে গেছেন। ভারতবর্ষের বিভিন্ন জায়গায় বিপ্লবী রাজনীতির সভা-সমিতি ইত্যাদিতে যোগদানে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতেন। বরাক উপত্যকার কমিউনিস্ট আন্দোলনের ইতিহাসের মূল্যায়নে কমরেড সোনা সিংহের অবদান বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ।


No comments

Powered by Blogger.